(Chitrabhanu 2)
এই চাপানউতোর যেমন এ মূল্যায়নের এক দিক, তেমনই আর এক দিকে উঁকি দিতে লাগল, দেরাদুনের ‘মিতালী’-আবাস ঘিরে রথি ঠাকুরের নতুন পাতা সংসারের অন্য এক ছবিও। বছর দশেকের কিশোরী মণিলা যেমন লিখে গিয়েছেন ‘চিত্রভানু’কে ঘিরে রথিবাবু ও প্রতিমার যাপন, তেমনই ‘মিতালী’ আবাসে থাকাকালীন রথি ঠাকুরের স্মৃতি নিয়ে লিখেছেন আরও একজন; নাম জয়দ্রথ চট্টোপাধ্যায়; যিনি অসঙ্কোচে এবং সগৌরবে নিজের পরিচয় দিয়েছেন রথি ঠাকুরের পালিত সন্তান বা ‘foster son’ হিসেবে।
কিশোর জয়দ্রথ লিখেছেন তাঁর ‘জেঠু’ রথি ঠাকুর ও তাঁর মা মীরা চট্টোপাধ্যায়কে ঘিরে তাঁর শৈশব থেকে কৈশোর যাপনের কথা। তা পড়ে বোঝা যায়, কালিম্পং-য়ের ‘চিত্রভানু’ সাজাবার মতো ঠিক একই উদ্যমে এবং আনন্দে মেতে উঠেছিলেন রথি ঠাকুর, দেরাদুনে তাঁর ‘মিতালী’-আবাসটি নির্মাণ এবং তা সাজানোর সময়।
আরও পড়ুন: মেয়েদের গপ্পো-আড্ডা
এখানেও সেই কাঠের কাজ, বাগান করা, দামি দামি কুকুর পোষা, ছবি আঁকা; অর্থাৎ যার সবটুকুই আমরা পেয়েছি ‘চিত্রভানু’ ঘিরে মণিলার স্মৃতিকথায়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ‘রবীন্দ্র সংসদ’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলার কাজে তাঁর সক্রিয় উদ্যোগ। অতিথি আপ্যায়ন, নৈশভোজ বা রবীন্দ্র চর্চা— কোনওকিছুতেই ছেদ পড়েনি কোথাও। বদলে গিয়েছিলেন শুধু তাঁর সঙ্গিনীটি; স্ত্রী প্রতিমার বদলে অন্য এক নারী।

এই পর্বের কথা না লিখেছেন রথি ঠাকুর, না প্রতিমা দেবী; জয়দ্রথ’র লেখাটিই আমাকে উসকে দিল, ১৯৫১-১৯৬১ সাল অবধি রথি ঠাকুরের জীবনের এই শেষ অধ্যায়টি একটু তুলনামূলকভাবে দেখতে। আশ্চর্যভাবে তা সম্ভব হল, প্রথমে একটি কিশোরী এবং পরে একটি কিশোরের চোখ দিয়ে তাঁকে দেখে; একই মানুষকে ঘিরে দুটি ভিন্ন পরিস্থিতি। কারণ পরিস্থিতি বদলে গেলেও সময়ের ক্রম তো বদলায়নি; রথি ঠাকুরের জীবনে ‘চিত্রভানু’র পথটা ঠিক যেখানে এবং যে-সময়ে শেষ হচ্ছে, ঠিক সেখান থেকেই তো শুরু হচ্ছে তাঁর ‘মিতালী’-আবাস গড়ে তোলার উদ্যোগ, এবং একই সঙ্গে বিশ্বভারতীর সঙ্গে চিরবিচ্ছেদও; এবং কিছু পরে মৃত্যু।
জয়দ্রথ জানাচ্ছেন, তাঁর মা মীরা চট্টোপাধ্যায় এবং রথীন্দ্রনাথের মধ্যে ওই বিশেষ সম্পর্কের শুরু সম্ভবত ১৯৪৮ সালে; অর্থাৎ তখনও তাঁর এবং প্রতিমা দেবীর নিয়মিত যাতায়াত ‘চিত্রভানু’ এবং শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতীতে; সাংসারিক বন্ধনে পাকাপাকিভাবে চিড় ধরল ১৯৫১ সালে; ফলে ‘চিত্রভানু’বাসে তাঁদের যৌথতা যাপনের যে ছবি মণিলার কলমে ফুটে উঠেছে, তা আসলে অসম্পূর্ণ; কিছুটা একপেশেও। কারণ এই যাপনে লুকিয়ে ছিল প্রতিমাদেবীর বিরহ, একাকিত্ব এবং প্রকাশ্যে অপমানিত হওয়ার মতো নানা ঘটনা ও একার লড়াই।
