(Zhenyi Wang)
মেয়েদের জীবন কি শুধু রান্নাঘরে, ঘরের চৌহদ্দিতে, সেলাই-ফোঁড়াই বা অন্যান্য ঘরকন্নার কাজে কেটে যাবে? তাদের লেখাপড়ার অধিকার নেই? যত সাহিত্য-বিজ্ঞানের চর্চা, সবই করবে একমাত্র পুরুষেরা? আদিতে এমনই ভাবনা ছিল পৃথিবীর সব দেশে। চিনও তার ব্যতিক্রম ছিল না। সেই চিন দেশেই আঠারো শতকে জন্মেছিল এক স্বভাব বিজ্ঞানী বুদ্ধিমতী মেয়ে। সে দেশে তিনি নাকি প্রথম নারী, যিনি আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
সে অনেক আগের কথা। ইংরেজির ১৭৬৮ সাল। চিনের পূর্ব দিকে জিয়াংনিং অঞ্চলের (এখন যার নাম নাঞ্জিং), আনহুই প্রদেশে জন্মেছিল এক আশ্চর্য মেয়ে। নাম ঝেনি ওয়াং (Zhenyi Wang)। সেখানে তখন রাজত্ব করত কুইং সাম্রাজ্যের রাজারা। চিনা-সমাজে তখন মাত্র দু’ধরনের লোক বাস করত। বেজায় বড়লোক আর খুব গরিব। বড়লোক সামন্ত-প্রভুরা ভাল খেত, পরত, আরামে দিন কাটাত। অন্যদিকে গরিবদের জীবনে ছিল অকথ্য দুঃখ-যন্ত্রণা। আর মেয়েরা নেহাতই নিচু স্তরের মানুষ। না ছিল শিক্ষা-দীক্ষা, না ছিল মানুষ হিসেবে কোনও সম্মান, মর্যাদা, জীবনের প্রাথমিক অধিকার।
আরও পড়ুন: এক মহৎ জীবনের সন্ধানে: অসামান্য এক উপন্যাস
তবে, ঝেনির ভাগ্য মোটের ওপর একটু ভাল ছিল। কারণ সে জন্মেছিল একটু ধনী পরিবারে, তার বাবা-ঠাকুরদা সবাই ছিলেন বেশ উদারপন্থী। মনে-প্রাণে প্রগতিবাদী। ঝেনির ঠাকুরদা ওয়াং যেফু (Wang Zefu) উঁচু সরকারি পদে কাজ করতেন। ফেঞ্জেন (Fengchen) প্রদেশের গভর্নর সেই বুদ্ধিমান আর পণ্ডিত মানুষটি প্রচুর পড়াশোনা করতেন। সে আমলে ব্যতিক্রমীভাবেই নিজের বাড়িতে পঁচাত্তরটি বই দিয়ে একটি ছোটখাটো লাইব্রেরিও সাজিয়েছিলেন। চর্চা করতেন জ্যোতির্বিদ্যার। (Zhenyi Wang)
বলা বাহুল্য, পরিবারে সবাই এই ছোট্ট ঝেনিকে পড়াশোনা করার জন্য উৎসাহ দিতেন। তাই ছোট থেকেই বইয়ের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। পড়তে পড়তে খাওয়া, ঘুম সব ভুলে যেত। আর ঠাকুরদার সঙ্গ পেয়ে ছোট থেকেই জ্যোতির্বিদ্যায় তার দারুণ আগ্রহ জাগল। অন্যদিকে, ঠাকুমা ড্যাং ছিলেন কবি। ঝেনি তার কাছ থেকে কবিতা লেখার প্রেরণাও পেয়েছিল। ঝেনির বাবা ছিলেন চিকিৎসা-বিজ্ঞানের লোক, চারটি বইয়ের লেখক। বাবা ঝেনিকে খুব যত্ন করে অঙ্ক আর ভূগোল পড়াতেন, দিতেন চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রাথমিক পাঠ। ঝেনির যখন ১৪ বছর বয়স, তখন তার ঠাকুরদা মারা গেলেন। পুরো পরিবারটি চিনের বিখ্যাত প্রাচীর এলাকার কাছে জিলিং (Jilling) নামের একটি জায়গায় চলে এল পাকাপাকিভাবে পাঁচ বছর থাকতে। (Zhenyi Wang)

সেখানে থেকেই ঝেনি তার ঠাকুরদার ফেলে যাওয়া সব বইপত্র পড়া শুরু করল। সে সময় চিন দেশে মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার প্রথা ছিল না। বাড়িতে বসেই বিশেষভাবে ঝেনি পড়তে শুরু করে ঠাকুরদার রেখে যাওয়া জ্যোতির্বিজ্ঞানের বইতে সমকালের বিজ্ঞানীদের লেখা। সূর্যগ্রহণ, চন্দ্রগ্রহণ, বুধ, শুক্র, নক্ষত্র এবং অন্যান্য মহাকর্ষীয় বস্তুর কথা। ঝেনিকে অবশ্য অন্যান্য বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা দিতেন একজন মঙ্গোলিয়ান জেনারেলের স্ত্রী ‘আআ’। তার কাছ থেকে ঝেনি শিখেছিল ধনুর্বিদ্যা, ঘোড়ায় চড়া আর আত্মরক্ষার জন্য চিনের বিখ্যাত কুংফু টেকনিক। (Zhenyi Wang)
ফলে ষোলো–সতেরো বছর বয়সেই ঝেনি সর্ববিদ্যায় পারদর্শিনী হয়ে এক সম্পূর্ণ নারীরূপে আত্মপ্রকাশ করল। তার গুণের খ্যাতি চারদিকে রটে গেল। এদিকে বাবার সঙ্গে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়ে চিনল দেশের ভৌগলিক অবস্থা, ধারণা হল দেশের রাজনীতি এবং সমাজ জীবন সম্পর্কে। আর সেই অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করতে লাগল কবিতার মাধ্যমে। দেখল দেশে ধনী আর দরিদ্রদের জীবন-যাপন পদ্ধতির ফারাক। (Zhenyi Wang)
বিদেশি জ্ঞানের আধারে তৈরি ক্যালেন্ডার চিন দেশের লোকেরা মানত না। ঝেনির কাছে এটি একটি প্রয়োজনীয় উপকরণ হয়ে উঠেছিল। সে সবাইকে বলত যে, এই ক্যালেন্ডারই নির্দ্বিধায় ব্যবহার করা উচিত। গণিত বিশেষত জ্যামিতি নিয়ে তার একটা অদ্ভুত পাগলামো ছিল।
গরিবদের বাড়ির রান্নাঘর থেকে ধোঁয়া বেরোয় না, আর বড়লোকদের বাড়ির ভাঁড়ার ঘরে শস্যগুলো অযথা পড়ে থেকে পোকায় কাটে, নষ্ট হয়। একসময় ঝেনির মনে হল, ছেলেদের মতো মেয়েদেরও যথেষ্ট বুদ্ধি আছে। তারাও পড়াশোনা করতে চায়। তাই সমাজে ছেলে এবং মেয়ে দু’জনেরই শিক্ষার অধিকার পাওয়া উচিত। এইসব ভাবনার কথা সে প্রকাশ্যে সোচ্চারে ঘোষণা করত। কবিতা লেখার সূত্রে তার সঙ্গে সমাজের বেশ কয়েকজন উন্নতমনা, বিদুষী নারীদের পরিচয় হয়। (Zhenyi Wang)
পঁচিশ বছর বয়সে তার বিয়ে হল। স্বামী ঝেন মাই (Zhen Mai)-কে নিয়ে তার সংসার যথেষ্ট সুখের, আরামের। কিন্তু ঝেনি ভুলতে পারে না তার প্রিয় বিষয় গণিত আর জ্যোতির্বিদ্যা। সংসার করতে গিয়েও তার লেখাপড়া এবং গবেষণার কাজ থামল না। স্বেচ্ছায় গণিত পড়াতে শুরু করল বালক-বালিকা, নারী পুরুষদের। সারাদিন কাজের ফাঁকে অনেক ভাবনা, যুক্তি মনে উঁকি দেয়। বিজ্ঞানের বিচিত্র বিষয়ে তার আন্তরিক অনুরাগ। পৃথিবীটা যদি গোল হয়, তাহলে আমরা এবং যাবতীয় প্রাণীরা কেন পড়ে যাচ্ছি না। তাহলে এর মধ্যে নিশ্চয়ই অভিকর্ষের প্রভাব আছে। (Zhenyi Wang)

