(Kolkata Book Fair)
একটি চৌবাচ্চা, দুটি পাইপ দিয়ে ভরা হচ্ছে আর একটি ফুটো দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে জল… তাই কখনই তা পুরোপুরি ভরে উঠছে না! কতক্ষণে খালি হবে, সেই অঙ্ক কষলে, কেসি নাগ বলে দেবেন এই চৌবাচ্চা খালিই হবে না কখনও! বইমেলারও অবস্থা খানিকটা তাই! মোট ন’টা গেট। আর সন্ধ্যে আটটার সময় সেখানে লোক ঢোকা বন্ধ না করা অব্দি কখনই খালি হয় না এই মাঠ!
মাঠে লোক আসে, প্রতিবারই আগের বারের ভিড় ছাপিয়ে যায় সংখ্যায়, স্টল বাড়ে, বাড়ে বইয়ের সংখ্যা, মানুষের উৎসাহও বাড়ে, কিন্তু মাঠ ছোট পড়ে না। মানুষ বোধহয় তেমন আর হারিয়ে যায় না এখন। তাই ঘোষণা কমে আসে। ‘তাপস বসু, আপনি শান্তিনগর থেকে এসেছেন, আপনার বাড়ির লোক আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন গিল্ড অফিসের সামনে।’ আমার পাড়ার লোক, মেলায় এসে হারিয়ে গেছেন, ভাবলে গর্ব হয়, আনন্দও হয় না কি? (Kolkata Book Fair)
আরও পড়ুন: মামার সামাজিক ভূূমিকা
মানুষ এখন ঠিক করে আসেন কী বই তাঁর চাই, তাঁদের স্টল নম্বর কত, শেষ কয়েক বছরে কেবলই স্টল নম্বর জিজ্ঞাসা করতে দেখেছি লোকজনকে, কেউ জিজ্ঞাসা করেন না, অমুক প্রকাশনা বসেছে এবার? এ কি কেবলই উত্তেজনার অভাব? নাকি মানুষের ব্যস্ততাই দায়ী এর জন্য? এত বেশি ফোকাসড বলেই হয়তো মেলার এই চৌহদ্দিতে বইয়ের খোঁজ করতে করতে কেউ নিজের লোককে হারিয়ে ফেলেন না আর! এই একচিলতে মেলায়, যে গলিতেই ঢুকি, তা-ই পৌঁছে যায় রিংরোডে। সেখানে বেদাংশুর ব্যাগের মতো মাপের কতগুলো লরি, পিঠে জেনারেটর চাপিয়ে প্রবল শব্দে নিঃশ্বাস নেয়! তার পিছনে কিছু তরুণ যুগল ভিড় এড়িয়ে, লাজুক শব্দে প্রেমালাপ করে! ওদের কেউ হারিয়ে যায়নি! সময়টুকুও না। তাদের পরিপাটি সাজে, নিজেদের দেখতে পাই এখনও! হায়! কোনওদিন যদি মেলায় হারিয়ে যেতাম! (Kolkata Book Fair)

সিদ্ধার্থদা, ক’দিন আগে একটি পোস্টে কমেন্ট করে জানালেন, ময়দানের মেলায় বান্ধবীদের নামে মিছিমিছি ঘোষণা করাতেন তাঁরা! সঙ্গে থাকা বন্ধু নাকি হারিয়ে ফেলেছে বান্ধবীকে! এসব স্মৃতি নিজের না হওয়ায় একগুচ্ছ হিংসা রাখি সেখানে… মনে হয় তড়িঘড়ি গিয়ে ঘোষণা করাই, ‘মেলার শিল্পীরা, আপনারা যেখানেই থাকুন, মেলায় ফিরে আসুন। গিল্ড অফিসের পিছনে, বইমেলা আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছে…’ (Kolkata Book Fair)
মাঠ বললেই যেসব বন্ধুমুখ ভেসে ওঠে তারা কেবল কলকাতা বইমেলার মুখ বলে দেগে দেওয়া যাবে না। বর্ধমান থেকে পুরুলিয়া, সার্বিকভাবে তারা হয়ে উঠেছে আমাদের কমফোর্ট জোন! কেউ কেউ মাঠ থেকে এসেছিল প্যাভেলিয়নে, সেখান থেকে আবার চলে গেছে ফুটপাথ বা মাঠেই কোথাও। এদের মধ্যে যার কথা না বললেই নয়, সে আমাদের শালিনীদি, আখরপত্র। যাদের হাতের কাজ, চেনা বন্ধুর উপহার হয়ে পৌঁছে যায় আমার বাড়িতেই। ডায়েরি থেকে খাতা, ক্যালেন্ডার, হার-দুল, কী না নেই সেই পসরায়! মেলা ওদের জায়গা দিল না এবারও! (Kolkata Book Fair)

টেবিলে কোনওদিনই খুব মন টেকে না আমার! এত এত চেনা লোক, আড্ডার লোভে তাই কাউকে না কাউকে বসিয়ে জল বা হিসির নাম করে বারংবার বেরিয়ে পড়তাম আমি। ‘ভাই পাঁচ মিনিটে আসছি’ বললে সেসব পুরোনো বন্ধুরা আর ফাঁদে পা দেয় না এখন! পাঁচ মিনিট যে কখন একঘণ্টা হয়ে যাবে, কেউ জানে না! টেবিল ছেড়ে ওঠা মানেই তখন, হয় বাথরুম অথবা শালিনীদির ঠেকে। ফুড কোর্ট পার করে রিং রোডের ধারে মোটামুটি একই জায়গায় বসত ওরা। খাতা বই আড্ডা ছাড়াও অন্য আকর্ষণ কি ছিল না সেখানে? বুদ্ধিমানেরা সেসব কথা না বলতেও বুঝবেন অবশ্যই! (Kolkata Book Fair)
তোমাদের জন্য অলিখিত কমিটি গঠন হবে, পয়সাও নেওয়া হবে সেই ইউনিয়নের তরফ থেকে, তারপর বলে দেওয়া হবে জায়গা দেওয়া যাবে না! ঘিরে দেওয়া হবে টিনের ব্যারিকেডে। সেখানে বিজ্ঞাপন জ্বলজ্বল করবে। বইয়ের বিক্রি বেড়েছে বলে, আমরাও তেমন একটা প্রতিবাদ করব না এসব নিয়ে!
মেলায় এখন বসতে দেওয়া হয় না শিল্পীদের! অবাঞ্ছিতের মতো, তাঁদের ঠাঁই হয়েছে রাস্তার ওপারে, পার্কিং-এর গায়ে, চা বাদাম আর মোমোর লাইনে। যেখানে উড়তি লোক হয়তো খানিক বেশি, তবে মেলা তাদের ডিজওন করে একেবারেই! মেলা তাদের অপবাদ দেয়! সম্পাদক সাক্ষাৎকারে জানান, তাঁরা নাকি অসামাজিক জিনিস বিক্রয় করেন। কথাটা মিথ্যা নয়। অশিক্ষার এই রাজ্যে খাতা বই সবই আসলে অসামাজিক বস্তুর আওতায় পড়ে! মানুষ ভাববে না, শিখবে না, লিখবেও না! শুধু হাতুড়ি চালাবে… শিশু বলতে শিখে গেলে, সে শুধু খাবার নয়, নিজের অধিকারও চেয়ে বসবেই একদিন! আমরা তা হতে দেব কেন! (Kolkata Book Fair)
অতএব শিল্পীরা দূর হও! তোমাদের জন্য অলিখিত কমিটি গঠন হবে, পয়সাও নেওয়া হবে সেই ইউনিয়নের তরফ থেকে, তারপর বলে দেওয়া হবে জায়গা দেওয়া যাবে না! ঘিরে দেওয়া হবে টিনের ব্যারিকেডে। সেখানে বিজ্ঞাপন জ্বলজ্বল করবে। বইয়ের বিক্রি বেড়েছে বলে, আমরাও তেমন একটা প্রতিবাদ করব না এসব নিয়ে! (Kolkata Book Fair)

বইমেলায় ফিশফ্রাই ভাজলে আগুন লাগে না। নির্দিষ্ট জায়গায় সিগারেট খেলে লাগেই! বইমেলায় আচার বিক্রি করা যায় আলো লাগিয়ে, কিন্তু খাতা ডায়েরি বা টি-শার্ট অথবা হার-দুল বিক্রি করলে বইয়ের ক্ষতি তো হতে বাধ্যই! আর তাই হয়তো তরুণ পাঠক থেকে প্রবীণ কবি, সকলেই ভুল পথে পা বাড়িয়ে শিল্পীদের হয়ে বললেন এবছর! যে মুখগুলো নিয়ে আমাদের বইমেলার সঙ্গেই বড় হয়ে ওঠা, তাদের ছাড়া কেমন যেন ফিকেই লাগে বইমেলা! রঙিন প্রচ্ছদের গেট পেরিয়ে যেন সাদাকালো ফর্মার দিকে ঢুকে পড়তে থাকি ক্রমশ… (Kolkata Book Fair)
কেবল জিজ্ঞাসা করলে হাসিমুখে জানিয়ে দেয়, মেট্রোর নিচে অস্ত যায় সে। একটা গদি, একটা চাদর আর বালিশ। এটুকুর লোভেই সূর্যাস্ত!
প্রথম পর্বেই বলেছি, ধূমপান কঠোর হাতে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবার। ফলত ৯ নম্বরের বাইরে বাসস্ট্যান্ড এবারের শো স্টপার। আমাদের দিন দু’য়েক লেগে গেল এটা বুঝতে, যে মেলার বাইরে ছাড়া গতি নেই! ততদিনে চায়ের দোকানও পছন্দ করে ফেলেছি আমরা। শ্যামলা রঙের সদাহাস্যময় লোকটির নাম সূর্যদেব গিরি। কথায় কথায় বেরিয়ে আসে, বাড়ি চণ্ডীপুর। পারিবারিকভাবে চুলের ব্যবসা তাদের, তবে নিজের একটি দোকান চালায় হাওড়ায় দীঘা বাসস্ট্যান্ডের সামনে। এবছর বইমেলার খবর পেয়ে প্রথম দোকান দিয়েছে সে। চোখেমুখে এক অদ্ভুত তৃপ্তি। এত লোক, এত আড্ডা সে আগে কোথাও দেখেনি বলে জানায়। ঘণ্টায় ঘণ্টায় একই মুখ, একেকবার একেকজনের সঙ্গে এসে চা খেয়ে যাচ্ছে, কেটলি থেকে কালি উঠছে না ওর! (Kolkata Book Fair)

দু-একদিনের পর তার দোকানটা কেমন নিজের টেবিলের মতো মুখস্থ হয়ে যায়, কোথায় ঠোঙা, কোথায় ডিম, কোথায় কেক আর সিগারেট থাকে, আমিই জানিয়ে দিই ওর হয়ে প্রক্সি দিতে আসা কোনও এক আত্মীয়কে। সূর্যদা সুখ দুঃখের গল্প করে না। কেবল জিজ্ঞাসা করলে হাসিমুখে জানিয়ে দেয়, মেট্রোর নিচে অস্ত যায় সে। একটা গদি, একটা চাদর আর বালিশ। এটুকুর লোভেই সূর্যাস্ত! তারপর দিন শুরু হলে, বাসস্ট্যান্ডের বাথরুমে স্নান সেরে দোকান খুলে হাসিমুখে আলো করে দেয় ন’নম্বর গেট। আমি তার হাজার খানেক খদ্দেরের একজন। কবিতা লিখি, না বইয়ের মুটে, তা নিয়ে মাথাব্যথা নেই তার। নাম সূর্য বলেই বোধহয় ছোট্ট দোকান থেকে খুচরো ফেরত দেয় যতবার, সে কয়েন হাতে ধরেই ছ্যাঁকা লাগে আমাদের! (Kolkata Book Fair)
জানা যায়, বইমেলা মিটে গেলে বাড়ি যাবে ক’দিনের জন্য, দীঘা থেকে ঘণ্টাখানেক আগেই বাড়ি তার। অথচ কলকাতায় কাজ ফেঁদেছে সে। যারা দীঘা যাবে, তাদেরই চা খাওয়াতে বাড়ি থেকে দেড়শো কিলোমিটার দূরে এসে রাস্তায় বিছানা পেতেছে। এত মধুর এক হাসি নিয়ে সূর্য রাস্তায় শুলে, কে না গলে যায়! আমরাও তারই দাস, তার কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করেই চলেছি বারোটা দিন। কখনও সামনে, কখনও পিছনে গিয়ে চা খাচ্ছি, চেয়ে নিচ্ছি ডিম সিদ্ধও! ডিম্বাকৃতি সেই কক্ষপথ, সূর্য লম্বা ছুরি দিয়ে দু’ভাগ করে ছিটিয়ে দিচ্ছে নুন, আমরা কাগজের গোল পাতায় নিয়ে, খেয়ে নিচ্ছি অতর্কিতে। (Kolkata Book Fair)

এই দোকানে এলে খানিক নিশ্চিন্ত লাগে, এখানেই এসে দাঁড়ায় প্রেসের লোক, বই দিয়ে যায়। কার কেমন বিক্রি, সে নিয়েও আলোচনা হয় এই ছোট্ট দোকান ঘিরে। মান অভিমান মিটে যায় পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে, ভুল বোঝাবুঝি মিটে যায় লিকার চায়ের চুমুকে। এক একটা সন্ধ্যেবেলা পাঁচটা থেকে পৌনে আটটা হয়ে যায় নির্বিঘ্নে! আমরা আমাদের ক্লান্তি ফেলে দিয়ে শেষবারের মতো ঢুকে পড়ি মেলায়। তারপর বেরিয়ে আসি বাড়ি যাওয়ার মতো গুছিয়ে, আবার চা খাই। তারপর শেষ বাসগুলো চলে গেলে, স্টোভ নিভিয়ে মেট্রোর নিচে মিলিয়ে যায় ব্যস্ত দোকান মালিক। (Kolkata Book Fair)
একা ছবি তুলতে রাজি হয় না সে, আমাদের টেনে নেয় কাছে, সূর্যের চারপাশ জুড়ে দাঁড়াই আমরা! আমাদের কবিতায়, আলো এসে পড়ে…
মেলা শেষের পর, জানাই আর তো দেখা হবে না, একটা ছবি তুলব তোমার। লিখব তোমায় নিয়ে। একা ছবি তুলতে রাজি হয় না সে, আমাদের টেনে নেয় কাছে, সূর্যের চারপাশ জুড়ে দাঁড়াই আমরা! আমাদের কবিতায়, আলো এসে পড়ে…
চিত্রঋণ- অরিত্র দত্ত
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
আকাশ লিখতে ভালোবাসে, ভালোবাসে গাছপালা আর বাইক রাইড! একসময় খেলাধুলার সঙ্গে কাটিয়েছে এক দশকেরও বেশি সময়। গত বেশ কয়েক বছর ধরে বাংলা পোর্টালে কর্মরত। যদিও মন থেকে ব্যবসার প্রতি এক অদ্ভুত টান আছে তার!
