চা বাগিচার কড়চা: পর্ব ১০- পড়া, প্রেম আর খেলা

চা বাগিচার কড়চা: পর্ব ১০- পড়া, প্রেম আর খেলা

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Stories of Tea Estate
চা-বাগানের জীবনযাত্রা ছিল অনাড়ম্বর
চা-বাগানের জীবনযাত্রা ছিল অনাড়ম্বর
চা-বাগানের জীবনযাত্রা ছিল অনাড়ম্বর
চা-বাগানের জীবনযাত্রা ছিল অনাড়ম্বর

ডুয়ার্সের চা-বাগানে দু’ধরনের শ্রমিক, নেপালি ও মদেশীয়া উৎপাদনের কাজে  নিয়োজিত ছিল। এই দুই সম্প্রদায়ের শ্রমিকদের সন্তানেরা ষাটের দশকে প্রাথমিক স্কুলে পড়তে আসত না, এমন নয়। মাঝখানে কোনও বিভাজন-দেওয়াল ছিল না, তবে  মাঝখানে একটা বড়ো ফাঁক রেখে একদিকে ক্লাস হত আমাদের ‘বাবু’ ছেলেমেয়েদের, অন্যদিকে পড়ানো হত সে আমলের ‘কুলি’ ছেলেদের। ওদের মেয়েদের আসতে দেখতাম খুব কম। 

আমাদের জন্যে বেঞ্চ ও ডেস্কের ব্যবস্থা ছিল, ওরা সঙ্গে বস্তা নিয়ে আসত। বস্তা পেতে বই-খাতা বিছিয়ে বসা ছিল ওদের আদত। তবে দুটি নেপালি ও একজন মদেশীয়া ছেলে, তাদের বাবারা ছিল সর্দার কিংবা বৈদার, তারা আমাদের সঙ্গে বাংলা মাধ্যমে পড়ত। ওদের অভিভাবকেরা মনে করতেন বাবুদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বাংলা মাধ্যমে পড়লে, ভবিষ্যতে হাইস্কুলে পড়ার সুবিধা হবে। তখন তো হিন্দি মাধ্যমে পড়ার স্কুল ধারে কাছে ছিল না। কিন্তু খুব বেশিদূর এরা এগুতে পারেনি  সে সময়ে। এমনকী ক্লাস ফাইভ পর্যন্তও যেতে পারেনি। আমাদের  স্কুলে অন্য  প্রান্তে বসা ছাত্রদের পঠনপাঠনের মাধ্যম ছিল হিন্দি। 

আমাদের স্কুলটি ছিল খড়ের ছাউনি দেওয়া বেশ লম্বা একটি দোচালা বাড়ি। কাঠের তৈরি অনেকগুলি জানালা এবং দুটি দরজা। মেঝে পাকা নয়, মাটির। আমাদের মাস্টারমশাই খুব যত্নে রাখতেন স্কুলটিকে। তারও বাঁশের খুটি দিয়ে ঘেরা  সুন্দর ফুলের বাগান ছিল আর স্কুলের সামনে ছিল প্রকাণ্ড সবুজ ঘাসে ঢাকা খেলার মাঠ, দু’দিকে বারপোস্ট-সহ। তবে ছিল না আমাদের জন্য কোনও টয়লেটের ব্যবস্থা, বোধহয় চারপাশে এত জঙ্গল ও চা বাগান থাকায় ওর কোনও প্রয়োজন কর্তৃপক্ষ বোধ করেননি। স্কুলটা বাড়ি থেকে খুব কাছে ছিল না। মাইল দেড়েক পথ হাঁটতে হত চা বাগানের মধ্যে দিয়ে। তার উপর, বাস-লরি চলা পিচের রাস্তা আর মিটারগেজের রেললাইন ডিঙোতে হবে মাঝে।

স্কুল দশটায় বসবে, ওই সময় বাবা-কাকাদের অফিস, মা-কাকিমাদের রান্নাঘর। কে আমাকে নিয়ে যাবে? ঠিক হল, উঁচু ক্লাসের দুই দিদি, কান্তা আর দীপন আমাকে নিয়ে যাবে। প্রথমদিকে বেশ কয়েকদিন এই ব্যবস্থাই চলল। কান্তা আমাদের ঠিক পাশের কোয়ার্টার, সুতরাং আমার উপর তার খবরদারি ছিল বেশি। সে আমাকে হাতছাড়া করত না। আমার পিঠের ব্যাগটির প্রায়ই বকলশ খুলে যেত আর কান্তা সেফটিপিন দিয়ে মেরামত করত। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই মেয়েদের সঙ্গে স্কুলে যাওয়া নিয়ে আমাদের ক্লাসের ছেলেরা হাসাহাসি শুরু করলে আমি কান্তার হাত ছেড়ে পালাই। কিন্তু আজ পর্যন্ত সে আমার হাত ছাড়েনি। আজও নিয়মিত সে আমার খবর নেয়।

Tea Garden
স্কুলে পৌঁছতে মাইল দেড়েক হাঁটতে হত চা-বাগানের মধ্যে দিয়ে

আমাদের মাস্টারমশাই বিভূতিবাবু প্রকৃতপক্ষে একজন মাস্টারমশাই হবার জন্যই জন্মেছিলেন। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতার জোরে তিনি চা-বাগানে সে আমলে চাকরি পেতেই পারতেন। তাতে বোধহয় সুযোগসুবিধা বেশি পাওয়া যেত। তবু শিশুদের নিজের হাতে মানুষ করা ছিল তাঁর নেশা। স্কুলে পৌঁছলেই তিনি জাতীয় সঙ্গীতের সঙ্গে আরো দু’একটি দেশাত্মবোধক গান (যেমন: ‘চল চল চল, ঊর্দ্ধগগনে বাজে মাদল’) আমাদের গাওয়াতেন, নিজেও সঙ্গে গাইতেন। কোনওদিন বেত ধরেননি হাতে। ছবি আঁকতেন চমৎকার, নতুন খাতা-বইয়ে তিনি তাঁর সুন্দর হস্তাক্ষরে আমাদের নাম লিখে দিতেন। সঙ্গে উপরি পাওনা পাখি, পদ্ম, গোলাপ বা অন্য কোনও স্বহস্তে আঁকা ছবি। রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনে তিনি আমাদের দিয়ে সুন্দর একটি অনুষ্ঠান করিয়ে নিতেন। তাঁর সুবিধে ছিল, আমাদের ক্লাসের আমি বাদ দিয়ে আর সকলে, বাবলু, বিশু, শিখা, টুকু সুন্দর গাইতে পারত। আমার অযোগ্যতাও তিনি পূর্ণ করে দিতেন। রবীন্দ্রনাথের উপর যে বক্তৃতা তিনি লিখতেন, সেটি পাঠ করার দায়িত্ব ছিল আমার। তিনি স্কুলের বিভিন্ন কাজের দায়িত্ব ভাগ করে দিতেন আমাদের মধ্যে। কেউ শ্রেণিমন্ত্রী, কেউ উদ্যানমন্ত্রী। সবার উপরে একজন প্রধানমন্ত্রী। তবে মাস্টারমশাইয়ের ইঙ্গিতে স্কুলছুটির ঘণ্টা বাজাবার দায়িত্ব শ্রেণিমন্ত্রীর উপর বর্তাত বলে এই পদটির উপর আমার লোভ ছিল।

স্কুলটি ছিল খড়ের ছাউনি দেওয়া বেশ লম্বা একটি দোচালা বাড়ি। কাঠের তৈরি অনেকগুলি জানালা এবং দুটি দরজা। মেঝে পাকা নয়, মাটির। আমাদের মাস্টারমশাই খুব যত্নে রাখতেন স্কুলটিকে। তারও বাঁশের খুটি দিয়ে ঘেরা  সুন্দর ফুলের বাগান ছিল আর স্কুলের সামনে ছিল প্রকাণ্ড সবুজ ঘাসে ঢাকা খেলার মাঠ, দু’দিকে বারপোস্ট-সহ। তবে ছিল না আমাদের জন্য কোনও টয়লেটের ব্যবস্থা, বোধহয় চারপাশে এত জঙ্গল ও চা বাগান থাকায় ওর কোনও প্রয়োজন কর্তৃপক্ষ বোধ করেননি। 

