(First Flight 2)
আমার উৎসাহে ফাদার এবার তাঁর শৈশব থেকে কৈশোরের নানা স্মৃতিকথা একে একে রোমন্থন করতে শুরু করলেন। ফাদারের মামা ছিলেন কানাডিয়ান আর্মিতে। সেই চাকরির সুবাদে এক দীর্ঘ সময় তাঁকে ‘সিলনে’ কাটাতে হয়েছিল। ভারতের মানচিত্রের নিচের অংশে তখন সিলন (শ্রীলঙ্কা) ছিল। ফলে সেই মামার মুখেই তিনি প্রথম ভারতবর্ষের গল্প শুনেছিলেন, এবং তখন থেকেই ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতি আকর্ষণ জন্মায়।
দীর্ঘ ২৬ বছরের কানাডিয়ান জীবনকে ফাদার হঠাৎ একদিন বিদায় জানিয়ে, উড়ে এসে ভারতীয় সভ্যতায় জুড়ে বসেননি। তাঁর যাত্রা ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের মতোই ধীর স্থির। ১৯৬১ সালে মন্ট্রিয়েল থেকে তিনি প্রথমে নিউইয়র্ক আসেন, এবং সেখান থেকে জাহাজে চড়ে অত্যন্ত ধীর গতিতে এদেশের মাটিতে পা রেখেছিলেন, শরীরের আগে তাঁর মনকে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন এই ভারতবর্ষে।
আরও পড়ুন: ফার্স্ট ফ্লাইট – পর্ব ১
সেই জাহাজে বসেই সেটা সম্ভব করেছিলেন সত্যজিৎ রায়। সে এক আশ্চর্য ঘটনা। জাহাজ ছাড়ার কিছুক্ষণ পরে ফাদার জানতে পারেন, তিনি যে দেশের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন, সেই দেশের কিছু সিনেমা দেখানোর ব্যবস্থা রয়েছে সেখানে। ওই জাহাজে বসেই তিনি ‘পথের পাঁচালী’, ‘অপরাজিত’ এবং ‘অপুর সংসার’ দেখেছিলেন। সেই সূত্রে বাংলা ও বাঙালি তথা ভারতবর্ষের মাটির সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয় করিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। সেদিন থেকেই তিনি সত্যজিতের একনিষ্ঠ অনুরাগী।
ফাদারের সঙ্গে মানিকবাবুর সাক্ষাৎ হয়েছিল অনেক কাল বাদে, সেও যেন সিনেমার দৃশ্যের মতো মজার ঘটনা। কোনও এক বিশেষ কাজে ফাদার তখন লন্ডনে। একদিন তাঁর বান্ধবী ‘সাইট এন্ড সাউন্ড’-এর চিত্র সমালোচক মারি সিটন (Marie Seton) তাঁর হাতে একটা খাম দেন। পাশাপাশি অনুরোধ করেন, কলকাতায় পৌঁছে তিনি যেন এই খাম নিজে হাতে মানিকবাবুকে দেন।

মারি সিটন ছিলেন নেহেরু পরিবারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। এহেন ব্যক্তির অনুরোধ ফাদারের কাছে বহু জন্মের পুণ্য কর্মের ফল বলে মনে হয়। মারি সিটনের সেই চিঠি পৌঁছতে গিয়ে সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে ফাদারের প্রথম পরিচয়। এই প্রসঙ্গে বলতেই হয়, সত্যজিৎ রায়ের কর্মজীবনের দীর্ঘক্ষণের সঙ্গী ছিলেন মারি। তাঁর লেখা ‘পোর্ট্রেট অব এ ডিরেক্টর সত্যজিৎ রে’ ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল। চিত্রবাণীর ফাউন্ডার মেম্বারদের অন্যতম ছিলেন সত্যজিৎ রায়।
চিত্রবাণীতে পড়াশোনা করা কালিন ব্রাদার কার্লো এবং সুনেত্রা ঘটকের মুখে শুনেছিলাম, ফাদার প্রতি রবিবার সকাল ন’টায় নিয়ম করে মানিকবাবুর বাড়িতে দেখা করতে যেতেন। পরে মানিকবাবু অসুস্থ হয়ে যখন আইসিইউ-তে ভর্তি, তখনও সেই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটেনি। ‘মানুষটার শরীর অসুস্থ, কিন্তু চিন্তাভাবনা ছিল পরিষ্কার।’ ফাদার ঘরে ঢুকতেই মানিকবাবু ইংরিজিতে জানতে চাইতেন ‘কেমন আছ?’ ওঁদের দু’জনের মধ্যে সাধারণত ইংরিজিতেই কথা হত।
সিটে বসতে না বসতেই একগাল হাসি নিয়ে সুন্দর কুচি দেওয়া লালচে শাড়ি পরা এক এয়ার হোস্টেস আমাদের সামনে নানা ধরনের চকোলেট, টফি, মৌরি লজেন্স ও ছোট তুলোর প্যাকেটে সাজানো একটা ট্রে ধরলেন।
ফাদারের বক্তব্য অনুযায়ী, মানিকবাবু অলোচনার মাঝে খুব ইমোশনাল হলেই একমাত্র বাংলায় কথা বলতেন। শেষের দিন হাসপাতালের কেবিন বিদায় নেওয়ার সময় মানিকবাবু বাংলায় বলেছিলেন ‘খুব ভাল লাগল।’ তাঁর শেষ কথাটা বাংলায় বলাতে ফাদারের মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছিল। সদ্য সম্পর্ক বিয়োগের স্মৃতিকথা বলতে গিয়ে ফাদার সেদিন ভীষণ ইমোশনাল হয়ে উঠেছেন। সত্যজিৎ রায়ের মৃত্যুর দিন আমি বম্বেতে ছিলাম। ফলে শেষযাত্রায় থাকতে পারিনি। হোটেলের শান্ত পরিবেশে ফাদারের সুন্দর বাচনভঙ্গিতে সেদিনের বর্ণনা প্রত্যক্ষ করেছিলাম।
বাসে ট্রেনেই বরাবর চড়ার অভ্যাস। সেই মতো ফ্লাইটে চড়ে সিটের মাথায় নম্বর খুঁজতে গিয়ে জানলাম বিমানের নিয়ম আলাদা। এখানে সিট নম্বর লুকিয়ে থাকে মাথার উপর মালপত্র রাখার ক্যাবিনেটের ঢাকনার নিচে। ভুলভ্রান্তির অবকাশ না রেখে জানলার ধারের সিট নম্বরের গায়ে ছোট্ট জানলার চিহ্ন আঁকা। আমার প্রথম আকাশযাত্রা বলে ফাদার আমাকে জানলার ধারে বসতে বললেন।

সিটে বসতে না বসতেই একগাল হাসি নিয়ে সুন্দর কুচি দেওয়া লালচে শাড়ি পরা এক এয়ার হোস্টেস আমাদের সামনে নানা ধরনের চকোলেট, টফি, মৌরি লজেন্স ও ছোট তুলোর প্যাকেটে সাজানো একটা ট্রে ধরলেন। বাচ্চাদের মতো মুঠো ভরে অনেক কিছু নিতে মন চাইলেও, আমার মধ্যবিত্ত মানসিকতায় বাধ সাধল। ফলে সেটা করে উঠতে পারলাম না। শেষমেশ অন্যদের দেখাদেখি দ্বিধাগ্রস্ত হাতে খানদুয়েক টফি তুলে নিলাম।
এর মধ্যে অন্য এক মেঘবালিকা চিমটে দিয়ে সবার সামনে পাকানো সাদা ঠাণ্ডা সুগন্ধি রুমাল এগিয়ে দিচ্ছেন। দেখে বুঝতে পারছিলাম না, ওটা আমার ঠিক কী কাজে লাগবে। আশেপাশের প্যাসেঞ্জাররা দেখি সেই রুমালে ঘাম মুছছেন। তাঁদের দেখাদেখি আমিও একটা ঠাণ্ডা রুমাল তুলে নিয়ে কিছুটা নকল ক্লান্তি দূর করলাম।
আসলে এই ধরনের আচরণ করে অন্যদের বুঝিয়ে দিতে চান, সহযাত্রী হলেও তাঁরা স্বতন্ত্র শ্রেণির। সেই সকল ব্যক্তিরাই আবার বিমান রানওয়ের মাটি স্পর্শ করা মাত্র সেফটি বেল্ট খুলে জানান দেন, তাঁরা সর্বজ্ঞ এবং একজন ‘ফ্রিকয়েন্ট ফ্লাইয়ার’। বিমানযাত্রা তাঁর নিত্যদিনের বিষয়, যাত্রাপথের নিয়মকানুন সবটাই ঠোঁটস্থ।
এক সময় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে বিমানসেবিকারা সিটবেল্ট বাঁধার কায়দা থেকে আপৎকালীন পরিস্থিতিতে জরুরি অবতরণ প্রয়োজন হলে যাত্রীদের কী করা উচিত, সে সম্পর্কে সকলকে সতর্ক করে দিলেন। প্রথমবার বলে আমি একাই উৎসাহ নিয়ে কথাগুলো মন দিয়ে শুনছিলাম, তেমন একদমই নয়। তাকিয়ে দেখলাম, আশেপাশে সকলেই তাঁদের সব উপদেশ শুনছেন।
ইদানীং ফ্লাইটে সতর্কবার্তা ঘোষণার সময় ইকনমি ক্লাসের অনেক যাত্রী অহেতুক উদাসীনতা অথবা অবজ্ঞার ছলে নিজেদের ফোনে ব্যস্ত রাখেন। আসলে এই ধরনের আচরণ করে অন্যদের বুঝিয়ে দিতে চান, সহযাত্রী হলেও তাঁরা স্বতন্ত্র শ্রেণির। সেই সকল ব্যক্তিরাই আবার বিমান রানওয়ের মাটি স্পর্শ করা মাত্র সেফটি বেল্ট খুলে জানান দেন, তাঁরা সর্বজ্ঞ এবং একজন ‘ফ্রিকয়েন্ট ফ্লাইয়ার’। বিমানযাত্রা তাঁর নিত্যদিনের বিষয়, যাত্রাপথের নিয়মকানুন সবটাই ঠোঁটস্থ।

আরও একটা জিনিস খেয়াল করেছি, এদের জীবনে ভীষণ তাড়া। বিমান সেবিকার অনুমতি ছাড়াই নিরাপত্তার তোয়াক্কা না করে ইচ্ছেমতো মোবাইল ফোন অন করেন। বিমান থেকে প্রস্থানের ব্যবস্থা প্রাথমিক পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই ঝাঁপিয়ে উঠে মাথার উপরের ডালা খুলে ব্যাগপত্তর নিয়ে সটান দাঁড়িয়ে পড়েন। কনভেয়র বেল্ট চালু হওয়ার আগেই সেই আধুনিক ওভারস্মার্টেরা দৌড়ে সেখানে চলে যান। তাঁদের সব আচরণের মধ্যে থাকে এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা।
যত দিন যাচ্ছে, এই ধরনের বেপরোয়া বিমানযাত্রীর সংখ্যা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। এদের সংযম বা নিয়মানুবর্তিতার বালাই নেই। ইচ্ছেমতো মোবাইলে চিৎকার করে কথা বলেন, মর্জিমাফিক ভিডিয়ো কল করে আশেপাশের মানুষকে রীতিমতো অস্বস্তিতে ফেলেন। অন্যের সুবিধা-অসুবিধা সম্পর্কে তারা উদাসীন, সামাজিক রীতিনীতির তোয়াক্কা করেন না। শালীনতা বিসর্জন দিয়ে নিয়ম ভাঙার মধ্যেই তাদের উত্তেজনা, অপরাধের মধ্যেই তাদের আনন্দ। রোজকার জীবনে আমরা যারা নিয়ম মেনে লাইনে দাঁড়িয়ে ‘সময় নষ্ট’ করি, ওদের চিহ্নবিজ্ঞানে তারা সময়ের থেকে পিছিয়ে পরা ‘ব্যাকডেটেড ফেলো’।
এই এক বড় দোষ, লিখতে বসে ক্রমাগত অন্য প্রসঙ্গে চলে যাই। যাই হোক, সেদিন আকাশ পথে আমাদের জানান হল যে, কোনও আজানা কারণে এই ফ্লাইট আজ আর লখনউয়ের মাটি ছোঁবে না। সেই মতো আমরা যাঁরা লখনউয়ের যাত্রী, তাঁদের বেনারসে নামিয়ে বিমান উড়ে গেল আমেদাবাদের উদ্দেশ্যে।
একবার মেট্রে রেলের কামরায় হঠাৎ এক সামান্য পরিচিতর দিকে চোখে চোখ পরতেই সে উত্তর গোলার্ধ থেকে গলা হাঁকিয়ে প্রশ্নবাণ ছুঁড়ে দিল ‘আপনার এখন কী সিনেমা চলছে?’ আমি ইশারায় কিছু চলছে না জানাতেই, আবার প্রশ্ন ‘সামনেরটা কবে রিলিজ?’ তাঁর প্রশ্ন শুনে কামরার বেশ কিছু মানুষজন মোবাইল ছেড়ে আমার দিকে চোখ তুলে তাকাতেই, এক অজানা অস্বস্তিতে আমি বাধ্য হয়ে নিজের সিট ছেড়ে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
এবার আমার গন্তব্য রবীন্দ্র সদন জেনে ভদ্রলোক আবারও আঁতকে উঠলেন। ‘সে কী তাহলে আপনি সিট ছেড়ে উঠলেন কেন? আমার কথা শুনতে পাচ্ছিলেন না বুঝি!’ তাঁকে আমার লজ্জা এবং আত্মসম্মানের বিষয়টা বলতেই, তিনি আমার অজ্ঞানতা দূরীকরণের চেষ্টায় অন্যদের শুনিয়ে শুনিয়ে বললেন, ‘এই তো আপনাদের প্রবলেম স্যর! পাবলিসিটির যুগে আপনারা প্রচারবিমুখ।’ কে বলল আমি প্রচারবিমুখ! আমি সবসময় আমার সৃষ্টি, সে সিনেমা, লেখা বা ফটোগ্রাফ যাই হোক না কেন, অবশ্যই তার প্রচার চাই, তাই বলে পাবলিক প্লেসে এই ধরনের অযাচিত চর্চাও যে এক ধরনের প্রচার ধারা, সে নিয়ে আমার ধারণা ছিল না। মনে দ্বিধা হয় সহযাত্রীরা কী ভাববে, সেই কথা ভেবে।
‘স্যর লোকের কথা ভাবলে আমি আমার কথা ভাবব কখন?’ সত্যিই তো! এ যুগের মূলমন্ত্র একটাই: শুধু নিজের কথা ভাবো, নিজেকে নিয়ে বাঁচো। চুলোয় যাক আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, অফিস কলিগ, পাড়া প্রতিবেশী। স্কুলফেরত যে ছোট বাচ্চার কাছে তাদের ‘মডার্ন আপ টু ডেট’ মাম্মি ইংরেজিতে জানতে চায় ‘বেবি তুমি তোমার টিফিন একলা খেয়েছ তো?’, সেই বাচ্চা বড় হয়ে যে সে শুধু নিজের কথাই ভাববে, এটাই তো স্বাভাবিক। সমাজ তো তাকে প্রথম থেকে সেটাই শিখিয়েছে।
এই এক বড় দোষ, লিখতে বসে ক্রমাগত অন্য প্রসঙ্গে চলে যাই। যাই হোক, সেদিন আকাশ পথে আমাদের জানান হল যে, কোনও আজানা কারণে এই ফ্লাইট আজ আর লখনউয়ের মাটি ছোঁবে না। সেই মতো আমরা যাঁরা লখনউয়ের যাত্রী, তাঁদের বেনারসে নামিয়ে বিমান উড়ে গেল আমেদাবাদের উদ্দেশ্যে। এয়ারলাইন্স থেকেই আমাদের রাতে থাকার ব্যাবস্থা হোটেল ‘ক্লার্ক’-এ করা হয়েছে। অতএব ভাগ্যের লিখনে যাত্রায় বেনারসে স্টার হোটেলে রাত্রিবাসও জুটে গেল।
বেনারসে সুইমিং পুলের ধারে পাশাপাশি ঘরে আমাদের রাত্রিবাস। ফ্লাইটে যথেষ্ট খাওয়া হয়েছে, রাতে কিছু না খেলেও চলবে। হোটেল রুমে চেক-ইন করে ফাদার নিজের জন্য একটা ফ্রেশ লাইম সোডা অর্ডার করলেন, সঙ্গে আমার জন্য বিয়ার।
হোটেলে পা রাখতেই সেখানে ডক্টর দে’র ফোন। তিনি আমাদের দুরবস্থার জন্য দুঃখপ্রকাশ করে আশ্বস্ত করলেন যে, পরদিন ভোর ভোর তাঁর নিজস্ব গাড়ি আমাদের কাছে পৌঁছে যাবে। বিপত্তি নাটক হয়ে ওঠার আগেই এয়ারলাইন্সের লোকদের ফাদার জানিয়ে দিলেন, পরের দিন কাজের চাপ আছে সুতরাং বেলা অবধি ফ্লাইটের অপেক্ষা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়, আমরা নিজেদের মতো বাই রোড লখনউ চলে যাব।
বেনারসে সুইমিং পুলের ধারে পাশাপাশি ঘরে আমাদের রাত্রিবাস। ফ্লাইটে যথেষ্ট খাওয়া হয়েছে, রাতে কিছু না খেলেও চলবে। হোটেল রুমে চেক-ইন করে ফাদার নিজের জন্য একটা ফ্রেশ লাইম সোডা অর্ডার করলেন, সঙ্গে আমার জন্য বিয়ার। রাতের স্নিগ্ধ আলোয় জলের উপর হোটেলের নীরব প্রতিফলন, সব মিলেমিশে সারা দিনের বিশৃঙ্খলার পর এক অদ্ভুত প্রশান্তি। হাফ প্যান্ট পরে বসে ফাদার ফ্রেশ লাইমে চুমুক দেওয়ার মুহূর্তে আমার দিকে গ্লাস তুলে ধরলেন। চোখে চোখ রেখে ‘চিয়ার্স’ করেই এক চোখ টিপে হেসে উঠলেন। তাঁর সুদীর্ঘ জীবনে বিমান যাতায়াতের পথে একদিনে এত ধরনের ঘটনা অতীতে হয়নি, এসবটাই নাকি আমার ভাগ্যগুণ বা দোষ।

সত্যিই তো, প্রথম বিমানযাত্রাতেই কলকাতায় দেরি, তারপর অশোকা হোটেল, ফাদারের গল্প, মাঝরাতে বেনারসে অবতরণ, সব মিলিয়ে যেন জীবন নিজেই আমাকে দ্রুত হাতে শিক্ষা দিচ্ছে। কিন্তু সফরসঙ্গী ফাদার না থাকলে আমার কপালে যে দুর্ভোগ ছিল, সেটা বেশ বুঝেছি। আড্ডার শেষে ফাদার ঈশ্বরকে বারবার ধন্যবাদ জানালেন এই যাত্রাপথে আমাদের দু’জনের দেখা করিয়ে দেওয়ার জন্য।
এই প্রসঙ্গে একটা কথা না বললেই নয়, ফাদার গাস্তঁ রোবের্জ ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্য নিয়ে এই দেশে আসেননি, এসেছিলেন শিক্ষা প্রচারের উদ্দেশ্যে এবং নিজে শিক্ষিত হতে। ভারতবর্ষকে তিনি জয় করতে চাননি, ভারতবর্ষকে তিনি নিজের মতো করে বুঝতে চেয়েছিলেন। এটাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দেয়। তাঁর কাছে শিক্ষা শুধু পাঠদান ছিল না, ছিল সভ্যতার সামনে বিনম্র হয়ে দাঁড়ানো।
ভোর হতে না হতেই চার তারা হোটেল ঘরের নিস্তব্ধতার মাঝে সুরেলা ফোন বেজে উঠল। হোটেলে সামনে আমাদের অপেক্ষায় দাঁড়ানো কাচ তোলা সাদা অ্যাম্বাসেডর। গাড়ির ভিতরে হালকা সুগন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে; ক্লান্ত রাতের পর সেই গন্ধে অদ্ভুত এক সতেজতা।
এক সাক্ষাৎকারে উনি বলেছিলেন ‘আমাদের ধর্মে প্রচার একটা বড় ইমপালস। কিন্তু আমি বেছে নিয়েছি কমিউনিকেশন। আমি জানি, শুধু প্রচার করলে কমিউনিকেশন হয় না। প্রথমে শুনতে হয়, শিখতে হয়, না হলে ডায়ালগ হয় না।’
শুরু থেকেই ফাদারের ঝোঁক ছিল মিডিয়া এডুকেশনের প্রতি। যেহেতু সিনেমা একটা শক্তিশালী এবং জনপ্রিয় আর্ট মাধ্যম, সেহেতু ওঁর উদ্দেশ্য ছিল সিনেমার মাধ্যমে মিডিয়া ও মিডিয়ার মাধ্যমে সমাজের কাছে পৌঁছানো। তাঁর মতে ‘সমাজ হল আসল কথা। কীভাবে সমাজের মধ্যে একটা অর্থপূর্ণ জীবন তৈরি করা যায়, তাঁর জন্য সিনেমা ইজ এ গুড এন্ট্রি।’

ভোর হতে না হতেই চার তারা হোটেল ঘরের নিস্তব্ধতার মাঝে সুরেলা ফোন বেজে উঠল। হোটেলে সামনে আমাদের অপেক্ষায় দাঁড়ানো কাচ তোলা সাদা অ্যাম্বাসেডর। গাড়ির ভিতরে হালকা সুগন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে; ক্লান্ত রাতের পর সেই গন্ধে অদ্ভুত এক সতেজতা। সুন্দর সাদা নরম তোয়ালে দিয়ে সিট আগাগোড়া মোড়া। ক্যামেরার ব্যাগ মাঝখানে রেখে পিছনের সিটে পাশাপাশি বসে শুরু হল আমাদের নতুন দিনের আড্ডা।
কলকাতায় এসে প্রথম ন’বছর সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’র গভীর বিশ্লেষণ এবং এই বিষয়ে ছাত্রদের সঙ্গে আলোচনা করাই ছিল ফাদার রোবের্জের কাজের প্রথম ধাপ। এর পরের ধাপে, ১৯৭০ সালের ৫ই অক্টোবর তিনি ফটোগ্রাফি, রেডিও, সিনেমা এবং গ্রাফিক্সের মতো গণমাধ্যম নিয়ে শিক্ষা ও গবেষণার কেন্দ্র ‘চিত্রবাণী’ গড়ে তোলেন। ‘চিত্রবাণী’তে আমরা যে সব শিক্ষকদের সান্নিধ্য লাভ করেছি, তাঁদের মধ্যে ফাদার ছাড়াও ছিলেন উৎপল বসু, ডঃ সোমনাথ যুৎসি, মিহির বন্দ্যোপাধ্যায়, দীপক মজুমদার, ধ্রুব গুপ্ত, নবীনানন্দ সেন, সেলিম পল, শশী আনন্দ, গৌতম চট্টোপাধ্যায়, রবি ওঝা, শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো গুণী মানুষরা। নব্বইয়ের দশকে ‘চিত্রবাণী’ই ছিল কলকাতার অন্যতম জনপ্রিয় মিডিয়া সেন্টার।
তাঁর ‘আ হিউম্যান টাচ ইন কমিউনিকেশন’-এ তিনি চেয়েছিলেন গণমাধ্যম যেন যন্ত্রনির্ভর না হয়ে মানুষের কল্যাণের কাজ করে এবং সাধারণ মানুষের নিজস্ব কণ্ঠস্বরের মর্যাদা পায়। বললেন, ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলন এবং আধুনিক সিনেমায় তার প্রতিফলনের কথা।
দীর্ঘ যাত্রাপথে ফাদার রোবের্জ বলে চললেন তাঁর সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা। তাঁর ‘আ হিউম্যান টাচ ইন কমিউনিকেশন’-এ তিনি চেয়েছিলেন গণমাধ্যম যেন যন্ত্রনির্ভর না হয়ে মানুষের কল্যাণের কাজ করে এবং সাধারণ মানুষের নিজস্ব কণ্ঠস্বরের মর্যাদা পায়। বললেন, ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলন এবং আধুনিক সিনেমায় তার প্রতিফলনের কথা। মৃণাল, সত্যজিৎ, ঋত্বিকের প্রসঙ্গ এল কথায় কথায়। ভারতীয় সিনেমা জগতের প্রতিটা বিভাগে তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল।
সকালের আলো, রাস্তার ধুলো, জানলার বাইরে ছুটে চলা উত্তর ভারতের সুদৃশ্য গ্রামের পর গ্রাম, এসব কিছুর মাঝেও মন নিবিষ্ট ছিল তাঁর কণ্ঠে। মনে হচ্ছিল, আমি লখনউয়ের পথে ছুটে চলেছি ভারতীয় চলচ্চিত্রের এক অদৃশ্য ইতিহাসের মধ্যে দিয়ে।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত