মাইনে (ছোটগল্প)

মাইনে (ছোটগল্প)

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

ফোন করলেই করোনা সংক্রান্ত উপদেশের তোড়ে কাকে কী জন্য ফোন করা হচ্ছে, মাঝেমাঝে সেটাই গুলিয়ে যাচ্ছে।
নাগরিকরাও বেশ সচেতন। মুখে মাস্ক পরে ঘুরছে।
বিদেশ থেকে ফিরে স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করিয়ে এদিক সেদিক ঘোরাফেরা করেছে জানলে ভিডিও তুলে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করে তুলকালাম করছে। তার ওপর গুটিকতক সংক্রমণের খবর আসতে সরকারও একদিন জনতা কার্ফিউ জারি করল।
প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে সন্ধ্যাবেলা ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের উদ্দেশ্যে কৃতজ্ঞতা ব্যক্ত করতে গিয়ে তালি থালি কাঁসর ঘণ্টা ডিজে সহকারে রীতিমতো করোনা বিজয় উৎসব পালন করে ফেলল জনতা। সুতরাং জনতা কার্ফিউ ঘেঁটে জনতা সমাবেশ হয়ে গেল।
সামাজিক দূরত্বের গুষ্টির তুষ্টি। বাধ্য হয়ে কিছু বড় শহরে লকডাউন করতে হল। কিছু মানুষের জমায়েত তাতেও আটকানো যায় না। বাধ্য হয়ে সারা দেশ জুড়ে পরোপুরি লকডাউন জারি হল।

ইতিমধ্যে বিদেশ থেকে ভারতীয়দের ফেরানো, মায় অভারতীয়দের যার যার দেশে লিফট্‌ দেওয়া ইত্যাদি সেরে ফেলেছেন ভারত সরকার। কিন্তু ট্রেন বন্ধ হওয়ায় আটকে পড়েছেন দেশের মধ্যেই ভিন রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া পরিযায়ী শ্রমিক, যাঁরা কাজ হারিয়ে বাসা বাড়ির ভাড়া গুণতে ও অন্ন সংস্থান করতে পারছেন না। তাঁদের রাতে শোওয়ার জন্য ছাউনির তলায় সামান্য খাটিয়ার আশ্রয়টুকু থেকেও উৎখাত হতে হয়েছে। যে যার নিজের জায়গায় আপনজনেদের মাঝে ফিরতে মরিয়া।

***

অতসী এতশত বোঝে না। শুধু বোঝে এক ভয়ানক ছোঁয়াচে রোগের ভয়ে তার কাজের বাড়িগুলো আসতে মানা করছে। আপাতত আটটা বাড়িতে তোলা কাজ করে সে। আগে আরও বেশি ছিল। সেই করেই বেকার মদ্যপ বর আর অসুস্থ শাশুড়িকে সঙ্গে নিয়ে দুই ছেলেমেয়েকে অল্পস্বল্প পড়িয়ে মানুষ করেছে। কাজের বাড়িগুলোর সাহায্য নিয়ে মেয়ের বিয়ে দিয়েছে। টুকটুক করে নিজের টিনের ছাউনি দেওয়া বস্তির ঘরের শ্রী ফিরিয়ে টোটো-চালক ছেলের বিয়ে দিয়েছে। কাজের বাড়িগুলো আসতে মানা করায় প্রথমে প্রমাদ গুণল। পরে দেখল তারা প্রত্যেকেই বাড়ির দুয়োর থেকে মাইনে তো বটেই, এমনকি দু’একজন নিজেদের উদ্যোগে চাঁদা জড়ো করে ত্রাণ বণ্টনের যে ব্যবস্থা করেছে, তার কুপন পর্যন্ত ধরিয়ে দিচ্ছে। মলি বৌদির বর তো মার্চের মাইনে পাড়ার মোড়ে এসে পৌঁছে দিয়ে বলে গিয়েছিল, “লকডাউন না ওঠা পর্যন্ত ঘরেই থাক। কাজে আসার দরকার নেই।” এদের বাড়িটা খানিক দূরে। বাস কিংবা অটো নিয়ে খানিকটা পথ যেতে হয়। লকডাউনে ভালোই হয়েছে। পথশ্রম গাড়িভাড়া সবই সাশ্রয় হচ্ছে, উল্টে বিনা কাজে বা দু’চারদিন হাজিরা দিয়ে পুরো মাইনে ও সুযোগ সন্ধান করে কুপন যোগাড় করতে পারলে চাল ডাল তেল মশলা আলু পেঁয়াজ এসবেরও অভাব হচ্ছে না।

তবে এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে পায়ে হেঁটে যাওয়া যায় এমন কয়েকটি বাড়িতে ডাক পেয়ে আবার যাতায়াত শুরু করেছে। মলি বৌদি খবর পেয়ে খচে গিয়েছিল। “তুমি সব বাড়িতে কাজে যেতে পার, শুধু আমারটা বাদ? তাহলে এক কাজ কর, আর আসতে হবে না। আমি এই কদিনে সব কাজই সামলে নিতে শিখে গেছি। এবার নিজেরাই চালিয়ে নেব। নয়তো কাছাকাছি কাউকে পেলে রাখব।”
— বৌদি রাগ কোরও না। এত দূর দিয়ে যাব কী করে? বাস অটো চলছে না। টোটো শুধু ব্রিজটা পার করানোর জন্য চল্লিশ টাকা চাইছে। আমি তিন চার তারিখে তো যাব মাইনে নিতে, সেদিন তোমার কাজ করে দেব, বাসনকোসন ফেলে রাখবা।
বৌদি কিছু একটা বলছিল, কিন্তু অতসীরা ভিআইপি, নিজের কথা শেষ হলেই ফোন কেটে দেয়। এই ফোনখানাও ওই বৌদি দিয়েছে। শুধু একবেলা বাসন মাজা ও ঘর ঝাড়মোছ করার জন্য আটশো টাকা দেওয়া ছাড়াও অতসীর এই ফোনটাও তিন মাসে একবার করে রিচার্জ করিয়ে দেয়। সেই ফোনও অতসী সব সময় খোলা রাখে না। ফোন ধরার মুড না হলে বা কুটুমবাড়ি গেলে কেটেও দেয়। মেয়ের বাড়িতে বলা হয়েছিল মা ফ্যাক্টরিতে কাজ করে। এখন সবাই জানে কী কাজ, তবু আড়াল রাখা।

কাজের বাড়িগুলো আসতে মানা করায় প্রথমে প্রমাদ গুণল। পরে দেখল তারা প্রত্যেকেই বাড়ির দুয়োর থেকে মাইনে তো বটেই, এমনকি দু’একজন নিজেদের উদ্যোগে চাঁদা জড়ো করে ত্রাণ বণ্টনের যে ব্যবস্থা করেছে, তার কুপন পর্যন্ত ধরিয়ে দিচ্ছে। মলি বৌদির বর তো মার্চের মাইনে পাড়ার মোড়ে এসে পৌঁছে দিয়ে বলে গিয়েছিল, “লকডাউন না ওঠা পর্যন্ত ঘরেই থাক। কাজে আসার দরকার নেই।”

কাজের বাড়িগুলো নিয়ে চিন্তা নেই। কিন্তু নিজের বাড়িতে জায়গা বড় কম। ছেলের বিয়ে দেওয়া ইস্তক ছেলে-ছেলের বৌকে শোবার ঘরটা ছেড়ে দিয়ে নিজে বাইরের দালানে শুচ্ছে অতসী। এত মশা যে দিনের বেলাতেও মশারি খাটিয়ে রাখতে হয়। ছেলে প্রথম দিকে হাবেভাবে বোঝাত। এখন তো সোজা বলে দিচ্ছে, এত কম জায়গায় তিনজন মানুষের থাকা চলে না। ওদের স্বামী স্ত্রীর আড়াল বলে কিছু থাকে না। রাতে বাথরুমে যেতে হলে মায়ের খাটের পাশ দিয়ে যেতে হয়। তাছাড়া আজ বাদে কাল ছানাপোনা কিছু হলে তো স্থান সংকুলান আরও মুশকিল হয়ে পড়বে। নেহাত লকডাউনের বাজার, নাহলে মাকে …।

এতদিন ছেলে ছেলে করে কারও বাড়িতে দিনরাত থাকার কাজ নেয়নি অতসী। ছেলের বৌ আসার পর ভেবেছিল, পাঁচ বাড়িতে কামিন খেটে ফিরলে সন্ধেবেলা অন্তত চা জলখাবারটুকু পাবে। এখন তো দেখছে দালানের এই চিলতে খাটিয়া প্রমাণ জায়গা থেকেও উদ্বাস্তু হওয়ার যোগাড়। মেয়ের বাড়ি ভাসুর জা মিলিয়ে বড় পরিবার, সেখানে দু’চার দিন অতিথির মতো থাকা চলে। কিন্তু পাকাপাকি বন্দোবস্ত জামাই কেন, মেয়েরই পছন্দ নয়। মাঝেমাঝে মনে হত ওই মলি বৌদির বাড়িতেই রাতদিন থেকে যায়। একটু কুঁড়ে প্রকৃতির মেয়েমানুষ। কিন্তু মনটা ভালো। কত সময় বাস ভাড়া অটো ভাড়া চাইলে বাড়তি দিয়ে দেয়। আর জামাকাপড়, এটা সেটা তো আছেই। পুজোয় বোনাস ছাড়াও শাড়ি সায়া ব্লাউজ কিনে দেয়। আর বৌদির মা-ও বছরে কিছুটা সময় থাকে। প্রতিবারই যাওয়ার আগে অতসীর হাতে দু’শো কি তিনশো টাকা দিয়ে যায়। পুজোর আগেটায় হলে তো মা মেয়ে দুজনের কাছে ডবল পাওনা।

এই ফোনখানাও ওই বৌদি দিয়েছে। শুধু একবেলা বাসন মাজা ও ঘর ঝাড়মোছ করার জন্য আটশো টাকা দেওয়া ছাড়াও অতসীর এই ফোনটাও তিন মাসে একবার করে রিচার্জ করিয়ে দেয়। সেই ফোনও অতসী সব সময় খোলা রাখে না। ফোন ধরার মুড না হলে বা কুটুমবাড়ি গেলে কেটেও দেয়।

কিন্তু নিজের বাস্তুচ্যুত হতে মন চায় না। মেয়ে বলে “মা, তুমি বাড়ি ছেড়ে কোথাও থাকবে না। দালানের একটা দিকে পার্টিসান করে নিলে একখানা ঘর হয়ে যায়। উঠোনে আর একটা বাথরুম করারও জায়গা আছে। তুমি ঘর ছেড়ে গেলে দাদা পুরোটার দখল নেবে। তখন আমার ও বাড়িতে কোনও হিসসা থাকবে না।”
অতএব বারান্দা কাম দালানের কোণে খাটিয়া, দিনে রাতে মশার কামড় বা ধূপের ধোঁয়া সহ্য করে, কলঘর নিয়ে ছেলে আর বৌয়ের সঙ্গে খটাখটির মধ্যেই কেটে যাচ্ছে। ছেলেটারও কাজকর্ম থম মেরে আছে। এদিকে সংসার শুরু করেছে। মেজাজ ঠিক না থাকারই কথা। নিয়মিত কাজে বেরোলে তবু এদের সংস্রব থেকে খানিক্ষণ নিস্তার পায়।
কিন্তু লকডাউনে বাইরে বেরনো কমে গেলেও ছেলের হুকুম, বৌয়ের ঠেস ও সংসারের কাজকর্ম করে না পাচ্ছে শরীরে বিশ্রাম, না পাচ্ছে মনে আরাম। মাঝখান থেকে সবচেয়ে ভালো বাড়ি থেকে শুনতে হল, “আর আসতে হবে না।” অবশ্য অতসী মলি বৌদির মুখের কথা গায়ে মাখে না। গিয়ে দাঁড়ালেই হল, হাতও পাততে লাগবে না। এই তো নিজেরাই ডেকে ওদের পাড়া থেকে চাঁদা তুলে প্রায় চারশো জনকে ত্রাণ দেওয়ার সময় অতসীকেও দিল। বাকি বাড়িগুলোর মন যুগিয়ে চলা জরুরি।

***

নিজের রাজ্য ও দেশের আনাচ কানাচ থেকে যা সব খবর আসছে, বিশেষত সামাজিক মাধ্যমগুলোতে যেসব ভিডিও সহকারে পর্দাফাঁস হচ্ছে, তাতে বাড়িতে বসেই অসহায় ক্ষোভে জ্বলতে থাকে মল্লিকা। রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, প্রশাসনের ভূমিকা, সাম্প্রদায়িক পরিবেশ – সবকিছু নিয়ে আকাশ পাতাল ভেবে কূলকিনারা না পেয়ে অস্থির অস্থির লাগে। কাগজ তো বন্ধ রাখা হয়েছে। টিভি চ্যানেলে সব খবর দেখায় না। তাই দিনরাত মুখপুস্তক আর হোয়াটস্‌অ্যাপে ভেসে আসা নানা খবর দেখা, ফরোয়ার্ড করা বা পোস্ট করা বদঅভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। ক্রমাগত চলভাষ হাতে নিয়ে বাঁ কাঁধ বেয়ে কনুই পর্যন্ত প্রচণ্ড যন্ত্রণা। তার ওপর কাজের মহিলাকে মাস দুয়েক ধরে মাইনে ও ছুটি দুটোই দেওয়াতে ঘরের কাজ করে করে শরীরের গাঁটে গাঁটে ব্যথা। কাজ করা নাকি ব্যায়াম, শরীর সুস্থ থাকে। ছাই থাকে। হাতের পাতার চামড়া থেকে কাঁধ, শিরদাঁড়া, পায়ের গুলি সবকটা অঙ্গই প্রবল বিদ্রোহ করছে। তার সঙ্গে যমজ ছেলেমেয়ের পেছনে ছুটোছুটি। আর এই জাতীয় বিপর্যয়ের মধ্যেই আমফান নামে এক ঘূর্ণিঝড় এসে গাঙ্গেয় দক্ষিণবঙ্গকে একেবারে দুমড়ে মুচড়ে দিল। এখন আর দেশ দুনিয়া নয়, নিজের বাড়ির বিদ্যুৎ জল ফ্রিজের খাবার এইসব নিয়ে ব্যতিব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। ভাগ্যিস সৌমেন এ ক’দিন অফিস যেতে পারেনি, না হলে চারতলা পর্যন্ত জল টেনে আর দেখতে হত না। টুকাই বুকাই ঘ্যানঘ্যান করেই চলেছে।

পাক্কা চার দিন দুর্ভোগের পরে বিদ্যুৎ এল। এবার অতসীকে হয় হাজিরা দিতে বলবে, নয় জবাব দিয়ে দেবে। শুধু মাইনে আর ত্রাণ নিতে এপ্রিলের শুরুতে আর শেষে দু’দিন এসেছিল। তারপর তিন চার তারিখে মাইনে নিতে এসে কাজ করে যাবে বলেও আর আসেনি। এ ছাতার লকডাউন কবে উঠবে ঠিক নেই। উঠলেও বাইরে যাতায়াত যত কম হয় ততই ভালো। অতসীকে গত এক মাসে কতবার ফোন করেছে, একবারও পায়নি। একবার কেউ ধরে কথা না বলে কেটে দিল। তারপর থেকে সুইচড্‌ অফ কিংবা নম্বর যাচাই করুন। নির্ঘাৎ অন্য বাড়িগুলোয় কাজ করছে, শুধু মল্লিকা বাদ। ধরেই নিয়েছে, মলি বৌদির কাছে কাজ না করেও মাইনে পাওয়া যাবে।

এখন আর দেশ দুনিয়া নয়, নিজের বাড়ির বিদ্যুৎ জল ফ্রিজের খাবার এইসব নিয়ে ব্যতিব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। ভাগ্যিস সৌমেন এ ক’দিন অফিস যেতে পারেনি, না হলে চারতলা পর্যন্ত জল টেনে আর দেখতে হত না। টুকাই বুকাই ঘ্যানঘ্যান করেই চলেছে।

