(Onoisorgik Andaman)
প্রথম পর্ব
তাসের দেশ পড়েননি এমন বাঙালি বিরল। তবু আন্দামান বেড়াতে যাওয়ার আগে আরেকবার পড়ে নিতে পারেন। না না, তাসের দেশের প্রেক্ষাপট নিয়ে কিছু বলছি না। বলছি, রাজপুত্রের বর্ণনায় দৃশ্যমান ছবির কথা।
কলকাতা বিমানবন্দর থেকে ভোর পাঁচটা দশের উড়ান। এখন তো জাহাজে যাওয়ার মতো বিলাসিতার সময় নেই হাতে। গোনাগুনতি সাতটা দিন, অষ্টম দিন ফিরে আসা। অগত্যা সাগর বিহঙ্গের মতো ডানা মেলা। দু’ঘণ্টা পর, পাইলট যখন ঘোষণা করছেন, “আমরা পোর্ট ব্লেয়ারে অবতরণের জন্য প্রস্তুত”, বুকের ভিতর তখন উত্তেজনার দুলুনি।
মায়ের কাছে অসংখ্যবার শোনা ‘নীলের কোলে শ্যামল সে দ্বীপ, প্রবাল দিয়ে ঘেরা’, স্বপ্নে কতবার ঘুরে বেড়িয়েছি সেখানে, বাস্তবের সামনে দাঁড়িয়ে অদ্ভুত অনুভূতি। উড়ান দ্রুত উচ্চতা কমাচ্ছে, দৃশ্যমান হচ্ছে বঙ্গোপসাগরের নীল জলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দ্বীপপুঞ্জ। হালকা ঝাঁকুনি, উড়ান মাটি ছুঁল স্বপ্নের আন্দামানে।

বিমানবন্দর থেকে বেরোতেই গাড়ি হাজির। চললাম হোটেলের দিকে। পোর্ট ব্লেয়ারের প্রাণকেন্দ্র অ্যাবারডিন বাজারে হোটেল। জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ, বেশ গরম, কলকাতার শীতবস্ত্র তখন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হোটেলের ঘরে ঢুকে হালকা করে এসি চালাতে হল। স্নান সেরে প্রাতরাশ পর্ব মিটিয়ে নিচে নেমে দেখি, ট্যুর কনডাক্টর দীপঙ্করবাবু হাজির। আমরা ২৫শে জানুয়ারি পৌঁছেছি, ২৬শে পোর্ট ব্লেয়ারের সব বন্ধ, তাই তিনি ২৬, ২৭, ২৮ তারিখে আমাদের হ্যাভলক আর নীল আইল্যান্ড ঘোরার শিডিউল রেখেছিলেন।
দীপঙ্করবাবু বললেন, তিনটের সময় গাড়ি আসবে সেলুলার জেল দেখাতে। কিন্তু মাত্র সাত দিনের পুঁজি, শুধু সেলুলার জেল দেখে একটা দিন কাটাই কী করে! তাই একটা অটো নিয়ে চললাম ওয়াটার কমপ্লেক্সের দিকে। ওখান থেকেই নর্থ বে আর রস আইল্যান্ডের বোট ছাড়ে। আরেক বিপত্তি, ২৩ থেকে ২৯শে জানুয়ারি সব বোট জংলাঘাটি থেকে ছাড়বে। আমরা নাছোড়, জংলাঘাটি পৌঁছে দেখি, সমস্ত বড় সরকারি বোট বেরিয়ে গেছে। চড়ে বসলাম দশজনের ছোট ফাইবার বোটে, সঙ্গে আরও দুটি চারজনের পরিবার। এই দশজন ছাড়া চালক আর গাইড।

পোর্টের এলাকা ছাড়তেই সাগরে তুলকালাম। হাওয়ার দাপটে সাগরের নীল জলে বড় বড় ঢেউয়ের মুখে মোচার খোলার মতো দুলছে ছোট্ট বোট। সকলে যখন “বাবাগো! মাগো!” করছে, তখন রবীন্দ্রনাথ মাথার মধ্যে গুনগুন করে উঠলেন, “হেরো সাগর উঠে তরঙ্গিয়া, বাতাস বহে বেগে”। সাগর এত নীল হয়, না দেখলে বিশ্বাসই করতাম না। চৈতন্যদেব যে সাগরকে কৃষ্ণ ভেবে আলিঙ্গন করতে গিয়েছিলেন, সে কি এর চেয়েও বেশি নীল ছিল!
একদা আন্দামানের রাজধানী এই রস-কে বলা হত প্রাচ্যের প্যারিস। ব্রিটিশ আমলের ক্লাব হাউস, গির্জা, নিজস্ব ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, টেনিস কোর্ট- জৌলুস হারিয়ে সব এখন ধ্বংসস্তুপ।
যতই নর্থ বে’র কাছে পৌঁছাচ্ছি ততই হাওয়ার দাপট বাড়ছে, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বোটের দুলুনি। পাড়ে নারকেল গাছের সারি, হাওয়া তাদের পাতায় আওয়াজ তুলছে। রবীন্দ্রনাথ আবার গুনগুন করে ওঠেন, “নারিকেলের শাখে শাখে, ঝোড়ো বাতাস কেবল ডাকে”।

পৌঁছলাম নর্থ বে। হাজারও ওয়াটার স্পোর্টস, স্কুবা ডাইভিং, স্নরকেলিং, সী বেড ওয়াকিং আরও কত কী! কমবয়সীরা অপেক্ষাকৃত শান্ত জলে কায়াকিং করছে। নীল জলে রঙবেরঙের কায়াকগুলোকে দেখতে বেশ লাগে। কিন্তু আমাদের, মানে পঞ্চাশ পেরোনোদের জন্য শুধুই গ্লাস বটম বোট। তাতেই চড়ে একটু কোরাল দেখলাম। মন ভরল না, অধিকাংশই ধূসর, মরা কোরাল। এরপর পায়ে হেঁটে প্রায় ঘণ্টাদুয়েক ঘুরে বেড়ালাম। অপূর্ব সুন্দর নারকেল গাছে ছাওয়া এই দ্বীপ। এখানেই রয়েছে পুরনো ২০ টাকার নোটে দেখা লাইট হাউস, তার উপরে ওঠাও যায়।
আবার সেই উত্তাল সমুদ্রে ছোট্ট ডিঙা ভাসিয়ে রস আইল্যান্ডের দিকে যাত্রা। এবার যেন সমুদ্র আরও উত্তাল। মাঝে মাঝেই গায়ে জলের ছিটে লাগছে। ঘণ্টাখানেক লাগল রস পৌঁছতে। একদা আন্দামানের রাজধানী এই রস-কে বলা হত প্রাচ্যের প্যারিস। ব্রিটিশ আমলের ক্লাব হাউস, গির্জা, নিজস্ব ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, টেনিস কোর্ট- জৌলুস হারিয়ে সব এখন ধ্বংসস্তুপ। ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর পরিত্যক্ত রস, সুনামি আর ভূমিকম্পে তছনছ হয়ে এখন শুধু ধ্বংসস্তুপে খুঁজে বেড়ানো ইতিহাস। ইলেকট্রিক গাড়ি নিয়ে সব ঘুরে দেখতে পারেন। শেষ মাথায় রয়েছে এক স্মৃতিস্তম্ভ আর পুরনো লাইটহাউস। আর আছে দ্বীপজুড়ে অসংখ্য হরিণ আর ময়ূর।

জংলাঘাটি ফিরতে ৫টা বেজে গেল। দীপঙ্করবাবুকে বলে দিয়েছিলাম, ফলে গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল। হোটেলে ফিরে দেখি উনি বসেই আছেন। হাতে হ্যাভলক আর নীলের ক্রুজের টিকিট। সেখানে যাঁরা ঘোরাবেন, তাঁদের ফোন নম্বর দিয়ে দিলেন, আর বলে দিলেন যেদিন নীল থেকে ফিরব, সেদিন সেলুলার জেল দেখিয়ে দেবেন। রাত তিনটেয় উঠে কলকাতা ছেড়ে এত দৌড়, ফলে খুব ক্লান্ত, কিছু খেয়ে সোজা বিছানায়। কাল সকাল পাঁচটায় গাড়ি আসবে, অ্যাডো জেটি নিয়ে যাওয়ার জন্য।
হ্যাভলকে আমাদের একদিনের অবস্থান, পরদিন চললাম নীল। দেড় ঘণ্টার যাত্রাপথের পুরোটাই ডেকে দাঁড়িয়ে কেটে গেল। জাহাজের ধাক্কায় নীল জলে সাদা ফেনার মুকুট।
সকাল সকাল একপ্রস্থ সিকিউরিটি চেকিং সেরে ম্যাক্রুজে চেপে বসলাম, ঘড়ির কাঁটায় ৬টা বাজতেই রওনা। সবচেয়ে জনপ্রিয় ম্যাক্রুজ, প্রিমিয়াম ক্লাস, কিন্তু অপরিচ্ছন্ন কাচ দিয়ে কিছুই পরিষ্কার দেখা যায় না। ঘণ্টাদুয়েকের পথ, পৌঁছলাম হ্যাভলক। জেটিটাই এত সুন্দর যে, দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। কিন্তু সিকিউরিটির লোকজনের জ্বালায় দাঁড়ানো যায় না, ছবি তোলা তো নিষিদ্ধ।

বাইরে এসে পায়ে হাঁটা পাঁচ মিনিটের পথে হোটেল, একেবারে গোবিন্দনগর সৈকতের পাশে, হোটেলটা সাধারণ হলেও, লোকেশনের কল্যাণে মন ভাল হয়ে যাবে। ড্রাইভার জানিয়ে দিল ১১টার সময় আসবে। স্নান সেরে, পেটে দানাপানি দিয়ে বেরোলাম কালাপাথর সৈকতের উদ্দেশে। আন্দামানের সবকটা সৈকত এত সুন্দর যে, সুন্দর কমন নিয়ে বলা যায়। আর সবকটাতেই অনুচ্চ পাহাড়শ্রেণি চাঁদের মতো বেঁকে জলে নেমে এসেছে। ঢেউ আদর করে সৈকতের বালি ছুঁয়ে যায়। সৈকতে ঝুঁকে পড়া গাছ, পাথর আর অজস্র ভাঙা কোরাল নিয়ে এই সৈকত মন ভোলায়।
ঘণ্টাখানেক কাটিয়ে চললাম এশিয়ার বৃহত্তম সাদা বালির সৈকত রাধানগরের দিকে। শান্ত সমুদ্র স্নানের জন্য আদর্শ। পাড়ের কাছে জল হালকা সবজে নীল, আরও গভীরে যে নীল, তার বর্ণনা দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। ভিড়ভাট্টা নেই, নিজের মতো সৈকতে হাঁটুন, জলে পা ভেজান, অতিরিক্ত পোশাক থাকলে স্নানও করে নিতে পারেন, প্রচুর পোশাক পাল্টানোর জায়গা আছে। তবে রোদের তেজ আছে, রোদ পড়লে আনন্দে ঘুরে বেড়ান। চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারি, রাধানগর শান্তি দেবেই!

হ্যাভলকে আমাদের একদিনের অবস্থান, পরদিন চললাম নীল। দেড় ঘণ্টার যাত্রাপথের পুরোটাই ডেকে দাঁড়িয়ে কেটে গেল। জাহাজের ধাক্কায় নীল জলে সাদা ফেনার মুকুট। নীলে জেটির পাশেই ভরতপুর সৈকত, জলের রঙের ফারাক বুঝিয়ে দেবে নিচে কোরাল প্রাচীরের অবস্থান।
ধীরে ধীরে আকাশে আলোর ঝলকানি, বালি আর নারকেল গাছের সারিতে আলোর বাহার, একটু একটু করে সমুদ্রের মধ্য থেকে উঠে এলেন সূর্যদেব। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না।
গাড়িতে মিনিট তিনেক লাগল হোটেল। ভরতপুর গ্রামের মধ্যে এর অবস্থান, পায়ে হেঁটে ভরতপুর সৈকত মিনিট দশেক। লাঞ্চ সেরে তিনটের সময় চললাম লক্ষ্মণপুর-১ সৈকতে সূর্যাস্ত দেখতে। এক অদ্ভুত ধরনের সৈকত, বাঁক নেওয়া সৈকতের একাংশ থেকে নীল জেটি দেখা যায়, বাঁক ঘুরলেই সূর্যাস্ত দেখতে পাবেন। বালির রঙও ভারি অদ্ভুত, সাদা নয়, হলুদও নয়, কেমন ঘিয়ে রঙ, আর অজস্র ভাঙা কোরাল তো আন্দামানের সব সৈকতে।

আলো কমতে কমতে দিন ফুরিয়ে এল। সূর্যদেব একটু একটু করে সমুদ্রের জলে ডুব দিলেন। আকাশে তখন রঙের হোলি। বালি, গাছপালা সেই লালরং মেখে এক অদ্ভুত পরিবেশ তৈরি করে। ফেরার পথে ড্রাইভারের সঙ্গে কথা বলি, প্যাকেজে না থাকলেও কিছু অর্থের বিনিময়ে সীতাপুর সৈকতে সূর্যোদয় দেখতে যাওয়া ঠিক করি। কথা হয় ড্রাইভার সকাল পৌনে পাঁচটায় আসবে।
রাত থাকতে উঠে তৈরি হয়ে বেরিয়ে সীতাপুর যখন পৌঁছলাম, তখনও ঘুটঘুটে অন্ধকার। একটা চায়ের দোকান, আর গোটাকয়েক ট্যুরিস্ট। মোবাইলের আলোয় ভর করে সিঁড়ি বেয়ে সৈকতে নামলাম। ধীরে ধীরে আকাশে আলোর ঝলকানি, বালি আর নারকেল গাছের সারিতে আলোর বাহার, একটু একটু করে সমুদ্রের মধ্য থেকে উঠে এলেন সূর্যদেব। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। মন শুধু এই আলোয় শিকল ভেঙে তরী ভাসাতে চায়।
(আগামী পর্বে সমাপ্য)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
7 Responses
মন শুধু এই ” আপনার লেখা পড়ে” শিকল ভেঙে তরী ভাসাতে চায়।।।।।।
ধন্যবাদ
অপূর্ব ছবিগুলো আর তার সাথে এমন সুন্দর ভ্রমণ বৃত্তান্ত,। পড়তে পড়তে সত্যিই যেন এক লহমায় আন্দামান থেকে ঘুরে এলাম ।
ধন্যবাদ
অপূর্ব লাগছে, পরের সংখ্যাটির তরে অপেক্ষায়….
খুব heartfelt প্রাঞ্জল লেখা তোর।সুখপাঠ্য। এইভাবেই ভ্রমণ করে যা আর তোর লেখার মাধ্যমে আমাদের মানসভ্রমণ করা।
যেমন সুন্দর ছবিগুলো, তেমনি ভ্রমণ বৃত্তান্ত। মন কেড়ে নেয়।