বিসর্জন লেন

বিসর্জন লেন

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Suvranil Ghosh illustration
অলঙ্করণ: শুভ্রনীল ঘোষ
অলঙ্করণ: শুভ্রনীল ঘোষ
অলঙ্করণ: শুভ্রনীল ঘোষ
অলঙ্করণ: শুভ্রনীল ঘোষ

একটা আলতো শীত মেখে দাঁড়িয়ে আছে শহরটা। কেমন যেন আনমনা। বা উদাসীন। মাঝরাতে জানলা খুলে দেখা কার্নিশে দুটো বেড়ালের লড়াই বা ল্যাম্পপোস্ট চুঁইয়ে পড়া আলোর ছায়াপথ, কুয়াশার ভেতর হারিয়ে যাওয়া গলিমুখ, অবিরাম ডেকে চলা কুকুরগুলোর সাথে মাতালের কথার টুকরো সংলাপ অথবা পুলিশের টহলদার জিপের নিঝুমকাড়া ভাঙাচোরা শব্দ, এইসব ইলিউশনের ট্রাফিকে ঈশান অহেতুক আটকে পড়ে প্রায়ই। সবকিছুতেই একটা দেরি ওকে পিছিয়ে দেয়। জীবনের সব ট্রেন ছেড়ে চলে যায়। ওর মনে হয় কোনও একা প্ল্যাটফর্মের খারাপ হয়ে যাওয়া টিউবলাইটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

স্ট্রেচারে শোওয়ানো পেশেন্ট নিয়ে একজন নার্স আর ওয়ার্ডবয় যন্ত্রের মতো হেঁটে চলে গেল করিডোর ধরে। ঈশান একটা চেয়ারে বসে হাঁটুতে কনুইয়ের ভর রেখে খানিক তাকিয়ে থাকল অপলক। সব নার্সিংহোমেই বোধহয় এরকম শাখা সিঁদুর পরা টিপিকাল বৌ বৌ টাইপ দু’একজন নার্স থাকে। কালো কিন্তু অদ্ভুত মায়াবি। একটা নিঝুমের একঘেয়েমিতে মাঝেমাঝে ভাগ বসাচ্ছে লিফ্‌টের ওঠানামারা। ঈশানের ঠিক তিনটে চেয়ার পরেই একটি মেয়ে। অপেক্ষার রুমাল ভাঁজ করে বসে আছে। আনমনা আর খুব পরিপাটি এলোমেলো। ঠিক ভাসানের পর শহরের রাত যেমন।

মেয়েটি শান্ত চোখে তাকায়। না, ঈশানের দিকে নয়, দেয়ালঘড়ির দিকে। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস, পলক ফেলা, এবং আবার নিজের ভেতর হারিয়ে যাওয়া। মেয়েটির প্রতীক্ষার কারণ ঈশানের জানা। লুকিয়ে দেখার কৌতুহলে তারই উৎসাহ বেশি। তুলনায় মেয়েটি অনেক সংযত।

নার্সিংহোমের কাঁচের দরজায় একফালি কাঁপা কাঁপা রোদ্দুর। ঈশান একটা ঘোরের মধ্যে উঠে দাঁড়ায়। যেন মনের মধ্যে শব্দ গুছিয়ে নেয়। এগিয়ে আসে মেয়েটির দিকে। মেয়েটি পলক কাঁপা চোখে চিবুক নামিয়ে নিজেকে দেখে। তার আড়চোখের চাহনিতে ভেসে ওঠে ঈশানের মৃতপ্রায়-শুকতলা চটি, পোড়া মোবিলের দাগ লাগা ধুলোমাখা জিন্‌স আর একসময়ে বহু সাধনার টানটান মেদহীন কোমর।

“আসলে আমাকে একটা জরুরি ফোন করতে হবে” – ঈশান হয়তো আরও কিছু বলত কিন্তু হঠাৎই মেয়েটির চোখের ভেতর কেমন যেন ছন্নছাড়া মনে হয় নিজেকে। একটা ভালোবাসার গন্ধের মতো মেয়েটির মোবাইল ধরা নির্জন হাত ঈশানের হাতের নাগালে পৌছে যায়। কথা ভিজে আসে ঈশানের মুখে – ‘না না আমি বাইরে থেকে করে নিচ্ছি।’

কাচের দরজায় রাস্তারা সরে গেল আবার। এখন ঈশান ফুটপাতে। একটা গ্লাস ভাঙল চায়ের দোকানে। কাচের জিনিস ভাঙা নাকি ভালো! আচ্ছা তাহলে এ ক্ষেত্রে কার ভালো হল? দোকানের মালিকের নাকি যে ভাঙল, তার? এসব ভাবতে ভাবতে ঈশান টেলিফোন বুথের দিকে এগিয়ে গেল। পেছনের কোলাহল থেকে তার মনের দূরত্ব একটা গোটা শহর।

ঘর খালি। ফোনটা একা। এক টুকরো কথা ভেসে এলো – ‘খুচরো দেবেন।’ বুথের ভেতরটা ট্রেনের বাথরুমের মতো মনে হল ঈশানের। মানুষের নাম, ফোন নাম্বার, প্রেম আর সস্তা খিস্তিও। কিন্তু কাকে ফোন করবে ঈশান? সত্যিই কি এমন জরুরি মানুষ আছে? অথবা এমন কেউ যাকে ফোন করার জন্য সত্যিই কোনও কারণের প্রয়োজন নেই। ঈশান ফোনটা নিয়ে নাড়াচাড়া করে। বুথ মালিক চশমার ফাঁক দিয়ে প্রশ্ন করে – ‘কি দাদা, নাম্বার মনে পড়ছে না?!’ মরা ঢেউয়ের মতো ঈশান ফিরে গেল। নিরুচ্ছ্বাস ও শব্দহীন।

নার্সিংহোমের বাইরে ধাবমান কলকাতা। রকমারি হোর্ডিং, মুখ, শোক, গলির ক্রিকেট। আজ কী বার যেন? ও আজ তো রোববার। দশটার আগেই চলে গিয়েছিল ঈশান। মেট্রো খোলেনি তখনও। যদিও এটা প্রথম নয়। আচমকা গলির ক্রিকেটে একটা আউট এবং নকল উচ্ছ্বাস। পাশ কাটিয়ে নার্সিংহোমের দিকে এগিয়ে গেল ও। নার্সিংহোমের অন্দরমহল একটা অন্য পৃথিবী। অসুখের গন্ধ। ভিড়ের মধ্যে বাসি ঘামের তাজা গন্ধের মতো। আজকাল আবার সেই অসুখের গন্ধে কফির গন্ধের ছোঁয়াচ লেগে থাকে।

মেয়েটি এখনও এলিয়ে আছে চেয়ারে। মাথাটা হয়ত একটা কাঁধ চাইছে। ঈশান পাশের চেয়ারে শরীরটা পুরোটা না রেখেই জানতে চাইল – ‘ডেকেছিল?’ মেয়েটি অন্য দিকে তাকিয়ে অসম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ে। আবার একটা স্ট্রেচারের শব্দ। এ বার একজন অন্য মানুষ। কতই বা বয়েস, হয়ত ষোড়শী। স্ট্রেচারের শব্দ মিলিয়ে যায় কিন্তু একটা অজানা আশঙ্কার অনুভূতি দাগ রেখে যায় করিডোরের জড়তায়। ‘আপনার নাম জানতে পারি?’ নীরবতা ঠোঁট খোলে ঈশানের প্রশ্নে।

– ‘নাম না জেনেও কিন্তু কথা বলা যায়।’

ঈশান একটা শব্দ আশা করেছিল। না পেয়ে নিঝুম গলায় বলল – ‘হয়ত যায়।’

কথাটা শেষ হতেই মেয়েটি দু’টি শব্দ ফেরত দিল – ‘হয়ত কেন?’

ঈশান এবার অনিচ্ছুক। একটা নাম নিয়ে এত কথা পোষাচ্ছে না ওর।

দায়সারা উত্তর দিল – ‘আপনি না বলতে চাইলে, থাক্‌।’

মেয়েটি একটা বিষাদমাখা গলায় বলে – ‘বলব না তো বলিনি।’

ঈশানের পেটের ভেতরটা গুলিয়ে ওঠে, খিদে পায়, একটু রাগও হয়। বিরক্তিটা ঠিক কিসের ওপর নিজেও বোঝে না।

মেয়েটি সেই বিরক্তি বাড়ায় আরও কিছুটা – ‘আমার কিন্তু মনে হয় একজন অচেনা পুরুষ ও মহিলার আলাপে নাম জানা বা না জানাটা কোনও দেয়াল তৈরী করতে পারে না, আপনার মনে হয় না?’

এই পর্যন্তই। গল্পের মতো বা সিনেমার মতো দুরন্ত কোনও চমক তৈরী হল না দুজনের আলাপচারিতায়। অচেনার ভেতর কোনও চেনাকে খুঁজে পাবার নেশায় বারবার চুরি করে তাকাল ঈশান। তবু পরীক্ষার হলের স্বার্থপর বন্ধুর মতন সব জেনেশুনেও সাড়া দিল না মেয়েটি। আলগোছে বাঁধা চুল কপালের উপর থেকে সরিয়ে একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় সে। ‘আজ যেন কত তারিখ?’

ইদানীং তারিখের হিসেব রাখা হয় না ঈশানের । দেখা গেছে এসব প্রশ্নে পাঁচজনকে পাঁচরকম উত্তর দিয়েছে ও। তেমনই কিছু একটা বলতে  গিয়েও থমকে গেল। ‘আজ কি সেকেন্ড সানডে?’

অস্ফুটে উত্তর দেয় ঈশান –‘বোধহয়!’

বাঁধভাঙা বিরক্তির জোয়ারে ভাসতে ভাসতে কথা হাতড়ে বেড়ায় ঈশান – ‘আপনার কি খুব প্রয়োজন?’

প্রশ্নটা শুনে অবাক হয়ে তাকায় মেয়েটি।  ওর দৃষ্টিতে যতটা না বিস্ময় তার থেকে অনেক বেশী স্পর্ধার প্রতিফলন।

ঈশান দমে না গিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করে – ‘না মানে …’,

কথা শেষ হয় না। মেয়েটি খুব নির্লিপ্তভাবে উত্তর দেয় – ‘আপনি হয়তো ভাবছেন প্রয়োজনটা আপনার বেশি, আমি ভাবছি আমার।’

ঈশান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, ‘আপনি হাসেন না কেন?’

একটা দীর্ঘশ্বাসের বিরাম নিয়ে মেয়েটি জানায় – ‘এতো পরিহাস জমা হয়ে রয়েছে মনের ভেতর, হেসে সেগুলো মুক্তি দিতে চাই না।’

কথাগুলো ভাবায়। আবার অন্যমনস্ক দুটো মানুষ। আবার কিছুটা জমাট শূন্যতার ভেতর হারিয়ে যাওয়া। বাস্তবে কৌতূহল বাঁধ মানছে না ঈশানের।

সে অকারণ স্বতঃস্ফূর্ত হবার চেষ্টা করে। ‘আপনার বাড়িতে কেউ জানে আপনি এখানে এসেছেন?’

-‘যার জন্য এখানে আসা সে মানুষটা তো জানেই। উপায় ছিল না আমার।’

দমকা হাওয়ায় মুখের উপর জানলা পড়ার মতই লাগল কথাগুলো। ঈশান জানলাটা আবার খুলবে নাকি বন্ধই করে রাখবে হয়তো এ রকমই কিছু একটা ভাবছিল। জানলাটা নিজে থেকেই ধপাস্‌ করে খুলে গেল।

-‘মোটামুটি একটা ভালো জায়গায় হার্ট অপারেশনের কত খরচ আপনার জানা আছে?’

ঈশানের উত্তরটা জানা নেই। এরকম ক্ষেত্রে অনেক সময় মানুষ অপরাধবোধে না-টা ঠিক না-এর মতো করে বলে না। ভাবখানা এমন করে যেন সঠিক উত্তরটা জানা নেই বলে বলল না। জানলার যে কাচটা এতক্ষণ জোড়াতালি দেওয়া লিউকোপ্লাস্টের দাগ নিয়ে খাপে খাপে লেগে থাকার চেষ্টা করছিল, সেটা ভেঙে গেল।

-‘আপনার সমস্যাটা জানতে পারি?’

আচমকা ভেঙে ছিটকে আসা কাচের মাঝখানে মানুষ খুব সাবধানে নিজের পা বাঁচাতে দাঁড়িয়ে থাকে।

ঈশান থেমে থেমে উত্তর দিল- ‘আমার তিনবছরের মেয়ে। শ্বাসনালীটা নাকি ঠিকমতো তৈরি হয়নি, মানে ছোটো। অপারেশন করতেই হবে। খুবই জটিল আর কি ব্যাপারটা।’

সিনেমায় যদি এই দৃশ্যটা একটা ঘরের মধ্যে হত তাহলে হঠাৎই লোডশেডিং হয়ে যেতো। নিপাট অন্ধকার। মোমবাতি নেই। শেষ দেশলাইটাও নিভে যেতো। অন্ধকারটায় ঠোকাঠুকি খেতো নায়িকার কথা।  ফ্রিজে রাখা সন্দেশের মতো মিষ্টি কিন্তু শুকনো। ‘আপনার মেয়ে ঠিক ভালো হয়ে যাবে, দেখবেন।’ প্লেটের সন্দেশ প্লেটেই পড়ে থাকে। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষ সহানুভূতি চায় আবার চায়ও না। দীর্ঘশ্বাস ব্যাপারটা না থাকলে এসব ক্ষেত্রে অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম কি হত এটা যথেষ্ট চর্চার বিষয়। মানে যেখানে একে অন্যের মুখ দেখতে পায় না, একটা কিছু কল্পনা করে নিতে পারে শুধু। সিনেমায় এরপর নায়ক নায়িকা বারান্দায় যেতে পারে। শহরটা জোনাকির মতো জ্বলবে।  ছেঁড়া ছেঁড়া কথার মধ্যেই হয়ত আলো জ্বলে উঠবে চারদিকে। হয়তো এরপরেই আলো জ্বলে উঠবে অন্ধকার অডিটোরিয়ামেও। শেষ নয়। শেষের শুরু। হাফটাইম।

কিন্তু এখানে মেয়েটি ঈশানকে প্রথমবার নিজের নাম বলল। শুধু নাম নয়, আরো অনেকটা। অনেকটাই।

-‘জানেন আমার ননদের ছেলের এ রকম একটা সমস্যা ছিল, এখন বছর দেড়েক হল ভালো আছে। খরচটা সত্যিই বেশ বড় রকমের। ওরা অবশ্য অ্যাপোলো না কোথায় একটা নিয়ে গিয়েছিল। আমরা মানে আমার হাজব্যান্ডও নিজের একটা পলিসি ভাঙিয়ে ওদের কিছু টাকা দিয়েছিল। কিন্তু তারাই এখন আমাদের বাড়ি যাওয়া আসা বন্ধ করে দিয়েছে। যদি এখন ওই টাকাগুলো ফেরৎ চাওয়া হয়! আমার বর সবসময় একটা কথা বলে। বলে, তোমার যেটা ঠিক মনে হয় তুমি সেটাই সবসময় করবে আনন্দী, তার বদলে কে তোমার জন্য কী করল ভাববে না। আচ্ছা অপারেশন কোথায় হবে আপনার মেয়ের?’

-‘কলকাতাতেই। আমার ডাক্তার দু’তিনটে অপশন দিয়েছেন। যেটায় পারব।’ কথাগুলো ঈশান এমনভাবে বলল যে উল্টোদিকের মানুষটা তার রেশ ধরে খুব একটা কথা এগোতে পারবেন না।

আনন্দী সিঁদুর পরে না, শাঁখাও না। আনন্দীও একটি পুরুষের মতোই, যার শরীরে বিয়ের ট্যাগ লাগানো নেই। অবশ্য ঈশান বিশ্বাস করে সিঁদুর পরে মেয়েদের সুন্দর লাগে। সিঁদুর খেলার পর আরো বেশি। বিয়ের পরের সেই বাড়তি মেদটাও লেগে নেই আনন্দীতে। সম্ভবত এখনও সন্তান আসেনি। অদ্ভুত একটা লাবণ্য। লাবণ্য নামটা ঈশানের খুব প্রিয়। ওর মনে হয় আনন্দীর নামটা লাবণ্য হতে পারত। পরক্ষণেই ভুল মনে হয় নিজেকে। ঈশান তোলপাড় হয় ভেবে। সার্কাসেও তো অনেকের প্রেম হয়। ট্র্যাপিজের সরু তারে দুলতে দুলতে। বাঘের গায়ের গন্ধ। কামাসক্ত ঘোড়ার পিঠের উপর বসে তার পিঠের অবাধ্যতার হিসেব বুঝে নিতে নিতে। না, প্রেমে পড়েনি ঈশান। প্রেমে পড়তে পারে না সে। আনন্দী আর সে দুজনেই দুটো বিশাল বালিঘড়ি নিয়ে বসে আছে। যার সবটা বালি আগে পড়ে যাবে, সে হেরে যাবে। তার যুদ্ধ শেষ। টাকার প্রয়োজনের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ওরা একে অন্যের প্রতিযোগী।

-‘আমারও মেয়ে ছিল, জন্মের কিছুদিন পর চলে যায়। ওকে আটকাতে পারিনি, চেষ্টা করেছিলাম। পারিনি। হয়ত আপনি পারবেন। আমার মন বলছে।’ আনন্দীর কথাগুলো গাছের পাতা খসে পড়ার মতো। অটুট রাখে নীরবতা।

সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনও লাইন এখন ইশানের মনেও পড়ছে না। নার্সিংহোমে ভিজিটিং আওয়ার্স শেষ। এখন করিডোরগুলো অনেকটা স্কুলের টিফিন শেষ হয়ে গেলে যেমন হয় তেমন। ছিমছাম। সংযত। এখন ঘরে ঘরে খাবার যাবে। তার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত কয়েকজন স্টাফ। হঠাৎ একটা ক্লান্ত বিধ্বস্ত শরীর তাদের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে আসে। ঈশান আর আনন্দী অপলক তাকিয়ে। নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ায় দুজনেই। উস্কোখুস্কো চুলে আঁচড় না পড়া লোকটাকে ওরা চেনে। এগিয়ে যায় আনন্দী। যন্ত্রের মতো অনুসরণ করে

‘সব শেষ। অনেক চেষ্টা করেছিলেন সবাই। রেসপন্স করল না বাবা। তোমাদের ধন্যবাদ দেবার ভাষা আমার জানা নেই। এটা আমি কোনোদিনও ভুলতে পারব না। পরে কথা হবে। আমি আসি। অনেকগুলো ফোনটোন করতে হবে।’

কয়েকমুহূর্ত কথাহীন। শব্দহীন। নিঃসঙ্গ। ঈশান অস্ফুটে বলে – ‘চলুন।’

নিজেদের খুব ফ্যালনা মনে হলে মানুষের চোখ তাকিয়েও তাকায় না। ঝাপসা লাগে কাছেরটাও। অনেকটা দূর থেকে ট্রেনে বাসে ঝুলতে ঝুলতে প্রিয় দলের ফুটবল ম্যাচ দেখতে এসে বিপক্ষকে জেতার উল্লাস করতে দেখলে যেমন নিজের উপর ঘেন্না হয়। যেমন মনে হয় বাড়ির পয়া টিভিটার সামনে বসে খেলা দেখলে ফলাফল অন্যরকম হত, ঠিক তেমনই একটা জোয়ার ঈশানের বুকের ভেতর বেঁধে রাখা সাধের নৌকাগুলোকে উপড়ে ফেলতে চাইছে। অথচ আজ ঈশান প্রতিরোধহীন দিলখোলা।

আনন্দী যেন একটা ঝিমধরা দুপুরবেলা। যেখানে পাশের বাড়ির পাম্প চালানোর শব্দ বা কারনিশে পায়রাদের আনাগোনা কোলাহল মনে হয়। দুটো ছায়া একে অপরকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে না, আবার কথাও বলছে না। ট্রাফিকের লাল আলো সবুজ হয়েছে। আটকে পড়েছে মানুষ।

ঈশান প্রশ্ন করে – ‘আপনি কোনদিকে?’ আঙুলের ইশারায় বলে দেয় আনন্দী।

‘ও। আমিও।’ ঈশানের গলায় উচ্ছ্বাস স্বতঃস্ফূর্ত।

আনন্দীর চোখ অস্থির। কখনও এদিক কখনও ওদিক। কখনও অনেকটা দূরে।

‘আপনি খুশি হলেন মনে হচ্ছে?’ কথাটা যেন চলমান গাড়িগুলোকে থামিয়ে দিল।

ভিড় ঠেলে এগোবার জড়তার আড়ালে লুকিয়ে পড়ল ঈশান। ‘আপনার আপত্তি?’

আনন্দী না তাকিয়েই অবাক সুরে পাল্টা বলে – ‘এটাই উত্তর’?

জেব্রা ক্রসিং মুছে গেছে পায়ের জঙ্গলে। এখন ফুটপাত। রবিবারের আমেজ। বড় ছোট সব দোকানেরই প্রায় শাটার টানা। কয়েক হাত এগিয়ে একমনে হাঁটছিল ঈশান। হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে বলে – ‘আপনি রাজী থাকলে আরও কিছুটা রাস্তা একসঙ্গে হাঁটতে পারি।’

প্রশ্নটা অদ্ভুত হেসে উড়িয়ে দেয় আনন্দী- ‘আচ্ছা আপনিটা এবার খুব কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। মানে আমার হচ্ছে আর কি। আমি এতক্ষণ টানা প্রায় সমবয়েসী কারওর সঙ্গে আপনি বলে কথা বলতে পারি না। কিছু মনে করবেন না প্লিজ। এই সরি, কিছু মনে করো না।’

ঈশান ঠোঁটের ফাঁকে হাসে- ‘আমি কিন্তু দেখেছি প্রায় সমবয়েসী মনে করলে মেয়েরা খুব সহজে তুইও বলতে পারে।’

হঠাৎ আনন্দী রাস্তার ওপারে ফুটপাতের দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলে – ‘ওই দেখো।’

ঈশান দেখে একটা বাচ্চা বহুরূপী। মা কালী সেজে ছুটছে আর দু’টো রাস্তার কুকুর ওকে তাড়া করেছে। কিছুটা দৌড়ে কুকুরগুলো থেমে যায়। ছেলেটা মুখ ফিরিয়ে দেখে একটা লাইটপোস্টে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। তারপর দেখা যায় মা কালী ইট ছুঁড়ে মারছে কুকুরগুলোর দিকে।

ঈশানের অস্ফুট স্বর শোনা যায় – ‘এই ছেলেটাই হয়তো কাল শিব সাজবে, অন্য কোনো পাড়ায়।’

-‘বা হয়তো কোনও শিব মন্দিরের বাইরে বসে ম্যানিপুলেট করবে।’শেষ কথাটা আনন্দীর।

ঈশান জানায় কোনও এক শিবমন্দিরের বাইরে সে এক বহুরূপী শিবকে হাতজোড় করে প্রণাম করতে দেখেছে একবার।

আনন্দীর গলায় প্রশ্নের সুর – ‘বিশ্বাস করো? ভগবান?’

একটা নীরবতা চেয়ে নেয় ঈশান। তারপর একটা আলতো দীর্ঘশ্বাস। ‘কতোটা ভালোবাসতে পেরেছি জানি না, ভয় পেয়েছি। একটা সময় বুঝতে পেরেছি ভয় থেকে ভালোবাসা বা  বিশ্বাস কোনোটাই আসতে পারে না। দেখবেন কিছু টিচার থাকে যাদের আপনি সারাজীবন ভয় পেয়ে গেলেন, যে রেসপেক্টটা দেখালেন সেটা মিথ্যে। বাধ্য হয়ে। আজ হয়ত তাদের মুখও মনে নেই ভালো করে। আর তাছাড়া ভগবান থাকলে একটা পাঁচ বছরের বাচ্চা রেপ্‌ড হয় না বা ক্লাস সেভেনের একটা বাচ্চা স্কুল বাস থেকে নেমে রাস্তা পার হতে গিয়ে মার চোখের সামনে বাসের চাকার তলায় চলে যায় না। কেন আপনি বিশ্বাস করেন নাকি?’

‘নাহ্‌ । একেবারেই না। তাই অভিমানও নেই তোমার মতো।’

সামনে একটা আইল্যান্ড। তাকে মক্ষিরানি করে রেখেছে চার পাঁচটা রাস্তা। ফ্লাইওভার চুঁইয়ে নেমে আসছে কয়েকটা গাড়ি। গাড়ি কম রাস্তায়, মানুষ আর পুলিশের জটলা বেশি। লোকে বলাবলি করছে যেভাবে ধাক্কা লেগেছে তারপরেও যদি বেঁচে যায় হাঁটতে চলতে পারবে কিনা সন্দেহ। একজন আবার বলছে, ‘শালা রোববারের বাজার, তার উপর ইন্ডিয়া-পাকিস্তান খেলা। নাহলে মালটা গাড়ি নিয়ে পালাতে পারত না।’

ভিড়ের আড়াল থেকে একফালি রক্তমাখা রাস্তা দেখা যাচ্ছে এবার। কয়েকহাত দূরে খেলনার মতো সামনেটা ভেঙে আলাদা হয়ে যাওয়া একটা বাইক। বারবার আক্ষেপের ইশশ্‌ আহারের মধ্যে আনন্দীর গলাও শুনতে পেল ঈশান। ‘কি অদ্ভুত না! এ যখন বাড়ি থেকে বেরোয়, কেউ ভেবেছিল আর কোনওদিন ফিরবে না! ভীষণ প্যাথেটিক।’

ঈশান রিয়্যাক্ট করে না। মাথার ভেতর শুধু ঘুরপাক খায় আজ রবিবার। কথা ছিল অন্য কোথাও যাবার। মাথার পেছনটা দপদপ করছে ঈশানের। কেন এদিকে চলে এল কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না। সত্যিই কি জীবন এমন কিছু শিখিয়ে দিল যার জন্য আবার নতুন করে বাঁচতে ইচ্ছে করতে পারে!

কপালের সামনে থেকে চুল সরিয়ে আনন্দী বলল, ‘নার্সিংহোমের করিডোরে তোমায় যা যা বলেছি সেগুলো একটাও সত্যি নয়। ওই চায়ের দোকানটায় বসবে?’

ঈশানের কাছে হ্যাঁ এবং না এর একই মানে এখন। আজ রোববার শোনার পর থেকেই মনটা তেতো হয়ে গেল। কিচ্ছু ভাল্লাগবে না কিছুক্ষণ। চায়ের দোকানে আনন্দীই ভাঁড়ে দুটো চা বলল। ওর মুখে পড়ন্ত বেলার রোদ্দুর। চোখের মণিটা বাদামী। আইল্যাশগুলো বড় বড়। প্যাস্টেলে আঁকা আকাশের পাখির ডানার মতো।

-‘ফ্যান্টাসি করাটা বোধহয় আমাদের সহজাত। কি অদ্ভুত! একবারও ঠোঁট কাঁপল না আমার কথাগুলো বলার সময়।’ আনন্দী চায়ের চুমুক শেষ করে বলল।

ঈশান একপাল কলেজ পড়ুয়ার অনর্গল কথা বলে যাওয়ার বিরক্তিকে আড়চোখে রেখে নির্বিকার স্বরে বলে – ‘আমার কথাগুলোও তো বানানো। পুরোটাই মনগড়া।  আসলে ডাক্তারবাবুর জন্য কোনওদিন কিচ্ছু করতে পারিনি। তাই ভেবেছিলাম যদি আমার একটা কিডনি …’ থেমে যায় ঈশান।

আনন্দীর চোখের দিকে তাকায়- ‘আমার একটা অন্য কাজ ছিল। এসে দেখলাম মেট্রোর শাটার বন্ধ। খুব তাড়া ছিল, কিন্তু আটকে গেলাম। আর কিছু মাথায় ছিল না। জানতাম আমায় মেট্রোর প্ল্যাটফর্মে পৌঁছতেই হবে। কি মনে হল ডাক্তারবাবুর মোবাইলে ফোন করলাম। শেষবারের জন্য খুব শুনতে ইচ্ছে করল ওনার গলাটা। কিন্তু ফোন ধরলেন না উনি। যে কথা বলল তার কাছেই শুনলাম। শরীরটা তো ছিন্নভিন্ন হয়েই যেতো, মনে হলো আমার শরীরের একটা অংশ যদি ওঁকে বাঁচিয়ে দিতে পারে। যদি আমার একটা কিডনি…’

আবার অসমাপ্ত তবু আঁচ পেলো আনন্দী। আনমনে কিছুটা চা উপচে পড়ল ঈশানের। ‘ডাক্তারবাবু বেঁচে থাকলে অনেকের ভালো হত।’

দীর্ঘশ্বাসে সম্মতি জানায় আনন্দী। একটা অদ্ভুত অনুভূতির চক্রবূহে দাঁড়িয়ে সে। নেগেটিভ। নিঃসঙ্গতা নয়, ব্যর্থতা নয়, কোনও অর্থহীন বিপ্লবও নয়। অন্য কিছু যেন। ‘আমার সবথেকে বেশী খারাপ কী লাগছে জানেন, আমার আসলে মরার সাহসই নেই, থাকলে আপনার সঙ্গে উল্টো রাস্তায় চলে আসতাম না। যাক্‌গে ফালতু বোর্‌ করছি আপনাকে! এইটাই সমস্যা! সবাই বলে আমি নাকি মিশতে পারি না, আনসোশ্যাল; মনে হচ্ছে আপনার?’

আনন্দী নিজেও কোথাও ঈশানের মতো। একবার মিশে গেলে কুয়াশা আর পাহাড়ের মতো। পরিবেশটা ভালো লাগছিল না আনন্দীর। চারপাশে এতো পার্থিব টুকরো কথা। জীবন নিয়ে আলোচনার মরীচিকা আর তর্ক আছে শুধু।

‘চলো একটা অন্য জায়গায় যাবো। কাছেই।’ আনন্দী কখন চায়ের দাম দিয়ে দিয়েছে ঈশান বুঝতেও পারেনি। তার মতো ফাঁকা সময়ের মানুষ আনন্দীর প্রস্তাবে না বলল না।

শীতের বেলা। নিভে যাবার তাড়া থাকে। আজ অ্যাক্সিডেন্টটা লেখাই ছিল ঈশানের কপালে। নাহলে তার সঙ্গে আনন্দীর দেখা হয় না। নাহলে প্রায় সাত আট মাস পর বিসর্জন লেনের দিকে হাঁটতে হাঁটতে নতুন করে সে ভগবানের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিঃসংশয় হয় না। তার মানে মাটি কামড়ে পড়ে থাকার ধৈর্যে জিতে যাওয়াটাই কি লড়াই? শহর পুরোটা কালো হয়ে যাবার আগেই রাস্তার আলোদের জ্বলে ওঠার রীতি। আনন্দীর মুখেও সেরকম একটা আলো। পর্দা সরে গেলেই উঁকি মারে।

নীরবতার সুতো খুলে ফেলল ঈশান- ‘আচ্ছা আপনার চোখে তো অনেক বাঁচার স্বপ্ন, অনেক লক্ষ্য, আপনার একবারও মনে হয়নি যে একটা কিডনি শরীর থেকে চলে গেলে আপনি জীবনের দৌড়ে পিছিয়ে পড়তে পারেন?’

সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে আনন্দী ম্লান হাসিতে- ‘কিন্তু অনিমেষকাকু আমার জীবনের অনেকটা জুড়ে আছেন। ওঁর থেকেই সাহস পেয়েছি। লড়াই শিখেছি। উনি তো রাতারাতি এতো বড় ডাক্তার হননি। ওঁর লড়াইটাও একটা গল্প। কত প্রত্যন্ত অঞ্চলে দিনের পর দিন ছিলেন। এক একটা ঘটনা শুনতাম আর শিহরণ হত শরীরে। উনিই আমার ঈশ্বর।’

হাঁটা থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল আনন্দী। এই জায়গাটার কথাই বলছিল সে। লোকে বলে বিসর্জন লেন। পোশাকি নামটা হারিয়ে গেছে। প্রায় অন্ধকার। খুব একটা বড় বাড়ি নেই চারপাশে। ক্রিকেট কোচিংয়ের বড় মাঠ পাশে। চারকোণা। লম্বা রাস্তাটার শেষ দু’টো প্রান্ত দুটো ব্যস্ত রাস্তা। আলো ঝলমলে। স্লো মোশনে গাড়িগুলো যাচ্ছে মনে হয়। চারপাশের এলাকার সব পুজোর ভাসান যায় এই শান্ত আলোছায়া রাস্তাটা দিয়ে। তখন রাস্তাটায় আলোর বন্যা। ভিড়। পারফিউম। মোবাইল ক্যামেরা। রেলিং টপকে মাঠের ভেতরে লোক ঢুকে যায়। আনন্দী আর ঈশানও ঢুকে পড়ল। আনন্দী সেই জায়গাটায় গিয়ে দাঁড়াল যেখানে দাঁড়িয়ে ও একা একা ভাসান দেখে। ভিড় বাঁচিয়ে নিজের মতো। ঈশান অবাক হয়ে শোনে। মনে করার চেষ্টা করে এর আগে কখনও আনন্দীকে দেখেছে কিনা। সেও তো আসে। ঠিক এখানেই। বিসর্জন লেন তারও মন খারাপের সঙ্গী। একাকীত্বের কথোপকথন। অদ্ভুত লাগছে ঈশানের। মৃত্যুর পরের জন্মে তার বিশ্বাস নেই। অথচ পুনর্জন্ম শব্দটা বড় ভালো লাগছে এখন।

Tags

2 Responses

  1. স্পীচলেস। অসম্ভব ভালো লেখনী আপনার। তুমুল ভালো লাগা জানাই।

Please share your feedback

Your email address will not be published. Required fields are marked *

SUBSCRIBE TO NEWSLETTER

Resize-+=

Please share your thoughts on this article

Please share your thoughts on this article

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.

  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.

  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.

  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).

  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

SUBSCRIBE TO NEWSLETTER

Please login and subscribe to Bangalive.com

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com