বনপলাশীর পদাবলী

বনপলাশীর পদাবলী

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
purulia
বাঘমুন্ডি পাহড়। ছবি ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়।
বাঘমুন্ডি পাহড়। ছবি ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়।

পুরুলিয়াকে আমার মনে হয় সেই আলগোছে খোঁপা আলতো হাতে বাঁধা আদুড় গায়ের এক আলুথালু শ্যামলা সুন্দরীর মত। নাক মাটামাটা চোখ ভাসা সাঁওতালিরা যেমন হয়। তাদের গড়নপেটনে যেমন একটা আঁটোসাঁটো ভাব থাকে অথচ লালিত্য যেন উপচে পড়ে মাথার খোঁপায় একটা বুনোফুল গুঁজলে। পুরুলিয়ায় পা দিলেই আমি দূর থেকে যেন শুনতে পাই ধামসা মাদলের দ্রিমি দ্রিমি। গন্ধ পাই মহুয়ার। আর শালপলাশ আকাশমণির ঘন জঙ্গলে বনফুলের যৌবনগন্ধ নিতে নিতে যেন একছুট্টে পৌঁছে যাই পাহাড় থেকে তিরতির করে ঝরে পড়া ঝর্ণার সামনে অথবা অচেনা নদীর কৃত্রিম জলাধারের পাশে।  

বহুবারের দেখা পুরুলিয়ার টানে পা বাড়িয়েছিলাম ভূত চতুর্দশীর ভোরে, হাওড়া থেকে রাঁচি-শতাব্দী এক্সপ্রেসে । এটি বড় সুখকর রেলযাত্রা। রেলের আতিথেয়তায় আবারও মুগ্ধতা। বেলা বারোটায় মুরি স্টেশনে নেমেই অযোধ্যা পাহাড়ের কোলে মুরগুমার ইকোরেসর্ট বনপলাশীর গাড়ি আমাদের নিয়ে চলে পাহাড়ের ধারে নির্জনতায়। কেন এই রেসর্টের নাম বনপলাশী সেখানে পা দিয়েই বুঝতে পারি। যে পলাশের জন্য বসন্তে শহুরেদের হাহাকার হয় সেই পলাশের নিসস্ব টেরিটরি।  

হেমন্তে যদিও বসন্তের পলাশবীথি শূন্য কিন্তু পুরুলিয়ার প্রকৃতির ঠান্ডা হিমেল হাওয়াই দুটোদিনের জন্যে যথেষ্ট আমাদের ষ্ট্রেস আর স্ট্রেইন উধাও করতে।  বৃষ্টিস্নাত সবুজের সজীবতা তো র‌ইলোই আষ্টেপৃষ্টে সেটাই দুচোখ ভরে নি‌ই আপাততঃ।  

গাড়ি থেকে নেমেই বনপলাশীর কেয়ারটেকার জলধর কে শুধাই আচ্ছা এ গ্রামের নাম মুরগুমা কেন? সে উত্তর দেয়, আগে প্রচুর ময়ূর ঘুরে বেড়াত বটে। এখন এত গাছ কেটে হোটেল হবার দরুণ তারা পালিয়েছে। ময়ূরের গ্রাম থেকেই আদিবাসীদের গ্রাম মুরগুমা বটে। তার মানে বর্ধমানের মোরগ্রাম‌ও তেমনি। অতএব একটা সরল সমীকরণ মনে মনে খাড়া করি। ময়ূরের গ্রাম> মোরগ্রাম> মুরগুমা। বটে। 

সেই পলাশ প্রান্তরে আমাদের কটেজে থাকার বন্দোবস্ত। দু’রাত, তিনদিন। কটেজের মাথায় খড়ের চাল। দেওয়ালে ছৌ নাচের রকমারী মুখোশ। সামনে উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছ খলবল করছে। দূরে অযোধ্যা পাহাড়ের হাতছানি।  

অযোধ্যা পাহাড়ের সর্বোচ্চ শৃঙ্গটি প্রায় ৭০০ মিটার উঁচু। ট্রেন থেকেও এই খোঁচাটি দেখা যায়। এই অযোধ্যা পাহাড়ের নামকরণের পেছনে স্থানীয় মানুষজনের এক মিথ এখনো প্রতিধ্বনিত হয় পাহাড়ের গায়ে। সীতাকুন্ড, রামমন্দির যার অন্যতম সাক্ষী। সীতাকুন্ডে আপনা হতে ভূগর্ভস্থ জল বুড়বুড়ি কেটে বেরোয়। রামচন্দ্র নাকি সীতার তৃষ্ণা মেটাতে পাতালভেদী বাণ নিক্ষেপ করে কুন্ড সৃষ্টি করেন । কাছেই সীতা চাটান, তাঁদের বিশ্রামের জায়গা। তার পাশেই গড়বাগান। সেখানকার শালগাছ থেকে নেমে আসা প্রাকৃতিক ঝুরিগুলিকে সীতার চুল ভাবে ওরা । এইসব গল্প শুনতে শুনতে সময় গড়িয়ে গেল মধ্যাহ্নভোজের অলস দুপুরে। বিকেলে পায়ে হেঁটে বাঁধের ধার । সন্ধের আগেই পাখপাখালীর ঘরে ফেরার গান শুনতে শুনতে ফেরা। মাঝেমধ্যেই হাতি বেরোনো বিচিত্র নয় এখানে। তবে অরণ্যমেধ যজ্ঞের কারণে বন্যপ্রাণীরা বেশ বিপন্ন।  

ফিরে এসে দূরের আদিবাসী গ্রামে আলো জ্বলে ওঠা দেখে মনে পড়ে যায় বীরসা মুন্ডাদের কথা। তাদের লড়াইয়ের কাহিনী আজও অব্যাহত। সমাজের মূলস্রোতে ফিরে আসা মাওবাদীদের গল্প থেকে সাঁওতালদের চিরাচরিত বঞ্চনার কথা, ছত্রেছত্রে না পাওয়ার বেদনা, সরকারী অনুদান ঠিকমত না পৌঁছনোর দুঃখ তাদের আজীবন লড়াকু করে রেখে দিল। তবে পাহাড়ী মেয়েমরদেরা এখানে খাটতে পারে কিন্তু খাটার মানসিকতা নেই। হচ্ছে, হবে এমন দীর্ঘসূত্রী। রেসর্টেই চলে ছৌ নাচের অনুশীলন। বুকিং করলে শো দেখাতে প্রস্তুত তারা।  

স্থানীয় আদিবাসীদের শিখিয়ে পড়িয়ে নিয়েছেন রেসর্টের মালিক। সন্ধে হতেই ঘরে ঘরে পৌঁছে গেল মুড়িমাখা আর পকোড়া। তবে রাতে গরম রুটি দিয়ে বেগুণ ভর্তার সঙ্গে মুরগীর ঝোল জমে গেল ।  ভূতচতুর্দশীর মধ্যরাতে জমাট বাঁধা অন্ধকার আকাশে ফুটফুটে তারা বুঝি এসব অঞ্চলেই দেখা যায়। সেই সঙ্গে শোনা যায় মাদলের আওয়াজ। দূরের গ্রামে নাচাকোঁদার সঙ্গে সঙ্গে মহুয়া কিম্বা হাঁড়িয়ার আসর আর সঙ্গে ঝলসানো মাংসের গন্ধটাও যেন ভেসে এল নাকে।   

পরদিন ভোরে উঠেই চায়ে চুমুক দিয়েই শীর্ণনদীর ড্যামের ধারে। হেমন্তের মিষ্টি রোদ মেখে ফিরে এসে প্রাতঃরাশ। তারপরেই গাড়ি করে আশেপাশে ঘোরাঘুরি। দিনকয়েক আগের বৃষ্টিভেজা আর্দ্রতা শুষে নিল রোদ। চলতে চলতে ভুরভুর করে ভেজামাটির সোঁদাগন্ধ । শরতের কাশ মনখারাপে শয্যা নিয়েছে হেমন্তের তড়িঘড়ি আগমনে।  

নামলাম মার্বেল লেকে। অপূর্ব নৈসর্গিক লেকের স্থানীয় নাম পাতাল ড্যাম।  শুনিনি আগে। এমন প্রাকৃতিক জলাশয় আর মার্বেল

Marble Lake পুরুলিয়া
মার্বল হ্রদ (ছবি ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়)

পাথর ছাড়াও চারিদিকে অদ্ভূত সুন্দর পাথরের আলম্ব গঠনশৈলী । এত সুন্দর ভূতাত্ত্বিক শিলা এখানে? শ্বেতপাথরের অনেকটাই কেটে কেটে নিয়ে গেছে কেউ। তবে কালো এবং অন্যরঙের প্রচুর মার্বেল পাথর রয়েছে সেখানে। উঁচুতে  তাকিয়ে দেখিয়ে একফালি ঝর্ণা তিরতির করে নেমে এসেছে লেকের জলে। অমন আশ্চর্য পাহাড়ের মধ্যিখানে একফালি নীল জলাশয়। স্থানীয় মানুষদের দারিদ্র্য সেখানে লুটেপুটে খাচ্ছে প্রকৃতি। ছোট ছোট ছেলেপুলেরা হাত পাতে এসে। গায়ে জামা নেই কারও। মন ভারি হয়। আবার বৈপরীত্যের নমুনাও যুগপত হাঁটছে সেখানে। হার্লে ডেভিডশন কিম্বা হন্ডা মোটরবাইকে নতুন হেয়ারকালারে তরুণ প্রজন্ম বিয়ারের বোতল ফেলে রেখে চলে যায়। জঙ্গুলে গ্রামে শহরায়নের সব অনুষঙ্গগুলি মজুত। মহার্ঘ ম্যাগির প্যাকেট থেকে পেপসির বোতল সব আছে পড়ে। পাহাড়ী মেয়ের মাথায় স্তূপাকৃতি গাছের পসরার পাশাপাশি ছেলেদের তাপ্পিমারা জিনসের সঙ্গে হাতে স্মার্টফোনও আছে। এর নাম‌ই বুঝি ব্যাপক বিশ্বায়ন।      

এবার গন্তব্য ভিউ পয়েন্ট। বেশ অনেকটা উঁচুতে উঠে পাহাড়ের মাথা থেকে এক ঝলকে আবিষ্কার করা যায় পুরুলিয়ার প্রকৃতিকে।  শাল, মহুয়া, পলাশ, আকশমণি আর বিড়ির পাতার কেন্দুগাছের জঙ্গলটি পাখীদের স্বর্গরাজ্য । তবে জঙ্গলের অতন্দ্র প্রহরায় থাকা লম্বা লম্বা গাছগুলি অনেক কেটে ফেলা হয়েছে। শহরায়নের করালগ্রাস ধেয়ে আসছে অতি দ্রুত।    

Bamn বামনি
বামনি ঝর্ণা (ছবি ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়)

এবার অযোধ্যা পাহাড় থেকে বাগমুন্ডীর দিকে।সেই চড়াই পথে পড়ে দুটি ঝর্ণা।বামনি আর টুর্গা ফলস।ভারি সুন্দর লাগে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গিয়ে আঁকাবাঁকা চড়াই উত্‌রাই পথ বিশাল বিশাল পাথরের ওপর দিয়ে নিয়ে চলে ঝর্ণার সামনে।বামনি ঝর্ণা থেকে আরেকটু এগুলেও টুর্গা ফলস। যেন অবাধ্য যুবতীর মত উঁচু থেকে একলাফে আত্মসমর্পণ করেছে টুর্গা ড্যামে।  

বাগমুন্ডী থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার গেলেই পড়বে ছোট্ট গ্রাম চড়িদা। ছৌ নাচ তথা ছৌ মুখোশ তৈরীর আঁতুড়ঘর। গালগল্পে মুখর দুপুর। ঘরে ঘরে আবাল বৃদ্ধ বনিতার রুজি রোজগার। এই মুখোশ শিল্প নিয়ে যা আজ সারাবিশ্বেও সমাদৃত ।  মিথ বলে ছৌনাচের ছ’রকম কোরিওগ্রাফি তাই এমন নাম। হিন্দু দেবতাদের মুখাবয়ব কেন মুখোশে? 

শিবদুর্গার বিয়েতে উপস্থিত ভূতপ্রেতিনীর দলকে যে পাতায় খেতে দেওয়া হয়েছিল তা দিয়ে তারা মুখোশ বেঁধে অভিনব নৃত্য পরিবেশন করেছিল। ঠিক যেন এখনকার কালের বিয়ের “সঙ্গীত”। আবার দক্ষযজ্ঞের সময় সেই লন্ডভন্ডের মূহুর্তে তারা দক্ষরাজাকে ভয় দেখাতে সেই ভূতের নেত্য দেখায়।  

লোকসংস্কৃতির এই অনবদ্য ধারাটি নাকি ইহকাল এবং পরকালের শুভাশুভের বার্তা দেয়। প্রায় ২০০ বছর আগে  বাগমুন্ডীর রাজারা চড়িদায় একটি নিষ্কর জমি দান করেন। প্রতিমা নির্মাণের জন্য সূত্রধরদের প্রধান কাজ ছিল পুরাণের দেবদেবীর চরিত্রের মুখাবয়ব অনুযায়ী মুখোশ তৈরী করা। এখানে বংশানুক্রমে নিযুক্ত আছেন প্রায় ৭০ টি পরিবার। অনেকে মনে করেন ছৌ বা ছো শব্দটির উত্পত্তি ছাউনি থেকে। সেনা ছাউনিতে সৈন্যদের অবসর বিনোদনের জন্য‌ই নাকি সৃষ্টি এই নাচের। তবে উদ্দাম বাদ্যযন্ত্রের আবহে পুরাণ মহাকাব্য‌ই হল এই নাচের মুখ্য বিষয়বস্তু।     

আধুনিক ছৌ নৃত্যে কথাকলি, কুচিপুডি, মণিপুরী বা ওড়িশির মত ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্যশৈলী মিশে এক দারুণ মিশ্র সংস্কৃতির বার্তা দিচ্ছে।  তাই এই অভিনব লোকশিল্প এখন লোকসংস্কৃতির অন্যতম ধারক ও বাহক হয়ে বিদেশের মাটিতে উত্তরোত্তর জনপ্রিয়তা অর্জন করছে ছৌ।   

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

One Response

Leave a Reply

pandit ravishankar

বিশ্বজন মোহিছে

রবিশঙ্কর আজীবন ভারতীয় মার্গসঙ্গীতের প্রতি থেকেছেন শ্রদ্ধাশীল। আর বারে বারে পাশ্চাত্যের উপযোগী করে তাকে পরিবেশন করেছেন। আবার জাপানি সঙ্গীতের সঙ্গে তাকে মিলিয়েও, দুই দেশের বাদ্যযন্ত্রের সম্মিলিত ব্যবহার করে নিরীক্ষা করেছেন। সারাক্ষণ, সব শুচিবায়ু ভেঙে, তিনি মেলানোর, মেশানোর, চেষ্টার, কৌতূহলের রাজ্যের বাসিন্দা হতে চেয়েছেন। এই প্রাণশক্তি আর প্রতিভার মিশ্রণেই, তিনি বিদেশের কাছে ভারতীয় মার্গসঙ্গীতের মুখ। আর ভারতের কাছে, পাশ্চাত্যের জৌলুসযুক্ত তারকা।