(Double Decker Bridge)
আসন বসন যাপন মিলে রংবেরং-এর পাখনা মেলা আমাদের দেশ। এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে চললেও যার স্পর্শময় অনুভব অধরাই থেকে যায়। তেমনই এক অধরা সৌন্দর্যের স্মৃতিরোমন্থন আজ। উত্তর-পূর্বের এক অসাধারণ মেঘ-রোদ্দুর-বৃষ্টির রাজ্য— রবি ঠাকুর তার সার্থক নাম রেখেছেন মেঘালয়। বর্ষা ও শরতের সময় এই রাজ্য তার পূর্ণ যৌবন মেলে ধরে। সেই অপরূপাকেই দেখতে ছুটেছিলাম সেবারে— অন্যভাবে, অন্য চোখে। শিলংকে বাদ রেখে নির্বাচিত স্থানে ছিল অল্প পরিচিত কিছু জায়গা। সেই তালিকায় অন্যতম আকর্ষণ ছিল মেঘালয়ের বিখ্যাত দু-একটা লিভিং রুট ব্রিজ। তার মধ্যে ইউনেস্কো হেরিটেজের তকমা পাওয়া নংরিয়াতের ডবল ডেকার রুট ব্রিজ দেখার আকর্ষণ ছিল প্রবল।
প্রথম দিন বৃষ্টি মাথায় নিয়ে শিলং পৌঁছলাম। তারপর দু’দিনের টানা বৃষ্টিতে পুলিশ বাজারের হোটেলে বন্দী। শহরের নামীদামী রেস্তোরাঁয় খেয়েদেয়ে সময় কাটল। এরপর সোহরা পৌঁছে, একটা ছোট গাড়িতে দুই বন্ধু রওনা দিলাম প্রায় ২০ কিমি দূরের পূর্ব খাসি পাহাড়ের টায়রনা গ্রামের উদ্দেশে। শরতের ঝকঝকে সকাল, মন ভাল করা রোদ্দুর, সতেজ সবুজ পাহাড়, পথের পাশে বৃষ্টিস্নাত ছোট-বড় ঝর্না আর ছোট ছোট গ্রাম দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম নংরিয়াতে। এখান থেকেই মেঘালয়ের সর্ববৃহৎ ও দীর্ঘ ডবল ডেকার ব্রিজে যাওয়ার পথ শুরু। শেষও হয় এই গ্রামে এসেই।

প্রায় ৩৬০০ সিঁড়ি বেয়ে নিচের নদীখাতে পৌঁছানোর জন্য হাঁটার শুরুতেই চেকপোস্ট থেকে পারমিট করিয়ে নিতে হবে। পথ নির্দেশ সুনির্দিষ্ট করা আছে। কিন্তু, যাত্রাপথ খুবই কষ্টকর। গ্রামের ছেলেরা গাইড ও প্রয়োজনে মালবাহকের কাজও করে। স্থানীয় বাসিন্দাদের রোজগারের খানিক সুরাহা হয়। গাইড ছাড়াও যাওয়া যায়। তবে, লোকাল লোক নিলে পথে যে আরও দু-তিনটে ছোট ভাঙা লিভিং ব্রিজ আছে, সেগুলো দেখা হয়। এছাড়াও, স্থানীয় গাছপালা, ফলটা, ফুলটা চেনা, লোকজনের সঙ্গে আলাপচারিতা— পথযাত্রী হিসাবে কিছু উপরি পাওনা হয় আর কি।
দরদাম করে একজন গাইড আমরা নিয়েই নিলাম। আমাদের সঙ্গে ক্যামেরার ব্যাগ দেখে, সে দ্বিগুণ উৎসাহে গাছপালা, মাকড়সা, পাখি, প্রজাপতি দেখাতে দেখাতে নিয়ে চলল গন্তব্যের দিকে।

