(Rahul Arunoday Banerjee)
সবাই বলছে। সংবাদমাধ্যম বলছে, সহ-অভিনেতারা বলছে, ইন্ডাস্ট্রি বলছে, বন্ধুরা বলছে, ওয়াকিবহাল মহল বলছে। তারা নিশ্চয়ই বলবে বা বলবেন। কিন্তু এই ‘সবাই’-এর মধ্যে আমরা যারা চুপচাপ পর্দার ওপারে বসে থাকতাম, যারা তোমার কথার ভিতরে নিজের কথা খুঁজে পেতাম, যারা তোমার লেখায় নীরব আশ্রয় পেতাম— আমাদের কণ্ঠই যেন কোথাও হারিয়ে গেল। আমরা যারা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কোথাও ‘প্যারাসোশাল’ সম্পর্কে জড়িয়ে ছিলাম। আমরা হয়তো অতি সামান্য। কোনও মাইক্রোফোন নেই, কোনও ক্যামেরা নেই, কোনও পরিচয়ও নেই। তবুও আজ চেষ্টা করছি, এই কোলাহলের ভিড় ঠেলে যদি পৌঁছানো যায় তোমার কাছে। হ্যাঁ, ‘তুমি’ বললাম কারণ ‘তুমি’র আত্মীয়তা কোথাও যেন ‘আপনি’র থেকে গাঢ়।
আরও পড়ুন: ভ্যালেনটাইনস সপ্তাহ: বইয়ের অভিমান, অনুযোগ, অনুরাগ
রাহুল,
কিছু মানুষের চলে যাওয়ার পর এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে। ভারী ও ভরাট। আমি তোমাকে চিনতাম না। তোমার আপনজনদের মতো করে নয়, বন্ধুদের মতো করে নয়, পরিবারের মতো করে নয়। আমি ছিলাম স্ক্রিনের ওপারে বসে থাকা অগণিত মুখের একজন। দেখতাম, শুনতাম, অনুভব করতাম। তবুও কেন যেন এই শূন্যতা ভীষণ ব্যক্তিগত। মনে হয়, কেউ একজন মাঝপথে কথা থামিয়ে হঠাৎ উঠে চলে গেল। কিছু কিছু কণ্ঠ থাকে, যেগুলো আমরা শুধু শুনি না, অপেক্ষা করি। তোমার কণ্ঠ ছিল তেমনই। এখন সেই অপেক্ষার আর কোনও ঠিকানা নেই, ডাকবাক্স নেই।
এই ইন্ডাস্ট্রির মুখ ও মুখোশের দ্বন্দ্বে তুমি ব্যতিক্রমী। ‘ট্রেন্ডিং’ ও ‘ভিজিবিলিটির’ ভিড়ে তুমি বেছে নিয়েছিলে এক নিরিবিলি খেলার মাঠ— অন্য ধারার সিনেমা, সাহিত্য, সংবাদপত্রের কলম, থিয়েটার আর ‘সহজ কথার’ পডকাস্ট। ‘সহজ কথা’ শুধু একটা নাম নয়, এটা ছিল তোমার দর্শন। মানুষের জটিল অনুভূতির গিঁটগুলো, যেখানে প্রতিদিন হোঁচট খাই আমরা, তুমি সেগুলো খুলে দিতে সহজে। তুমি আমাদের সঙ্গে আলাপ করিয়েছিলে, তুমি আমাদের হয়ে কথা বলেছিলে। এক অদ্ভুত সেতুবন্ধন তৈরি করেছিলে। আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছিলে, আমরা এখনও গল্পের মানুষ, শব্দের মানুষ, আত্মার মানুষ।

‘সহজ কথা’য় প্রশ্ন করার আগে তোমার সেই হালকা থেমে যাওয়া, সামান্য এগিয়ে এসে বসা, যেন তুমি ইন্টারভিউ নিচ্ছ না, তুমি বুঝতে চাইছ। কারণ ওটা নিছক কন্টেন্ট নয়, কোনও এপিসোড নয়। ওটা পরনের কোট খুলে রেখে, মুখের মেকআপ মুছে ফেলে, বাধ্যবাধকতার ছিটকিনি আলগা করে কথা বলার জায়গা। যেখানে আবির চট্টোপাধ্যায় একনাগাড়ে ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ নিয়ে কথা বলে, যেখানে শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় মন খুলে ‘মেঘে ঢাকা তারা’ দেখে তিনটে বিশেষ মানুষের তারিফের কথা বলে, যেখানে অনির্বাণ ভট্টাচার্য শিল্পে স্থবিরতা ও স্থিরতা নিয়ে অকপটে কথা বলে, যেখানে সোহিনী সরকার অবলীলায় ছোটবেলার ‘গোঁসাঘরের’ কথা বলে। যেখানে আলাপ সিনেমার গণ্ডি পেরিয়ে গিয়ে পৌঁছেছে রাজনীতি, সাহিত্য, খেলা, ব্লগিং ও সমাজের আরও পাঁচটা ক্ষেত্রে।
তুমি এমন একটা প্ল্যাটফর্ম বানিয়েছিলে যেখানে ভাবনার মূল্য ছিল, ভাইরাল হওয়ার নয়। প্রতিটা পর্ব যেন একটা বইয়ের মাঝখান থেকে খুলে পড়া পাতা। না আছে কোনও তাড়া, না কোনও সরলীকরণ, না কোনও হাত ধরে বুঝিয়ে দেওয়া।
সবচেয়ে বড় কথা— সেখানে তুমি কখনও সবচেয়ে জোরে কথা বলার চেষ্টা করনি। তুমি নীরবতাকে জায়গা দিয়েছ। তুমি আলাপচারিতাকে সাহিত্যে পরিণত করেছ। যেখানে সবাই বলার তাড়ায় ব্যস্ত, তুমি আমাদের শুনতে শিখিয়েছ। যেখানে ইন্ডাস্ট্রি শুধু দৃশ্যমানতার পিছনে ছুটছে, তুমি এমন একটা প্ল্যাটফর্ম বানিয়েছিলে যেখানে ভাবনার মূল্য ছিল, ভাইরাল হওয়ার নয়। প্রতিটা পর্ব যেন একটা বইয়ের মাঝখান থেকে খুলে পড়া পাতা। না আছে কোনও তাড়া, না কোনও সরলীকরণ, না কোনও হাত ধরে বুঝিয়ে দেওয়া। তুমি দর্শককে ভরসা করেছিলে— যে তারা ভাবতে পারে। এটাই একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় সম্মান।
কী অনায়াসে ‘সহজ কথা’ এক পৃথিবী থেকে আরেক পৃথিবীতে চলে যেত। একটা পর্বে ‘শিশুরা আমাদের সরল থাকতে শেখায়’-এর মতো উপলব্ধি। আরেকটা পর্বে নায়ক হওয়ার ধারণাটাকেই প্রশ্ন— ‘আসল নায়ক তো সে, যে জীবন বাঁচায়’। এইসব কথার মাঝখানে আমরা নিজেদের খুঁজে পেতাম। তুমি উত্তর খুঁজছিলে না, রাহুল। তুমি প্রশ্নগুলো আঁকড়ে ধরেছিলে। ছিল না প্রভাবিত করার তাড়া। ছিল শুধু একরাশ সততা। আর তাই কষ্টটা এত গভীর।

চলচ্চিত্রে, লেখায় কিংবা তোমার কণ্ঠে— সবখানেই মনে হত তুমি শুধু কিছু কথা বলছ না, তুমি কিছু খুঁজছ। সাহিত্যে, সিনেমায়, মানুষের ভিতরে। আর সেই খোঁজে তুমি আমাদেরও সঙ্গে নিয়ে যেতে। তুমি আমাদের বিশ্বাস করতে শিখিয়েছিলে গভীরতা এখনও সম্ভব, শিল্প এখনও ক্ষণিক বিনোদনের বাইরে গিয়ে কিছু বলতে পারে।
‘চিরদিনই তুমি যে আমার’-এর পর তুমি চাইলে সহজ পথেই থাকতে পারতে। অনেকে থাকে। আলো যেখানে বেশি, হাততালি যেখানে সহজ, সেখানে থেকে যাওয়াটা কঠিন নয়। কিন্তু তুমি গেলে অন্যদিকে— ‘মিনিংফুল’ গল্পের দিকে, ধৈর্যের চরিত্রের দিকে, ভাবনার গভীরতার দিকে। তুমি কঠিন পথটাই বেছে নিয়েছিলে।
আমরা তোমাকে খুব মিস করব, রাহুল। শুধু সেই সিনেমাগুলোর জন্য নয়, যেগুলো আর কখনও তৈরি হবে না, শুধু সেই গল্পগুলোর জন্য নয়, যেগুলো আর লেখা হবে না। বোধহয় সেই নিশ্চুপ শূন্যস্থানগুলোর জন্য, যেখানে হঠাৎ তোমার কণ্ঠ এসে কিছু বদলে দিত। ছোটবেলার ‘ঠাকুমার ঝুলি’র গল্পের মতো।
সমুদ্র তোমাকে এভাবে কেড়ে নিল। যে কণ্ঠের এত কিছু বলার বাকি ছিল, তাকে এভাবে থামিয়ে দেওয়া যেন একটা প্রিয় বই হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়া শেষ চ্যাপ্টারগুলো পড়ার আগেই। তবুও, যা থেকে যায়, তা শুধু শূন্যতা নয়। তা তোমার প্রতিধ্বনি। ওটা রয়ে গিয়েছে তোমার কথার কলরবে, তোমার ফেলে যাওয়া প্রশ্নগুলোর মধ্যে, তোমার অনাড়ম্বর সততার ভিতরে। ওটা বেঁচে আছে সেই সিনেমায়, যেটা তুমি বিশ্বাস করতে, সেই লেখায় যেটা তুমি লিখতে, সেই অনুভবে যেটা তুমি শিখিয়ে গেলে। যে গভীরতা এখনও জরুরি, যদিও পৃথিবী তার উল্টো তালেই নাচে।

আমরা তোমাকে খুব মিস করব, রাহুল। শুধু সেই সিনেমাগুলোর জন্য নয়, যেগুলো আর কখনও তৈরি হবে না, শুধু সেই গল্পগুলোর জন্য নয়, যেগুলো আর লেখা হবে না। বোধহয় সেই নিশ্চুপ শূন্যস্থানগুলোর জন্য, যেখানে হঠাৎ তোমার কণ্ঠ এসে কিছু বদলে দিত। ছোটবেলার ‘ঠাকুমার ঝুলি’র গল্পের মতো।
বিজয়গড়ের সরু গলির সামনের ঠাসা ভিড়, ঠা ঠা রোদকে উপেক্ষা, ছলছল চোখ, চুপচুপে ভেজা মন, ফুটবল ফ্ল্যাগের আবেগ, আকাশ চিরে গান, শেষ অবধি বন্ধুদের লড়ে যাওয়া একবার ‘বাবিন’কে দেখতে পাওয়ার জন্য— এটা ভালবাসা, নিখাদ ভালবাসা যার শিরোনামে লেখা ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত