প্রিয়বন্ধুর অনুরোধে লিখলেন ‘কর্ণকুন্তীসংবাদ’

প্রিয়বন্ধুর অনুরোধে লিখলেন ‘কর্ণকুন্তীসংবাদ’

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
William Rothenstein
ছবি সৌজন্য – alchetron.com
ছবি সৌজন্য - alchetron.com
ছবি সৌজন্য – alchetron.com
ছবি সৌজন্য - alchetron.com

১৮৯৯-এর ২০ মে। উনচল্লিশ বছর বয়সি কবি দার্জিলিং থেকে একটি চিঠি পেলেন। লেফাফার মোড়ক খুললে দেখলেন….

সুহৃদবরেষু,

…এখানে একেবারে নিশ্চেষ্ট অবস্থায় জীবন কাটাইতেছি। যেখানে আছি সেখানে কোন লোকের সাড়া শব্দ নাই…; কেবল পাখীর গান ও সম্মুখে হিমাচল। আপনি যদি আসিতে পারিতেন, তবে ভাল হইত। কয়দিনের জন্য আসিতে পারেন কি?’

এরপর পত্রদাতা আরও লিখলেন, ‘তদভাবে আপনার গ্রন্থাবলী পড়িতেছিলাম।শুধু পড়েই যে ক্ষান্ত হয়েছেন তা তো নয়। মতামতও দিয়েছেন সানন্দে। কী বলেছেন দেখা যাক্।,

আপনার পৌরাণিক কবিতাগুলি সর্ব্বাংশে সুন্দর হইয়াছে। এগুলি কবে সম্পূর্ণ করিবেন?… মহাভারত হইতে আরও অনেকগুলি লিখিবেন।আরও অনেক বলতে কী বুঝিয়েছিলেন সে কথাও স্পষ্ট করে বললেন, ‘একবার কর্ণ সম্বন্ধে লিখিতে অনুরোধ করিয়াছিলাম। ভীষ্মের দেবচরিত্রে আমরা অভিভূত হই, কিন্তু কর্ণের দোষগুণমিশ্রিত অপরিপূর্ণ জীবনের সহিত আমাদের অনেকটা সহানুভূতি হয়।’ 

কেন এই সহানুভূতি? বলছেন

ঘটনাচক্রে যাহার জীবন পূর্ণ হইতে পারে নাই, যাহার জীবনে ক্ষুদ্রতা ও মহৎভাবের সংগ্রাম সর্ব্বদা প্রজ্বলিত ছিল, যে এক একসময়ে মানুষ হইয়াও দেবতা হইতে পারিত, এবং যাহার পরাজয় জয় অপেক্ষাও মহত্তর, তাহার দিকে মন সহজেই আকৃষ্ট হয়।

JC Bose Letter
জগদীশচন্দ্র বসুকে লেখা রবীন্দ্রনাথের পত্রাংশ। ছবি সৌজন্য – লেখকের সংগ্রহ

পত্রটি সযত্নে এবং সাগ্রহে পাঠ করলেন কবিবর রবীন্দ্রনাথ। ছদিনের মাথায় শ্রদ্ধাবনত হয়ে সেই সুহৃদকে প্রত্যুত্তরে জানালেন, ‘কতকগুলি পৌরাণিক গল্প আমার মস্তিষ্কের মধ্যে আশ্রয় লইয়াছেযেমন করিয়া হৌক তাহাদের একটা গতি করিতে হইবেতাহারা আমার কন্যাদায়ের মতপাব্লিকের সহিত তাহাদের পরিণয় সাধন করিতে না পারিলে তাহারা অরক্ষণীয়া হইয়া উঠিবে।

কবিমন সত্যি সত্যিই এই কন্যাদায়ে চঞ্চল হয়ে উঠেছিল। সেই বছরই তিনি কলম ধরলেন। এবং তৈরি হল ঐতিহাসিক কবিতা, ‘কর্ণকুন্তীসংবাদ’! ধন্য হল বাংলা সাহিত্যের আঙিনা।

প্রশ্ন উঠতেই পারে, কে এই কবির সুহৃদ যার অনুপ্রেরণা কাজ করেছিল এমন একটি কালজয়ী কবিতা রচনায়? তিনি বৈজ্ঞানিক জগদীশচন্দ্র বসু।