হিন্দি মাধ্যমে যাঁরা পড়াতেন, তারা বাঙালি ছিলেন না, ছিলেন আদিবাসী ও নেপালি। তাঁদের একজনের নাম পাত্রাস, অন্যজন জুলিয়াস। পাত্রাস দেখতাম পড়াতেন মন দিয়ে। পড়াশুনোর বাইরেও ছাত্রদের ড্রিল করাতেন। অন্যজন জুলিয়াস, তিনি চেয়ারে বসে ঝিমোতেন বেশি। শুনতাম, এই ঝিমনোর পিছনে হাড়িয়ার বিশেষ ভূমিকা ছিল। আলিপুরদুয়ারের আশপাশে খ্রিস্টান মিশনারিরা হিন্দিমাধ্যম স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই ষাটের দশকে দু’য়েকজন আদিবাসী ছাত্র সেখানে পৌঁছনোর যোগ্যতা দেখাত। সেখানে হস্টেলে থেকে যারা পড়াশুনো শেষ করতে পেরেছিল, তারা বড় হয়ে রেল, ফরেস্ট কিংবা সরকারি অন্য কোনও বিভাগে চাকরি পেয়েছিল। তবে সে সংখ্যা ছিল নগন্য। পরবর্তী সময়ে সরকারি উদ্যোগে হিন্দিমাধ্যমে পাকাবাড়ির স্কুল প্রতিষ্ঠা হলে অবস্থা অনেকটাই পালটে যায়।

আমাদের সময়ে প্রাথমিক স্কুলের দায়িত্ব ছিল চা কোম্পানির হাতে। শিক্ষকদের বেতন তাঁরাই দিতেন, স্কুলবাড়ি রক্ষনাবেক্ষণ করতেন তাঁরাই। সরকারি পরিদর্শক তাই স্কুল দেখতে আসতেন না, বদলে আসতেন চা বাগানের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার। এরকম একজন ম্যানেজার, সিং সাহে‌ব বোধহয় তাঁর নাম, একবার এলেন স্কুলে এবং আমাদের সঙ্গে কথা বলে সন্তুষ্ট  হলেন। মাস্টারমশাই সাহস পেয়ে স্কুলের উন্নতির কিছু দাবি রাখলেন। ফলে পরিদর্শনের পর আমাদের স্কুলের বাগানের জন্য একজন মালি জুটে গেল।   

আমি, বিশু ও বাবলু স্কুলে যেতাম একসঙ্গে। স্কুলে যাবার পথটি ছিল অফিস ও ফ্যাক্টরির বুক চিরে। তারপর চা-বাগান ও কুলি লাইন ছাড়িয়ে। নুড়ি ঢালা পথ, ফলে স্কুলে যেতাম ছোট-মাঝারি পাথরদের ফুটবল বানিয়ে খেলতে খেলতে। এ কারণে আমাদের নটি-বয় বুটগুলির সামনের অংশের চামড়া উঠে গিয়ে সাদা হয়েই থাকত। পুজোর নতুন জুতো মাসখানেকের মধ্যেই বিবর্ণ। এদিকে আমরা যখন স্কুলের পথে কুলিলাইনে ঢুকতাম, তখন পথের ধারে এক গাছতলায় একজন বুড়ো মদেশীয়া বসে থাকতেন, বড্ড মজার আর বেজায় হাসিখুশি। বাবুদের ছেলেদের এতটা হাঁটতে হচ্ছে দেখে তিনি হায় হায় করে উঠতেন। যেসব দিন তিনি হাড়িয়া খেয়ে থাকতেন, সে সব দিনে হাফপ্যান্ট পরিহিত বুড়ো মানুষটি নৃত্য সহযোগে তাঁর আর্তি প্রকাশ করে গান ধরতেন, ‘আড়িয়া গাছে টাড়িয়া বাছুর/ লাল টুলটুল লটকে আছে/ বোতলের মধ্যে কালীমাই লাল টলটল করিয়াছে/ বাবা আমাকে একটা সাইকেল কিনিয়া দাও।’ তবে সাইকেল পেতে আমাদের যথেষ্ট বিলম্ব হয়েছিল। আমরা তা পেয়েছিলাম অবশেষে ক্লাস এইটে উঠে।

Coolie Lines
সেকালে চা-বাগানের কুলি লাইন ছিল এমনই জায়গা

আমাদের চা-বাগানের কোয়ার্টারের মধ্যেই দুটি মাঠ ছিল। যখন আমরা প্রাথমিক স্কুলে পড়ি, বড় মাঠে আমাদের স্থান হত না। ওটা ছিল বড়দের দখলে। আমরা ছোটরা ছোট মাঠে রাবারের বলে ফুটবল, ক্রিকেটের সঙ্গে গোল্লাছুট, দাড়িয়াবান্ধা ইত্যাদি খেলতাম। বড় মাঠ থেকে বড়দের গোল হবার কিংবা উইকেট পতনের আকাশ-কাঁপানো উল্লাসধ্বনি আমাদের কানে আসত। তারপর আমাদের দাদারা স্কুল পাস করে যখন কলকাতা, জলপাইগুড়ি কিংবা আলিপুরদুয়ার কলেজে পড়তে চলে গেল, আমরা বড় মাঠের দখল পেলাম। খেলাধুলোর জগতে, ডুয়ার্সের ওই সুদূরে থেকেও আমরা যে সুযোগসুবিধে পেয়েছি সেটা ভারি আশ্চর্যের। সে আমলে কোম্পানি থেকে আমাদের জন্যে ফুটবল, ব্যাডমিন্টন, ভলিবল-সহ আরো অনেক ধরনের খেলাধুলোর সরঞ্জাম দেওয়া হত। ক্লাবের ভেতরে ছিল টেবিলটেনিস, বিলিয়ার্ড, ক্যারম ইত্যাদি। বাইরে ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন,ভলি ইত্যাদি। ব্যাডমিন্টনটা হত রাতে। আলোর ব্যবস্থা হত ক্লাব থেকে।

মাস্টারমশাই বিভূতিবাবু প্রকৃতপক্ষে একজন মাস্টারমশাই হবার জন্যই জন্মেছিলেন। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতার জোরে তিনি চা-বাগানে সে আমলে চাকরি পেতেই পারতেন। তাতে বোধহয় সুযোগসুবিধা বেশি পাওয়া যেত। তবু শিশুদের নিজের হাতে মানুষ করা ছিল তাঁর নেশা। স্কুলে পৌঁছলেই তিনি জাতীয় সঙ্গীতের সঙ্গে আরো দু’একটি দেশাত্মবোধক গান (যেমন: ‘চল চল চল, ঊর্দ্ধগগনে বাজে মাদল’) আমাদের গাওয়াতেন, নিজেও সঙ্গে গাইতেন। কোনওদিন বেত ধরেননি হাতে। ছবি আঁকতেন চমৎকার, নতুন খাতা-বইয়ে তিনি তাঁর সুন্দর হস্তাক্ষরে আমাদের নাম লিখে দিতেন। সঙ্গে উপরি পাওনা পাখি, পদ্ম, গোলাপ বা অন্য কোনও স্বহস্তে আঁকা ছবি। রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনে তিনি আমাদের দিয়ে সুন্দর একটি অনুষ্ঠান করিয়ে নিতেন।

বক্সা ডুয়ার্স টি কোম্পানির অধীনে তখন চারটি চা-বাগান ছিল। এই চার চাবাগানের মধ্যে ফুটবল প্রতিযোগিতা ঘিরে একটা বড় রকমের উৎসব লেগে যেত। এই একটি বিষয়েই চা-বাগানের কঠোর শ্রেণিবৈষম্য একেবারে মুছে যেতে দেখেছিলাম। সাহেবদের জন্য চেয়ার পেতে পৃথক দর্শকাসন করা হলেও ফুটবল দল তৈরি হত শ্রমিক, বাবু ও সাহেবদের নিয়ে। স্বপক্ষ গোল করলে আনন্দ প্রকাশেও বৈষ্যম্য নেই, সবাই উদ্বাহু, অনেকেই মাঠে ঢুকে পড়ত। আদিবাসী শ্রমিকদের কালো দীর্ঘকায় ছাতাটিকে প্যারাস্যুট বানিয়ে মাঠের ভেতরে লাফ দিয়ে পড়া ছিল অনিবার্য। যে বাগান ফাইনালে জয়ী হত, তারা ট্রাকে করে ট্রফি নিয়ে অন্য বাগানগুলি প্রদক্ষিণ করত। আমরা যেবার ফাইনালে পরাজিত, তখন বিজয়ী দল নৃত্যগীত-সহ উৎসব করতে এলে আমরা সচরাচর ঘরের বাইরে আসতাম না।

বোঝাই যায়, এত সব খেলাধুলোর মধ্যে আমাদের স্কুলের পড়াশুনো নিয়ে তেমন বাড়াবাড়ি ছিল না। তখন তো ছিল হায়ার সেকেন্ডারি। তা সেই পরীক্ষার আগে ছাড়া আমাদের ছেলে-মেয়েদের কাউকে মরণপন পড়াশুনো করতে দেখিনি। আমাদের মা কাকিমাদের সঙ্গে আমরাও দেদার গল্প উপন্যাসের মধ্যে বেশ ডুবে থাকতাম। ক্লাবে একটা বেশ সমৃদ্ধ লাইব্রেরি ছিল। নিজেদের মধ্যেও বইয়ের আদানপ্রদান হত খুব। বিয়েতে প্রচুর বই সে আমলে উপহার পাওয়া যেত। হাইস্কুলে গিয়ে পরীক্ষার আগে পড়ে টরে পরের ক্লাসে উঠে যেতাম, খুব বেশি নম্বর না-পাওয়ার জন্য বাবা অফিস থেকে ফিরে রুটিন বকাবকি করে ছেড়ে দিতেন। নিজেও অফিসের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন পরদিন থেকে। আমাদের জীবন পরের ক্লাসে ফের আগের মতোই ফাঁকি দিয়ে চলত।

প্রাথমিক স্কুলের সবাই তো এসে পড়লাম হাইস্কুলে। স্কুলের নাম ‘ইউনিয়ন অ্যাকাডেমি।’ আমাদের বাগানের ডাক্তারবাবু  হরকুমার সান্যাল তার প্রতিষ্ঠাতা। স্কুলের সেক্রেটারি হিসেবে তিনি রোজ দুপুরে একবার সাইকেল নিয়ে স্কুলে আসতেন। হেড স্যারের ঘরে বসতেন। দেখে আমাদের বেশ গর্ব হত। যাঁকে এত সম্মান দেওয়া হচ্ছে তিনি আমাদের বাগানের ডাক্তারবাবু, আমরা তাঁকে জ্যাঠামশাই বলে ডাকি। আমাদের স্কুলের মোট তিনটে বিল্ডিং ছিল। স্কুলে ঢুকেই বাঁ দিকে হলুদ রঙের পাকা বিল্ডিং, সেখানে ছেলেদের ক্লাস নাইন থেকে ইলেভেন। ডানদিকে হেডমাস্টার মশাইয়ের ঘর-সহ কাঠ ও টিনের পরপর ক্লাস ঘর। ছাত্রদের সেভেন, এইট আর তারপরে মেয়েদের ফাইভ থেকে ইলেভেন। আর একটা চার কামরার দুর্দশাগ্রস্ত বাড়ি ছিল মাঠের ওপারে, পঞ্চম শ্রেণির জন্য। এদের চালু নাম ছিল যথাক্রমে, রাশিয়া, হিন্দুস্তান ও পাকিস্তান। এখন বুঝি, সবচেয়ে বিশ্রিটিকে পাকিস্তান বলার স্বভাব আমাদের নতুন কিছু নয়। আর শ্রেষ্ঠ সুন্দরটি সমাজতান্ত্রিক দেশ, এটিও তখন ছিল চালু ধারণা।

বক্সা ডুয়ার্স টি কোম্পানির অধীনে তখন চারটি চা-বাগান ছিল। এই চার চাবাগানের মধ্যে ফুটবল প্রতিযোগিতা ঘিরে একটা বড় রকমের উৎসব লেগে যেত। এই একটি বিষয়েই চা-বাগানের কঠোর শ্রেণিবৈষম্য একেবারে মুছে যেতে দেখেছিলাম। সাহেবদের জন্য চেয়ার পেতে পৃথক দর্শকাসন করা হলেও ফুটবল দল তৈরি হত শ্রমিক, বাবু ও সাহেবদের নিয়ে। স্বপক্ষ গোল করলে আনন্দ প্রকাশেও বৈষ্যম্য নেই, সবাই উদ্বাহু, অনেকেই মাঠে ঢুকে পড়ত। 

কৈশোর-যৌবনের সন্ধিক্ষনের কথা চলতে থাকলে সেখানে প্রেমের বিষয়টি উহ্য থাকা অনুচিত। আমরা বেশ কয়েকজন ছেলেমেয়ে একসঙ্গে বড় হয়ে উঠেছিলাম চা বাগানে। একসঙ্গে সেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাশাপাশি বেঞ্চে বসা, রস-কষ-শিঙাড়া-বুলবুলি খেলা, রবীন্দ্র জয়ন্তীর মহড়া দেওয়া, এইভাবে মূলত প্রবল বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল ছেলেমেয়েদের মধ্যে। কিশোর বয়সে দু’ একজনের মধ্যে পরস্পরের প্রতি প্রেমও নিঃশব্দ চরণে এসেছিল। সে প্রেমগুলি মিথ্যেও ছিল না, কিন্তু তার পরিনতি পরিণয় পর্যন্ত বেশিরভাগই গড়ায়নি। আমাদের একটিমাত্র বন্ধু-বান্ধবী শুধু জোট বাঁধতে পেরেছিল পরবর্তী জীবনে। 

দূরে নীল পাহাড়, তারপর গাছগাছালির অস্পষ্ট বন, চা-বাগান, মিটার গেজ রেলপথ, পিচের রাস্তা ইত্যাদি পশ্চিমে রেখে আমাদের স্কুল ‘ইউনিয়ন অ্যাকাডেমি’র অবস্থান। প্রেমের উন্মেষের পক্ষে যথেষ্ট উপযুক্ত পরিবেশ। স্কুলটিও ‘কো-এড’। কিন্তু দুঃখের ঘটনা হল এখানেও প্রেম খুব ডানা মেলতে পারেনি। তার একটা কারণ, ‘কো-এড’ হলেও মেয়েদের ক্লাস ছিল আলাদা, একটু দূরে, আলাদা বাড়িতে। জাতীয় সঙ্গীত গাইতাম একসঙ্গে। কিন্তু ‘জনগণ’-র পরেই  গণবিচ্ছেদ হত আমাদের। ফলে কথা বলবার বা মন দেওয়া নেওয়ার সুযোগ ছিল না। 

Tea estates
চা-বাগানের এমন নির্জনতা থাকলেও সেখানে বাবুদের ছেলেমেয়েরা প্রেম করতে পারত না

তদুপরি সেই সত্তর দশকের প্রথম দিকেও, ছেলেমেয়েদের সহজ স্বাভাবিক মেলামেশা বড়দের কাছে অনুমোদিত ছিল না। ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে দলবদ্ধ হয়ে স্কুল থেকে একসঙ্গে ফিরলে তাও ঠিক আছে, কিন্তু একটি মেয়ে হেঁটে  ফিরছে একা, তার সঙ্গে যদি ছেলেরা কেউ সাইকেল ঠেলতে ঠেলতে তার সঙ্গ ধরত, তো এই খবর আরো পল্লবিত হয়ে অভিভাবকদের কাছে পৌঁছে যাবেই। এরই মধ্যে যখন আমাদের বন্ধুদের মধ্যে কারও কোনও মেয়েকে ভালো লাগতে শুরু করত, সে খবর তাকে পৌঁছে দেওয়াই ছিল এক কঠিন পরীক্ষা। তখন প্রয়োজন  হত একজন পিওনের, প্রেমপত্র পোঁছে দেবার জন্য। মহিলা পিওন অবশ্যই। সেক্ষেত্রে সেরা পছন্দ হল পছন্দের মেয়েটির কোনও সহপাঠিনী, যে প্রেমিকের নিজের চা-বাগানের বাসিন্দা। তাকে ভজিয়ে ভাজিয়ে চিঠি পৌঁছে দিতে রাজি করানো হত।

এইভাবে যদিবা প্রেম দানা বাঁধত কিছুটা, দ্বিতীয় সমস্যা বিরাট হয়ে দেখা দিত। দু’জনে একা হবে কী করে? ২০/২৫ মাইল দূরে আলিপুরদুয়ারের আগে কোনও ‘রেস্টুরেন্ট’-এর দেখা মেলে না। এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা নীতিপুলিশের উপস্থিতিতে হ্যামিল্টনগঞ্জের সিনেমা হলে দু’জনে যে নির্জনতা খুঁজে নেবে, তার উপায় নেই। গোপনীয়তার মালিকানা দুষ্প্রাপ্য। প্রশ্ন উঠতে পারে, এত বিস্তৃত ও নির্জন চা-বাগান থাকতে নির্জনতার অভাব বিশ্বাসযোগ্য হয় কী করে? কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি কথা হল, যে আমি অন্তত আমাদের কোনও বন্ধু-বান্ধবীকে এই আড়ালের সুযোগ নিতে দেখিনি। মদেশীয়াদের বন্য বলা ঠিক হবে না হয়তো, কিন্তু ‘বন্যেরা বনে সুন্দর’ এই বাণী সার্থক করে তারাই সেখানে বৃন্দাবন রচনা করত।

আমাদের চাবাগানের বান্ধবীরা তো চলে গেল মেয়েদের বিল্ডিংয়ে, আর এমনই মন্দ আমার কপাল যে আমার প্রিয় বন্ধু,বাবলু ও বিশু ‘এ’ সেকশনে ঠাঁই পেলেও আমাকে ঠেলে দিল ‘বি’ সেকশনে। ওপরের ক্লাসে ফেলটুশ ছেলেদের ‘বি’ সেকশনে দেওয়া হত। কিন্তু এখানে তখনও পর্যন্ত কোনও ক্লাস হল না, আমার অযোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ না দিয়েই কেন আমার ‘বি’ সেকশনে ঠাঁই হল, ভেবে পেলাম না। প্রথমে মনখারাপ হয়েছিল, কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই দেখলাম যে ‘বি’ সেকশনও মন্দ না। সেখানেও বেশ মজাদার ছেলেপুলে রয়েছে। বেশিরভাগ ছেলেরাই এসেছে আমার মতো বিভিন্ন চা-বাগান থেকে, কয়েকজন আছে হ্যামিল্টনগঞ্জ থেকে। 

পড়াশুনো বাদে তারা আমাদের তুলনায় সব বিষয়েই অনেক ওস্তাদ। জীবনের গোপন নানা দিগন্ত তারা আমার সামনে খুলে দিতে লাগল। আমার সঙ্গে অনেকেরই খুব ভাব হয়ে গেল। তারমধ্যে একজন, স্যামুয়েল, সে আমার পাশের বাগানেরই ছেলে, মদেশীয়া, ধর্মে খ্রিস্টান। সে হাসছে সবসময়। এরকম হাসিমুখের ছেলে কমই দেখা যায়। পড়াশোনায় চলনসই হলেও তার আসল ওস্তাদি ছিল ফুটবলে। প্রথম ম্যাচে আমরা যে ‘এ’ সেকশনকে হারিয়ে দিলাম তাঁর সিংহভাগ কৃতিত্ব ছিল স্যামুয়েলের। ‘এ’ সেকশন সম্পর্কিত হীনম্মন্যতা ওই জয়ের পর আমার কেটে গিয়েছিল। কিছুদিনের মধ্যেই স্যামুয়েল আমার খুব কাছের বন্ধু হয়ে গেল। ফুটবলে সে ছিল আমাদের মধ্যে সেরা, তবু তাকেই একদিন আমরা খেলার মাঠে আঘাত দিয়ে ফেললাম। চা বাগানের শ্রেণি-বৈষ্যম্যের এটা ছিল এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত।

Plucking tea
সেকালের চা-বাগানে পাতা তোলার কাজ

তখন আমরা ক্লাস সেভেন বা এইটে পড়ি। স্যামুয়েলদের চা-বাগানের সঙ্গে একদিন আমাদের ফুটবল ম্যাচ হবে ঠিক হল। আমরা গেলাম ওদের মাঠে খেলতে। দেখলাম মাঠে স্যামুয়েল উপস্থিত। আমি যখন ভাবছিলাম, যে আজ আমাকে আমার ক্লাসের বন্ধুর বিপক্ষে খেলতে নামতে হবে, তখন দেখি অদ্ভুত এক কারণে তার টিমে সুযোগ পাওয়া নিয়ে আপত্তি উঠল। আমাদের বাগানের ছেলেরা বলল, এটা বাবুদের বাড়ির ছেলেদের খেলা, সেখানে ও কেন খেলতে পাবে? আমাদের বিপক্ষের ছেলেদের কাছেও এ যুক্তি যথাযথ মনে হল। তারাও কোনও আপত্তি করল না। সুতরাং সে রইল মাঠের বাইরে। আমার খুব খারাপ লাগল। ভাবলাম ও বুঝি রাগে-দুঃখে চলে যাবে। কিন্তু ও চলে গেল না, মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে খেলা দেখতে লাগল।

সেদিন আমরা এক গোলে পিছিয়ে পড়লাম, গোল আর শোধ দিতে পারছিলাম না। হঠাৎ লক্ষ করি, স্যামুয়েল মাঠের বাইরে থেকে আমার নাম ধরে চিৎকার করছে, ‘অপূর্ব জোর করো, জোর করো।’ ও আমাদের দলকে সমর্থন করছে দেখে প্রতিপক্ষ বাগানের ছেলেরা ক্ষুব্ধ হল, তবু সে আমাকে একইভাবে উৎসাহ দিতে লাগল। সবার মতো আমিও ভেবেছিলাম যে ওকে দলে নেবার ব্যাপারে ওর বাগানের ছেলেরা ওর হয়ে কথা বলেনি বলে স্যামুয়েল আমাদের সমর্থন করছে। কিন্তু পরেরদিন স্কুলে গিয়ে ওর সঙ্গে কথা বলে আমি অবাক। ও নাকি বন্ধুর হেরে যাওয়া মানতে পারছিল না, তাই আমাকে উৎসাহ দিচ্ছিল। নিজের বাদ পড়াটা ওর কাছে স্বাভাবিক ঘটনা। লেবার লাইনের ছেলে আবার বাবুদের দলে খেলতে পারে নাকি?

 

 *ছবি সৌজন্য: Nomadic Weekends, Wikimedia Commons

Tags

2 Responses

  1. যদিও ডুয়ারস আর আসামের চা বাগানের মধ্যে কতগুলো পার্থক্য ছিল আর আছে , মোটামুটি জীবন যাত্রা আর লোকেদের চলন চালন প্রায় একই । আমরা আসামে মদেশিয়া এবং বিহার, সিঙভুম, মানভুম, জঙ্গল মহলের থেকে চলে যাওয়া ( চলে যাওয়া বলা অর্ধ সত্য হবে, তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া ) সাঁওতাল, ভীল,কূরমী, মুনডা, টুডু, আরো কতো কি , মনে পড়ে না, এদের সাহেব আর মুহূরী রাত লোভ দেখিয়ে, ফুসলিয়ে আসাম দেশে আনতো ।এটার জন্য বৃটিশ রা আসাম বেঙ্গল রেল লাইন পাতলো। সুবিধা হবে বুঝে Assam Bengal Trading Corporation ( ARTC) করল। মহাত্মা গান্ধী একবার আসামের কলেরা পীড়িত শ্রমিক আর লোকদের সরিয়ে নিয়ে বাঙলা এবং নানা জায়গায় স্থানান্তরিত করার জন্য বৃটিশ সরকার কে অনুরোধ করেছিলেন, তারা বলেছিল এই রেল‌ চা শ্রমিকদের জন্য এবং অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছিল। জীবনযাপন মোটামুটি এক, তবে ঐ প্রেম ভালোবাসা পালিয়ে নিয়ে বিয়ে ,,, শেষ পর্যন্ত বাগানের এ্যসিসট্যানট ম্যানেজার কে ঠেকে ফয়শালা।কারন, বিয়ে মানেই বংশবৃদ্ধি , এবং লেবার বাড়লো। কোন লেবার কে ছুটি দেওয়া হতো না। অসুখ হলে বাগানের হসপিটাল আছে। বাঙালি ডাক্তার বাবু আছেন তো। লেবার দের “তলব” বা ” দরমহা হতো ১০/১৪ দিন পর। আর তলবের দিন বসতো হাট । সঙ্গে শহর থেকে আসা সিনেমা মেশিন এ হিন্দি ছবি।হাড়িয়া মদের গন্ধে মাত হতো বাগান। এ আমার দেখা।

  2. কত কথা, কত ব্যথা, আরো কত কিছু। চা বাগানের শৈশব বা কৈশোরের রঙিন স্মৃতি। মনে পড়ে গেল কত কিছু।
    অপু, দুর্গা পুজো আর কালী পুজোর মেলার অনুষঙ্গ না থাকলে চা বাগানের ছেলেবেলার প্রেম পূর্ণতা পাবেনা। একটু ভেবে দেখিস।

Please share your feedback

Your email address will not be published.

SUBSCRIBE TO NEWSLETTER

Resize-+=

Please share your thoughts on this article

Please share your thoughts on this article

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.

  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.

  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.

  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).

  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

SUBSCRIBE TO NEWSLETTER

Please login and subscribe to Bangalive.com

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com