টেলিং লাইজ়? কী করবেন?

87

আমরা সবাই কখনও না কখনও মিথ্যে বলেছি| তাই বাচ্চা যখন মিথ্যে বলবে‚ প্রথমেই উত্তেজিত না হয়ে সে কেন মিথ্যে বলছে, সেটা বোঝার চেষ্টা করুন| বাচ্চা মিথ্যা বললে আপনি কী করবেন? বা বাচ্চা যাতে সত্যি বলে সেই অভ্যাসই বা করাবেন কী করে?

বাবা-মা যখন জানতে পারে তার সন্তান মিথ্যা বলছে তখন রাগ‚ হতাশা‚ সন্তানকে অবিশ্বাস করা‚ কেন সে মিথ্যা বলছে তাই নিয়ে বিভ্রান্তি‚ বা বাচ্চাকে সঠিক ভাবে মানুষ করতে পারছেন না বলে নিজের প্রতি আস্থা হারানোটা স্বাভাবিক|

আপনার সন্তান আপনাকে যত ক্ষণ না বিশ্বাস করছে তত ক্ষণ কিন্তু সে মিথ্যার আশ্রয় নেবে| তাই আগে নিজেকে তার কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলুন|

বাচ্চা যাতে মিথ্যা না বলে এবং সন্তান যদি মিথ্যা বলে তাহলে আপনি কী করবেন সেই নিয়ে রইলো আজকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ টিপ্স|

১) কেন মিথ্যা বলছে তা জানার চেষ্টা করুন : ব্যাপারটার গভীরে গিয়ে দেখুন| সন্তান কেন মিথ্যা বলছে তা জানা কিন্তু খুব জরুরি|মনে রাখবেন শুধু শুধু কেউ মিথ্যা বলে না| এর পিছনে নিশ্চয়ই কোনও কারণ থাকে| সেটা জানার চেষ্টা করুন| বাচ্চাকে বোঝার চেষ্টা করুন‚ মনোযোগ দিয়ে বাচ্চার কথা শুনুন| বাচ্চারা যেমন বড়দের ভাষায় কথা বলা শেখে তেমনি সব বাবা মায়েদেরও কিন্তু বাচ্চার ভাষা বুঝতে শিখতে হবে|মনে রাখবেন বাচ্চা কিন্তু যখন মিথ্যা বলে তখনও সে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করার চেষ্টা করছে| তার মিথ্যার মধ্যে কোনও লুকনো কথা বা মনোভাব আছে কি না খতিয়ে দেখুন|

২) বাচ্চার বয়সের দিকে খেয়াল রাখুন : বড়দের মতো বাচ্চারাও বড় হওয়ার বিভিন্ন ধাপের মধ্যে দিয়ে যায়| আমাদের যত বয়স বাড়ে আমাদের চিন্তাধারা বদলায় বা আমরা কল্পনা এবং বাস্তবের মধ্যে তফাত ধরতে পারি| বাচ্চার সঙ্গে যখন ডিল করবেন তখন তার বয়স কত তা সব সময় মাথায় রাখুন| একটা উদাহরণ দিলেই বুঝতে পারবেন| একটা তিন বছরের বাচ্চা যদি বলে ‘ আমার দাদুর ২০০ বছর বয়স ‘| তখন কিন্তু সে মিথ্যা বলছে না| সে নিজে যেটা ভাবছে তাই বলছে| এবং সে কিন্তু তখনও জানে না ২০০ বছর মানে কত| বা ধরুন আপনার চার বছরের মেয়ে আপনাকে এক দিন বললো পার্কে খেলতে গিয়ে তার একটা পরীর সঙ্গে দেখা হয়েছে তখন সে কিন্তু বাস্তবে তার কল্পনার মাঝামাঝি জগতে আছে| তাই এই অবস্থায় সে-ও কিন্তু মিথ্যা বলছে না| অন্য দিকে আপনার ৮ বছরের পুত্র হোমওয়ার্ক না করে টিভি দেখেছে এবং আপনি যখন তাকে এই ব্যাপারে প্রশ্ন করছেন সে কিন্তু বার বার বলছে সে টিভি দেখেনি‚ তখন কিন্তু সে জানে আসলে কী হয়েছে এবং সে কী বলছে তার মধ্যে তফাত আছে| তাই বিভিন্ন বয়সী বাচ্চাদের সঙ্গে বিভিন্ন ভাবে মিশতে হবে|

৩) বাচ্চা কী বলছে শুধু তাতে মনোযোগ না দিয়ে তার প্রকাশের ধরনের দিকেও নজর দিন : অনেক সময় আপনার সন্তান বুঝতে পারে না সে কী বলছে| যেমন ধরুন আপনি তাকে প্রশ্ন করলেন ‘ তুমি কেমন আছ? বা আজকের দিনটা তোমার কেমন গেল ?’| উত্তরে সে হয়তো বললো ‘ আমি ঠিক আছি ‘ বা ‘ ঠিক আছে ‘ বাচ্চার জীবনে যদি কোন সমস্যা এসেও থাকে সে কিন্তু তা বুঝতে পারে না| তার জীবনে যে কিছু একটা গন্ডগোল হয়েছে সে হয়তো তা জানেই না| তাই উত্তরে ‘ সব ঠিক আছে ‘ বলা মানেই কিন্তু সে মিথ্যা বলছে না| আবার এ-ও হতে পারে সে হয়তো ঠিকমতো নিজেকে বোঝাতে পারছে না| তাই শুধুমাত্র সন্তান কী বলছে তাতে গুরুত্ব না দিয়ে তার ভাব প্রকাশ লক্ষ্য করুন| যেমন ধরুন স্কুলে হয়তো কারুর সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে আপনার সন্তানের| মুখে সে বললো সব ঠিক আছে কিন্তু দেখলেন সে চুপচাপ ঘরের এক কোণে বসে আছে‚ বা অন্য দিন সে হয়তো বন্ধুকে নিয়ে প্রচুর কথা বলে সে দিন বন্ধুর প্রসঙ্গ উঠলে তা এড়িয়ে যাচ্ছে| এই ক্ষেত্রে আপনি একটু ভাল করে খেয়াল করলেই বুঝতে পারবেন গন্ডগোলটা কোথায়|

৪) বাচ্চার সঙ্গে মনের ভাব আর কথার আদানপ্রদান যেন আপনার কাছে সবচেয়ে গুরুত্ব পায় : মনে রাখবেন বাচ্চার সঙ্গে আপনি নিজে যত জড়িয়ে থাকবেন তত বেশি আপনাদের মধ্যে বিশ্বাস বাড়বে। এবং বাচ্চাকে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হবে না| বাচ্চার সঙ্গে বেশি অনেক ক্ষণ সময় কাটালে সে তার জীবনের সব কথা আপনাকে জানাবে এমনকি সে কী ভাবছে তাও জানাবে| তাই বাচ্চার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করাটা ভীষণ জরুরি।

৫) নিজের মধ্যে বদল আনুন : মনে রাখবেন আপনার বাচ্চা কিন্তু প্রতিটা ক্ষেত্রে আপনাকে নকল করার চেষ্টা করে| তাই আপনি যা করবেন সেও তাই শিখবে| এ ছাড়াও কোনও দিন এমন প্রতিশ্রুতি বাচ্চাকে দেবেন না যা আপনি রাখতে পারবেন না| কারণ সে ভাববে‚ হয়তো কিছু প্রমিস করলে তা রাখার কোনও দরকার নেই‚ ঠিক আপনি যেমন তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েও সেই কাজটা করেননি, তেমন|

৬) ৬-৭ বছরের বাচ্চাদের শেখান সে যা বলছে বা করছে তার দায়িত্ব কিন্তু তাকে নিজেকেই নিতে হবে : যেমন ধরুন সে কারওর সঙ্গে মারামারি করল বা কাউকে ইচ্ছা করে মিস গাইড করল তখন তাকে শেখান, সে যা করেছে তার ফল ও কিন্তু তাকেই ভোগ করতে হবে| যেমন সে হয়তো তার কাছের বন্ধুকে মিথ্য বলেছে তখন তাকে বোঝান ভবিষ্যতে তার বন্ধু কিন্তু তাকে বিশ্বাস করবে না| যদি দেখেন আপনার বাচ্চা আপনার সঙ্গে মিথ্যা বলছে তা হলে তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলুন| এবং সে যে ভুল কাজ করছে তাকে বোঝান| বা কী করে সে আবার বিশ্বাসী হয়ে উঠতে পারে তা-ও শেখান|

৭) বাচ্চাকে সত্যি কথা বলার গুরুত্ব বোঝান : সে মিথ্যা না বলে কেন সত্যি বলবে সেটা কিন্তু আপনাকেই শেখাতে হবে| একই সঙ্গে শেখান সত্যি বলা মোটেই কঠিন কাজ নয়| একই সঙ্গে এ-ও শেখান যে একটা মিথ্যা কথা ঢাকতে তাকে আরও অনেক মিথ্যার সাহায্য নিতে হবে| সত্যি বললে সে কী পাবে তাও বোঝানোর চেষ্টা করুন|

৮) বাচ্চাকে বোঝান যে আপনিও ভুল করতে পারেন : আপনি যা বলেন বা যা করেন সেটা যে সব সময় ঠিক হবে তার কোনও মানে নেই‚ বাচ্চাকে বোঝান আপনারও ভুল হতে পারে| তাকে বোঝান সে যেমন আপনার ওপর নির্ভরশীল আপনিও তেমনি তার ওপর নির্ভর করেন| কী করে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে হয় সেটা বোঝানোও খুব জরুরি। নিজেদের মধ্যে আস্থা এবং বিশ্বাস গড়ে তুলুন| আপনি কোনও ভুল করলে অবশ্যই তার জন্য ক্ষমা চান|

৯) বাচ্চাকে কোনওদিন মিথ্যাবাদী বলে দাগিয়ে দেবেন না : তাকে মিথ্যবাদী প্রতিপন্ন না করে সে কেন মিথ্যা বলছে তা জানার চেষ্টা করুন| তাকে মিথ্যাবদী বলে দাগিয়ে দিলে সে লজ্জা পাবে এবং সেই লজ্জা ঢাকতে বারবার মিথ্যা বলবে| সে যেটা করেছে তার জন্য আপনি যে দুঃখ পেয়েছেন তাকে বোঝান বা তার থেকে আপনি কী আশা করেছেন তাও বোঝানোর চেষ্টা করুন| একই সঙ্গে সন্তানকে বোঝান যে সে আসলে এক জন ভাল মানুষ এবং তার যে সত্যি কথা বলার সাহস আছে তা-ও বুঝিয়ে দিন| এর ফলে আপনার বাচ্চা নিজে শোধরানোর চেষ্টা করবে। এবং এ-ও প্রমাণ হয়ে যাবে অপনি তাকে বিশ্বাস করেন‚ ভরসা করেন | আপনার বাচ্চা নিজের ভুল বুঝতে পেরে নিজেকে অপরাধী ভাবতে পারে, কিন্তপ সেটুকু আপনি ভুলিয়ে দিতে পারবেন। জানবেন, বাচ্চা যদি মিথ্যা বলার জন্য অনুতপ্ত হয় তা হলে সেটা ভাল লক্ষণ|

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.