(Color Change Of Friendship)
‘কিন্তু সেটিই শেষ কথা নয়। সেটি ট্র্যাজেডিও নয়। সে মহৎ কিছু করছে না, তার দারিদ্র যাচ্ছে না, তার অভাব মিটছে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও সে জীবন বিমুখ হচ্ছে না! সে পালাচ্ছে না, এস্কেপ করছে না, সে বাচঁতে চাইছে! সে বলছে বাচাঁর মধ্যেই সার্থকতা, তার মধ্যেই আনন্দ। He wants to live…’
‘অপুর সংসার’-এর এই ঐতিহাসিক সংলাপটি প্রণব বা পুলুকে বলছিল অপু। অনিল আর প্রণব ছাড়া কলেজ লাইফে আর কেউ বন্ধু ছিল না তার। অপুর সংলাপ মনে থাকলেও, সেই পুলুকে হয়তো বহু বাঙালিরই মনে নেই। অপুর নানা কাজে সায় দিয়েছে সে। গভীর রাতে রাজপথে হাঁটতে হাঁটতে বন্ধুর জীবনদর্শন শুনেছে। বন্ধুত্বে নিহিত ভালবাসার দায়ও বারবার স্বীকার করেছে। অপুও তেমন স্বীকার করেছে অপর্ণাকে রক্ষার দায়। পুলুরই তো মামাতো বোন ছিল অপর্ণা। বন্ধুর বোনের বিয়েতে হইহুল্লোড় আর ছুটি কাটানোর ইচ্ছে নিয়ে পুলুর মামার বাড়ি গিয়েছিল অপু। সেখানে গিয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হবে, তা কি দুঃস্বপ্নেও ভেবেছিল?
আরও পড়ুন: নহি যন্ত্র, মোরা AI
বিভূতিভূষণ লিখছেন— ‘আকাশ থেকে পড়িলেও অপু এত অবাক হইত না।’ অপর্ণাকে দেখে অপুর ভাল লেগেছিল ঠিকই। মনে পড়ে গিয়েছিল একটা ইংরেজি উপন্যাসের লাইন— ‘Do they breed goddesses in slocum magna?’। কিন্তু, যে কোনও বন্ধন থেকে মুক্তি চেয়েছিল সে। শেষমেশ বন্ধুত্বের বন্ধনই যেন অপুকে সংসারে বাঁধল। পুলু না থাকলে বুঝি দেখা হত না অপর্ণার ‘অনুশোচনা’ কাটিয়ে ওঠার মধুরতম দৃশ্য। দেখা হত না একটা ঘর আর একটা ব্যালকনির দাম্পত্য। সর্বোপরি দেখা হত না কাজলের সঙ্গেও; যে শুধু অপুর নয়, গোটা ট্রিলজির উত্তরাধিকার।
অপু-পুলুর থেকেও বেশিক্ষণ রাজপথে হেঁটেছিলেন সুনীল-শক্তি-শরৎ-সন্দীপন। কলকাতার রাত্রিশাসক।

কৃত্তিবাসের পাতায় জন্মানো বন্ধুত্ব বাংলা সাহিত্যের খনি হয়ে উঠেছিল। একের পর এক অসামান্য লেখকদের পেয়েছিল সেই সময়ের বঙ্গদেশ। শেষ পর্যন্ত বন্ধুত্ব একইরকম থাকেনি। কৃত্তিবাস বন্ধ হল। ছড়িয়েছিটিয়ে গেল সবাই। ব্যস্ততা কেড়ে নিল অনেকগুলো আড্ডা আর বিকেল।
কিছুটা অভিমান করেই ‘আমাদের সামান্য কথা’য় শক্তি লিখলেন, ‘শহরের উত্তর দিকটায় আমরা কেউ রাজনীতি ছেড়ে, কেউ ইস্কুল-কলেজ ঘুচিয়ে, কেউ মধ্যমগ্রাম ত্যাগ করে ‘কৃত্তিবাস’ পতাকার নিচে এসে দাঁড়ালুম। যে যেমনটা লিখতে পারে, পদ্যে যতদূর পরীক্ষা করতে সাহস পায়— তাদের জন্যে ‘কৃত্তিবাস’।… আমরা বুড়ো হয়েছি। আমার মাথায় একরাশ কালো-পাকা চুল, সুনীলের হাতের লোম, বুকের চুল শাদা। শরৎ দিল্লিতে বাড়ি বদলে স্ত্রীপুত্র ছাড়া নির্বান্ধব হাউস-খাসে, উৎপল বিলেতে– অনেকে কলকাতায় থেকেও একার সিংহাসনে। সমরেন্দ্র, প্রণব, মোহিত, শঙ্কর, তারাপদ, কবিতা, আনন্দ, সুধেন্দু প্রভৃতির সঙ্গে কালেভদ্রে দেখা হয়।’ শক্তিজায়া মীনাক্ষী চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, ‘একা হয়ে যাওয়ায় শক্তির প্রবল আপত্তি ছিল। যে বাড়ি না ফিরে, ক্ষণে ক্ষণে বন্ধুর বাড়ি চলে যায়, তার কি একা থাকা মানায়?’
গুপীর গান শুনলেই পালিয়ে যাচ্ছে কানু কাইনের খদ্দের। মাঠ থেকে গরুরা দড়ি ছিঁড়ে পালাচ্ছে। গান গাওয়ার জন্যই তো গুপীকে তাড়িয়ে দিল গোটা গ্রাম। বাঘারও একই হাল হল। হাতে মিষ্টির হাঁড়ি ধরিয়ে মিষ্টি কথায় বিদায় করল গ্রামবাসীরা। বনের ভিতর ভাগ্যিস তাদের দেখা হল।
যোগাযোগ কমলেও কিছু বন্ধুত্ব হারিয়ে ফেলা দুরূহ। একরাশ সাফল্যের পাশাপাশি বহু ব্যর্থ স্বপ্ন নিয়েও শেষমেশ বেঁচে থাকে সেই সব বন্ধুত্ব। বেঁচে থাকে বলেই শক্তির প্রয়াণের পর সুনীল লেখেন, ‘…সমস্ত শব্দের মাত্রা ও ছন্দ হঠাৎ হারিয়ে যায়, সাদা পৃষ্ঠা জ্বলজ্বল করে/ শক্তি নেই, কবেকার সেই দুজনে মিলে লেখা লেখার খেলা হঠাৎ শেষ হয়ে গেল…’
বন্ধুত্ব কখনও বাউন্ডুলে করে, আবার কখনও বেঁধে ফেলে জীবনে। যেমন বেঁধেছিল গুপী আর বাঘাকে। গ্রামে থাকতে কীই বা জীবন ছিল গুপীর! তার গান শুনলেই পালিয়ে যাচ্ছে কানু কাইনের খদ্দের। মাঠের গরুরা দড়ি ছিঁড়ে পালাচ্ছে। গান গাওয়ার জন্যই তো গুপীকে তাড়িয়ে দিল গোটা গ্রাম। বাঘারও একই হাল হল। হাতে মিষ্টির হাঁড়ি ধরিয়ে মিষ্টি কথায় বিদায় করল গ্রামবাসীরা।

বনের ভিতর ভাগ্যিস তাদের দেখা হল। দেখা হল বলেই ভূতেরা তাদের যুগলবন্দী শোনার সুযোগ পেল। সে যুগলবন্দী ভালও লাগল অশরীরীদের। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী আমাদের জানালেন, ভূতের রাজার ছেলের বিয়েতে গুপী-বাঘাকে একসঙ্গে বায়না করে নিয়ে গিয়েছিল ভূতের দল। শুধু গুপীর গান বা বাঘার ঢোল শুনলে কি ভূতেরা খুশি হত? না, ঠিকমতো জমত ভূতুড়ে রাজপুত্রের বিয়ে?