কালিম্পঙয়ের এ জায়গাটার নাম দুরপিন হিল; শহর থেকে প্রায় দু’কিলোমিটার দূরে রিং-কিং-পং রোড ধরে এগোলেই এখানেই বাগান দেওয়া এক অপূর্ব দোতলা ভিলা, যার নাম আসলে গৌরীপুর ম্যানসন বা লোকমুখে গৌরীপুর হাউস।
পুত্রবধূ হিসেবে ‘বাবামশাই’ রবীন্দ্রনাথের ব্যাপারে তিনি ছিলেন সমর্পিত। রথীন্দ্রনাথ যেমন সংরক্ষণ দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের জীবন ও সৃষ্টিকে, তেমনই সহযোগ দিয়েছেন প্রতিমা দেবীও। কিন্তু সব ছেড়ে রথীন্দ্রনাথ যত সহজে চলে যেতে পেরেছিলেন, প্রতিমা তা পারেননি; তা সে বিশ্বভারতীই হোক, বা হোক রবীন্দ্রনাথের স্মরণ-যাপনে কালিম্পং-এর ‘চিত্রভানু’।
প্রতিমা দেবী নিশ্চয়ই স্মরণে রেখেছিলেন, রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে কালিম্পংবাসীদের গর্ব এবং কালিম্পঙয়ের গৌরীপুর রাজবাড়িতে থাকাকালীন রবীন্দ্রনাথের সুখস্মৃতি। আসলে একে শুধু সুখস্মৃতি না বলে, বলা ভাল এক আশ্চর্য ইতিহাস। কালিম্পঙয়ের এ জায়গাটার নাম দুরপিন হিল; শহর থেকে প্রায় দু’কিলোমিটার দূরে রিং-কিং-পং রোড ধরে এগোলেই এখানেই বাগান দেওয়া এক অপূর্ব দোতলা ভিলা, যার নাম আসলে গৌরীপুর ম্যানসন বা লোকমুখে গৌরীপুর হাউস।

প্রথমবার এসে (১৯৩৮) কবি একেবারে মুগ্ধ। পরের বার আবার আসেন ১৯৩৯ সালে; সে বছর কবির ৭৭তম জন্মদিনটি ওই বাড়ি থেকেই উদযাপন করা হয় মহাসমারোহে, ২৫ বৈশাখ। কবি আসবেন এবং তাঁর হাতেই উদ্বোধন করা হবে ট্রাঙ্ক-টেলিফোন যোগাযোগে কালিম্পং-এর সঙ্গে কলকাতার সংযোগ এবং বেতার কেন্দ্রটি। সেই ভাবনাতেই টেলিগ্রাফের নতুন পোস্ট বসিয়ে, ওই বাড়ি থেকেই লাইভ রেকর্ডিং করে, আকাশবাণীর তত্ত্বাবধানে সম্প্রচার করা হয়, ওই জন্মদিন উপলক্ষে লেখা এবং তাঁর নিজ কণ্ঠে পড়া সেই নতুন কবিতা, যেটি সেদিন শুনেছিল সমগ্র ভারতবাসী— ‘আজ মম জন্মদিন’ (জন্মদিন, সেঁজুতি)।
এই কথাগুলি লেখা আছে পাথরের ফলকে, সময় ২৫ বৈশাখ, ১৩৪৫। পরাধীন ভারতে ইংরেজ প্রশাসনের আমলে পাওয়া এ-এক বিরল ঘটনা। আর ওইদিন অনেকের সঙ্গে বিশেষ ব্যবস্থাপনার জন্য সেখানে উপস্থিত ছিলেন রথীন্দ্রনাথ এবং প্রতিমা দেবীও। পাইন, ওক এবং পাহাড়ি ফুল দিয়ে তৈরি তোরণ সাজিয়ে অভ্যর্থনা জানানো হয়েছিল কবিকে।
কবি প্রয়াণের পরে-পরেই তৈরি প্রতিমা-রথির ‘চিত্রভানু’— যে বাড়ির ফলকে লেখা ‘২২শে শ্রাবণ’; ফলে কবি এবং তাঁর পরিবারের জীবনে কালিম্পং মানেই কবির জন্মদিন এবং মৃত্যুদিনের মধ্যে এক দীর্ঘ পরিক্রমা এবং স্মৃতিযাপন। ঠিক এখানেই বাঁধা পড়েছিলেন প্রতিমা।
জন্মদিনের সকালে তিব্বতী সাধুরা আসেন কবিকে শুভেচ্ছা জানাতে। আমন্ত্রিত অতিথিদের সঙ্গে একে-একে এসে জড়ো হয়েছিলেন কালিম্পং-এর সাধারণ মানুষরাও। তাদের প্রত্যেকের সুযোগ হয়েছিল একে-একে এসে, পা ছুঁয়ে কবিকে প্রণাম করবার। সারা সকাল এভাবেই সকলের সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন কবি এবং সেখানেও পড়ে শুনিয়েছিলেন তাঁর কিছু নির্বাচিত কবিতা।

এই কালিম্পং-এই কবির শেষ বেড়াতে আসা ১৯৪০; এখানেই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে কলকাতায় ফেরা এবং অল্প কয়েকমাস পরে মৃত্যু। আরও আশ্চর্যের, কবি প্রয়াণের পরে-পরেই তৈরি প্রতিমা-রথির ‘চিত্রভানু’— যে বাড়ির ফলকে লেখা ‘২২শে শ্রাবণ’; ফলে কবি এবং তাঁর পরিবারের জীবনে কালিম্পং মানেই কবির জন্মদিন এবং মৃত্যুদিনের মধ্যে এক দীর্ঘ পরিক্রমা এবং স্মৃতিযাপন। ঠিক এখানেই বাঁধা পড়েছিলেন প্রতিমা।
২
রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণ ঘটেছে ১৯৪১ সালে; সব ছেড়ে রথি ঠাকুর চলে গেছেন ১৯৫১ সালে, এবং নিজের আবাসও গুছিয়েছেন দেরাদুনের অন্য এক পাহাড়ি এলাকায়। প্রতিমা দেবী তার পরেও নিয়মিত এসেছেন ‘চিত্রভানু’তে। এখানকার মেয়েদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন, হাতের কাজ শেখানোর নানা প্রয়াস; এবং লজ্জা বা অপমানে গুটিয়ে গিয়ে বিশ্বভারতী ছেড়ে চলেও যাননি কোথাও। এমনকি পরবর্তীকালে রথি ঠাকুরের সঙ্গে দেখা করতে দেরাদুনও গিয়েছিলেন প্রতিমা।
তবে ১৯৬১-তে রথীন্দ্রনাথ মারা গেলে, ঠিক একবছর পর ১৯৬২-তে নিজসিদ্ধান্তেই ‘চিত্রভানু’ বাড়িটি তিনি তুলে দেন সরকারের হাতে; এবং তা সমস্ত জিনিসপত্র এবং স্মারক সমেত। তাঁর ইচ্ছাতেই সেইসব জিনিসপত্র দিয়ে একটি ছোট সংগ্রহশালা গড়ে ওঠে; চলতে থাকে মেয়েদের শিক্ষা এবং হাতের কাজের ট্রেনিংও ; পরেও দু’একবার যে আসেননি এমন নয়। তবে ১৯৬৪ সালের পর তাঁর আসবার খবর আর তেমন পাওয়া যায় না; এবং ১৯৬৯ সালে তাঁর জীবনাবসান হয় শান্তিনিকেতনেই।

আপাতত ২০১৮ সাল থেকে এটি ঘোষিতভাবে হেরিটেজ বিল্ডিং। ১৯৬২ থেকেই যে ক্র্যাফট ট্রেনিং সেন্টার, সেটিও সেইভাবেই পশ্চিমবঙ্গ সরকারের হেফাজতে আছে। নিয়ম মোতাবেক বাড়িটির বাইরে ইংরেজি, হিন্দি এবং বাংলায় সাইনবোর্ডে পরিচিতি লেখা। লোহার গেটের বাইরে সাদা পাথরের ফলকে কালো কালিতে লেখা চিত্রভানু– ২২শে শ্রাবণ, ১৩৫০। তার মানে, আজ ১২ এপ্রিল, আমি এই বাড়িটির সামনে এসে দাঁড়ালাম নির্মাণের প্রায় তিরাশি বছর পর; আর তিনদিন কাটলেই বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩। ফলে ভাবুক এবং আবেগ তাড়িত বাঙালির যা হয়— বেজায় আপ্লুত এবং চোখে জল।
শুধু যদি স্মারক সাজানো এক সংরক্ষালয় হয়ে সরকারি নিরাপত্তাকর্মীদের হেফাজতেই থেকে যেত, তাহলে তা কি এত আপন মনে হত? মনে হয়, না। অবর্তমান শব্দটি যেন এখানকার অভিধানে নেই; যা আছে তা হল, ভালবাসায় বাঁচিয়ে রাখা এক স্মরণভূমি।
খোলা গেটের মধ্যে পা রাখতেই মনে হল, যেন খুব পরিচিত কারও বাড়ি এলাম। কারণ ধুলি ধূসরিত গৌরীপুর ‘ম্যানসন’ বা ‘হাউস’এর মতো অবস্থা নয় এই বাড়িটির। ভূমিকম্পের ফাটল সামলে নিয়েছে বাড়ির সিঁড়ি ও দেওয়াল। বাড়ি সংলগ্ন বাগানের রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াও দেখলাম, বেশ কিছু মেমসাহেবদেরও, যাঁরা রেসিডেন্ট ট্রেনার বা টিচার হিসেবে ওখানে থেকে যুক্ত হয়েছেন এর কর্মকাণ্ডে; পরিষ্কার নেপালিতে কথা বলছেন মালি ও রাধুনীদের সঙ্গে। এ বাড়ির চাতালে দাঁড়ালে যেমন মেঘ আর পাহাড়, তেমনই বাঁদিকে সরে এসে দাঁড়ালে নীচে নেমে যাওয়ার সিঁড়ি। ধাপে ধাপে নামা-ওঠায় স্থানীয় মানুষ এবং ছোট ছোট ছেলেমেয়ের দল। এক চলমান কর্মকাণ্ড, যা ঘটে চলেছে অবিজ্ঞাপিতভাবে।
শুধু যদি স্মারক সাজানো এক সংরক্ষালয় হয়ে সরকারি নিরাপত্তাকর্মীদের হেফাজতেই থেকে যেত, তাহলে তা কি এত আপন মনে হত? মনে হয়, না। অবর্তমান শব্দটি যেন এখানকার অভিধানে নেই; যা আছে তা হল, ভালবাসায় বাঁচিয়ে রাখা এক স্মরণভূমি।

রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাইজটি এখানে রাখা থাকলে বোধহয় যথার্থ সুরক্ষা পেত; শত সুরক্ষা সত্ত্বেও অমন বেমালুম লোপাট হয়ে যেত না, কিছুতেই। আরও কথা এই যে, ‘চিত্রভানু’ নির্মাণের প্রায় বছর দশেক পর, রথি ঠাকুরের একার উদ্যোগে নির্মিত হয় দেরাদুনের ‘মিতালী’ আবাস এবং রবীন্দ্র সংসদ। আজ সে-দুটির একটিও আর খুঁজে পাওয়া যায় না। শোনা যায়, কোন এক পাঞ্জাবি ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি হয়ে যায় সে বাড়ি। দেরাদুনবাসীদের স্মৃতিতেও ধরা নেই এমন কোনও গর্বের ইতিহাস, যা মনে করিয়ে দেবে, কম করেও অন্তত দশ বছর এখানেই কাটিয়ে যাওয়া রথি ঠাকুরের যাপন কথা এবং এই স্বগৃহেই তাঁর মৃত্যুর খতিয়ান। নোবেল প্রাইজের মতোই লোপাট হয়ে গেল দেরাদুনবাসকালে রথি ঠাকুরের ‘মিতালী’ বাড়ি এবং তাঁর গড়ে তোলা রবীন্দ্র সংসদ।
বাংলার নতুন বছর শুরু হওয়ার ঠিক আগেই আমি পেলাম, এমন এক অভিজ্ঞতা যা আপ্লুত করল আমাকে। আর পায়ের নিচের মাটিটা আর একটু শক্ত হল, নথিপত্র ঘেঁটে নিজেরই তাগিদে এমন এক লেখাও লিখে ফেলতে পারলাম বলে। এ বছরের ২৫ বৈশাখ নতুন করে যুক্ত করল আমায় রবীন্দ্রনাথের জীবনে প্রতিমাদেবীর ভূমিকা সম্পর্কে আরও গভীরভাবে জানতে। প্রায় শতাব্দী প্রাচীন এক নারীর সংসার, বিরহ, অপমান এবং সংগঠনের নজির এই ‘চিত্রভানু’। প্রতিমা ঠাকুরের অবদান।
(সমাপ্ত)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
One Response
ভালো লাগলো