উপার্জনের ন্যূনতম পরিসরে উমসিয়াং নদীর খাতে অবস্থিত খুবই ছোট দুটি গ্রাম Laitkynsew (খাসি উচ্চারণে সঠিক নামটা বাংলায় লেখা মুশকিল) আর নংরিয়াত। গ্রামবাসীদের নিত্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই ওই ছাতিফাটা সিঁড়ি বেয়ে ওঠানামা করে নিকটবর্তী শহর চেরাপুঞ্জি বা শিলং থেকে আনতে হয়। স্থানীয় জীবিকা বলতে রাস্তার ধারে বাড়ির লাগোয়া ছোট দোকান, নার্সারি-বাগান, কিছু সব্জি ফলানো আর হাতে গোনা কয়েকটা হোমস্টে। একটা প্রাথমিক স্কুল ছাড়া পড়াশোনাও সবই শহরে। এমনকি কেউ অসুস্থ হলেও চারজনের কাঁধে চেপে ডোলিতে করে টায়রনা গ্রাম অবধি পৌঁছে, গাড়ির ব্যবস্থা করে তারপর চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে হয়।
উমসিয়াং নদী প্রবাহকে ঘিরে পাহাড় ঘেরা ঘন জঙ্গলের আড়ালে তৈরি হয়েছে এই উমসিয়াং ডবল ডেকার লিভিং রুটব্রিজ। এক বিশেষ প্রজাতির ভারতীয় রবার গাছের শিকড় দিয়ে তৈরি প্রায় ২০ মিটার লম্বা ২৪০০ ফুট উচ্চতার এই দোতলা ব্রিজ প্রকৃতি আর মানুষের ব্যবহারিক প্রযুক্তির এক অভূতপূর্ব নিদর্শন। এইরকম মোটা শিকড়ের রবার গাছ (Ficus elastica) শুধুমাত্র পূর্ব খাসি আর জয়ন্তিয়া পাহাড়েই জন্মাতে দেখা যায়। তাই মেঘালয়ের মূলত এই অঞ্চলেই এই ধরনের ব্রিজ দেখতে পাওয়া যায়। তার মধ্যে এই নংরিয়াত গ্রামের লিভিং রুট ব্রিজটি সব থেকে বড় আর প্রায় ২০০ বছর পুরনো।

প্রাচীন এই রবার গাছের মোটা শিকড়গুলিকে স্থানীয় গ্রামবাসীরা এক নির্দিষ্ট দিকনির্দেশে বেঁধে দেয়। সেই অনুসারে শিকড়গুলি একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে এই ব্রিজ তৈরি হয়। এই ব্রিজ একসঙ্গে ৫০ জন যাতায়াতের উপযোগী হয়ে উঠতে প্রায় ১৫-২০ বছর সময় নেয়।
টায়রনা গ্রাম থেকে প্রায় ৩ কিমি টানা উতরাই-এর রাস্তা। সকালের মিষ্টি রোদে হাঁটা শুরু করতেই দু’পাশের ঘন সবুজ পাহাড় ঝুঁকে এসে স্বাগত জানাচ্ছে। চিরহরিৎ গাছপালা, বিভিন্ন পাখির কলকাকলি, আর প্রজাপতিরা নেচে নেচে সঙ্গ নিয়েছে। সিঁড়িগুলি কোথাও খুবই সরু, ঠিক করে পা ফেলা যাচ্ছে না। সদ্য বৃষ্টির পর আরও শ্যাওলাময় পিচ্ছিল হয়ে আছে। ভরা বর্ষায় অনেক সময়ই পর্যটকদের জন্য রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। সেকারণেই শুরুর দু’দিন আমরা অপেক্ষায় ছিলাম রাস্তা যাতায়াতের উপযোগী হওয়ার। স্থানীয় ড্রাইভারদের কাছে পথ খোলার খবর পেয়ে, তবেই রওনা হয়েছিলাম।

শুরুর দিকে যখন সিঁড়ি বেয়ে নামা শুরু করলাম, তখন বেশ মজা লাগছিল। সুন্দর পথে রঙিন প্রজাপতিরা সবসময়ের সঙ্গী। এই রাস্তায় হাঁটতে শুরু করে মোট চারটি রুট ব্রিজ দেখলাম। তার মধ্যে ১৪০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত উমনোই ব্রিজটি ৭৪ মিটার লম্বা, সবচেয়ে পুরনো ও জনপ্রিয়, কিন্তু ভগ্নপ্রায় সিঙ্গল রুট ব্রিজ। মূল রাস্তা থেকে একটু ভিতরে। বর্তমানে সংরক্ষণের কারণে এক সঙ্গে তিনজনের বেশি পর্যটককে উঠতে দেওয়া হয় না।
এ রাস্তায় অনেকগুলো ব্রিজ পার হতে হয় যাত্রীদের। আসলে নদী গিরিপথ ধরেই পুরো পথটা আমাদের চলতে হবে। রিতম্মেন, উমকার ও মাওইয়াসাও নামের ছোট ছোট ব্রিজগুলো, এই ডবল ডেকার ব্রিজের রাস্তায় যেতে গেলে, দেখতে পাওয়া যায়। এর মধ্যে কোনওটি শুধুই তিনটি পাশাপাশি বাঁশের পাটাতন দিয়ে ঝুলন্ত সেতু তৈরি করা আছে, খরস্রোতা নদীর উপর। আরেকটিতে, সিমেন্ট বাঁধানো ব্রিজের নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝোরায় প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হয়েছে সুইমিংপুল। ইচ্ছে হলে নেমে স্নানও করা যায়। কিন্তু ভিজে জামা পড়ে হাঁটার অসুবিধা, তাই এ যাত্রায় বিরত থাকতে হল। এছাড়াও দুটি তারের সাসপেনশন ব্রিজ পার হতে হল দুলতে দুলতে। এক কথায়, যথেষ্ট কষ্টকর আর রোমাঞ্চকর জার্নি এই ট্রেকপথটি।

তিনটি ঘণ্টার চরাই-উতরাইয়ের পর আমাদের জন্য অপেক্ষা করে ছিল এক অসাধারণ সুন্দর জলপ্রপাত। সেই প্রপাতের পায়ের তলায় তৈরি প্রাকৃতিক এক জলাধার। আর সেই জলাধারের উপর আড়াআড়িভাবে বিস্তৃত আমাদের বহু আকাঙ্খিত দোতলা প্রাকৃতিক রুটব্রিজ। দেখেই আমাদের ক্লান্ত পরিশ্রান্ত শরীর জলে ঝাঁপ দেওয়ার জন্য ছটফট করে উঠল। প্রচুর পর্যটক সমাগম হয়েছে।
তাতে কী! যে যার নিজের মতো সেই জলে, খোলা আকাশের নিচে শুয়ে বসে মাছেদের সঙ্গে প্রাকৃতিক জাকুজির আদর উপভোগ করছে। আমরাও জলের মধ্যে পড়ে থাকলাম খানিকক্ষণ। জলের ধারে একটা ছোট বাঁশের তৈরি চেঞ্জিং রুম আছে। জল থেকে উঠে শুকনো জামা পরে নিয়ে, একটি মাত্র ছোট দোকানে ম্যাগি আর চা খেয়ে উদরপূর্তি করলাম। ফেরার জন্য তারপর আবার সেই কঠিন রাস্তা।

ইচ্ছে ছিল একটা রাত ওই ব্রিজের পাশেই সাধারণ কোনও হোমস্টেতে অবিরাম নদীর শব্দ, রাতচরা পাখি, ঝিঁঝিঁ, ঘণ্টাপোকার ডাক শুনতে শুনতে, এক মায়াময় রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা জীবনের ঝুলিতে পুরে নেওয়ার। কথা ছিল, পরের দিন স্বপ্ন থেকে জেগে কাদামাখা এবড়ো খেবড়ো জঙ্গলের পথ ধরে আরও ঘণ্টাখানেক হেঁটে রেনবো ফলস (জলপ্রপাত) দেখতে যাব। যদিও আহামরি কিছু নয়, তবে খোঁজ খবর নিয়ে মনে হয়েছিল অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় মানুষদের কাছে এই পথ এক দারুণ পাওনা। কিন্ত ওই যে বলে, ‘Man proposes, but God disposes’।
দু’দিনের সাইক্লোনে সময় নষ্ট আর রেনবো ফলস যাওয়ার রাস্তাও নষ্ট। তাই সেই পরিকল্পনা বাতিল করে, যা পেয়েছি তার ষোলআনা খুশিতেই, টায়রনা ফেরার রাস্তা ধরলাম— আবার ফিরব এই রাস্তায়, সেই আশায়। ফেরার রাস্তা আরও কঠিন। কারণ এবার অধিকাংশটাই চড়াই পথে সিঁড়িভাঙা। পাক্কা তিন ঘণ্টা উঠে নেমে, আবার প্রজাপতির পিছনে ছুটতে ছুটতে শেষ বিকেলে টায়রনা গ্রামের পার্কিং-এ রেখে যাওয়া গাড়িটার কাছে পৌঁছে সেবারের মতো যাত্রায় ইতি টানলাম।

উইকেন্ডে মেঘালয়ের অন্যতম জনপ্রিয় পিকনিকের জায়গা হল এই ডবল ডেকার রুটব্রিজ। মেঘালয়ের ‘তাজমহল’ নামে খ্যাত এই ব্রিজে অতিরিক্ত ব্যবহৃত হয় বলে নানা সমস্যার আশঙ্কাও বাড়ছে। তবে আশার কথা এই যে, সর্বদা সজাগ দৃষ্টি থাকে ওখানকার স্থানীয় বাসিন্দাদের। তাঁরাই নিয়ম করে যত্ন নেন তাঁদের সম্পদের। এই ‘তাজমহল’ যেন প্রকৃতি-মানুষের নিবিড় প্রেমের সাক্ষী।
ছবি সৌজন্য: লেখক
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত