ভুলে থাকার সময় নয়

জওহরলাল নেহরুকে বাঙালি কোনও দিনই বিশেষ পছন্দ করেনি। ব্যক্তিগতভাবে নেহরুভক্ত বাঙালি অনেকই আছেন হয়তো, কিন্তু সাধারণভাবে বাঙালি সমাজে নেহরুর প্রতি সদয় মনোভাব দেখা যায়নি কখনওই। তার অনেকগুলো কারণ। একটা বড় কারণ নিশ্চয়ই সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে তাঁর জটিল টানাপড়েন। একটা সময় পর্যন্ত মতামতের দিক থেকে দুজনের রীতিমত মিল ছিল, উনিশশো ত্রিশের দশকে জাতীয় পরিকল্পনা কমিটি তৈরির উদ্যোগ ছিল নেহরু এবং সুভাষের, গান্ধীজির ও নিয়ে কোনও উৎসাহ ছিল না। কিন্তু ওই দশকের শেষের দিক থেকেই মনান্তর শুরু হল, কংগ্রেসের নেতৃত্ব নিয়ে গান্ধী বনাম সুভাষ দ্বন্দ্বে নেহরু, দলের অন্য অনেক নেতার মতোই, গান্ধীর পক্ষে থাকেন। তার পর সুভাষচন্দ্রের কংগ্রেস ত্যাগ, ফরওয়ার্ড ব্লক তৈরি, স্বাধীন ক্রিয়াকলাপ, মহানিষ্ক্রমণ এবং আজাদ হিন্দ ফৌজ, অক্ষশক্তির সাহায্য নিয়ে ইংরেজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা ইত্যাদি। নেহরুর সঙ্গে বিরোধই কেবল নয়, আদর্শগত দূরত্বও কেবলই বেড়ে চলল। পরে, সুভাষচন্দ্রের ‘বিমান দুর্ঘটনা’ এবং পরবর্তী কালে তাঁর জীবনের পরিণতি নিয়ে দীর্ঘ তর্কবিতর্ক, যার সর্বজনস্বীকৃত মীমাংসা হয়নি আজও। এই গোটা ব্যাপারটার মধ্যে দিয়ে নেহরু বহু বাঙালির মন থেকে ক্রমশই আরও দূরে সরে গেলেন, অনেকের কাছে এমনকী খলনায়কে পরিণত হলেন তিনি।

এর পাশাপাশি আর একটা ঘটনাও ঘটল স্বাধীনতার পরে। কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক নীতিতে পশ্চিমবঙ্গ মার খেল। বেদম মার খেল বললেও ভুল হবে না। যেহেতু সেই সময় অর্থনৈতিক বিচারে অন্য প্রায় সব রাজ্যের থেকে এগিয়ে ছিল সে, তাই নেহরু এবং তাঁর সহকর্মীরা বললেন, রাজ্যে রাজ্যে সমতা আনার জন্য পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যকে আত্মত্যাগ করতে হবে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ও সেই যুক্তি মেনে নিলেন। শুধু তাই নয়, পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আসা উদ্বাস্তুদের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার প্রচুর সাহায্য করলেও পূর্ব পাকিস্তানের উদ্বাস্তুদের জন্য কার্যত কিছুই করলেন না, নেহরুরা বললেন তাঁরা ফিরে যাবেন, তাই এটা সাময়িক সমস্যা! স্বাভাবিকভাবেই বাঙালির নেহরু-বিরোধিতা আরও বাড়ল।

আজ, জওহরলাল নেহরু চলে যাওয়ার অর্ধ শতাব্দীর বেশি অতিক্রান্ত হওয়ার পরে, যখন কেন্দ্রীয় সরকারের শাসকরা তাঁর ঐতিহ্য এবং আদর্শ ও মতামতকে নানা দিক থেকে আক্রমণ করছেন, তখন বাঙালি তাঁকে কীভাবে দেখে? কীভাবেই বা দেখবে? সে কি পুরনো বিরূপতাকে আঁকড়ে ধরে থাকবে? সে কি সেই পুরনো বিরূপতার ঊর্ধ্বে উঠে নেহরুর বৃহত্তর আদর্শ এবং কাজকর্মকে তার প্রাপ্য মর্যাদা দেবে? সে কি গোটা প্রশ্নটাকেই অগ্রাহ্য করবে? দেখেশুনে মনে হয়, তৃতীয় সম্ভাবনাটাই সবচেয়ে বেশি প্রবল। এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এবং বৃহত্তর সমাজের অঙ্গনেও যে সব তর্কবিতর্ক, দ্বন্দ্ব, টানাপড়েন চলছে, তাতে নেহরুর নাম প্রায় উচ্চারণই করা হয় না। তাঁর জন্মদিনেও বাঙালি মোটের ওপর চুপ।

অথচ এখনই সময় তাঁর ধারণাগুলিকে এবং তাঁর নীতি ও কর্মসূচিগুলিকেও খতিয়ে দেখা, তাদের থেকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা নেওয়া। অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলি নিয়ে সমস্যা আছে, সমালোচনা আছে, কিন্তু সেই সমালোচনার মধ্যে থেকেই এই মুহূর্তের রাজনীতিতে উত্তরণের পথের সন্ধান মিলতে পারে। এখন তাঁকে ভুলে থাকার সময় নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

pakhi

ওরে বিহঙ্গ

বাঙালির কাছে পাখি মানে টুনটুনি, শ্রীকাক্কেশ্বর কুচ্‌কুচে, বড়িয়া ‘পখ্শি’ জটায়ু। এরা বাঙালির আইকন। নিছক পাখি নয়। অবশ্য আরও কেউ কেউ