সে সময়কার মানুষের বদ্ধমূল বিশ্বাস ছিল— দেবতারা রেগে গেলে তবেই নাকি সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণ হয়। তারা কোনও বৈজ্ঞানিক ধারণায় বিশ্বাস করত না। যুক্তিবাদী চিন্তাশীল ঝেনি কখনওই এ বিষয়ে দেবতাদের রাগের কথা ঘুণাক্ষরেও মনে স্থান দেয়নি। বরং ভাবত, নিশ্চয়ই এর পেছনে কোনও বৈজ্ঞানিক কারণ আছে। (Zhenyi Wang)
সে সময় কোনও প্রথাগত গবেষণাগার ছিল না। নিজের যুক্তির পক্ষে সওয়াল করার জন্য ঝেনি পরীক্ষা শুরু করল বাড়ির বাগানে। একটি গোল টেবিলের (যেন আমাদের গোলাকার পৃথিবী) উপর থেকে ঝোলানো একটি ল্যাম্প যা সূর্যের প্রতিরূপ, আর একটি গোল আয়না যা নাকি চাঁদের অস্তিত্বের পরিপূরক— এই ছিল তার পরীক্ষার উপকরণ। একটি সরলরেখায় জিনিসগুলো সাজানোর পর ইচ্ছে করে তাদের অবস্থানের পরিবর্তন ঘটিয়ে বুঝতে চেষ্টা করল কীভাবে সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণ হয়। এ নিয়ে একটি প্রবন্ধ অবধি লিখে ফেলল, যার নাম ছিল ‘দ্য এক্সপ্লানেশন অফ এ সোলার একলিপস’। (Zhenyi Wang)
তাঁর কিছু উল্লেখযোগ্য বই হল ‘দ্য এক্সপ্ল্যানেশান অফ লুনার একলিপসেস’, ‘দ্য এক্সপ্ল্যানেশান অফ দ্য পাইথাগোরিয়ান থিওরেম অ্যান্ড ট্রিগনমেট্রি’, ‘থিওরি অফ দ্য রাউন্ড আর্থ’
তার খুব পছন্দের ছিল পাশ্চাত্য প্রথায় তৈরি নিখুঁত ক্যালেন্ডার। বিদেশি জ্ঞানের আধারে তৈরি ক্যালেন্ডার চিন দেশের লোকেরা মানত না। ঝেনির কাছে এটি একটি প্রয়োজনীয় উপকরণ হয়ে উঠেছিল। সে সবাইকে বলত যে, এই ক্যালেন্ডারই নির্দ্বিধায় ব্যবহার করা উচিত। গণিত বিশেষত জ্যামিতি নিয়ে তার একটা অদ্ভুত পাগলামো ছিল। জ্যামিতিতে পিথাগোরাসের উপপাদ্যগুলো তার কাছে খুব আকর্ষণীয় ছিল। খুব সহজভাবে সেগুলির ব্যাখ্যা করতে পারত। তার নিজের মতো করে সমকোণী ত্রিভুজের ব্যাখ্যা করে বলেছিল, বিভিন্ন বাহুর মধ্যে সম্পর্কের কথা। (Zhenyi Wang)
সেই সময় সাহিত্যের ভাষা এত জটিল ও দুর্বোধ্য ছিল যে, সাধারণ মানুষ সহজে বুঝতে পারত না। তাদের কথা ভেবে খুব সহজ আর স্বাদু গদ্যে ঝেনি বই লিখতে শুরু করে। ঝেনির পূর্বসূরি, বয়সে পঁয়ত্রিশ বছরের বড় এক বিখ্যাত চৈনিক গণিতজ্ঞ মাই ভেন্ডিং (Mai Vending) একটি বই লিখেছিলেন যার নাম ছিল ‘প্রিন্সিপল অফ ক্যালকুলাস’। বইটি যথেষ্ট প্রয়োজনীয় হলেও তার ভাষা ছিল অত্যন্ত জটিল। বইটির একটি সরল রূপ দিল ঝেনি। (Zhenyi Wang)

এছাড়াও, গণিতে গুণের এবং বিভাজনের সরল পদ্ধতিও তার অন্যতম আবিষ্কার। ঝেনি তার লেখা বইতে লিখেছে ত্রিকোণমিতির কথা, পিথাগরাসের একাধিক উপপাদ্যের সহজ ব্যাখ্যা, সূর্যগ্রহণ, চন্দ্রগ্রহণ, আর অনেক মহাজাগতিক ঘটনার বিষয়। তাঁর কিছু উল্লেখযোগ্য বই হল ‘দ্য এক্সপ্ল্যানেশান অফ লুনার একলিপসেস’, ‘দ্য এক্সপ্ল্যানেশান অফ দ্য পাইথাগোরিয়ান থিওরেম অ্যান্ড ট্রিগনমেট্রি’, ‘ডিসপিউট অফ দ্য প্রিসিসন্স অফ দ্য ইকুইনকসেস (Dispute of the Precessions of the Equinoxes)’, ‘থিওরি অফ দ্য রাউন্ড আর্থ’ ইত্যাদি। চন্দ্রগ্রহণের বিশদভাবে ব্যাখা দিতে গিয়ে নিজে হাতে ছবি এঁকেছে। (Zhenyi Wang)
জীবনে খুব বেশি সময় ঝেনি পাননি। মাত্র ২৯ বছর। সেই সময়ের মধ্যেই অজস্র লেখা লিখেছেন, বিশেষভাবে জ্যোতির্বিজ্ঞান আর গণিত নিয়ে। তাঁর লেখা ছয়টি বইয়ের কথা জানা গেলেও, দুর্ভাগ্যের বিষয় ১৭৯৭ সালে তাঁর অকালে মৃত্যুর পর বেশিরভাগ লেখাই নষ্ট হয়ে গেছে। এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায় ‘The First Volume of the Pavilion of Virtuous Demeanor’। ১৭৯৭ সালে বাবার সঙ্গে দেশভ্রমণ কালে সম্ভবত ম্যালেরিয়া বা কোনও অপুষ্টিজনিত ব্যাধি ও ধারাবাহিক জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ঝেনি মারা যান। মৃত্যু আসন্ন জেনে নিজের সমস্ত লেখালেখি তাঁর প্রিয় বন্ধু মাদাম কুইকে দিয়ে যান। মাদাম কুই সেসব দিয়ে দেন তাঁর ভাইপো, কালক্রমে বিশিষ্ট বিজ্ঞানী কুইয়ান ইজি-কে। ঝেনির লেখা পড়ে মুগ্ধ কুইয়ান সমস্ত লেখা গ্রন্থিত করে, তাকে বইয়ের রূপ দেন। (Zhenyi Wang)
ঝেনি নারীদের বলতেন, ‘তোমরা পড়ো, শেখো, ভাবো, লেখো আর সে লেখাগুলিকে পুরুষের মতো একইভাবে প্রকাশ করো। তোমার পরিবার, তোমার সমাজ কখনওই তোমাকে এই সব কাজে অনুমতি দেবে না। তারা বলবে তুমি বরং এমব্রয়ডারি নিয়ে ব্যস্ত থাকো।’
কুইয়ান ইজি একসময় বলেছিলেন, বিখ্যাত চিনা নারী বিজ্ঞানী বেন ঝাউয়ের (যিশুর মৃত্যুর ৪৫ বছর পরে জন্ম তাঁর) পর ঝেনি হলেন সবচেয়ে প্রতিভাধর এবং প্রভাব বিস্তারকারী মহিলা। বেন ‘লেসন্স ফর উইমেন’ নামে একটি বই লিখেছিলেন। সেই বইতে অবশ্য ছিল পুরুষ-শাসিত সংস্কৃতিতে নারীরা কীভাবে জীবনযাপন করবে এবং পুরুষের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের দিকে নজর রেখে পরিবারের ঐতিহ্য বজায় রাখবে, সেসব কথা। (Zhenyi Wang)
নারী-শিক্ষার উপর জোর দিলেও বেন ঝাউ বিশ্বাস করতেন সেই শিক্ষা ব্যবহার করা হবে স্বামী, পিতা বা ভাইদের সেবা-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য। বেন ঝাউ নিজেও জ্যোতির্বিজ্ঞানে যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। কিন্তু আঠারো শতকের ঝেনি সেই অর্থে আধুনিক, যিনি যুক্তি দিয়ে সব কিছু বিচার করতেন। তিনি কখনওই মনে করেননি যে, নারী শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু পুরুষের দাসত্ব ও সেবার জন্য। তাঁর বক্তব্য ছিল, নারীকে কখনও শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়। (Zhenyi Wang)
যেসব নারীরা সমকালে ঝেনির চারপাশে ছিল, তারা এই শিক্ষার জগত সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানত না। এসব দেখেই স্বাধীন চিন্তাভাবনায় অভ্যস্ত ঝেনি নারীদের বলতেন, ‘তোমরা পড়ো, শেখো, ভাবো, লেখো আর সে লেখাগুলিকে পুরুষের মতো একইভাবে প্রকাশ করো। তোমার পরিবার, তোমার সমাজ কখনওই তোমাকে এই সব কাজে অনুমতি দেবে না। তারা বলবে তুমি বরং এমব্রয়ডারি নিয়ে ব্যস্ত থাকো।’ (Zhenyi Wang)
ঝেনির দৃঢ় বিশ্বাস ছিল মেয়েরা অনেক কিছু পারে। তারা হাজার হাজার মাইল হাঁটতে পারে, হাজার হাজার বই পড়তে পারে, আর সেই গ্রন্থলব্ধ জ্ঞান দিয়ে সমাজের উপকারে আসতে পারে। সাহিত্য আর বিজ্ঞানে সমান দক্ষ এই নারীর সাহিত্যকর্ম কুইং সাম্রাজ্যে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। তবে তিনি অমর হয়ে আছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানের গবেষণায়। (Zhenyi Wang)
‘যখন শিক্ষা আর বিজ্ঞানের বিষয় নিয়ে কথা হয়, লোকে কোনও নারীর কথা ভাবে না— তারা বলে মেয়েরা শুধু রান্না আর সেলাই করবে‘
এই বিষয়ে তাঁর প্রথম অবদান ছিল— চ্যাপটা নয়, পৃথিবী আসলে গোলাকার। ইকুইনক্সেসের (বিষুব বা দিন রাতের সমান হওয়া) হিসাব গণনা করেছিলেন ঝেনি। তিনি হেলিওসেন্ট্রিক বা সূর্যকেন্দ্রিক মডেল অবলম্বন করেন, যেখানে চান্দ্রমাসের পরিবর্তে পাশ্চাত্য ধারার মতো সৌরমাসের সাহায্যে মহাজাগতিক বস্তু বিষয়ে নিখুঁত গণনা করা হয়। এছাড়াও, জ্যোতির্বিদ্যাকে আবহাওয়াবিদ্যার সঙ্গে যুক্ত করে বায়ুমণ্ডলের জলীয় বাষ্পের পরিমাণ গণনা করেন। আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিয়ে কৃষকদের খরা-বন্যা থেকে রক্ষা করাই ছিল এই গণনার উদ্দেশ্য। সাধারণ মানুষের জন্য জ্যোতির্বিদ্যাকে সহজ করে লেখা, বিশেষত নক্ষত্রদের চলাচল সম্বন্ধে ধারণা দেওয়ার কাজও করে গিয়েছেন ঝেনি। (Zhenyi Wang)

ঝেনি তাঁর জীবদ্দশায় এক অসামান্য উক্তি করেছিলেন, ‘যখন শিক্ষা আর বিজ্ঞানের বিষয় নিয়ে কথা হয়, লোকে কোনও নারীর কথা ভাবে না— তারা বলে মেয়েরা শুধু রান্না আর সেলাই করবে, আর তাদের দিয়ে জনসমক্ষে প্রকাশ করার জন্য কোনও নিবন্ধ লেখা, কিংবা ইতিহাস পড়া, কবিতা লেখা, ক্যালিগ্র্যাফি করার মতো কাজে যুক্ত করে তাদের বিড়ম্বনায় ফেলা উচিত নয়। অথচ “লোক” শব্দের অর্থ পুরুষ আর নারী দু’জনেই, আর একই কারণে তারা পড়তে পারে।’ (Zhenyi Wang)
বিশ্বের প্রথম নারী জ্যোতির্বিজ্ঞানী জার্মান-কন্যা ক্যারোলিন হার্শেলের জন্ম ঝেনি ওয়াং-এর জন্মের ১৮ বছর আগে। প্রাচীন চৈনিক জ্যোতির্বিদেরা ধূমকেতু আবিষ্কার করলেও, আধুনিক চিনের প্রথম নারী বিজ্ঞানী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছেন ঝেনি ওয়াং। বিজ্ঞানে নিবেদিতপ্রাণ স্বল্পায়ু ঝেনি জীবদ্দশায় তেমনভাবে স্বীকৃতি না পেলেও, মৃত্যুর দু’শো বছর পূর্তির কিছু আগে, ১৯৯৪ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চায় যুক্ত আন্তর্জাতিক মহল International Astronomical Union তাঁর স্মরণে শুক্র গ্রহে একটি গহ্বরের নামকরণ করে। অন্যদিকে, বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানবিষয়ক জার্নাল ‘নেচার’ ঝেনি-কে স্বীকৃতি দিতে তাঁর স্মরণে অল্পবয়সি নারী বিজ্ঞানীদের পুরস্কৃত করে উৎসাহ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। (Zhenyi Wang)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
কৃষ্ণা রায় ছোট গল্পকার ও প্রাবন্ধিক। পেশা শারীরবিদ্যায় অধ্যাপনা। বেথুন কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ্যা। গত দুই দশকের বেশি সময় সৃজনমূলক বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত। নবকল্লোল, শিলাদিত্য, সাপ্তাহিক বর্তমান, শুকতারা, প্রমা, বসুমতী, আনন্দবাজার রবিবাসরীয় সংখ্যা, চিরসবুজ লেখা, অনুবাদ পত্রিকা প্রভৃতিতে লেখা প্রকাশিত। ছোটগল্প, উপন্যাস, জীবনী গ্রন্থ, প্রবন্ধ সংকলন ইত্যাদি নিয়ে সাহিত্য বিষয়ক প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২০। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ 'উপেক্ষিত নারী বিজ্ঞানী', 'আগুন ডানার পাখি সরলা দেবী চৌধুরাণী', 'যে দিন গেছে ভেসে'।