কবি এবং বৈজ্ঞানিক, সম্পর্কের এই রসায়নে উভয়ই জারিত হয়েছিলেন তাঁদের জীবনে। এই সম্পর্ক রবীন্দ্রনাথ নিজে পরবর্তীকালে ব্যাখ্যা করেছিলেন। বলেছেন অল্পবয়সে যখন চলা আর পথ বাঁধা, এই দুই উদ্যোগের ব্যস্ততায় জীবন সদা চঞ্চল থাকে, সেই চঞ্চলা সময়ে জগদীশের সঙ্গে আমার প্রথম মিলন।প্রথম দেখা কিন্তু বললেন না। খুব সচেতনভাবেই প্রথম মিলনবলে উল্লেখ করলেন। এখানেই দু’জনের সম্পর্কের গভীরতাকে মান্যতা দেওয়া হল। আরও লিখলেন, ‘তিনিও তখন চূড়ার উপর ওঠেননি। পূর্ব্ব উদয়াচলের ছায়ার দিকটা থেকেই ঢালু চড়াই পথে যাত্রা করে চলেছেন, কীর্ত্তন-সূর্য্য আপন সহস্রকিরণ দিয়ে তাঁর সফলতাকে দীপ্যমান করে তোলেনি।কী নিবিড় অনুভব! সেই অনুভবের দুর্নিবার আকর্ষণেই যেন তাঁদের মিলন ঘটেছিল, যা কিনা পাওয়া যায় এমন আত্মকথনেও, ‘প্রবল সুখদুঃখের দেবাসুরে মিলে অমৃতের জন্য যখন জগদীশের তরুণশক্তিকে মন্থন করছিল সেইসময় আমি তাঁর খুব কাছে এসেছি। বন্ধুত্বের পক্ষে এমন শুভ সময় আর হয় না।

JC Bose
দুই বন্ধু। কবি ও বৈজ্ঞানিক। ছবি সৌজন্য – লেখক

আসলে মধ্যজীবনে মানুষের সংসার বিপুল এবং বৃহৎ হয়ে দেখা দেয়। তখন চারিদিক থেকে তার মূল্য চোকাতে হয় বলে মূল্যবান অনেক কিছুই মানুষের জীবন থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়। রবীন্দ্রনাথ এবং জগদীশচন্দ্রের বন্ধুত্বের জগৎটা কিন্তু নিজেদের বিপুল এবং বৃহৎ বিশ্ব সংসারের দায়িত্ব পালন করেও ভীষণরকম আন্তরিক এবং মধুর হয়ে উঠেছিল। কলকাতা থেকে শিলাইদহের পদ্মাতীর পর্যন্ত যা কিনা ব্যপ্ত। বন্ধুত্বের মহিমার কথা বলতে গিয়ে কবি স্বীকার করেছেন, ‘আমার চিরাভ্যস্ত কোণ থেকে তিনি আমাকে টেনে বের করেছিলেন।তুলনা করেছেন এমন, ‘যেমন করে শরতের শিশির স্নিগ্ধ সূর্য্যোদয়ের মহিমা চিরদিন আমাকে শোবার ঘর থেকে ছুটিয়ে বাইরে এনেছে।’ 

শুধু যে কবি নিজেই এমন বন্ধুত্বের স্বীকৃতি দিয়েছিলেন তা তো নয়। বৈজ্ঞানিকও ততোধিক সহমর্মী ছিলেন। বিদেশের মাটিতে নিজের কাজের মধ্যে ডুবে থেকেও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন কবির পরশ পাবার। প্রবাসে নির্বান্ধব শুষ্ক ও অবসন্ন জীবনের মধ্যে যখন নিরবচ্ছিন্ন একাকীত্ব যখন তাঁকে গ্রাস করত, তখন আলো বলতে রবির আলোই তাঁকে পুনরুজ্জীবিত করে তুলত। তার মধ্যে দিয়েই আশার আলোর সন্ধান পেতেন। সে কথা এমনভাবে কবুল করেছেন, ‘তোমার স্বরে আমি মাতৃস্বর শুনিতে পাইসেই মাতৃদেবী ব্যতীত আমার আর কি উপাস্য আছে?’ এমন স্বীকারোক্তি কি খুব সাধারণে করতে পারে? এও বলেছেন, ‘তাঁহার বরেই আমি বল পাই আমার আর কে আছে?’ এমনকী দাবিও করেছেন বন্ধুর কাছে এই বলে, ‘একটা কাজ তোমাকে করিতে হইবে। তুমি যদি আমাকে তোমার হৃদয়ে স্থান দিয়া থাক, তাহা হইলে তুমি আমার সুখে সুখী, আমার কষ্টে দুঃখী। আমি আমার সম্মানের কার্য্য ভিন্ন অন্যকথা ভাবিতে পারি না, ভাবিলেও কি উচিত বুঝিতে পারি না।বন্ধুকে বলেছেন, তাঁর পক্ষে কী শ্রেয়, সেসব বুঝে যেন বন্ধুই তাঁর হয়ে সব স্থির করেন। তুমি আমার সমস্ত বিষয় জানিয়া যাহা ভাল তাহা স্থির করিও।

JC Bose
রবীন্দ্রনাথকে লেখা জগদীশচন্দ্র বসুর চিঠি। ছবি সৌজন্য – লেখক

দু’জনের বন্ধুত্ব যে এত গভীর হবে, তা রবীন্দ্রনাথ বা জগদীশচন্দ্র কারওরই জানা ছিল না। বা বলা যেতে পারে, দু’জনের কেউই তা আঁচ করতে পারেননি। তাই দু’জনেই বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন একে অপরের কাছে। তোমার বন্ধুত্ব যে আমাকে এমন প্রবল ও গভীরভাবে আকৃষ্ট করিবে তাহা একবৎসর পূর্ব্বে জানিতাম না।১৯০১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কবির লেখা এই চিঠির প্রত্যুত্তর ১৫ অক্টোবরে বৈজ্ঞানিক দিয়েছিলেন এমন, ‘হয়ত জান না যে, আমার অবস্থাও ঐরূপ।কেন কবির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন বৈজ্ঞানিক? ‘কারণ এই যে, হৃদয়ের অনেক আকাঙ্ক্ষা যাহা আমার মনেই থাকিত তাহা তোমার মুখে তোমার লেখাতে পরিস্ফুট দেখিতে পাই।’ 

এই অমোঘ সত্যের উপর নির্ভর করেই বাংলার নব-জাগরণের দুই মনীষার বন্ধুত্ব পূর্ণতা পেয়েছিল। জগদীশচন্দ্র লিখেছিলেন ৮৮টি পত্র, পক্ষান্তরে রবীন্দ্রনাথের লেখা চিঠির সংখ্যা ৩৬। কথাকাব্য উৎসর্গ ছাড়া কবি জগদীশচন্দ্র বসুশীর্ষক কবিতায় রবীন্দ্রনাথ শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেছিলেন এই পঙ্‌ক্তিতে,

ভারতের কোন বৃদ্ধ ঋষির তরুণ মূর্ত্তি তুমি
হে আর্য্য আচার্য্য জগদীশ?’

 

গ্রন্থঋণ: 

১। চিঠিপত্র ৬-নং~ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: বিশ্বভারতী
২। জগদীশচন্দ্র বসু~ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পত্রাবলী:~ দিবাকর সেন সম্পাদিত
৩। আচার্য জগদীশ: ~ অনিলচন্দ্র ঘোষ
৪। আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু~ চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য
৫। রবিজীবনী ৫, , , ৮-ম খণ্ড~ প্রশান্তকুমার পাল

Tags

2 Responses

  1. এতো সুন্দর ভাবে তথ্য সংগ্রহ করে তার ভিত্তিতে সাবলীল রচনা। পড়ে উপভোগ করলাম বেশ। বিষয়টা সত্যি অসামান্য। দুই বন্দিত ব্যক্তিত্বের গভীর বন্ধুত্ব। সমৃদ্ধ হলাম খুবই। অশেষ ধন্যবাদ লেখক কে।

  2. খুব ই ভালো লাগলো এই অজানা তথ্য সমৃদ্ধ লেখা

Please share your feedback

Your email address will not be published.

SUBSCRIBE TO NEWSLETTER

Resize-+=

Please share your thoughts on this article

Please share your thoughts on this article

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.

  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.

  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.

  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).

  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

SUBSCRIBE TO NEWSLETTER

Please login and subscribe to Bangalive.com

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com