রাজার ছেলের বিয়েতে যেমন শুধু গান বা শুধু ঢোলের বাদ্যি শুনতে ভাল লাগে না, তেমনই পড়তে ভাল লাগে না একা অজিতের গল্প। বাবার ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স বিপুল বলে তার ইচ্ছে, বাকি জীবনটাও সাহিত্য করে কাটিয়ে দেবে। বিয়ের চক্করে না পড়ে, তাই চিনেবাজারে মেস ভাড়া করে একাই থাকছিল। মেসে থাকতে থাকতেই একদিন অতুলচন্দ্র মিত্রের সঙ্গে আলাপ। যুবকটি এসেছিল ঘর খুঁজতে। এদিকে মেসে কোনও রুম ফাঁকা নেই। মেস মালিক ডাক্তারবাবু ভাগিয়েই দিচ্ছিলেন। শেষ মুহূর্তে অজিতই অতুলকে নিজের ঘরে থাকতে দিল। সেদিন রুম শেয়ার না করলে, আজীবন কি এত গল্পের জোগান পেত অজিত? পরে জানা গেল, ওসব অতুল-ফতুল ভুয়ো নাম। যুবকটির আসল নাম ব্যোমকেশ বক্সী। ওরফে সত্যান্বেষী।
শঙ্কর আর আলভারেজ বন্ধু না হলে, বাঙালির বোধহয় চাঁদের পাহাড় দেখা হত না। আলভারেজ শঙ্করের বাবার বয়সি হলেও দুজনের মধ্যে গড়ে উঠেছিল অসমবয়সি বন্ধুত্ব।
আচমকা বন্ধুত্ব যেমন অপরাধজগতে নিয়ে গিয়ে ফেলতে পারে, তেমনই ফেলে দিতে পারে গভীর অনিশ্চয়তায়। ঠিক যেভাবে পড়ে গিয়েছিল শঙ্কর। সেদিন বেলা তিনটে নাগাদ মাছ ধরে ফিরছিল। কড়া রোদ। হঠাৎ কানে এল অস্ফুট কণ্ঠস্বর। আওয়াজ লক্ষ করে কিছুটা এগিয়ে যেতেই দেখল, ইউকা গাছের নিচে বসে আছে একজন ইউরোপিয়ান। পরে সেই লোকটা গল্প শোনাল এক অদ্ভুত গুপ্তধনের। যে গুপ্তধন লুকোনো আছে রিখটার্সভেল্ড পর্বতমালার কোনও এক নদীর গুহায়। আলভারেজকে সেদিন স্টেশন ঘরে এনে সুশ্রুষা না করলে, এক ‘ভয়ঙ্কর সুন্দর’ অ্যাডভেঞ্চারের আমরা যেতাম কীভাবে?
শঙ্কর আর আলভারেজ বন্ধু না হলে, বাঙালির বোধহয় চাঁদের পাহাড় দেখা হত না। আলভারেজ শঙ্করের বাবার বয়সি হলেও, দুজনের মধ্যে গড়ে উঠেছিল অসমবয়সি বন্ধুত্ব। তাই তো আলভারেজের মৃত্যুর পর বিভূতিভূষণ লিখলেন, ‘ওঃ সে কি ভীষণ রাত্রি! যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন এ রাত্রির কথা সে ভুলবে না।…সম্মুখে বন্ধুর মৃতদেহ।’

বন্ধু বলতে যখন সত্যিই কেউ থাকে না, তখন একাকীত্বের দোসর হয় ভয়। সেই ভয়, আশঙ্কা, অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা থেকেই কি জীবনানন্দ দাশ লিখলেন ‘সফলতা নিষ্ফলতা’? নিখিল ও বাণেশ্বরের মোড়কে টেনে আনলেন নিজের ও বুদ্ধদেব বসুর ভিতরকার টানাপোড়েন? জীবনানন্দ তখন শুধুই নিন্দা ও সমালোচনার শিকার। পাঠক, সাহিত্যিক কেউই ছাড়ছে না তাঁকে। তার মধ্যেই কল্লোল পত্রিকায় ‘নীলিমা’ কবিতাটা ছাপা হল। তরুণ বুদ্ধদেব ছুটে গেলেন অগ্রজ কবির সঙ্গে আলাপ করতে।
তারপরই বুদ্ধদেব বসুর ‘প্রগতি’ ও ‘কবিতা’ পত্রিকায় একে একে প্রকাশিত হল জীবনানন্দের দুর্ধর্ষ সব কবিতা। অগ্রজ কবির পাশে অনুজ কবির বন্ধুসম উপস্থিতি ধাঁচ বদলে দিল বাংলা কবিতার। সেই জীবনানন্দের ‘সফলতা নিষ্ফলতা’ উপন্যাস কেন এই অনুজ কবির এই পাশে থাকা অস্বীকার করতে চাইল?
বন্ধুত্বের অভাবে যেমন শূন্যতা, বন্ধুত্বের উপস্থিতিতে তেমনই কখনও কখনও একরাশ অস্বস্তি। বেকারত্বের জ্বালায় দুই বন্ধুর একজন তাই বাসস্ট্যান্ডের বাউন্ডুলে, অন্যজন বড়বাজারের দালাল। গাড়িতে পাশে বসে থাকা মেয়েটির পরিচয় জেনে কুঁকড়়ে যায় সোমনাথ। ডিল ফাইনাল করতে শেষমেশ সুকুমারের বোনকে ‘ভেট’ দিতে হল তাকে। পাপবোধের উপর যেন কেউ বিছিয়ে দিল একরাশ অস্বস্তি বা গ্লানি।
কেতকী কুশারী ডাইসন অবশ্য উপন্যাসটির সম্পাদক ভূমেন্দ্র গুহর এই ‘দাবি’ মানতে নারাজ। ‘তিসিডোর’-এ কেতকী লিখলেন, বাণেশ্বরকে বুদ্ধদেব বসু বলে দেখানোর ব্যাপারে ভূমেন্দ্র গুহ মাত্রাতিরিক্ত জোরারোপ করেছেন। এই দাবি যথোপযুক্ত নয়। এসব তর্কবিতর্ক পেরিয়েও অবশ্য জীবনানন্দ দাশের জীবনে বন্ধুহীন অধ্যায়টা প্রকটই থেকে যায়। যে সময় তাঁর রামযশ কলেজের চাকরি গেল, ভাইয়ের টাকাতেই দিন গুজরান হল, লেখার জন্য পাঠক ও সাহিত্যিক মহল থেকে ধেয়ে এল তাচ্ছিল্য, যে কর্মহীন দীর্ঘ পাঁচ বছরে মাত্র একটি কবিতা লিখলেন, সে সময়টা কি ভীষণভাবে মনের মতো কোনও বন্ধু খুঁজছিলেন কবি?
বন্ধুত্বের অভাবে যেমন শূন্যতা, বন্ধুত্বের উপস্থিতিতে তেমনই কখনও কখনও একরাশ অস্বস্তি। বেকারত্বের জ্বালায় দুই বন্ধুর একজন তাই বাসস্ট্যান্ডের বাউন্ডুলে, অন্যজন বড়বাজারের দালাল। গাড়িতে পাশে বসে থাকা মেয়েটির পরিচয় জেনে কুঁকড়়ে যায় সোমনাথ। ডিল ফাইনাল করতে শেষমেশ সুকুমারের বোনকে ‘ভেট’ দিতে হল তাকে। পাপবোধের উপর যেন কেউ বিছিয়ে দিল একরাশ অস্বস্তি বা গ্লানি।

মানুষ যদি রং বদলাতে পারে, তবে বন্ধু কেন নয়? প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময় বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরেই তো ‘অতসীমামী’ গল্পটা লিখলেন কিংবদন্তি সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। তারপরেই তাঁর জয়যাত্রা শুরু। ওই গল্পটা না লিখলে হয়তো বাংলা সাহিত্যের ভীষণ ক্ষতি হত। কিন্তু, গল্পটা লিখে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কি খুব লাভ হল? পড়াশোনা লাটে তুলে, চাকরিবাকরি না করে, ফুল টাইম সাহিত্যপ্রেম কী দিল তাঁকে? মৃগী রোগ, মানসিক অসুস্থতা, অসুস্থ বাবা, দারিদ্র্য, আধপেটা জীবন, মদ-বিড়ির নেশা, জোড়াতালি দেওয়া খাট, বস্তির ঘর ছাড়া আর কী পেলেন তিনি? বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা, সম্মানের পাশাপাশি প্রকাশকের ঘর থেকে ঠিকমতো টাকা পেলে ৪৮ বছরেই দাঁড়ি টানত না তাঁর কলম।
মনেপ্রাণে কমিউনিস্ট হলেও দল থেকে আশানুরূপ আর্থিক সাহায্য পাননি। সরকারের থেকে সাহায্য নিতে চাননি। রোগে ভরা শরীর নিয়ে তারপরেও লিখে গিয়েছেন একের পর এক কালজয়ী সাহিত্য। এমনই কালজয়ী যে, মৃত্যুর পর একটা লরিতে ধরল না শ্রদ্ধার্পিত ফুল। দরকার পড়ল আরেকটা লরির। সেই প্রথম বোধহয় খাটের বদলে পালঙ্কে শুয়েছিলেন মানিক। মরদেহের উপর রাখা ফুলের ভারে চিড় ধরে গিয়েছিল পালঙ্কের একটি পায়ায়। অথচ আগের দিন হাসপাতাল যাওয়ার জন্য একটা ভাল অ্যাম্বুলেন্সও জোটেনি তাঁর।
শ্রেণির তফাত নিষ্পাপ ছোট্ট শিশুদেরও বন্ধু হতে দেয় না। ‘টু’-তে বড়লোক ছেলেটি তাই গরিব ঘরের ছেলেটির খেলা নষ্ট করেই সুখ পায়। ওটাই তার খেলা, বা বন্ধুত্বের ধরন! বাঁশির সুর ঢাকা পড়ে যায় খেলনা ট্রাম্পেটের বেসুরে। এয়ার গানের তাকে মরে যায় ফুরফুরে ঘুড়িটা।
কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় অনুযোগ করেছিলেন, ‘বৌদি এমন অবস্থা, আগে টেলিফোন করেননি কেন?’ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্ত্রী কমলা দেবীর উত্তর ছিল, ‘তাতে যে পাঁচ আনা পয়সা লাগে ভাই।’ মৃত্যুর পর দিন এত ফুল কেনা গেল। অথচ মৃত্যুর আগের দিন, পাঁচ আনা পয়সা দেওয়ার মতো একজনও ছিল না। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতাটা তাই ‘বন্ধু’দের উদ্দেশ্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বগতোক্তি বলেও ধরে নেওয়া যায়— ‘ফুলগুলো সরিয়ে নাও,/ আমার লাগছে/ মালা জমে জমে পাহাড় হয়/ ফুল জমতে জমতে পাথর।’
পৃথিবীতে সবাই সবার বন্ধু হতে পারে। চাইলেই সম্ভব। তবে বাধা প্রচুর! যেমন শ্রেণির তফাত নিষ্পাপ ছোট্ট শিশুদেরও বন্ধু হতে দেয় না। ‘টু’-তে বড়লোক ছেলেটি তাই গরিব ঘরের ছেলেটির খেলা নষ্ট করেই সুখ পায়। ওটাই তার খেলা, বা বন্ধুত্বের ধরন! বাঁশির সুর ঢাকা পড়ে যায় খেলনা ট্রাম্পেটের বেসুরে। এয়ার গানের তাকে মরে যায় ফুরফুরে ঘুড়িটা। শ্রেণির তফাতের কারণেই বন্ধুত্ব শেষমেশ বন্ধুত্ব থাকে না অপু-দুর্গা আর সতু-রাণুর মধ্যে। দুর্গা আম কুড়োতে গেলে খেঁকিয়ে ওঠে সতু। রাণু প্রতিবাদ করলেও, দুর্গাকে তাড়াতে তার একটুও বাঁধে না। ‘দেবযান’-এ যতীনের মতো দুর্গাকেও যদি পুষ্প স্বর্গের আমবাগানটা দেখিয়ে দিত, বেশ হত!

কত বিপরীত স্বভাবের মানুষরাও বন্ধু হয়ে ওঠে। ‘গোরা’ আর বিনয় যেমন আদর্শে ভিন্ন হলেও একই পথের পথিক হয়। শ্রীবিলাসের বন্ধু্প্রীতি শচীশকে উৎসাহ জোগায় ‘চতুরঙ্গ’-এ। ‘চোখের বালি’ এড়িয়েও মহেন্দ্রর সঙ্গে বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখে বিহারী। খেলার মাঠে সেদিন ইন্দ্রনাথ না থাকলে কেই বা শ্রীকান্তকে বাঁচাত? অন্নদাদিদির বিদায়ের পর ইন্দ্রনাথও বিদায় নেয় অচিরে। শ্রীকান্তর কি মনে পড়ে তাঁকে? বিপরীত স্বভাবের বন্ধু কখনও কখনও উপহার দেয় চরম শত্রুতাও। তাই নিখিলেশের ঔদার্যের সুযোগ নিয়ে ‘ঘরে-বাইরে’ সর্বত্র তার ক্ষতি করে সন্দীপ।
সমাজের ক্রুরতায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে বন্ধুর মাথায় লাঙল বসিয়েছিল গফুর। জানতে ইচ্ছে করে, ফুলবেড়ের চটকলে যাওয়ার পর মহেশের মতো আর কি কেউ তার বন্ধু হল? খুব অল্প সময়ের আলাপেও সুতা-মজুর আর মাঝি যেন বন্ধু হয়ে উঠেছিল ‘আদাব’-এ। আরেকটিবার মাঝিকে যদি বারণ করত সুতা-মজুর, পরের দিন ঈদ পরব কি খুশির হত না? কিশোর বা সুবল সেই রাতে জেগে থাকলে, কিশোর বোধহয় স্ত্রীকে হারিয়ে পাগল হত না। তিতাসের বুকে অন্যদের সঙ্গে মাছ ধরতে গিয়ে প্রাণ হারাত না সুবলও। স্কুলছুট বয়স থেকে সে যে কিশোরের সঙ্গেই মাছ ধরেছে বরাবর।
কিছু বন্ধুত্বের গভীর রং ফিকে হয়ে যায় একটা বয়সে পৌঁছে। আবার তখন, ফিকে মনে হওয়া কিছু বন্ধুত্ব গভীর হয়ে ওঠে। ছিন্নপত্রের তৃতীয় চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ সকৌতুকে সাক্ষাৎ প্রার্থনা করছেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বন্ধু শ্রীশচন্দ্র মজুমদারের। আবার তিনিই অজ্ঞাতনামা প্রিয়তম বন্ধুর উদ্দেশ্যে লিখে চলেছেন একের পর এক গান।
কিছু বন্ধুত্বের গভীর রং ফিকে হয়ে যায় একটা বয়সে পৌঁছে। আবার তখন, ফিকে মনে হওয়া কিছু বন্ধুত্ব গভীর হয়ে ওঠে। ছিন্নপত্রের তৃতীয় চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ সকৌতুকে সাক্ষাৎ প্রার্থনা করছেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বন্ধু শ্রীশচন্দ্র মজুমদারের। আবার তিনিই অজ্ঞাতনামা প্রিয়তম বন্ধুর উদ্দেশ্যে লিখে চলেছেন একের পর এক গান। জীবনের শেষ লগ্ন পর্যন্ত। সেই গানে আজ বাঙালিও তার বন্ধু খুঁজে পায়। রক্তমাংসের বন্ধু না হলেও ফিরে পায় বন্ধুত্ব, কাঙ্খিত অনির্বাণ বন্ধুসুখ।
তথ্যসূত্র:
জীবনানন্দ দাশ-এর স্মরণে (পুনর্পাঠ) – বুদ্ধদেব বসু
সফলতা নিষ্ফলতা: বুদ্ধদেব-জীবনানন্দ সম্পর্কের বাস্তব আখ্যান? – বিদিশা বিশ্বাস
একা বিমর্ষ, অনর্গল বন্ধুরাই শক্তির বেঁচে থাকার শক্তি – মীনাক্ষী চট্টোপাধ্যায়
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু, ‘সব মরণ নয় সমান’ – সুকল্প চট্টোপাধ্যায়
মহেশ, শ্রীকান্ত – শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসসমূহ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাসসমূহ ও ছিন্নপত্র
সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা ও শর্টফিল্ম
শক্তি – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, পাথরের ফুল – সুভাষ মুখোপাধ্যায়, আদাব – সমরেশ বসু, জন অরণ্য – শঙ্কর, গুপী গাইন বাঘা বাইন – উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, তিতাস একটি নদীর নাম – অদ্বৈত মল্লবর্মণ
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত