(Bengali Novel)
স্নেহলতা, রাইয়ের চলে যাওয়ার পর নিজের ঘরে ফিরে এল। খাটের পাশে রাখা টেবিল থেকে তুলে নিল ‘সুবর্ণলতা’। এই বইটির মধ্যে দিয়ে তিনি খুঁজে পান তার জ্যাঠাইমাকে। সুবর্ণর প্রতিটি সংলাপ, তার প্রতিবাদের ধরন, শাশুড়ির বিরুদ্ধে গিয়ে স্বামীর প্রতি অভিমান, কিংবা নিরুচ্চারিত শব্দের মধ্যে নিজের মতকে শেষ অবধি প্রতিষ্ঠা, এবং কোনওটাই পরিবারের ক্ষতি না করে- এই যে বলিষ্ঠতা, তা যেন জ্যেঠিমার অনুকরণেই তৈরি। (Bengali Novel)
সেই যেদিন প্রথম অক্ষর শেখার শুরু হয়েছিল তাঁর হাত ধরে- তিনি বলেছিলেন, সারাজীবন শুনে গেলুম ‘মেয়েমানুষ নেখাপড়া করলে ভগবান পাপ দেন, সোয়ামীর ক্ষতি হয়। তাই যদি তাঁদের ইচ্ছে ছিল, তাহলে বিদ্যার দেবী সরস্বতী আর ধনের দেবী লক্ষ্মী হন কী করে?’ এর কোনও উত্তর এঁরা দিতে পারবেন? তা পারবেন না। কারণ এ-সবই আমাদের দমিয়ে রাখার চেষ্টা। (Bengali Novel)
-তাহলে আমরা পাঠশালা যাব না? স্নেহলতা ওরফে ‘বুড়ি’ জানতে চেয়েছিল।
-পাঠশালা না গেলে বুঝি নেখাপড়া হয় না? বাইরে না যেতে দিলে ঘরেই পড়বি।
-কে পড়াবে আমাদের? মাস্টার আসবে দাদাদের মতো?
-না এলে না আসবে। আমি পড়াব।
-কিন্তু সেলেট পেনসিল পাব কী করে?
-পড়তে চাইলে সব কিছুর উপায় আছে। আগে বল রাজি আছিস কিনা!
-পড়াশোনা ছেলেরা করে, মেয়েরা হেঁশেল সামলায়, বাচ্চা বিয়োয়- জন্ম থেকে শুনে আসা বুড়ি তখনই ঠিক করে নিয়েছিল দাদাদের মতো সেও নেখাপড়া শিখে বড় হবে। কাজেই সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেছিল। (Bengali Novel)
শুরু হল জ্যাঠাইমার হাত ধরে অক্ষর লিখতে শেখা। প্রথমেই অবশ্য সেলেট পেনসিল জোটেনি তার ভাগ্যে। রান্না ঘরে কয়লা দিয়ে মাটিতে আঁক কেটে লেখা শুরু হল।
শুরু হল জ্যাঠাইমার হাত ধরে অক্ষর লিখতে শেখা। প্রথমেই অবশ্য সেলেট পেনসিল জোটেনি তার ভাগ্যে। রান্না ঘরে কয়লা দিয়ে মাটিতে আঁক কেটে লেখা শুরু হল।
স্বরবর্ণ শেষ করার পর জ্যাঠাইমা কীভাবে যেন যোগাড় করে ফেললেন একটা আস্ত সেলেট আর পেনসিল। কী যে আনন্দ হয়েছিল সেদিন! বারবার তাতে লিখছে একটা করে শব্দ, আর মুছে ফেলছে। প্রথম দুটো বাক্য আজও মনে আছে- আমার নাম স্নেহলতা ব্যানার্জি, আমার বাড়ি ওন্দা। এটুকু লিখেই মনে হয়েছিল সেও এবার জজ ব্যারিস্টার হতে পারবে। নিদেনপক্ষে স্কুলে তো পড়াতেই পারবে। (Bengali Novel)

জ্যাঠাইমার বড় শখ ছিল, শিক্ষিকা হওয়ার। তাঁর ঠাকুরদা বেনারস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংস্কৃতে পণ্ডিত হয়েছিলেন। জমিদারি সামালানোর থেকেও তাঁর প্রধান কাজ ছিল, জেলা জুড়ে মেয়েদের জন্য পাঠশালা আর ছেলেদের জন্য টোল খোলা। একশোটা পাঠশালা আর টোল খুলেছিলেন তিনি। ব্রাহ্মণ সমাজ তাঁকে তিরস্কার করেছিল। পুজো পার্বণে আসা বন্ধ করে দিয়েছিলেন তাঁরা। শুধু কী তাই! এ-বাড়ির মেয়েদের বা ছেলেদের সঙ্গে যাতে কেউ বৈবাহিক সম্পর্ক না করতে পারে, তার বিধান দিয়েছিলেন। (Bengali Novel)
তাতেও দমানো যায়নি অবিনাশ চাটুজ্জেকে। তিনি উল্টে ঘোষণা করেছিলেন, এই ব্রাহ্মণদের তিনি তাঁর জমিদারি থেকে উৎখাত করছেন। এখনই যদি তাঁরা নিজেদের অবস্থান বদল না করেন, তবে সূর্যোদয়ের আগেই যেন তারা তাঁর অধীনস্থ গ্রাম ছেড়ে চলে যান। বাধ্য হয়েই কয়েকজন তাঁর এই অনাসৃষ্টি মেনে নিয়েছিলেন। যদিও আড়ালে শাপ শাপান্ত করতে ছাড়েননি। অন্যরা অবশ্য চলে গিয়েছিলেন, এই পাপ ভূমিতে থাকবেন না বলে। (Bengali Novel)
সেই বংশের মেয়ে জ্যাঠাইমা শ্বেতবরণী দেবী। দুধের মতো সাদা তাঁর গায়ের রং। টোকা লাগলেও যেন লাল হয়ে যেত জায়গাটা। এমনিতে শান্ত, কিন্তু রেগে গেলে মারাত্মক। তখন তিনি দরজায় খিল দিতেন, এমন মৌনব্রত নিতেন যে জ্যাঠামশাই বাধ্য হতেন তাঁর দাবি মেনে নিতে। সেসব দাবির কথা মনে পড়লে, এখনও হাসি পায় স্নেহর। (Bengali Novel)
আরও পড়ুন: জলকে চল: অষ্টম পর্ব
মা বলেছিলেন, “বড়দি বলে কিনা বাচ্চা হয়েছে বলে মা আর বাচ্চাকে অশোচের দোহাই দিয়ে গোয়ালে রাখা যাবে না। একদিকে গরু হাগবে- মুতবে, আর অন্যদিকে বাচ্চা নিয়ে মা অসুস্থ হয়ে সেখানেই পড়ে থাকবে কোনও সেবা যত্ন না পেয়ে, তা চলবে না। আলাদা আঁতুড় ঘর লাগবে। এই নিয়ে কী ভীষণ অশান্তি বড়দির সঙ্গে শাশুড়ি মায়ের! আমি যত বোঝাই বড়দি আমি গোয়ালেই থাকব, তুমিও তো থেকেছ। আমিও পারব। সে তত রেগে যায়। (Bengali Novel)
-আমি থেকে দেখেছি, থাকা যায় না বলেই বলছি তুই থাকবি না মেজো। তুই জানিস! সূতিকাগারে এই কারণে কত মেয়ে মারা যায়? আমি দাদার কাছে শুনেছি, এদেশে সবচেয়ে বেশি মেয়ের মৃত্যু হয় বাচ্চা হতে গিয়ে, কিংবা এই অসুস্থ নোংরা পরিবেশে থাকতে গিয়ে। আঁতুড় ঘর বানাতেই হবে। এত ঘর রয়েছে, একটা ঘরে ভাল করে বিছানা করে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে রাখতে অসুবিধা কোথায়? তাছাড়া বিছানা বলতে তো দেবে চারটে খড়ের আঁটি, তার উপর একটা চাটাই বা মাদুর। তাতেও এত আপত্তি! (Bengali Novel)
শেষ পর্যন্ত তাঁর দাবি মানা হল। তুই-ই প্রথম জন্মালি বড়দির পছন্দ মতো আঁতুড় ঘরে। আসলে বড়দি মেয়েদের প্রতি অবহেলা একেবারে সহ্য করতে পারতেন না।
আমি যত বোঝাই এই নিয়ে অশান্তি করো না, সে তত দরজায় খিল দেয়।
শেষ পর্যন্ত তাঁর দাবি মানা হল। তুই-ই প্রথম জন্মালি বড়দির পছন্দ মতো আঁতুড় ঘরে। আসলে বড়দি মেয়েদের প্রতি অবহেলা একেবারে সহ্য করতে পারতেন না। শাশুড়ি বিধবা বলে একবেলা খাবেন আর আরেক বেলা সূর্য ডুবতেই জল খেয়ে হাতে তুলসীমালা নিয়ে জপ করতে করতে শুয়ে পড়বেন- এটাও তাঁর পছন্দ ছিল না। নিজে রোজ তুলসী তলায় প্রদীপ জ্বালিয়ে কাচা শাড়ি পরে দালানে বসে শাশুড়িমাকে রামায়ণ পাঠ করে শোনাত। সে পাঠ শুনে সীতার দুঃখে আমরাও কাঁদতাম, শাশুড়িও কাঁদতেন। পাঠ শেষ হলে গরম দুধ বড় গেলাসে খাইয়ে শাশুড়িকে শুতে পাঠাতেন। (Bengali Novel)
জানিস খুকি, শাশুড়ি কিন্তু প্রথমে আপত্তি করলেও পরে ঠিক বড়দির কথাগুলো মেনে নিতেন। তবে তোর বিদ্যালয়ে যাওয়া হল না, তোর বাবা একেবারেই অনুমতি দিলেন না। বড়দি অনেক চেষ্টা করেছিলেন। তাই তোর বিয়েটা যাতে এই পরিবারেই হয়, তার জন্য ক্ষেপে গিয়েছিলেন। (Bengali Novel)
-জ্যাঠাইমার বাড়ির লোকেরা এত যখন শিক্ষিত ছিলেন, তখন তাঁর বিয়ে আমাদের বাড়িতে দিয়েছিলেন কেন? জ্যাঠামশাই তো বিখ্যাত কেউ ছিলেন না। বুড়ি তার মাকে প্রশ্ন করেছিল। (Bengali Novel)

-সেই তো রে! বড়দির তো তাই মনে মনে ভীষণ রাগ বাপের ওপর। আসলে অবিনাশ চাটুজ্জে ব্রাহ্মণদের রাগিয়ে দিয়েছিলেন, তাই কোনও ভাল ঘরে বিয়ে দিতে পারছিলেন না মেয়েদের। তাছাড়া অন্য মেয়েদের পড়াশোনা শেখানোর ব্যবস্থা করলেও নিজের পরিবারের মেয়েদের কিন্তু খুব বেশি পড়াতে পারেননি ওই বিরোধিতার জন্যই। যতটুকু পেরেছিলেন বাড়িতেই পড়িয়েছিলেন। তোর ঠাকুমারা বড়লোক ছিলেন না, তবে খুব গরিবও নয়, কুষ্ঠি বিচার করে মিলে গেল, বিয়ে দিয়ে দিলেন। বড়দি রাগে অনেকদিন বাপের বাড়ি যায়নি। শেষ অবধি শাশুড়ি জোর করে পাঠিয়েছিলেন। বাবা মাকে না দেখে থাকা যায়? যদি মরে যায়, তবে না দেখার আফসোস থেকে যাবে চিরকাল। (Bengali Novel)
তবে বড়দির দাদারা কিন্তু সবাই বিখ্যাত। কলেজে পড়াতেন। বড় বউদি পড়াশোনা জানতেন না। বড়দার আপত্তি সত্ত্বেও জোর করেই বিয়েটা হয়েছিল। সে অবশ্য এক গল্প।
তবে বড়দির দাদারা কিন্তু সবাই বিখ্যাত। কলেজে পড়াতেন। বড় বউদি পড়াশোনা জানতেন না। বড়দার আপত্তি সত্ত্বেও জোর করেই বিয়েটা হয়েছিল। সে অবশ্য এক গল্প।
-কেমন গল্প? স্নেহলতাকে গল্পে পেয়েছে তখন।
-বড় বউদির বিয়ে ঠিক হয়েছিল অন্য একজনের সঙ্গে। পাওনা যৌতুক সব ঠিকঠাক। বিয়ের সময় পাত্রপক্ষ আরও দশ ভরি সোনা আর এক হাজার টাকা চেয়ে বসল। তা সেই মুহূর্তে তারা পাবেন কোথা থেকে! এদিকে পাত্রপক্ষ বলছে টাকা ও সোনা না পেলে এ বিয়ে হবে না। (Bengali Novel)
বিয়ে বাড়িতে কান্নার রোল উঠল। তো বড়দির বাবা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি চাইছিলেন মেয়েটা যাতে লগ্নভ্রষ্টা না হয়। একবার বিয়ের পিঁড়ি থেকে বর উঠে গেলে, আর তো মেয়েটার বিয়ে হবে না। তখন নাকি পাত্র পক্ষের থেকে কেউ বলেছিল- অত যখন সহানুভূতি, নিজের ছেলের সঙ্গে দিন বিয়ে। দেখি কত মহান আপনি! (Bengali Novel)
আরও পড়ুন: জলকে চল: সপ্তম পর্ব
তাঁর আঁতে লেগে গেল। ডেকে পাঠালেন বড় ছেলেকে। সেই লগ্নেই কারোর সঙ্গে আলোচনা না করেই ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিলেন সেই মেয়েটির। বড়দা বাবার অমতে যেতে পারেননি। কিন্তু পড়াশোনা জানা ছেলে, সে কি আর মূর্খ বউ চায়? তবে সবই নিয়তি। বলা হয়, বিয়ে হল সাত জন্মের সম্পর্ক। ললাটে লেখা থাকলে তাকে কে খণ্ডাবে? (Bengali Novel)
-আর মেজো বউদি?
-তিনি বিশ্বভারতী থেকে লেখাপড়া শিখেছিলেন। ওই যে রবিঠাকুর আশ্রম করেছিলেন না? সেখান থেকে। নাচ গান জানতেন। আমার বিয়েতে বাসর রাতে গেয়েছিলেন- আহা! কী সে গান! আজও মনে আছে। আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ, সুরের বাঁধনে…। তার আগে আমি রবীন্দ্রনাথের নাম শুনেছিলাম। কী একটা পুরস্কার পেয়েছিলেন, সবাই তাঁকে নিয়ে আলোচনা করত। কিন্তু এ গান যে তাঁর, তা জানতাম না। ধীরে ধীরে বড়দির মুখে গান শুনে শুনে জানলাম। (Bengali Novel)
-জ্যাঠাইমা গান জানত?
-হ্যাঁ জানত। তবে গাইবার সুযোগ কোথায় পেত? সারাদিন সংসারের যাঁতাকলে আটকে পড়া একটা মানুষ। সেই কাক ভোরে দিন শুরু, আর সন্ধ্যার প্রদীপ নিভলে বিছানায়। তারমধ্যে বাড়িতে নারায়ণ শিলা। ঠাকুর মশাইয়ের হাতে হাতে যোগাড় করে দেওয়া, ভোগ রাঁধা এসব কাজগুলোও তাঁকেই করতে হত। (Bengali Novel)

-তোমার বিয়ে জ্যাঠামশাইয়ের কত বছর পর হয়েছিল মা?
-বছর পাঁচ হবে। তখন বড়দির কোলে দুটো বাচ্চা। শান্ত আর মালা। আমি আসার পর প্রথম প্রথম তো কিছুই পারতাম না। বয়সই বা কত! এগারো বারো! ধীরে ধীরে শিখলাম। ভাত রাঁধতে একবারেই পারতাম না। আরেকটা সমস্যা ছিল ভাষার। বুঝতে অসুবিধা হত। একবার একটা যা মজার কাণ্ড হয়েছিল না, এখন মনে পড়লেই হাসি পায়। বলেই হাসতে লাগল আশালতা। (Bengali Novel)
-না হেসে বলো কী হয়েছিল?
-বড়দির তখন অশোচ চলছে। রান্না ঘরে ঢুকবে না। শাশুড়ি মা আমাকে বললেন, মেজো বউ দেখে এসো তো আখাটা ঠিক আছে কিনা?
এখন আখা কাকে বলে? আমি সারা বাড়ি খুঁজে মরি, আখা কোথায়? কাকেই বা জিজ্ঞেস করব? মা তো বলে পুজোর ঘরে ঢুকে গেছে, আর বড়দি সে-কদিন ঘর থেকে বেরোবে না। আমি কী করি! এদিকে বেলা বাড়ছে। (Bengali Novel)
তখন আমি বুঝতে পারলাম আমরা যাকে উনুন বলি, এরা তাকেই আখা বলে। এমন কত যে বিভ্রান্তি হয়েছে প্রথমদিকে। রান্না তো পারতাম না। আমাদের এক দাসী ছিল। মুক্তার মা। সে কুটনো কেটে, মাছ ছাড়িয়ে, মশলা বেটে দিত। কিন্তু রান্না করত না।
আমি আখা খুঁজে না পেয়ে, গালে হাত দিয়ে ভাবছি কী করব!
-তারপর?
-আর তারপর! পুজো সেরে মা বেরিয়ে এসে আমাকে বলল- মেজো বউ দেখে নিয়েছ তো, আখাতে ঘুঁটে আছে?
আমি কাচুমাচু মুখ করে বললাম, মা আখা তো খুঁজে পাইনি।
-খুঁজে পাওনি মানে? অত বড় আখা কি রাতেই চোরে লোপাট করে দিল! নাকি তার পাখনা গজালো যে উড়ে গেছে?
আমি আরও আস্তে বললাম, সত্যি মা আখা কোথাও নেই।
-রান্না ঘরে গেছিলে? শাশুড়ি এবার সত্যি অবাক হচ্ছে আমার কথা শুনে।
আমি বললাম, হ্যাঁ। কিন্তু সেখানে নেই।
-বলো কী! চলো তো দেখি, বলে শাশুড়ি আমাকে নিয়ে রান্না ঘরে ঢুকলেন। তারপর চিৎকার জুড়ে দিলেন। তোমার চোখে কি ন্যাবা পড়েছে? এখানে এত বড় আখা রয়েছে, আর তুমি দেখতে পেলে না? তোমার বাড়িতে কিসে রান্না হয়? উনুন দেখনি? (Bengali Novel)
তখন আমি বুঝতে পারলাম আমরা যাকে উনুন বলি, এরা তাকেই আখা বলে। এমন কত যে বিভ্রান্তি হয়েছে প্রথমদিকে। রান্না তো পারতাম না। আমাদের এক দাসী ছিল। মুক্তার মা। সে কুটনো কেটে, মাছ ছাড়িয়ে, মশলা বেটে দিত। কিন্তু রান্না করত না। আমি ভাত রাঁধতেই পারতাম না। নয় গলে যেত, নয় শক্ত থেকে যেত। যেদিন গলে যেত সেদিন ঝামেলায় পড়তাম। তখন মুক্তার মা সেই ভাত গোয়ালে নিয়ে গিয়ে গরুদের খাইয়ে দিত। আবার ভাত বসাতাম। (Bengali Novel)

-এত চাল নষ্ট করতে?
-নষ্ট করছি, এটাই তো ভাবতে পারতাম না। ভয়েই মরে যেতাম। বড়দি ধরে ধরে সেসব শেখালো। যা রান্না শিখেছি, সব তার থেকে। খুব ভাল রান্না করত। কিন্তু মেজাজ যদি বিগড়ে যেত একবার, কারোর সাধ্যি ছিল না শান্ত করার। কুরুক্ষেত্র বাঁধিয়ে দিত। যুদ্ধক্ষেত্র চোখে দেখিনি। তোর বাবা বলত, এত বড় যুদ্ধ চলছে, বড় বউদি ঢাল তরোয়াল নিয়ে লড়ছে, দেখতে পাচ্ছ না? এই যুদ্ধ থেকে আগে উদ্ধার পাও, পরে কুরুক্ষেত্র দেখবে। আসলে তাকে দোষ দিই না। এই পরিবার তার জন্য উপযুক্ত ছিল না, সেটা বয়সকালে বুঝতে পেরেছি।” (Bengali Novel)
স্নেহলতা এসব কথাই জেনেছেন বিয়ের পরে। যত জেনেছেন, তত মুগ্ধ হয়ে গেছেন। শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে এসেছে। বারবার মনে হয়েছে তাঁকে নিয়েও লেখা যায়। কিন্তু হয়ে উঠল না। হয়তো নিজেদের ঘরে এত লেখক-লেখিকা দেখে, নিজের লেখিকা হওয়ার ইচ্ছেটাকে গোপন করে রেখেছিলেন। কিন্তু আশাপূর্ণাদেবীর এই লেখার মধ্যে দিয়েই তিনি ছুঁতে পারেন শ্বেতবরণী দেবী-তাঁর জ্যাঠাইমাকে।
চশমাটা শাড়ির খুঁট দিয়ে মুছে নিয়ে পাতা ওল্টালেন স্নেহলতা। (Bengali Novel)
(ক্রমশ)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
অলংকরণ- আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়