মায়াবিদ্যা

মায়াবিদ্যা

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
শুভ্রনীল ঘোষের ছবি
অলংকরণ: শুভ্রনীল ঘোষ
অলংকরণ: শুভ্রনীল ঘোষ

তা-ও হয়ে গেল আজ উনিশ কুড়ি বছর, হালিশহর থেকে রাস্তাটা চলে গেছে চৈতন্যডোবার দিকে, হাঁটছিলাম আপন মনে। তখন মন কাচের মতো স্বচ্ছ,যা দেখি তাতেই উথলে ওঠে খুশি। যৌবনবেলার এমনই নিয়ম! একপাশে গঙ্গা, লাজুক শীতকাল আসব আসব করেও থমকে দাঁড়িয়ে আছে চৌকাঠে। ইচ্ছে ছিল চৈতন্যডোবায় নিমাই সন্ন্যাসীর গুরু ঈশ্বরপুরীর আশ্রম দেখে ফিরব।

কার্তিক মাসের বিকেল, এখনই ঝপ করে মরে গিয়ে নেমে আসবে সন্ধে। কেমন যেন ধোঁয়া ধোঁয়া চারপাশ। নাক টানলে ভেজা গন্ধ পাওয়া যায় বাতাসে। মলিন মধ্যবিত্ত পাড়ায় খেলা সেরে বাড়ি ফিরছে ছেলেপিলের দল, শঙ্খ বেজে উঠছে কারওর তুলসিতলায়। কত পুরনো মন্দির, গায়ে ভাঙা পোড়া মাটির কাজ। এই যুবতি সন্ধেবেলায় কেউ সেখানে আর দীপ জ্বালে না, কতদিন হল হারিয়ে গেছে দেববিগ্রহ! চামচিকে আর বাদুড়ের আস্তানা, আর একটু পরেই অন্ধকারে পাখা মেলে তারা উড়ে যাবে খাবারের খোঁজে।

রাস্তার একপাশে দু চারটে ছোট তাঁবু পেতেছে বেদের দল। গাঁ-গঞ্জে তখন প্রায়ই দেখা যেত তাদের। তাঁবুর বাইরে বসে আছে এক বেদেনী। মাথায় একঢাল রুক্ষ চুল,পরনে ঘাঘরা আর ব্লাউজ, কটা চোখ। তামাটে শরীরের গড়নটি ভারী সুন্দর। কাঠকুটো জুটিয়ে আগুন জ্বেলেছে, তিনটে ইঁটের ওপর মাটির হাঁড়ি চাপানো, গুবগুব করে কী যেন ফুটছে। পাশে রঙবেরঙের তাপ্পি মারা একটা বিশাল ঝোলা। বিচিত্র সব জিনিস থাকে ওই ঝোলায়। কলাবাদুড়ের নখ, শাখামুটি সাপের বিষদাঁত, ঘোড়ার নাল, মানুষের করোটি আরও কত কী! সাপের বিষ নামাতে, গাঁয়ে অজান্তে মেয়েদের গর্ভ হলে গর্ভ খসাতেও ডাক পড়ে বেদেনীদের! ডাইনি ভর করলে জলপড়া দেয়! 

সেই ছোটবেলায়, কতই বা বয়স তখন আমার, নয়-দশ বছর হবে, এমনই এক শীতের সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে আলাপ হয়েছিল এক বেদেনীর সঙ্গে। তার ঝোলা খুলে রূপকথার রাজ্য দেখিয়েছিল আমাকে! গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিল, কী বোঁটকা গন্ধ হাতে। বড় বড় নখে কিরকির শব্দ, কেমন গা শিরশির করেছিল আমার, ঠিক যেন অরুণ-বরুণ-কিরণমালার ডাইনি বুড়ি, সেই যে হাড়ের পাহাড়ে থাকত! ফেরার রাস্তায় যতবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেছিলাম, স্থির চোখে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে! মরা মরা দুটো চোখ। কী-ই বা বুঝতাম আর সেই বালকবয়সে!

দুপুরে খেতে বেরিয়েছিলাম, অফিসপাড়ার ছায়াচ্ছন্ন সস্তার হোটেল। ঠাঠা দুপুরে যেন আগুন গলে গলে পড়ছে আকাশ থেকে। রাস্তার ধারে পাতা নড়বড়ে প্লাস্টিকের টেবিল চেয়ার। এখানে বাবুরা খায় না। আশেপাশের অফিসের দারোয়ান, উর্দি পরা এটিমএম রক্ষী, হকার, ইলিকঝিলিক মানুষেরা খেতে আসে। পেরেকের মতো ভাত, জোলো মুসুর ডাল, পুঁইশাক কুমড়োর ঘন্ট, এককুচি লেবু লঙ্কা কাঁচা পেঁয়াজ এই সব সামান্য আয়োজন! একটা বুড়ো রাধাচূড়া গাছের ছায়ায় সামান্য মানুষের দল পেট ভরে খেতে বসেছে আর তাদের মাথায়, শরীরে, খিদের থালায়, বাতাসে উড়ে উড়ে নেমে আসছে রাধাচূড়ার হলুদ রেণু।

মুখে ভাতের গরস তুলেই চোখে পড়ল, দুটি বেদেনী এসে বসেছে আমার উল্টোদিকের চেয়ারে। সেই একরকম ঝোলা পায়ের কাছে রাখা। টান করে বাঁধা রুক্ষ চুল, বড় বড় হাতের নখ, কটা চোখ। একটু অবাকই হলাম, ভালও লাগল, এখনও এই ফসিল হয়ে যাওয়া প্রেতশহরে দু-এক জন জ্যান্ত মানুষ আসে তা হলে! খাওয়া শেষ করে দাম মিটিয়ে উঠে আসছি, সিগারেট ধরিয়ে কী মনে হল, পিছনে তাকালাম। খাওয়া থামিয়ে এক জন দেখি ঠায় চেয়ে রয়েছে আমার দিকে। সেই রকম মরা চোখ।

এ বার চোখে চোখ রেখে একটু হাসলাম। ছোটবেলায় বুঝিনি, আজ জানি ওই রকম সব দৃষ্টির মায়াই সারা জীবন আমাকে থিতু হতে দিল না! একটু আরাম করে দাওয়ায় বসলেই তাড়া দিতে থাকে নিরন্তর, চলো চলো।
ওই দৃষ্টিপথ বেয়ে আমার সামনে খুলে গেল এক আশ্চর্য জগত! যেন অবিকল ছায়াচিত্র। কত মানুষজন, অবাক হয়ে তাদের দেখতে থাকি আমি, বিচিত্র সব গল্প ঘোরাফেরা করছে, একজন নিয়তিতাড়িত কিস্সাওয়ালার মতোই তাদের অনুসরণ করতে থাকি আমি। নিজেকেও দেখতে পাই, ওই তো সারাদিনের কাজ শেষে বাড়ি ফিরছি। 

কাজ সেরে দাওয়ায় এসে বসি প্রতিদিন । পা টিপে টিপে সন্ধে নেমে আসে। মন যেদিন পরিস্কার থাকে স্পষ্ট শোনা যায় তার পায়ে বাঁধা ঘুঙুরের টুংটাং শব্দ। ময়লা লাল রঙের ছোপ পশ্চিম আকাশে।

খিড়কির দরজায় কে যেন ডাকছে। ও, ঘোষ পাড়ার রাধাদি, বাড়ির বেত ঝোপ কেটে সকালে পরিষ্কার করছিল, ক’টা বেত ফল দিতে এসেছে মনে হয়। ভারী ভালো লাগে খেতে। ধামায় খুব করে ঝাঁকালে শাঁস আর খোসা আলাদা হয়ে যায়। সেই তুলতুলে শাঁস অল্প কাসুন্দি আর নুনে মেখে মুখে দিলেই মনে হয় ক্ষুৎকাতর পৃথিবীতে এর থেকে নরম আদর আর নেই!

কত কী দিয়ে যায় রাধাদি আমাকে। বরের সঙ্গে বনিবনা নাই তেমন। কখনও দুটো কামরাঙা কোনওদিন থোলো থোলো ক’টা পাকা জাম অথবা একবাটি কাচা আমমাখা আঁচলের তলায় লুকিয়ে নিয়ে আসে। দাওয়ায় বসে খাই দুজনে। গল্প করি, নিতান্তই গেঁয়ো সুখ দুঃখের কথা। একএকদিন সন্ধের মুখে বলে, তুই বাঁশি বাজাতি পারলি বেশ হত!

দুলুদের বাড়ির গাভীটা ডাকছে সন্ধে থেকেই। আজ রাতেই বিয়োবে হয়তো। কাল তিড়িং তিড়িং করে উঠোনময় খেলা করে বেড়াবে কচি বাছুর। তখনও নাড়ি খসেনি। তলতলে বাঁট চুষে চুষে দুধ খাবে মায়ের।

উঠোনের ভরন্ত পেয়ারাগাছে ঝেঁপে ফল এসেছে এবার। কে খাবে অত পেয়ারা! বেছে বেছে ডাঁসা কয়েকটা তুলে রাখি রাধাদির জন্য। কলাবাদুড়ের দল এরকম সন্ধের মুখে পাকা পেয়ারার লোভে উড়ে আসে।

জুঁইয়ের সুবাসে ম ম চারপাশ। দাওয়ায় বসে মাথা ঝিমঝিম করে। ঘরের পেছনদিকে বুনো ঝিঙের ঝোপ লকলক করে বেড়ে উঠেছে নিজের মনেই। এ রকম দিনশেষের মুখে টুপটুপ করে ঝিঙেফুল ফুটে ওঠে। গন্ধরাজ গাছটা মরে গেল গত শীতে, বুড়ো হয়েছিল। একটা গন্ধরাজের চারা কিনে আনলে হয়, কিন্তু আমার হাতে লাগানো গাছ বাঁচে না বেশিদিন। হয়তো অভিশাপ লেগে আছে আমার দু হাতে।

কতদিন ঘরদোর রঙ করা হয়নি। তুলসিতলা ভেঙে পড়ে আছে, বন তুলসির মঞ্জরী উঠোনময়। সন্ধে ঘন হয়েছে। কুপি জ্বেলে এনে রাখি দাওয়ায়। তুলসীপাতা শ্বেত চন্দনে মেখে গিরিধারীর পায়ে দিই প্রতি সন্ধ্যায়। দুটো গুড়ের বাতাসা সামনে রাখি। শাঁখ বাজাতে পারি না ভাল। বিড়ি খেয়ে খেয়ে শ্বাসে দম নেই মোটে।

সেই কবে বাবার দাদু ছাদ তুলেছিল, তারপর কেউ আর যত্ন করিনি তাকে। আলসেতে বটের চারা মাথা দোলায়। বেলগাছে শুধু নিয়ম করে ফল আসে প্রতি বছর। ছোট ছোট পাকা বেল, আঠা কম, মাখনের মতো হলুদ শাঁস। কী মিষ্টি। রাত হলে নারকেল গাছের পাতায় সরসর করে কীসের যেন শব্দ হয়। যেদিন জোসনা থাকে, আনন্দে ঝলমল করে আমার ভিটা।

যাক আর একটু রাত। একা মানুষ, পুরোনো আতপ চাল, ভাল ঘি আছে বয়ামে। আলু পেঁপে সেদ্ধ। একমুঠো সোনামুগ ডাল। দুটো ভাতে ভাত করে নেব।

কাল সকালে তালা চাবি এঁটে আবার কলকাতার সংসারে ঢুকে পড়ব। অফিস যাব। এঁটো পাতা কুড়োব মানুষের সারাদিন। বিষাক্ত তীর সরিয়ে রক্ত মুছে মুছে ঘড়ি দেখব বারবার। অর্থের ঝুলি এনে ফেলে দেব দায়িত্বের চৌকাঠে। মুখে ফেনা তুলে আয়ুক্ষয় করব নিজের।

আমার ভিটা অপেক্ষা করে আছে। শুধু আমারই জন্য। আরও কতসব মানুষ। চৈত্রের আকাশ ভরে উঠবে নক্ষত্ররাজির ছায়ায় । সংকীর্তনের আসরে নাচবে রাধাদি। বাতাস বইবে এলোমেলো। তারপর একদিন ছুটে আসবে মেঘের দল। কদম রেণু ভেসে বেড়াবে উঠোনে। আরও কদিন পর থলকমল মাথা দোলাবে আশ্বিনের রৌদ্রে। শুকনো পাতায় শোনা যাবে ছোট দিনের গান।

ওই ভুবনডাঙা শুধু আমার জন্য খুলে দেয় দুয়ার। প্রতিরাতে।

বিছানা পেতে দেয়। গেলাসে জল রাখে। মাথার কাছে বসে দুটো শীতল হাত রাখে আমার জ্বরতপ্ত কপালে।

আবার বদলে যায় দৃশ্যপট। দেখি, একজন লোক জামরুল নিয়ে বসে আছে পথের ধারে।

আলোয় ভেসে যাচ্ছে বড় রাস্তা। একটু দূরে ধুলোর ওপর সাদা চিকচিকে বস্তা বিছিয়ে বসে আছে একজন মলিন লোক। সামনে একরাশ টাটকা জামরুল। এদিকটা ঝুঁঝকো আঁধার ঢাকা। ভাঙা গলায় লোকটা হেঁকে চলেছে, জামরুল জামরুল!

সন্ধ্যা নেমেছে অনেকক্ষণ, তবুও মাটির গা থেকে গরম ভাপ উঠছে। ঘামে ভেজা ক্লান্ত মানুষজন বাড়ি ফিরছে, কলমুখর জনপথ।

লোকজন ফিরেও তাকাচ্ছে না। কে কিনবে জামরুল! জোলো স্বাদ, মাথায় কালো কালো ঝুঁটি বাঁধা। অত সময় কোথায় মানুষের। কাছেই একটা বড় আকাশমুখো বাড়ি উঠছে, ধুলোয় ঝাপসা চারপাশ। কেমন যেন আবছা দেখাচ্ছে জামরুল আর তার সামনে উবু হয়ে বসে থাকা লোকটাকে।

—কত করে গো জামরুল
একগাল হেসে জবাব দিল
—চলিস করে দিসসি, তিরিস দ্যান আপুনি
—পাল্লা কোথায় তোমার ?
—এই যি
পাশে চটের বস্তার ওপর রাখা একটা মরচে ধরা দাড়িপাল্লা তুলে দেখায় আমাকে! বড় ছোট পাথরের টুকরোও আছে ক’টা! বুঝলাম ওগুলোই বাটখারা।
—দাও পাঁচশো মতো! ভালো হবে তো গো ? কেমন যেন শুকনো শুকনো মনে হচ্ছে!
একটা ধুলোমাখা ফল আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে লোকটা বলে উঠল
—খেইয়ে দ্যাখেন! এই দুফুরে পাড়া বাবু গাস থিকে!

কিচিরমিচির অটো বাস শেয়ার ট্যাক্সি আর রঙিন গাড়ির ভিড়ে কারওর ফুরসত ফেলার অবকাশ নেই। সকলেই ফিরতে চাইছে নিজেদের ঘরে, কলঘরের ঠাণ্ডা জল আর দিনান্তের নরম বিছানা ক্রমাগত হাতছানি দিয়ে ডাকছে তাদের।

বেশ খেতে। মুখে দিলেই একটা ছায়াচ্ছন্ন বাগান মনে পড়ে। থল কমলের গাছে থোকা থোকা ফুল ফুটেছে, তেজপাতা গাছের মিষ্টি মিষ্টি গন্ধ মেশা বাতাস, চন্দন গাছের সারা গায়ে উইপোকাদের বসত। আর মনে হয় না বাঁচবে বেশিদিন। ঝুনো নারকেলে ভর্তি দুটো গাছ, গাছাল ডেকে কামাতে হবে এর মধ্যেই। বড় বড় সবুজ ঘাসে ছাওয়া মাটি, কেউ আসে না আর এদিকে, একটা বেজি শুধু আপনমনে ঘুরে ঘুরে বেড়ায়। টুপটুপ করে খসে পড়ে লেবুফুল, বাতাবি পেকে লাল হয়েছে কেমন!
আর ওই যে ঝাকামুকো জামরুল গাছ!

— কোথাকার জামরুল গো?
—লাউআটির থিকে আনসি
—তোমার নিজের গাছ নাকি?
একটু হেসে বলে
—গাস কোতায় পাবঅ, লুকের গাস তেকে পেড়ে নিয়া আসসি

পাতলা সাদা পলিথিনে জামরুল মুড়ে এগিয়ে দেয় আমার দিকে। হঠাৎ চোখে পড়ে পাশে আলাদা করে রাখা বেশ কিছু জামরুল। বড় বড়, চকচকে গা। হাত তুলে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করি
—ওইগুলো থেকে দিলে না কেন ? বেশ বড় বড় ছিল!
মুখ নিচু করে দু এক মিনিট পর বলে ওঠে
—ওকিন তেকে ন্যাবেন ? তাই দিসসি
কী একটা সন্দেহ হয় আমার, বলি
—আলাদা করে রেখেছিল কেন গো ?
মুখ তুলে আমার দিকে তাকায় লোকটা। তেলতেলে মুখ, হনু উঁচু তোবড়ানো গাল, করুণ দৃষ্টি। একটু ইতস্তত করে বলে
—আলগা লয়, সেলেটা খেতি সায়, তাই ক’টা..
চুপ করে দু এক মুহূর্ত পর বলে উঠি
—থাক দিতে হবে না, কত বয়স তোমার ছেলের ?
ঝকমকে হেসে উত্তর দেয়
—ই সৈতে তিন বসর পেরুলো!
—বাহ! কী নাম ?
—আকরাম!

অবিরল জনস্রোত বয়ে যাচ্ছে বড় রাস্তায়। ডানায় ভর করে নেমে আসছে কত দেশি বিদেশি উড়ান। সামনে বিমান বন্দর, ছোট জানলা দিয়ে আকাশ থেকে রঙিন শহর কী মোহময়! যেন আলোর কাজল পরা এক যুবতি।

আমাদের দেখা যাবে ? দুই পিতা মুখোমুখি কবেকার জোলো ফল সামনে নিয়ে উদ্বাস্তুর মতো চেয়ে আছি পরস্পরের দিকে, যাবে দেখা রাত্রির আকাশ থেকে আমাদের ?

—কোথায় বাড়ি তোমার?
—হুই বাদু পার হয়ি ফকিরগন্স
—রাত হবে তো বাড়ি ফিরতে?
চুপ করে থাকে লোকটা। ও জামরুল আর বিক্রি হবে বলে মনে হয় না, আপেল আঙুর বেদানা আম কত ভালো ভালো ফল আছে ঝকঝকে বাজারে, ওসব ছেড়ে কেনই বা কিনবে লোকে অন্ধকারে ফুটে ওঠা সাদা সাদা জামরুল !

আবার জিজ্ঞেস করি
—আক্রম খাবে কখন তাহলে জামরুল ? ঘুমিয়ে পড়বে না ?
একটু ম্লান হেসে লোকটি বলে
—মাতার কাসে রেখি দেব, কাইল ফজরের আসানের আগি উঠবি…

এক ঘুমন্ত অবোধ শিশুর মাথার কাছে রাখা আছে ক’টা জোলো ফল! মধ্যরাতে তার বাবা সারাদিনের পরিশ্রম শেষে নিয়ে এসেছে! ফজরের নামাজের পর রোজা। সারাদিন আবার খালি পেটে ঘুরে বেড়াবে টাকার ধান্দায় ওই হতদরিদ্র পিতা। ওর রোজা কবুল করুন আপনি, আল্লাহ !

জামরুল গাছের ছায়ায় ততক্ষণ ঢেকে গেছে ব্যস্ত জনপদ। দুটি অবোধ শিশু খেলে বেড়াচ্ছে সেই নির্জন ছায়াতলে, ওদের সারা শরীরে সবুজ ঘাস। এক প্রাচীন বাড়ি কী খুশিই না হয়েছে! টলটলে হাতে ধরা আছে স্বচ্ছ অমলিন জামরুল।

খেলুক ওরা, আমি বাসের খোঁজে এগিয়ে যাই! লবণহ্রদের দিকে যাব আমি। দেখা হয়ে গেল আবার একটি দৃশ্যের সঙ্গে!

লবণহ্রদের রাস্তায় এখনও তত রোদ্দুর ওঠেনি। ছায়া ছায়া আলো, বাতাসে দুলছে দেবদারু ম্যালেরিয়া-গাছের ডালপালা। বাড়িঘরে লোকজন থাকে বলে মনে হয় না, ধূ ধূ বারান্দায় জীর্ণ পাতা পড়ে আছে আনমনে। লোক থাকলেও হয়তো দু একজন বুড়োবুড়ি। মানুষের গলার স্বর বড় বিরল এখানে।
ঠক ঠক করে আমগাছের মোটা গুঁড়ির ওপর ঠোঁট ঘষছে কাঠঠোকরা। অনেক রকম পাখ-পাখালির আনাগোনা এদিকে। একবার সন্ধেরাতে একটা পেঁচাকে গোল গোল চোখ ঘুরিয়ে ল্যাম্পপোস্টের মাথা থেকে উড়ে যেতে দেখেছিলাম।

রাস্তার দুপাশ কী সুন্দর যত্ন করে সাজানো! এলোমেলো নিজের খেয়ালে বড় হয়ে ওঠা ঝোপঝাড় গাছের ডালপালা কেটে ছেঁটে আমাদের মাপমতো করে দেয় পুরকর্মীরা। তবুও দু একটা অবাধ্য ঘাড়বেঁকা গাছ বুনো ঝোপ থাকেই, পোষ মানে না মানুষের হাতে!
ওই যেমন দোতলা বারান্দায় থোকা থোকা মাধবীলতা ফুটেছে, লাল সাদা ফুলের জঙ্গল। পা টিপে টিপে লতা বেয়ে শুঁয়োপোকা কাঠপিঁপড়ের দল ওঠে আর নামে সারাদিন!

দু একটা রিক্সা অটো অফিসের বাবু বিবিদের নিয়ে রওনা দিয়েছে। ঠাণ্ডা গাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছে সওয়ারি নিয়ে। এসব কোলাহল কিছুক্ষণ মাত্র, আগুনখেকো দ্বিপ্রহর তারপর নিশুত রাতের মতোই নির্জন। রাধাচূড়ার হলুদ পাপড়ি ছাওয়া শুনশান পথ পড়ে থাকবে একপাশে।

আমিও বাস ধরব বলে হাঁটছি। আজ খুব বাতাস বইছে চারপাশে। কী ফুল এসেছে জারুল গাছটায়! বেগুনি ছায়ার নিচে রোগা হতদরিদ্র এক কিশোরী ডাবের কাঁদি নিয়ে বসে আছে। পাশে ধুলোর ওপর হামা টানছে ন্যাংটো দামাল শিশু। নাকে সিকনি। ওই ক’টা ডাব বিক্রির টাকায় আর কী হবে ! চাল কিনে নুন কিনতেই ফুরিয়ে যাবে। তখন কী করবে ? কী আর করবে, কাঁচা তেঁতুল পাতা মেখে জল ঢেলে খাবে ভাত, টকটক স্বাদ বেশ।

হঠাৎ উল্টোদিক থেকে দেখি একজন লোক এসে দাঁড়ালেন ওই ডাবওয়ালির সামনে। হাট্টাগোট্টা গুন্ডার মতো চেহারা, একমাথা চুল, চওড়া কপাল। শক্তপোক্ত কাঁধ আর চোয়াল। পরনে এই গরমেও মোটা ধূসর খদ্দরের কলার তোলা পাঞ্জাবি, মিলের সাদা ধুতি, পায়ে ক্যাম্বিসের জুতো। হন্তদন্ত ভাব বেশ একটা। একটু হেসে কিশোরীকে জিজ্ঞেস করলেন
—ডাব কত করে দিচ্চ গো খুকি ?
বেজার মুখে মেয়েটি জবাব দিল
—ছ’ আনা!
—তা বেশ! ভালো শাঁসওয়ালা দেকে একটা দেও দিকিনি! বেশ শাঁস হয় যেন!

ছ’আনা দাম শুনে চমকে উঠলাম। কবেকার কথা এসব ? এগিয়ে গিয়ে লোকটির পাশে দাঁড়ালাম, কেমন যেন চেনা চেনা, কোথায় দেখেছি, কোথায় যেন দেখেছি! আমিও জিজ্ঞেস করলাম
—ডাব কত করে ?
পরিষ্কার গলায় মেয়েটি উত্তর দিল
—পনেরো টাকা, বড় গুলান কুড়ি।

কিছু বলার আগেই দেখি লোকটি খোশগল্প জুড়েছে মেয়েটির সঙ্গে।
—তা খুকির ঘর কোতায়? খোকা কে হয় গো ?
এমন সব সাধারণ গল্প। দুজনেই হাসছে। মেয়েটা বলছে
—দিনমানে ত্যামন বিককিরি লাই গো!
লোকটি মুচকি মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করল
—এ কি তোদের গাছের ডাব খুকি ?
—গাছ কুতায় পাব বাবা! হুই মহাজনের কাচ থিকি লিয়েচি ধারে।
মেয়েটির দিকে চেয়ে আছে লোকটি। কী সজল দুটো চোখ। দু এক মুহূর্ত পর বলছে
—চল না একবার চালকি-ব্যারাকপুর, আমার গাঁয়ে, রায়খুড়োদের কত ডাব গাচ, নোনা গাচ, পাকা আতার জঙ্গল,খাওয়ার লোক নাই, সব বাদুড় মাদুড়ে খেয়ে যায়! পেড়ে এনে বিককিরি করবি কেমন! বেশ হবে!  পাকা নোনা খেয়েচিস খুকি কোনওদিন ?
—তুমার গেরামের লোক কিচু যদি বলে!
—হা হা হা! ক্ষেপেচিস তুই খুকি! রায়খুড়োর মতো লোক হয় না! দেকবি একবার রায়খুড়োর বাগানের ফল খেলে ইদিককার লোক কেমন পিলপিল করে আসবে রোজ তোর কাচে !

কত কথা দুজনের! যেন শুধু কথা দিয়েই টেনে নেবেন মেয়েটির সব যন্ত্রণা। এক হৃদয়বান পুরুষ একটি সরলমতি কিশোরী অবোধ শিশু আর কতগুলো ডাব। এই সামান্য মাত্র আয়োজন।
একটু তফাতে দাঁড়িয়ে আছে রাক্ষুসে আমার শহর।

কেমন যেন মাথাটা একটু ঘুরে উঠল। পরমুহূর্তেই দেখি কোথায় কী! কেউই নেই।
শুধু দু একটা জারুল ফুল খসে পড়ছে বাতাসের দোলায় ধূলার ওপর।

এগিয়ে গিয়ে মাথা নিচু করে তুলে নিলাম একটি ফুল। থাক আমার কাছে একটুকরো। ওই কুসুমরেণুর শরীরে লেগে আছে মায়াবিদ্যা! 

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

Leave a Reply

Handpulled_Rikshaw_of_Kolkata

আমি যে রিসকাওয়ালা

ব্যস্তসমস্ত রাস্তার মধ্যে দিয়ে কাটিয়ে কাটিয়ে হেলেদুলে যেতে আমার ভালই লাগে। ছাপড়া আর মুঙ্গের জেলার বহু ভূমিহীন কৃষকের রিকশায় আমার ছোটবেলা কেটেছে। যে ছোট বেলায় আনন্দ মিশে আছে, যে ছোট-বড় বেলায় ওদের কষ্ট মিশে আছে, যে বড় বেলায় ওদের অনুপস্থিতির যন্ত্রণা মিশে আছে। থাকবেও চির দিন।