(Planning Commission 2)
প্ল্যানিং কমিশন গঠনের সরকারি সিদ্ধান্ত ১৯৫০ সালের মার্চ মাসে বিজ্ঞাপিত হলেও সলতে পাকানোর কাজ অনেক দিন আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল। সময়টা ছিল ১৯৩৮ সালের ফেব্রুয়ারি। তারপর কেটে গেছে অনেকগুলো বছর। ইতোমধ্যে শুরু হয়ে শেষ হয়েছে একটা বিশ্বযুদ্ধ। মন্বন্তরে মারা গেছে অসংখ্য মানুষ। হয়েছে দেশভাগ। এসেছে স্বাধীনতা। লক্ষ লক্ষ শরণার্থী আশ্রয় ও উপার্জনের সন্ধানে দিশেহারা। নেতাজি দেশত্যাগী। গান্ধীজি নিহত। এবং জওহরলাল নেহরু দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী।
গুজরাটের সুরাট জেলার তাপ্তি নদীর তীরে অবস্থিত হরিপুরা গ্রামে ১৯৩৮ সালের ১৯-২২ ফেব্রুয়ারি আয়োজিত হয়েছিল ভারতের জাতীয় কংগ্রেস দলের ৫১তম বার্ষিক অধিবেশন, চলতি ভাষ্যে যা ‘হরিপুরা কংগ্রেস’ বলে পরিচিত। এই অধিবেশনের শেষে প্রথমবারের জন্য দলের সভাপতি নির্বাচিত হন সুভাষচন্দ্র বসু। সভাপতির সম্ভাষণে তিনি শুধু কংগ্রেস দলের নয়, সমগ্র ভারতীয় সমাজের ভবিষ্যৎ রূপরেখা বিশ্লেষণ করেন।
ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাসে সুভাষচন্দ্রের হরিপুরা ভাষণের গুরুত্ব অপরিসীম। সুললিত ভাষ্যে রচিত দীর্ঘ ভাষণে তিনি বলেছিলেন— ‘…আমাদের ভবিষ্যৎ সরকারকে সর্বাগ্রে যে কাজ করতে হবে, তা হল একটি কমিশন গঠন, যা দেশের সামগ্রিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করবে।…’
দলের অধিবেশনে ভাষণ দিয়ে তা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে, সভাপতি হওয়ার পরে সুভাষচন্দ্র জাতীয় পরিকল্পনা প্রণয়নে রীতিমতো ছক বেঁধে কাজ শুরু করলেন। কয়েক মাসের ব্যবধানে এই বিষয়ে চারটি গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন আয়োজিত হল। ১৯৩৮-এর মে মাসে তখনকার বোম্বাইয়ে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির মিটিং এবং সেই সঙ্গে কংগ্রেসি মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীদের নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম সম্মেলন (প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রীদের তখন প্রধানমন্ত্রী বলা হত)।

জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সভাকে এই ব্যাপারে দ্বিতীয় সম্মেলন বলা যায়। অক্টোবর মাসে দিল্লিতে আয়োজিত কংগ্রেসি শিল্পমন্ত্রীদের বৈঠক ছিল এই বিষয়ে তৃতীয় সম্মেলন। তিনটি সভাতেই সুভাষচন্দ্র পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। আর ডিসেম্বর মাসে বোম্বাইয়ে আয়োজিত চতুর্থ সম্মেলনে গঠন করলেন ‘ন্যাশনাল প্ল্যানিং কমিটি’।
বোম্বাইয়ের সেক্রেটারিয়েটে ১৭ই ডিসেম্বর শনিবার দুপুরে ন্যাশনাল প্ল্যানিং কমিটির প্রথম অধিবেশন বসল। উদ্বোধন করলেন সুভাষচন্দ্র বসু। সভাপতিত্ব করলেন জওহরলাল নেহরু। অক্টোবর মাসে আয়োজিত প্রাদেশিক শিল্পমন্ত্রীদের সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল, ন্যাশনাল প্ল্যানিং কমিটির প্রথম সভায় কংগ্রেস সভাপতিই সভাপতিত্ব করবেন। সুভাষচন্দ্র কিন্তু নেহরুকে জায়গা ছেড়ে দিয়েছিলেন। কারণ কী? মেঘনাদ সাহার রচনায় ব্যাখ্যা রয়েছে।
ন্যাশনাল প্ল্যানিং কমিটির উদ্বোধনী অধিবেশনে সুভাষচন্দ্র ছাড়া অন্যান্য যেসব সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন, তাঁরা হলেন— পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু, স্যার এম.বিশ্বেশ্বরায়া, স্যার পুরুষোত্তম দাস ঠাকুরদাস, অম্বালাল সরাভাই, এ.ডি.শরফ, কে.টি.শাহ, ডক্টর ভি.এস.দুবে, এবং আহ্বায়ক ভি.ভি.গিরি।
