Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

চৌরিচৌরা, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের দিশা বদলের মুহূর্ত

প্রেমেন্দু বিকাশ চাকী

জানুয়ারি ২১, ২০২৬

Chauri Chaura
Bookmark (0)
Please login to bookmark Close
(Chauri Chaura)

উত্তর প্রদেশের গোরখপুর জেলায় অবস্থিত চৌরিচৌরা, ১৯২২ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি অসহযোগ আন্দোলনের অংশ হিসেবে স্থানীয় মানুষ একটি শান্তিপূর্ণ মিছিল করছিল, এই শহরে। সেদিন ব্রিটিশ পুলিশ নিরপরাধ মিছিলকারীদের ওপর লাঠিচার্জ করে। এতে ক্ষুব্ধ জনতা, পুলিশ থানা ঘেরাও করে আগুন ধরিয়ে দেয়, ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং এই ঘটনায়, ২২ জন ব্রিটিশ পুলিশ আগুনে পুড়ে মারা যায় এবংবহু নিরীহ মানুষ আহত হন। (Chauri Chaura)

অহিংসার কঠোর অনুসারী গান্ধীজী এই ঘটনার প্রেক্ষিতে ১২ ফেব্রুয়ারি অসহযোগ আন্দোলন স্থগিত করেন। আন্দোলনের এই আকস্মিক সমাপ্তি সেদিন অনেক তরুণ জাতীয়তাবাদীকে হতাশ করেছিল। অহিংসার মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করার বিষয়ে তাঁদের মনে নতুন করে প্রশ্ন জাগে। পরবর্তীতে যা তাদের বিপ্লবী পন্থা অবলম্বনে উৎসাহিত করে। আন্দোলন স্থগিত হওয়ার ফলে ব্রিটিশ সরকার কঠোর দমন-পীড়নের মাধ্যমে প্রায় ১৭২ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং বহু আন্দোলনকারীকে কারাদণ্ড দেয়। (Chauri Chaura)


আরও পড়ুন: একাত্তরের মুক্তির গান


তাঁদের মধ্যে ১৯ জনের ফাঁসির আদেশ, জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে সাময়িকভাবে দুর্বল করে দিয়েছিল। আসলে চৌরিচৌরার এই দিনটা ছিল অহিংস আন্দোলনের সীমা নির্দেশক, গান্ধীয় রাজনীতির মোড় ঘোরানো মুহূর্ত এবং বিকল্প জাতীয়তাবাদী ভাবনার সূচনার দিন। এক কথায় চৌরিচৌরা শুধুমাত্র একটা হিংসাত্মক ঘটনা নয়, এটাই ছিল ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের দিশা বদলে দেওয়ার মুহূর্ত। (Chauri Chaura)

Chauri Chaura
এক কথায় চৌরিচৌরা শুধুমাত্র একটা হিংসাত্মক ঘটনা নয়, এটাই ছিল ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের দিশা বদলে দেওয়ার মুহূর্ত।

মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত, স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত মুহূর্তগুলোর মধ্যে অন্যতম। গান্ধীপন্থীদের মতে অহিংসা ছিল তাঁদের আন্দোলনের আত্মা। চৌরিচৌরার সহিংসতা আন্দোলন তাঁর নৈতিক সীমা লঙ্ঘন করেছে। জনগণ এখনও অহিংসার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত নয়। হিংসা ছড়ালে সেই আন্দোলন ব্রিটিশ দমননীতিকে বৈধতা দেবে। অতএব চৌরিচৌরার আন্দোলন থামানো ছিল ভবিষ্যৎ রক্ষার কৌশল। গান্ধীজীর যুক্তি “হিংসার পথে পাওয়া স্বাধীনতা আত্মঘাতী।” (Chauri Chaura)

তাঁর মতে একটি মৃত্যুর দায়ও নেতা এড়াতে পারেন না। এক্ষেত্রে ২২ জন পুলিশের মৃত্যু তাঁর কাছে আন্দোলনের ব্যর্থতা। এই দৃষ্টিতে গান্ধীজী ছিলেন “নৈতিক অভিভাবক”, “রাজনৈতিক কৌশলবিদ”নন। দলের একনিষ্ঠ বেশ কিছু সদস্যের মতে এটা আন্দোলনের অপচয় মাত্র। অসহযোগ আন্দোলন যখন সর্বোচ্চ গণসমর্থন লাভ করেছে, তখন একক ঘটনার প্রেক্ষিতে গোটা আন্দোলন বন্ধ করার অর্থ অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া। (Chauri Chaura)

বিরোধীদের মতে ঔপনিবেশিক শাসনে, সংঘর্ষ অনিবার্য, গণআন্দোলনে বিচ্ছিন্ন সহিংসতা স্বাভাবিক নয়। এই বাস্তবকে অস্বীকার করে গান্ধীজী আন্দোলনকে দুর্বল করেছেন।

বিরোধীদের মতে ঔপনিবেশিক শাসনে, সংঘর্ষ অনিবার্য, গণআন্দোলনে বিচ্ছিন্ন সহিংসতা স্বাভাবিক নয়। এই বাস্তবকে অস্বীকার করে গান্ধীজী আন্দোলনকে দুর্বল করেছেন। কিন্তু সেদিনের গান্ধীজীর সেই সিদ্ধান্ত অনিচ্ছাকৃতভাবে বিকল্প জাতীয়তাবাদী ধারাকে শক্তিশালী করে। বিপ্লবী সশস্ত্র আন্দোলন জোরদার হয়। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু ও চিত্তরঞ্জন দাস এই সিদ্ধান্তে গভীর হতাশা প্রকাশ করেন। হেডগেওয়ার ও অন্যান্য সংগঠক মূলধারার রাজনীতি থেকে সরে আসেন। (Chauri Chaura)

চৌরিচৌরার পরবর্তী ঘটনা গান্ধীজীকে শুধু রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নয়, নৈতিক দার্শনিক হিসেবেও উন্মোচিত করে। তাঁর অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার কি নৈতিক প্রয়োজনে নাকি রাজনৈতিক ভুল? সে প্রশ্ন আজও উত্তরহীন। সমর্থকদের চোখে তিনি আন্দোলন বাঁচিয়েছেন, কারণ অসহযোগ আন্দোলনের ভিত্তি ছিল অহিংসা। (Chauri Chaura)

Chauri Chaura
বিরোধীদের মতে ঔপনিবেশিক শাসনে, সংঘর্ষ অনিবার্য, গণআন্দোলনে বিচ্ছিন্ন সহিংসতা স্বাভাবিক নয়। এই বাস্তবকে অস্বীকার করে গান্ধীজী আন্দোলনকে দুর্বল করেছেন।

চৌরিচৌরায় যখন, পুলিশ থানায় আগুন জ্বলে, শুধু একটা থানা নয়, অহিংস আন্দোলনের নৈতিক মেরুদণ্ডটাই সেদিন ভেঙে পড়ে। গান্ধীবাদীদের মতে, যে স্বাধীনতা হিংসার রক্তে রঞ্জিত, তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। সেই অর্থে গান্ধীজী সেদিন আন্দোলন থামাননি, তিনি আন্দোলনকে নৈতিক পতন থেকে রক্ষা করে ক্ষমতার নয়, নৈতিক নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন। (Chauri Chaura)

রাজনীতি শুধু নৈতিকতার পাঠশালা নয়। একটা বিচ্ছিন্ন সহিংস ঘটনার জন্য আন্দোলন থামানো মানে, লক্ষ মানুষের আত্মত্যাগকে অর্থহীন করা। বিরোধীদের চোখে গান্ধীজীর সিদ্ধান্তের দরুন অযথা স্বাধীনতা বিলম্বিত হল। তাঁদের মতে গান্ধীজী নৈতিকতার নামে ইতিহাসের গতি থামিয়েছেন। কিন্তু আমার ধারণা, ইতিহাস গতি থামায়নি বরং ইতিহাস পথ বদলেছে। চৌরিচৌরা ছিল এমন এক মুহূর্ত, যা গান্ধীর নেতৃত্বের নৈতিক উচ্চতার চরমে পৌঁছায় আবার একই সঙ্গে ভগত সিং, চন্দ্রশেখর আজাদ, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, মতিলাল নেহেরু, হাকিম আজমল খান এবং হেডগেওয়ারের মতো নেতাদের বিকল্প পথে হাঁটার প্রেরণা জোগায়। (Chauri Chaura)

ইতিহাসের পাতায়চৌরিচৌরা সামান্য একটা ঘটনা না বলে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের বহু পথের সূচনাবিন্দু বলা যেতেই পারে।

ইতিহাসের পাতায়চৌরিচৌরা সামান্য একটা ঘটনা না বলে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের বহু পথের সূচনাবিন্দু বলা যেতেই পারে। (Chauri Chaura)

গান্ধীজীর মতে সেদিন আন্দোলন না থামালে ব্রিটিশ সরকার দেশজুড়ে দমননীতি চালিয়ে অহিংস আন্দোলনকে সহিংস বিদ্রোহ বলে চিহ্নিত করত। চৌরিচৌরা নিছক ঘটনা নয়, এটা ছিল নৈতিকতা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সংঘর্ষ। গান্ধীজীর বিশ্বাস ছিল নৈতিক নেতৃত্বে, আর তাঁর সমালোচকরা মনে করিয়ে দেন ইতিহাসের কঠিন বাস্তবতা। (Chauri Chaura)

Chauri Chaura
গান্ধীজীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস

গান্ধীজীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, কিন্তু চৌরিচৌরার ঘটনায় গান্ধীজীর সিদ্ধান্তে তিনি সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি অহিংসার নীতিকে সমর্থন করতেন, কিন্তু আন্দোলন প্রত্যাহারকে মনে করেছিলেন রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিকরতাঁর মতে, আন্দোলনের ভেতর থেকেই সংশোধন সম্ভব ছিল। এই হতাশা থেকেই ১৯২৩ সালের ১লা জানুয়ারি, চিত্তরঞ্জন দাশ এবং মতিলাল নেহরু “স্বরাজ পার্টি” গঠন করেন। তাঁদের প্রধান লক্ষ্য ব্রিটিশদের সাথে সাংবিধানিক ও সংসদীয় লড়াই করে ভারতকে স্বায়ত্তশাসন (Swaraj) দেওয়া এবং পার্টি কংগ্রেসের ভেতর থেকেই কাজ করে এবং অতিরিক্ত নরমপন্থা এড়িয়ে সরাসরি ব্রিটিশ শাসনকে রাজনৈতিক ও আইনগত চ্যালেঞ্জ করার পথ বেছে নেওয়া। এটা ব্রিটিশ দমননীতি মোকাবিলায় ছিল এক নতুন রাজনৈতিক কৌশল। (Chauri Chaura)

স্বরাজ পার্টি ব্রিটিশ বিরোধী লড়াইকে সাংবিধানিক ও স্থায়ী মাত্রা দেয়। চিত্তরঞ্জন দাসের রাজনৈতিক দক্ষতা ও কৌশল দেখায় যে, সংগঠন, আইন ও রাজনৈতিক আন্দোলনের সমন্বয় কীভাবে স্বাধীনতা অর্জনে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। (Chauri Chaura)

চৌরিচৌরা ঘটনায় জনতার সহিংসতা প্রমাণ করে, যে গণআন্দোলন সবসময় অহিংস হতে পারে না।

চৌরিচৌরা ঘটনায় জনতার সহিংসতা প্রমাণ করে, যে গণআন্দোলন সবসময় অহিংস হতে পারে না। নেতাজী সুভাষ বসু সরাসরি চৌরিচৌরা কাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, তবে এই ঘটনাটি ছিল ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের এমন একটি মুহূর্ত যা মহাত্মা গান্ধী ও সুভাষ বসুর রাজনৈতিক কৌশল ও আদর্শগত পার্থক্যকে স্পষ্ট করে তুলেছিল। নেতাজী এই অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি করে পরিকল্পনা করেন, যাতে সশস্ত্র ও সুসংগঠিত আন্দোলন সম্ভব হয়। নেতাজীর দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট ছিল, তিনি বিশ্বাস করতেন স্বাধীনতার জন্য রক্ত ও সংগ্রাম অপরিহার্য। চৌরিচৌরা নেতাজীকে শুধুমাত্র আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে নয়, ভবিষ্যতের স্বাধীনতা সংগ্রামের পরিকল্পনায় দিকনির্দেশক হিসেবে তৈরি করে। (Chauri Chaura)

আধুনিক ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে আর এক বিতর্কিত এবং প্রভাবশালী চরিত্র হলেন কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার। ভারতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ব্যক্তিত্ব। যিনি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (RSS)-এর প্রতিষ্ঠাতা। (Chauri Chaura)

হেডগেওয়ারের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও বিপ্লবী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে।

হেডগেওয়ারের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও বিপ্লবী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে। বঙ্গভঙ্গ পরবর্তী সময়ে কলকাতায় ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজে পড়াশোনার সময় তিনি অনুশীলন সমিতি ও বিপ্লবী চক্রের সংস্পর্শে আসেন। অস্ত্রধারী বিপ্লব ও গোপন সংগঠনের প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়, অসহযোগ আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন, ফলে সেসময় তাঁকে কিছুদিনের জন্য কারাবরণও করতে হয়েছিল। (Chauri Chaura)

চৌরিচৌরার আন্দোলন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তে হেডগেওয়ার গভীরভাবে হতাশ হয়েছিলেন বলে জানা যায়। কংগ্রেসের কৌশলগত পিছু হটা হেডগেওয়ারকে বিশ্বাস করায় যে ভারতীয় সমাজ মানসিকভাবে এখনও প্রস্তুত নয়। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি কংগ্রেস ও আন্দোলনের পথ ছেড়ে বেরিয়ে এসে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হন বীর সাভারকর এবং বাল গঙ্গাধর তিলকের আদর্শে। (Chauri Chaura)

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে কেশব বলিরাম হেডগেওয়ারের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। প্রথমত স্বাধীনতা আন্দোলনে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের অভাব।

১৯২৫ সালে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ প্রতিষ্ঠা, ছিল তাঁর স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি মনে করতেন বিদেশি শাসনের মূল কারণ ভারতীয় সমাজের ভাঙন। শক্তিশালী জাতীয় চরিত্র তৈরি না হলে, স্বাধীনতা টেকসই হবে না। RSS তাই আন্দোলন নয় প্রশিক্ষণে, স্লোগান নয় দৈনিক শাখা, তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ নয় দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির মধ্যে দিয়ে এক ধরনের ‘নীরব আন্দোলন’ হয়ে ওঠে। সংঘর্ষের চেয়ে সমাজের ভিত মজবুত করাই কার্যকর, এই যুক্তিতে হেডগেওয়ার কখনই ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে সংঘাতে জড়াননি। (Chauri Chaura)

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে কেশব বলিরাম হেডগেওয়ারের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। প্রথমত স্বাধীনতা আন্দোলনে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের অভাব। দ্বিতীয়ত সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের উপর অতিরিক্ত জোর এবং সর্বশেষে ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে RSS এর নীরবতা। এর ফলে আজও রাজনৈতিক মঞ্চে তাঁর দলের সমর্থকেরা প্রশ্নবিদ্ধ হন। যদিও তাঁর সমর্থকদের মতে তিনি স্বাধীনতাকে কেবল রাজনৈতিক নয়, সভ্যতা ও সংস্কৃতির মুক্তি হিসেবে দেখেছিলেন। (Chauri Chaura)

Chauri Chaura
হেডগেওয়ার আন্দোলনের নায়ক নন বরং তিনি ছিলেন পেছনের কুশীলব।

হেডগেওয়ার আন্দোলনের নায়ক নন বরং তিনি ছিলেন পেছনের কুশীলব। স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে তাঁর স্থান মিছিলের সামনে নয় বরং ইতিহাসের গভীরে। (Chauri Chaura)

গান্ধীজী বিশ্বাস করতেন জনগণের নৈতিক শক্তিই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে ভাঙবে। হেডগেওয়ার মতে নৈতিকতা যথেষ্ট নয়, সঙ্গে প্রয়োজন শৃঙ্খলা ও শক্তিশালী জাতিসত্তা। গান্ধীজীর স্বাধীনতা ছিল ‘নৈতিক-রাজনৈতিক”, হেডগেওয়ারের স্বাধীনতা ছিল “সাংস্কৃতিক-সভ্যতাগত”। গান্ধীর চোখে ভারত ছিল এক নৈতিক সম্প্রদায়, হেডগেওয়ারের চোখে ভারত ছিল এক ভাঙা সমাজ। (Chauri Chaura)

নেতাজী সুভাষ বসু বলেছিলেন “তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব।” সুভাষের কাছে স্বাধীনতা ছিল লড়াই জিতে নেওয়ার বিষয়। হেডগেওয়ারের কাছে স্বাধীনতা ছিল যোগ্য হয়ে ওঠার ফল। হেডগেওয়ার ছিলেন হিন্দুত্বের (সাংস্কৃতিক) নীরব সংগঠক। (Chauri Chaura)

হেডগেওয়ার চেয়েছেন সাংস্কৃতিক পুনর্গঠন ও সামাজিক শক্তির ভিত। এই কারণে হেডগেওয়ার গান্ধীর আন্দোলনে সম্পূর্ণভাবে মিশে যেতে পারেননি। তাঁর কাছে অহিংসতা ছিল নৈতিক আদর্শ, কিন্তু জাতীয় চরিত্র নির্মাণের বিকল্প নয়। (Chauri Chaura)

সুভাষচন্দ্র বসু ইতিহাসে প্রবেশ করেছেন বজ্রনিনাদের মতো। সশস্ত্র সংগ্রাম, আজাদ হিন্দ ফৌজ, আন্তর্জাতিক রাজনীতি।

হেডগেওয়ার এবং সাভারকার, দু’জনেই হিন্দু পরিচয়ের কথা বলেছেন। এই বিষয়ে তাঁদের এক করে দেখা হয়। সাভারকার হিন্দুত্বকে রাজনৈতিক অস্ত্র বানাতে চেয়েছিলেন। হেডগেওয়ার চেয়েছিলেন তাকে দৈনন্দিন অনুশীলনে রূপ দিতে। একজন ক্ষমতার ভাষায় কথা বলেছেন অন্যজন শৃঙ্খলার ভাষায়। এই পার্থক্য না বুঝলে হেডগেওয়ারকে শুধু সাভারকারের ছায়া মনে হবে যা ইতিহাসের প্রতি অবিচার। হেডগেওয়ারকে ভালবাসা বা ঘৃণা দুটোর যে কোনওটাই করা যায়। কিন্তু তাঁকে এড়িয়েও যাওয়া যায় না। (Chauri Chaura)

সুভাষচন্দ্র বসু ইতিহাসে প্রবেশ করেছেন বজ্রনিনাদের মতো। সশস্ত্র সংগ্রাম, আজাদ হিন্দ ফৌজ, আন্তর্জাতিক রাজনীতি। তিনি চেয়েছিলেন শত্রুকে পরাস্ত করতে, অন্যজন চেয়েছিলেন সমাজকে প্রস্তুত করতে। এখানেই হেডগেওয়ারের বিতর্কিত অবস্থান, তিনি ভারতের স্বাধীনতা জয়ের আন্দোলনের কোথাও নেই অথচ স্বাধীনতা পরবর্তী রাষ্ট্রের মঞ্চ সাজাচ্ছেন। (Chauri Chaura)

Chauri Chaura
সুভাষচন্দ্র বসু ইতিহাসে প্রবেশ করেছেন বজ্রনিনাদের মতো। সশস্ত্র সংগ্রাম, আজাদ হিন্দ ফৌজ, আন্তর্জাতিক রাজনীতি।

১৯৩৪ সালের ৩১শে জানুয়ারিতে হেডগেওয়ার ফ্যাসিবাদ এবং মুসোলিনিকে নিয়ে একটি সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেছিলেন। একই বছরের মার্চ মাসে, হেডগেওয়ার এবং অন্যান্য আরএসএস নেতারা আলোচনা করেছিলেন যে কীভাবে সমসাময়িক ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র জার্মানি এবং ইতালির মতো হিন্দুদের সামরিকভাবে সংগঠিত করা যায়। অথচ তাঁর মতাদর্শ ছিল ব্রিটিশ বিরোধী জাতীয়তাবাদ এবং সামাজিক সংগঠনের উপর ভিত্তি করে, যা ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রীয় সর্বময়তার বিপরীত ছিল। (Chauri Chaura)

আবার আরএসএস-এর সামরিক শৈলীর কুচকাওয়াজ, ইউনিফর্ম এবং কঠোর শৃঙ্খলার সঙ্গে ইউরোপের ফ্যাসিবাদী সংগঠনের কাঠামোগত সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায় বলে অনেকে মনে করেন। হেডগেওয়ারের উত্তরসূরি এম.এস. গোলওয়ালকর এর লেখা বই, “উই অর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইনড” (We or Our Nationhood Defined)-এ নাৎসি আদর্শের প্রতি এক ধরণের মুগ্ধতা বা প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। যা আজও বিতর্কের মূল কারণ। (Chauri Chaura)

গান্ধীজী এবং সুভাষচন্দ্র ইতিহাসের মুখ্য নায়ক। সেখানে হেডগেওয়ার নেপথ্যের এক দীর্ঘ ছায়া। হেডগেওয়ারকে বুঝতে গেলে তাঁকে গান্ধীর ব্যর্থতা বা সুভাষের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতের সম্ভাব্য রূপের প্রস্তুতকারক হিসেবে দেখতে হবে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে প্রায়শই একটি ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল বিভিন্ন আদর্শ, কৌশল ও লক্ষ্যবিশিষ্ট আন্দোলনের সমষ্টি। এইসব কারণে স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে ভারতের স্বাধীনতা কি নৈতিক শুদ্ধতার পুরস্কার, নাকি রাজনৈতিক সংঘর্ষের ফল? আজ আটাত্তর বছর স্বাধীন হয়ে আমরা কী করছি? (Chauri Chaura)

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত
চিত্রঋণ- আন্তর্জাল

Author Premendu Bikash Chaki

প্রেমেন্দু বিকাশ চাকী বাংলা সিনেমা জগতে একজন দক্ষ চিত্রগ্রাহক হিসেবে বহু কালজয়ী এবং সমাদৃত ছবিতে কাজ করেছেন। তাঁর সিনেমাটোগ্রাফি, ছবির নান্দনিকতাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁর বহু ছবিই সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। ভূষিত হয়েছে বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে। পরবর্তীকালে, তিনি চলচ্চিত্র পরিচালনায় পদার্পণ করেন। পরিচালক হিসেবে মূলত পারিবারিক গল্প এবং মিষ্টি সম্পর্কের রসায়ন পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে ভালোবাসেন।
পরিচালনার পাশাপাশি চলচ্চিত্র জগতের সাংগঠনিক ক্ষেত্রেও তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বর্ণময় কর্মজীবনে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে ইস্টার্ন ইন্ডিয়া সিনেমাটোগ্রাফার্স অ্যাসোসিয়েশনের (EICA) সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব (KIFF)-এর টেকনিক্যাল কমিটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন সুদীর্ঘ সময়।
চলচ্চিত্রের কারিগরি বিষয়ে তাঁর ব্যবহারিক অভিজ্ঞতার আলোকে সরকারি এবং বেসরকারি বিভিন্ন চলচ্চিত্র শিক্ষাকেন্দ্রে একজন অতিথি অধ্যাপক (Guest Lecturer) হিসেবে আগামী প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের সমৃদ্ধ করে চলেছেন তিনি।

Picture of প্রেমেন্দু বিকাশ চাকী

প্রেমেন্দু বিকাশ চাকী

প্রেমেন্দু বিকাশ চাকী বাংলা সিনেমা জগতে একজন দক্ষ চিত্রগ্রাহক হিসেবে বহু কালজয়ী এবং সমাদৃত ছবিতে কাজ করেছেন। তাঁর সিনেমাটোগ্রাফি, ছবির নান্দনিকতাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁর বহু ছবিই সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। ভূষিত হয়েছে বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে। পরবর্তীকালে, তিনি চলচ্চিত্র পরিচালনায় পদার্পণ করেন। পরিচালক হিসেবে মূলত পারিবারিক গল্প এবং মিষ্টি সম্পর্কের রসায়ন পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে ভালোবাসেন। পরিচালনার পাশাপাশি চলচ্চিত্র জগতের সাংগঠনিক ক্ষেত্রেও তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বর্ণময় কর্মজীবনে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে ইস্টার্ন ইন্ডিয়া সিনেমাটোগ্রাফার্স অ্যাসোসিয়েশনের (EICA) সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব (KIFF)-এর টেকনিক্যাল কমিটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন সুদীর্ঘ সময়। চলচ্চিত্রের কারিগরি বিষয়ে তাঁর ব্যবহারিক অভিজ্ঞতার আলোকে সরকারি এবং বেসরকারি বিভিন্ন চলচ্চিত্র শিক্ষাকেন্দ্রে একজন অতিথি অধ্যাপক (Guest Lecturer) হিসেবে আগামী প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের সমৃদ্ধ করে চলেছেন তিনি।
Picture of প্রেমেন্দু বিকাশ চাকী

প্রেমেন্দু বিকাশ চাকী

প্রেমেন্দু বিকাশ চাকী বাংলা সিনেমা জগতে একজন দক্ষ চিত্রগ্রাহক হিসেবে বহু কালজয়ী এবং সমাদৃত ছবিতে কাজ করেছেন। তাঁর সিনেমাটোগ্রাফি, ছবির নান্দনিকতাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁর বহু ছবিই সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। ভূষিত হয়েছে বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে। পরবর্তীকালে, তিনি চলচ্চিত্র পরিচালনায় পদার্পণ করেন। পরিচালক হিসেবে মূলত পারিবারিক গল্প এবং মিষ্টি সম্পর্কের রসায়ন পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে ভালোবাসেন। পরিচালনার পাশাপাশি চলচ্চিত্র জগতের সাংগঠনিক ক্ষেত্রেও তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বর্ণময় কর্মজীবনে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে ইস্টার্ন ইন্ডিয়া সিনেমাটোগ্রাফার্স অ্যাসোসিয়েশনের (EICA) সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব (KIFF)-এর টেকনিক্যাল কমিটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন সুদীর্ঘ সময়। চলচ্চিত্রের কারিগরি বিষয়ে তাঁর ব্যবহারিক অভিজ্ঞতার আলোকে সরকারি এবং বেসরকারি বিভিন্ন চলচ্চিত্র শিক্ষাকেন্দ্রে একজন অতিথি অধ্যাপক (Guest Lecturer) হিসেবে আগামী প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের সমৃদ্ধ করে চলেছেন তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Subscribe To Newsletter

কথাসাহিত্য

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী
বিতস্তা ঘোষাল
মাইকেল মধুসূদন দত্ত

সংস্কৃতি

আহার

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়
অমৃতা ভট্টাচার্য
শ্রুতি গঙ্গোপাধ্যায়

বিহার

নির্মাল্য চ্যাটার্জি

কলমকারী

ফোটো স্টোরি

নির্মাল্য চ্যাটার্জি
দেবার্চন চ্যাটার্জি
নির্মাল্য চ্যাটার্জি

উপন্যাস

বিতস্তা ঘোষাল
বিতস্তা ঘোষাল
বিতস্তা ঘোষাল
[adning id="384325"]
[adning id="384325"]

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.
  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.
  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.
  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).
  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

 

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com