রাত সাড়ে নটা বেজে গেল। এখনও সৌমেনের দেখা নেই। এই লকডাউনের মধ্যে ছেলেরা ঘরে বসে বৌকে সাহায্য করছে, আর উনি সপ্তাহে পাঁচ দিনই নিজের বাইকের তেল পুড়িয়ে পঁচিশ পঁচিশ পঞ্চাশ কিলোমিটার ছুটে অফিসে চলেছেন। আজ ফিরতে দেরি হবে বলেছিল, কিন্তু এত রাত?
টিংটং। মুখের ডগায় বরের উদ্দেশ্যে ঝাঁঝালো কথাগুলো সাজিয়েই দরজা খুলল মল্লিকা।
ও মা! এ তো বাবাই, অতসীর সুপুত্র।
— কী ব্যাপার? তোর মায়ের খবর কী?
— মা মাইনেটা দিতে বলল।
— মা নিজে এল না কেন?
— শরীর খারাপ।
— কী হয়েছে?
বাবাই উত্তর দিল না। শরীরের ভাষায় বুঝিয়ে দিল, সময় নেই, পাওনা মিটিয়ে দিলে চলে যাবে।
ছেলেটার ভাবভঙ্গী কেমন তেঁয়েটে ধরনের। মল্লিকার একটুও ভালো লাগে না। বিয়ের পর থেকেই তো মাকে তাড়াতে উঠে পড়ে লেগেছে। অতসী একদিন ছেলের প্রশংসায় পঞ্চমুখ তো পরের দিন চোখের জল ফেলে বলে, তাকে এই বয়সে বাপের বাড়িতে দাদাদের হাতেপায়ে ধরে আশ্রয় নিতে হবে। এর মধ্যে ছেলের সঙ্গে এত ভাব হয়ে গেল? এর হাতে টাকা দেওয়া কি ঠিক হবে? মল্লিকা বলল,
— আজ ঘরে টাকা তুলে রাখা নেই। তোর মা একটু সুস্থ হলে তাকেই এসে নিয়ে যেতে বলিস। গত মাসের শেষে পাঁচ কেজি চাল থেকে ডাল আলু সয়াবিন ডিম তেল অতগুলো জিনিস পেয়ে আর একদিনও দেখা দিল না। তিন-চার তারিখ করে মাইনে নিতে আসবে বলেছিল, আমি পর পর তিন দিন তো অপেক্ষা করে ছিলাম। মানছি বাসটাস বন্ধ। কিন্তু ব্রিজের ওপারে এসে কাজ করে যাচ্ছে, আর এ পারে হপ্তায় দুটো দিনও আসতে পারছে না? আর আজ তো চব্বিশ। জুন পড়ুক, টাকা তুলি, একেবারে এপ্রিল-মে দু’ মাসের মাইনে দিয়ে দেব। ততদিনে নিশ্চয়ই অতসীদির শরীর একটু সেরে উঠবে। কী হয়েছে মায়ের?
— গেল মাসে মাইনে নেয়নি?… এখন তো আসতে পারবে না… ঠান্ডা লেগেছে।
— দেখিস আবার, সময়টা ভালো নয়। ডাক্তার দেখিয়েছিস? করোনা পরীক্ষা করিয়ে নে একবার। সরকারি হাসপাতালে তো ফ্রি।
— মা আমার হাতেই দু’মাসের টাকা দিতে বলল। ঘরের চাল উড়ে গেছে।
মল্লিকা ইতস্তত করছিল। মোবাইল বেজে উঠল। ভেতরের ঘর থেকে দুই পাজি টুকাই বুকাই ছুট্টে এল ফোনটা কাড়াকাড়ি করতে করতে।
— মা, ফোন…। বুকাই কাড়াকাড়িতে জিতে গিয়ে ফোনের পর্দা ঘষে লাইন ধরে দিয়ে ফ্লিপ কভার বন্ধ করে মায়ের হাতে ধরিয়ে দিল। এখনও বাড়ি না ফিরে এতক্ষণে ফোন করছে সৌমেন? রাত পৌনে দশটায়!
— কী ব্যাপার, কোথায় আছ? এই লকডাউনের মধ্যে এত রাত পর্যন্ত…! যদি পুলিস হ্যারাস করে?
— বৌদি, আমি অতসী বলছি… । গলাটা ক্ষীণ। মনে হল সর্দি বসা ও খুব দুর্বল। মানে ভালোই অসুখ বাধিয়েছে।
— কী গো, কী বাধালে আবার? নিজে না এসে ছেলেকে পাঠালে?
— বাবাইরে আমার টাকাটা দিয়ে দাও বৌদি। খুব দরকার। আমি যেতে পারব না।

ছেলেটার ভাবভঙ্গী কেমন তেঁয়েটে ধরনের। মল্লিকার একটুও ভালো লাগে না। বিয়ের পর থেকেই তো মাকে তাড়াতে উঠে পড়ে লেগেছে। অতসী একদিন ছেলের প্রশংসায় পঞ্চমুখ তো পরের দিন চোখের জল ফেলে বলে, তাকে এই বয়সে বাপের বাড়িতে দাদাদের হাতেপায়ে ধরে আশ্রয় নিতে হবে। এর মধ্যে ছেলের সঙ্গে এত ভাব হয়ে গেল?

শুধু মাইনের টাকা নয়, ঘরের অবস্থা শুনে নিজেদের বিছানা থেকে দু’টো তোশক ও দু’টো বালিশও বাবাইকে নিয়ে যেতে বলল। মাঝে সৌমেনের বদলির কারণে সিকিমের কোয়ার্টের থাকার সময় এগুলো করানো হয়েছিল, নিজেদের বিছানাতেই পেতে রাখা ছিল। দুই ভাইবোনকে বিছানা থেকে নামিয়ে বেশ জোর লাগিয়ে কসরত করে সেগুলো টেনে এনে বলল,
— দেখিস, একখানা বালিশ মায়ের মাথাতেও দিস কিন্তু। শুধু নিজেরা কত্তা-গিন্নি নতুন বালিশে শুয়ে অসুস্থ মা-টাকে ভিজে বিছানায় শুইয়ে রাখিস না।
বাবাই নিজের টোটো নিয়েই এসেছিল। ইদানীং একটু আধটু তো চলা শুরু হয়েছে। বেশ হৃষ্টচিত্তে বিদায় নেওয়ার পর দরজা বন্ধ করার আগেই সৌমেন হাজির।
— অতসীর ছেলে না? এতদিনে খবর দিতে এসেছে?
— খবর আর কী? অতসীদির শরীর খারাপ, ঠান্ডা লেগেছে। আমি তো বললাম করোনার টেস্ট ফেস্ট করিয়ে নিতে। বলল নাকি বাড়ির চাল উড়ে গেছে। এপ্রিল মে দু’মাসের টাকা নিয়ে চলে গেল। এদিকে আমি খেটে মরছি, আর ওদিকে কাজের লোককে বসিয়ে বসিয়ে মাইনে দিয়ে যাও। কী করব? এ অবস্থায় বলতেও বিবেকে লাগে। তার ওপর ঝড়ে ঘরের অবস্থা বেহাল। চাল উড়ে যাওয়া মানে তো সর্বস্ব ভিজে যাওয়া। এমনিই কত লোককে সাহায্য করতে হচ্ছে। তাই….।
— তোমাকে আর কিছু বলল না?
— আর কী বলবে?
— অতসীর খবরটা জানায়নি?
— অতসীর খবর মানে? তিনি তো ভিআইপি। এতদিন মোবাইল সুইচ অফ রেখে আজ ঠিক নিজেই ফোন করে বলল, খুব দরকার, ছেলের হাতেই যেন টাকা দিয়ে দিই।
— অতসী বলল মানে? তুমি কি জানো, সেই যে এসে আমাদের এখান থেকে চাল-ডাল নিয়ে গেল, তার পরের দিনই নাকি বাবাই ওকে করোনা হয়েছে বলে জোর করে ওখানকার একটা স্কুলে কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে দিয়ে এসেছিল। অতসীর কোভিডের কোনও সিম্পটম ছিল না। কিন্তু সবাই বলছে, ঐ কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে থেকেই অ্যাফেকটেড হয়। কিছুদিন আগে বেলেঘাটায় শিফট করেছিল। এই ঝড়ের রাতেই মারা গেছে। তলায় ছেলেটাকে টোটো বোঝাই করে বেরিয়ে যেতে দেখে আমাকে তারক বলল, এই বজ্জাতটা কী করতে এসেছে। তারকের কাছেই সব বৃত্তান্ত এক্ষুণি শুনলাম।

Tags

শুভ্রনীল ঘোষ
শুভ্রনীল ঘোষ
কোনও প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই শুভ্রনীল অলঙ্করণের কাজ করে চলেছেন সেই ১৯৯৭ সাল থেকে। প্রিয় মাধ্যম জলরং। কলকাতার বহু নামী প্রকাশক ও বিজ্ঞাপন সংস্থার জন্য কাজ করেছেন।

One Response

  1. অনবদ্য। শ্রীপর্ণার যতগুলো গল্প পড়েছি সবকটাই দারুণ ও স্বতন্ত্র। একটার থেকে অন্যটা আলাদা। অনেকদিন পর বাংলা লাইভে দেখে ভালো লাগল। তবে লেখিকার intro র ভাষা বেশ খাপছাড়া। এই বিষয়ে ওয়েবসাইটের একটু যত্নশীল হওয়া উচিত।

Please share your feedback

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.

Soumitra Chatterjee Session-Episode-4 Soumitra Chatterjee Session-Episode-2 স্মরণ- ২২শে শ্রাবণ Tribe Artspace presents Collage Exhibition by Sanjay Roy Chowdhury ITI LAABANYA Tibetan Folktales Jonaki Jogen পরমা বন্দ্যোপাধ্যায়

SUBSCRIBE TO NEWSLETTER

Member Login

Submit Your Content