“…নেতাজি ১৯৩৮ সালের অক্টোবর মাসে দিল্লিতে বিভিন্ন প্রদেশের শিল্পমন্ত্রীদের ও ভারতের কিছু অন্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের যে সভা ডাকলেন, তাতে আমাকে নিমন্ত্রণ করলেন। আমি সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনেই মাত্র যোগ দিতে পেরেছিলাম। দেখলাম, সেখানে ড.কাটজু, ড.সৈয়দ মামুদসহ প্রদেশসমূহের প্রায় সকল শিল্পমন্ত্রীই উপস্থিত। ন্যাশন্যাল প্ল্যানিং কমিটি গঠনের প্রস্তাব আগেই গৃহীত হয়ে গিয়েছিল এবং স্যার এম. বিশ্বেশ্বরায়াকে অনুরোধ করা হয়েছিল সভাপতিত্ব স্বীকার করার জন্য।
আমি স্যার বিশ্বেশ্বরায়ার সঙ্গে কথা বলে সভাপতির পদ গ্রহণ থেকে তাঁকে নিবৃত্ত করতে সমর্থ হলাম। তাঁকে বুঝিয়েছিলাম— একজন শীর্ষস্থানীয় কংগ্রেস নেতাকে সভাপতি না করলে ন্যাশন্যাল প্ল্যানিং কমিটির সিদ্ধান্তগুলি বিশুদ্ধ তাত্ত্বিক সিদ্ধান্ত থেকে যাবে, কংগ্রেসের কাছে তার কোনও মূল্যই থাকবে না। সেই মহান প্রবীণ ব্যক্তি আমার কথার সারবত্তা বুঝে তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে গেলেন। আমার পরামর্শ মতোই পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুকে (তখন ইউরোপে) ন্যাশন্যাল প্ল্যানিং কমিটির সভাপতিত্ব করতে আমন্ত্রণ জানানো হল।…” (Rethinking Our Future গ্রন্থ থেকে)

ন্যাশনাল প্ল্যানিং কমিটির উদ্বোধনী অধিবেশনে সুভাষচন্দ্র ছাড়া অন্যান্য যেসব সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন, তাঁরা হলেন— পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু, স্যার এম.বিশ্বেশ্বরায়া, স্যার পুরুষোত্তম দাস ঠাকুরদাস, অম্বালাল সরাভাই, এ.ডি.শরফ, কে.টি.শাহ, ডক্টর ভি.এস.দুবে, এবং আহ্বায়ক ভি.ভি.গিরি। বিশেষ আমন্ত্রিতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন বল্লভভাই প্যাটেল, ভুলাভাই দেশাই, জে.বি.কৃপালনি, যমনলাল বাজাজ এবং অধ্যাপক সি.এন.ভকিল।
পাঁচ দিন ধরে চলে জাতীয় প্ল্যানিং কমিটির প্রথম আলোচনা। গঠিত হয় বিষয় ভিত্তিক সাব-কমিটি। প্রধান সাব-কমিটিগুলি ছিল— কৃষি (Agriculture), শিল্প ও শিল্পায়ন (Industries), শ্রম (Labour), বিদ্যুৎ ও জ্বালানি (Power and Fuel), খনিজ সম্পদ (Minerals), পরিবহন ও যোগাযোগ (Transport and Communications), অর্থ ও ব্যাঙ্কিং (Finance and Banking), গ্রামীণ শিল্প (Village and Cottage Industries), শিক্ষা (Education), জনস্বাস্থ্য (Public Health), বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি (Science and Scientific Research), নারী ও শিশু কল্যাণ (Women and Child Welfare)।
প্রথম পঞ্চবার্ষিকী মূলত হ্যারড-ডোমার (Harrod-Domar) মডেল দ্বারা প্রভাবিত ছিল। হ্যারড-ডোমার বৃদ্ধি মডেল অনুযায়ী, একটি অর্থনীতির অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার সঞ্চয়ের স্তর এবং মূলধনী বিনিয়োগের উৎপাদনশীলতার উপর নির্ভর করে।
প্রতিটি সাব-কমিটির অধ্যক্ষ ও সদস্যরা ছিলেন নিজের নিজের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য সাব-কমিটির কাজ কিঞ্চিৎ মন্থর হয়ে যায়। ১৯৪৬ নাগাদ সবকটি সাব-কমিটির চূড়ান্ত রিপোর্ট ন্যাশনাল প্ল্যানিং কমিটির অধ্যক্ষর কাছে জমা দেওয়া হয়। ততদিনে শুরু হয়ে গেছে স্বাধীনতা লাভ ও দেশভাগের ক্রিয়াকর্মাদি। স্বভাবতই জওহরলাল নেহরু তখন ভীষণ ব্যস্ত।
রিপোর্টগুলি একত্রিত করতে করতে এসে গেল ১৯৪৮। সবকটি সাব-কমিটির রিপোর্ট ১৯৪৮–১৯৪৯ সালের মধ্যে প্রকাশিত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় প্ল্যানিং কমিটির সাব-কমিটির সম্মিলিত রিপোর্টের ভিত্তিতে রচিত হয় প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার রূপরেখা।
দুই
ভারতের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার (First Five-Year Plan) সময়রেখা ছিল,– ১ এপ্রিল ১৯৫১ – ৩১ মার্চ ১৯৫৬।
প্রথম পঞ্চবার্ষিকী মূলত হ্যারড-ডোমার (Harrod-Domar) মডেল দ্বারা প্রভাবিত ছিল। হ্যারড-ডোমার বৃদ্ধি মডেল অনুযায়ী, একটি অর্থনীতির অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার সঞ্চয়ের স্তর এবং মূলধনী বিনিয়োগের উৎপাদনশীলতার উপর নির্ভর করে। ১৯৩৯ সালে রয় এফ.হ্যারড এবং ১৯৪৬ সালে এভসে ডোমার কর্তৃক স্বাধীনভাবে বিকশিত এই মডেলটি দেখায় যে, জাতীয় বৃদ্ধির জন্য বিনিয়োগের চাহিদা ও সরবরাহ প্রভাবের মধ্যে ভারসাম্য প্রয়োজন।
এই পর্যায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল সমস্ত অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকা। সেই সময়ে এই ধরনের ভূমিকা ন্যায়সঙ্গত ছিল কারণ স্বাধীনতার পরে ভারত মৌলিক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল— পুঁজির অভাব এবং সঞ্চয় করার ক্ষমতা কম।
প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার প্রধান লক্ষ্য ছিল— কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জন, সেচ ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়ন, উদ্বাস্তু পুনর্বাসন, দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা।
প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সাফল্য হিসেবে বলা হয়— পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বৃদ্ধির লক্ষ্য ছিল ২.১ শতাংশ, কিন্তু প্রকৃত বৃদ্ধি হয় প্রায় ৩.৬ শতাংশ। ২,০৬৯ কোটি টাকা মোট পরিকল্পিত বাজেট (পরে ২,৩৭৮ কোটি টাকা) সাতটি বিস্তৃত ক্ষেত্রে বরাদ্দ করা হয়েছিল: সেচ এবং শক্তি (২৭.২%), কৃষি এবং সম্প্রদায়ের উন্নয়ন (১৭.৪%), পরিবহন ও যোগাযোগ (২৪%), শিল্প (৮.৬%) ), সামাজিক সেবা (১৬.৬%), ভূমিহীন কৃষকদের পুনর্বাসন (৪.১%), এবং অন্যান্য খাত এবং পরিষেবাগুলির জন্য (২.৫%)।
এই পর্যায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল সমস্ত অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকা। সেই সময়ে এই ধরনের ভূমিকা ন্যায়সঙ্গত ছিল কারণ স্বাধীনতার পরে ভারত মৌলিক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল— পুঁজির অভাব এবং সঞ্চয় করার ক্ষমতা কম।
কৃষি ও সেচ খাতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটে। কতগুলি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প এই সময় বাস্তবায়িত হয়। ভাকরা-নাঙ্গল বাঁধ, হিরাকুদ বাঁধ প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার ফসল। দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন ১৯৪৮ সালের ৭ জুলাই প্রতিষ্ঠিত হলেও সংস্থাটির বিস্তৃতি প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সময়সীমায়।

১৯৫৬ সালে পরিকল্পনার মেয়াদ শেষে, পাঁচটি ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আইআইটি) প্রধান প্রযুক্তি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে শুরু হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) তহবিলের যত্ন নেওয়ার জন্য এবং দেশে উচ্চশিক্ষাকে শক্তিশালী করার ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মাঝামাঝি সময়ে পাঁচটি স্টিল প্ল্যান্ট চালু করার জন্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
ভারতের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (১৯৫১–১৯৫৬) শুরু হওয়ার সময় প্ল্যানিং কমিশনের প্রধান সদস্যরা ছিলেন—
চেয়ারম্যান: জওহরলাল নেহরু (পদাধিকারবলে)
উপ-চেয়ারম্যান: গুলজারিলাল নন্দা
পূর্ণকালীন সদস্যবৃন্দ: ভি.টি.কৃষ্ণমাচারী, জি.এল.মেহতা, আর.কে.পাটিল, সি.ডি.দেশমুখ (পরবর্তী সময়ে সদস্য হিসেবে যুক্ত হন)।
উল্লেখ্য, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য সংখ্যা সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হয়েছে। তবে প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা শুরুর সময় উপরোক্ত ব্যক্তিরাই কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত