আইঢাই: সর-পর

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Kitchen stories

এ শব্দ যে কোথা থেকে এল জানা নেই।
জানি না জুড়ে লিখব নাকি ছাড়িয়ে! ‘সর’ মানে কি সরিয়ে দেওয়া? পরের আগে বসলে তো সেটাই মানায়!
দূর বাবা! নিকুচি করেছে বলে লিখেই ফেললাম, আগের কালে এদেশি বুড়িদের মুখে মুখে ফেরা এই লব্জখানি।
অন্তত আমার তল্লাটের মানুষেরা হাঁ হাঁ করে শোরগোল পাকাবে না। উল্টে মিলিয়ে নেবে স্মৃতির রেফারেন্স।

‘সরপর’ হল গিন্নিদের হাতে এক ব্রহ্মাস্ত্র, যেটি হাতে দৃশ্যমান না হয়েও, মাথার এক প্রখর অবস্থানে সজাগ হয়ে উঁচিয়ে থাকতগিন্নির নানা গুণপনা ম্লান হয়ে যেত এই সরপরের নিরিখে। সরপর তাহলে কী – না, কর্তৃত্বের জোরে বিভেদ তৈরি করা।
কোথায়? সংসারের ভাগ বাঁটোয়ারায়।
সম্পত্তি, বাড়ি, জমি , গহনা, বাসন – এ সবে কর্তাদের ছাপিয়ে তাঁদের মতামত সামান্যই খাটত, আর খাটলেও সে সুযোগ তো কালেভদ্রে; ভাগের বা উপহারের বা যৌতুকের প্রশ্ন উঠলে। গিন্নিরা তাই এর প্রয়োগ নামিয়ে এনেছিলেন দৈনন্দিনের যাপনে। এ থেকেই বোঝা যেত, কোন গিন্নির মনটি কেমন! তবে বোঝা গেলেও যে তাতে খুব একটা কিছু হেলদোল ঘটত তা নয়। আর এই জন্যেই যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়ার একটি বিবেচ্য কারণ হয়েও হয়তো এটি ক্রমে দেখা দিল।  

‘সরপর’ ঘটত মূলত দুটি ক্ষেত্রে –  এক, খাবার বেড়ে দেওয়ায় আর দুই, কাজের ভাগাভাগিতে।
আসলে ‘সম’ বোধটা সংসারে প্রায় থাকেই না। তা না হলে রান্নার সময়তেই কী করে, মনে মনে ঠিক হয়ে যেত, কোন মাছের কোন খণ্ডটি  কার পাতে পড়বে। সেই অনুসারে প্রথম আধিকারিক কর্তা। তারপরে একে একে বাড়ির ছেলেরা– মানে ভাইপো, ভাগনে এমনকি অনাত্মীয় অন্য কোনও পুরুষও, যার দু’বেলার পাতও ওই হেঁশেলেই বাঁধা। রুই হলে মুড়ো, আর আড় মাছ হলে ল্যাজা কারণ, রুই-মুড়োতে ঘি, আর আড়ের ল্যাজায় তেল থাকে। রুই কাতলার গাদা-পেটি নিয়ে সরপর, তো আড় বোয়ালের ল্যাজা পেতে অপেক্ষা। এরকমই চলবে ইলিশ ভেটকির খণ্ড নিয়েও
আর যে সব মাছ পাতে গোটা গোটা পড়বে, যেমন পাবদা, পারশে, ট্যাংরা-  সে সবের পরিবেশনে মাপা হবে আড়ে দিঘে সাইজ কেমন এবং ডিমওলা না ডিম ছাড়া।
জটিল হবে ভাবনা, যদি বড়ো ছেলেকে টপকে মেজ বা সেজর রোজগার বা রমরমা বেশি হয়; বা চার পাঁচজন জামাইয়ের মধ্যে একজন যদি কম রোজগেরে হয় তো গেল! সিনিয়রিটি বাতিল; সাবলীল পরিবেশনে সেই বেশি রোজগেরেরা পেয়ে যাবে সরেস মাছ, আলু বাদ দিয়ে চর্বি ছাড়া পাঁঠার টুকরো, দইয়ের মাথা এবং একটু বেশি আদিখ্যেতা
বাড়ির কর্তাটি যদি তেমন বলিয়ে কইয়ে না হন বা স্বভাবত মুখচোরা – দাবিহীন, তো তাঁর কপাল পুড়লসেখানে ভারসই বড়ো খোকা হয়ে যাবে মায়ের নয়নের মণি। বাবাকে পাশে বসিয়েই সে একটু বেশি তোয়াজ পাবে। যেমন কাজে বেরনোর সময় কচি ডাবটি, পথে খাবার জন্যে বাহারি ডিবেতে একটু মুখশুদ্ধি আলাদা করে।
এই সব আদিখ্যেতার কোনও শেষ ছিল না। ব্যাপারটা হল, তেলা মাথায় তেল দেওয়া। সেক্ষেত্রে বাড়ির ছেলের মুখ চুন করেও বড়লোক জামাইকে একটু হেঁইও আদর। যুক্তি হল, আহা ও কি ছেলে নয়! বা রোজ রোজ তো কাছে পাই না, তাই হলই বা একটু সরপর! সাধারণ ভাবে, বাবা-ছেলের মধ্যে বিশেষ ব্যতিক্রম ছাড়া বাবা; মেয়ে-বৌয়ের মধ্যে অবশ্যই মেয়ে; ছেলে-বৌমার মধ্যেও নিশ্চিতভাবেই ছেলে। একই ভাবে নাতি-নাতনির মধ্যে নাতি তো বটেই।

জটিল হবে ভাবনা, যদি বড়ো ছেলেকে টপকে মেজ বা সেজর রোজগার বা রমরমা বেশি হয়; বা চার পাঁচজন জামাইয়ের মধ্যে একজন যদি কম রোজগেরে হয় তো গেল! সিনিয়রিটি বাতিল; সাবলীল পরিবেশনে সেই বেশি রোজগেরেরা পেয়ে যাবে সরেস মাছ, আলু বাদ দিয়ে চর্বি ছাড়া পাঁঠার টুকরো, দইয়ের মাথা এবং একটু বেশি আদিখ্যেতা বাড়ির কর্তাটি যদি তেমন বলিয়ে কইয়ে না হন বা স্বভাবত মুখচোরা – দাবিহীন, তো তাঁর কপাল পুড়লসেখানে ভারসই বড়ো খোকা হয়ে যাবে মায়ের নয়নের মণি। বাবাকে পাশে বসিয়েই সে একটু বেশি তোয়াজ পাবে। যেমন কাজে বেরনোর সময় কচি ডাবটি, পথে খাবার জন্যে বাহারি ডিবেতে একটু মুখশুদ্ধি আলাদা করে।

সোহাগ দেখিয়ে গিন্নিরা মুখে বলতেন বটে, ‘ননদে-ভাজে খেয়ে নাও দিকি’ – কিন্তু পছন্দ জানানোর ব্যাপারে ভাজের সুযোগ কোথায় থাকত! ‘মেয়েটা আমার কাঁটা বেছে খেতে পারে না’ তাই সব সময় পেটি। আর বৌ মানেই তো ল্যাজা খেতে ভালোবাসে, তাই না! সমস্ত বৌ এক ইশকুল থেকে ল্যাজার কাঁটা বাছা শিখে, তবে না বিয়ের পিঁড়িতে বসেছে! আর এ ব্যাপারে শিক্ষা, বনেদিয়ানা, জাতি, ধর্ম, এপার বা ওপার কিছুই কাজ করে না। সব বৌদেরই এক কপাল। তার ওপর ননদটি যদি আবার বড়লোকের বৌ হয়ে বাপের বাড়িতে আসে, তখন সে তো আরও আদর পাবেইসাধারণ ঘরে বিয়ে হওয়া অন্যান্য বিবাহিত বোনেদের থেকে তার আসন তখন অনেক উঁচুতে। হোক সে নিজের মেয়ে, বা ভাসুরঝি, বা ভাগ্নি; আসল হল, বড়লোকের বৌ তো! তার পাতে কি যেমন তেমন দেওয়া যায়! গিন্নিরা মান মর্যাদার ব্যাপারে টনকো হয়েই এসব বিচারকে সাবলীলভাবে চালিয়ে যেতেন, লজ্জা সঙ্কোচ সব বিসর্জন দিয়েই। কারণ, তাঁদের মতে এটাই ‘দস্তুর।’ কাউকে তো আর না খাইয়ে রাখছেন না, এ পাতে না দিয়ে ও পাতে দিচ্ছেন – এই যা!  

আরও এক রকম সরপর ছিল। কে কার ‘নেপো’ তার বিচারে।
দশ-বারোজনের সংসারে এসব তো হবেই।
যেমন বড়োমাসির নেপো বড়ো ভাই শঙ্কর। মেজমাসির নেপো তাঁর মেজ ভাই দুলু। সেজমাসি আর নতুনমাসির নেপো হল ছোটমামা বাবু। আমার মায়ের নেপো হল সব ছোট বোনটি। তো এই দশ ভাইবোন যে তাদের ভালবাসার বিচারে সমদর্শী তা মোটেও নয়। শুধু খাবার পরিবেশনেই নয়, গিন্নিপনার নানা ক্ষেত্রেই এসব জাহির করতেন তাঁরা। এই অনুযায়ী ভাগাভাগি হয়ে যেত ভাই বউরাও। বাপের বাড়ি এসে কোন মাসি কোন মামির আলমারিতে পার্সটা রাখছেন, তাতেই ফুটে উঠত চরম সরপরের হিসেব।
আর এ ছিল সব বাড়িতেই, এমনকি আমাদের সংসারেও। ঠাকুমা তো আমার দস্যিপনায় অস্থির হয়ে আমাকে বকে ধমকে, পাখা পেটা করে শোরগোল বাধাতেন। তবু কেন জানি না, সকলের ধারণা ছিল তিনি আমাকে, আমার বোনের থেকে বেশি ভালবাসেন
কারণ, নিজে প্রয়োজনের  থেকে বেশি শাসন করলেও, বাবা মাকে নালিশ করে বকুনি খাওয়াতেন না। আর সেটা পুরিয়ে দিতেন আমাদের নিঃসন্তান বড়োপিসি মানে, ‘মামণি’আমাকে যথেষ্ট ভালবেসেও বোনকে আদর দিয়ে দিয়ে তুলতুলে করে রাখতেন। তবে কলকাতায় থাকা ছোটপিসির মেয়েকে ঠাকুমা যখন তাঁর দেওয়া আদরের নামে ‘ময়না’ বলে ডাকতেন, সে স্নেহ সব কিছুকেই  ছাপিয়ে যেত।

সম্পত্তি, বাড়ি, জমি , গহনা, বাসন – এ সবে কর্তাদের ছাপিয়ে তাঁদের মতামত সামান্যই খাটত, আর খাটলেও সে সুযোগ তো কালেভদ্রে; ভাগের বা উপহারের বা যৌতুকের প্রশ্ন উঠলে। গিন্নিরা তাই এর প্রয়োগ নামিয়ে এনেছিলেন দৈনন্দিনের যাপনে। এ থেকেই বোঝা যেত, কোন গিন্নির মনটি কেমন! তবে বোঝা গেলেও যে তাতে খুব একটা কিছু হেলদোল ঘটত তা নয়। আর এই জন্যেই যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়ার একটি বিবেচ্য কারণ হয়েও হয়তো এটি ক্রমে দেখা দিল।  

দুই পিসি মিলিয়ে পাঁচজন পিসতুতো দাদার মধ্যে আমাদের মা যে সব থেকে বেশি ভালোবাসতেন ভালোদা আর দাদাভাইকে, এটাও লুকনো থাকত না, তাঁর সেই ‘মাইমা আদরে।’ পিসিরা তো নয়ই, বড়দা, রাঙাদা বা ভাইদারাও মনে করত না যে, তাদের ভাগে কিছু কম পড়ল। আর আমার যুক্তিবাদী দাদামশাই তো এই সরপরের একটা বৈজ্ঞানিক ফর্মুলা ভরে দিয়েছিলেন দিদুর মাথায়; দিদুর বানানো নারকেল নাড়ু, ছেলের ঘরের নাতি নাতনিরা মাথাপিছু পাবে এক জোড়া; আর মেয়ের ঘরের নাতি নাতনিরা পাবে চারটে করে, কারণ তারা  রোজ খাচ্ছে না। সেজমামির মায়ের বানানো তেঁতুলের আচার, তিনি নেবেন চামচের মাথা ডুবিয়ে। কিন্তু অন্যের বেলা যাতে কম ওঠে, তাই তাঁর কড়া নজরদারিতে, চামচের ডাঁটি ডুবিয়ে। আর খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে বেস্টটা সব সময়তেই তাঁর – সে ব্যাপারে কোনও আপস নেই। সেটা তেমন দৃষ্টিকটু হত না, কারণ তিনি রাজার মতো বাটি সাজিয়ে নিজের ঘরে নিজের জলচৌকিতে থালা রেখে একাই খেতেন।   

আর দিদুর সরপর আবার উল্টো। সব সময় দুঃখীদের দিকে।
অতিথি, আশ্রিত, ভিখারিদের জন্য তাঁর হাতায় সব সময় বেশি ভালোটাই উঠত। কম অবস্থাপন্নদের পাতে ভালোটুকু দিয়েই তাঁর মন জুড়ত। নিজের ছেলে মেয়েদের থেকেও বাপ মরা ভাসুরপো সানি, বা পুত্রসম সব আশ্রিত দেওর সত্য, শেতল এবং পুঁটুর জন্যেই তাঁর মন কাঁদত। আর মন পড়ে থাকত, কুকুর বেড়ালদের জন্যে। বিশেষ বিশেষ দিনে দিদুকে তাই সরিয়ে রাখা হতো হেঁশেলের ব্যবস্থাপনা থেকে।
এমনও হয়েছে যে, বিয়েবাড়ির ব্যাচ বসার আগেই প্যান্ডেলের বাইরে, পাড়াঘরের অনিমন্ত্রিত দুস্থজনদের সারি দিয়ে খেতে বসিয়ে দিয়েছেন চুপি চুপি। দিদু ঠিক চাবি ঝমঝম গিন্নি ছিলেন না বলেই দাদামশাইয়ের সংসারে অত অত বাড়তি মানুষ অনায়াসে বাড়ি বাড়ি খেলতে পেরেছিল। আর দিদুও দিন কাটাতে পেরেছিলেন, সংসারের টানাপোড়েনে কাতর হয়েও কবিতা লিখে, গান গেয়ে এবং মনের সুখে বাগান করে।   

সেজমামির মায়ের বানানো তেঁতুলের আচার, তিনি নেবেন চামচের মাথা ডুবিয়ে। কিন্তু অন্যের বেলা যাতে কম ওঠে, তাই তাঁর কড়া নজরদারিতে, চামচের ডাঁটি ডুবিয়ে। আর খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে বেস্টটা সব সময়তেই তাঁর – সে ব্যাপারে কোনও আপস নেই। সেটা তেমন দৃষ্টিকটু হত না, কারণ তিনি রাজার মতো বাটি সাজিয়ে নিজের ঘরে নিজের জলচৌকিতে থালা রেখে একাই খেতেন।  

এই হেঁশেল সর্বস্ব জাঁদরেল গিন্নিরা, তাঁদের মনের কথা, ভালোবাসা দেখিয়ে ফেলে সরপরকে এমন প্রকট করে ফেলতেন যে, অপমান গিলে চোখ ফেটে জল আসত অন্যদের। শুধু তো খাওয়া নয়, এই ভয়ঙ্কর পক্ষপাত কাজ ভাগের ক্ষেত্রেও ছিল। দিদুর কাছেই শুনেছি যে, তাঁকে দিয়ে সব সময় লঙ্কা বাটানো হত, কারণ ওই তুলতুলি হাতের তেলো শক্ত না হলে সংসারের বাঁধন আলগা হয়ে যাবে। মা-মরা মেয়ে হলেও দিদুর সৎমা দিদুকে খুব ভালোবাসতেন। রূপবান এবং বড় অফিসার দেখে বিয়ে হয়েছিল এই অপরূপা ক্ষণপ্রভার। বিয়েতে অন্যান্য সামগ্রি ছাড়াও তাঁর গায়ে ছিল একশো ভরি সোনার গয়না। কিন্তু একঘর বিধবা জা এবং ননদদের মধ্যে একমাত্র সধবা হওয়া ছিল তাঁর অপরাধ। তাই ট্রেনিংয়ের ছলে, নানা শাস্তিমূলক কাজের সিলেবাস তাঁর জন্য বরাদ্দ হয়েছিল। এত রাত পর্যন্ত বাড়ির বড়োদের পায়ে তেল মাখাতে হত যে, অপেক্ষা করতে করতে তাঁর বর ঘুমিয়েই পড়ত।
এই ব্যবস্থা দিদিমা কেন, মায়েদের সময় পার করে আমাদের সময়েও দেখেছি। নানা রকম রাতের কাজের ফিরিস্তি এঁটে কিছুতেই শুতে যেতে না দেওয়া। আর ওই রাতের বেলাতেই শুরু হত শাশুড়ি মায়েদের গা ব্যথা, পা ব্যথা, হেঁচকি, গ্যাস, যেটা আবার বৌ ছাড়া আর কারও মালিশেই সারবে না।
এই ফিরিস্তিতে ছিল, কয়েক ডজন নারকেল কোরা, হাতের নরম তেলো পুড়িয়ে, গরম ছেঁই  দিয়ে সমান মাপে নাড়ু পাকানো, পিঠ কোমর ব্যথা করে মোচা, এঁচোড়, থোড় এসব  ছাড়িয়ে কুচনো। ঝুড়ি ঝুড়ি শাক বেছে জিরি জিরি করে কাটা তো প্রি-নার্সারি কোর্স
এসব শুনে আমি তাই দৃঢ় ধারণা করেছিলাম, যে সেকালের হেঁশেল চলত বালিকা শিশুশ্রমিকদের শ্রমেই – যাদের বৌ নামের তকমায় ঠকানো সহজ ছিল। ঘটনাক্রমে যদি কোনও গিন্নি একটু উদারমনা হতেন, তো কচি বৌরা বেঁচে যেত যোগাড়ে হবার হাত থেকে। অন্যথায় ছিল সরপরের চাবিকাঠি। পছন্দের হলে ময়দা ঠাসা, চাল ধোয়া। না-পসন্দ হলেই ভারি ভারি কুটনো বাটনা আর পা কোমরে তেল মালিশ।

বড়োমাসির নেপো বড়ো ভাই শঙ্কর। মেজমাসির নেপো তাঁর মেজ ভাই দুলু। সেজমাসি আর নতুনমাসির নেপো হল ছোটমামা বাবু। আমার মায়ের নেপো হল সব ছোট বোনটি। তো এই দশ ভাইবোন যে তাদের ভালবাসার বিচারে সমদর্শী তা মোটেও নয়। শুধু খাবার পরিবেশনেই নয়, গিন্নিপনার নানা ক্ষেত্রেই এসব জাহির করতেন তাঁরা।

এখনকার সংসারে এসব কমে এসেছে। শাশুড়ি-বৌ দু’জনেই হাত তুলে দিয়েছেন। আনারস, পাকা তাল, নারকেল, মোচা, এঁচোড় এই সব কাটা বাছার ব্যাপারে। ‘তুমিও জানো না, আমিও জানি না’ তো কি! বাজারের মাসি কেটে দেবে, না হলে আছে অর্ডার করার অজস্র আ্যপ। আর আছে বাঙালি খানার বিস্তর সব নামজাদা রেস্তোরাঁ।  

কিন্তু সরপরের এই মজ্জাগত মনোভাব যে তামাদি হয়েছে তা নয়, উপরন্তু বেশ জাঁকিয়ে বসেছে কর্মস্থলে কাজ ভাগের ব্যাপারে। কর্তার ইচ্ছায় হোক বা পদাধিকারীর আপাত অনুরোধে, কার নাম কোন কমিটিতে ঢুকছে তা দেখেই বোঝা যায় ‘সরপর’ ছাড়া প্রশাসন অচল। সুপ্রিম কোর্টের চিফ জাস্টিস নিয়োগ থেকে রাজ্যপালের মনোনয়ন, সবেতেই আছে এই টপকাটপকির নজির। তাই, সেই সব সাবেক গিন্নিদের শাপশাপান্ত না করে, ‘বেটার’ হবে চুপচাপ শুধু দেখে যাওয়া– মুখে অমলিন হাসিটুকু রেখে। আর একটু আধটু লিখে ফেলা যাতে পরম্পরার ভোল বদলের হিসেবটা না গুলিয়ে যায়  

Tags

লাবনী বর্মণ
লাবনী বর্মণ
রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফাইন আর্ট বিভাগে স্নাতকোত্তর পাঠরতা লাবনী পছন্দ করেন কার্টুন, ক্যারিকেচার, পোর্ট্রেট ও ইলাস্ট্রেশন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ শেষ করে লাবনী ইলাস্ট্রেশনকেই পেশা হিসেবে বেছে নিতে চান।

5 Responses

  1. ওয়াও। লেখিকার অন্তদৃষ্টি প্রবল। খুব ভালো লেখা। সংসারের নিভৃত কোনে যে কতবড় রাজনীতি তা সুন্দর ভাবে তুলে আনা হয়েছ।

Leave a Reply