(Suhasini Ganguly)
মার্চ মাস। ১৯৪১। কলকাতা। ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ থেকে বেরিয়ে সিআইটি রোড দিয়ে ডানদিকে, লাল হয়ে আছে ফুটপাত পলাশ আর শিমুলে। খড়কে-ডুরে তাঁতের শাড়ি পরে সন্তর্পণে এগিয়ে চলেছে ছিপছিপে সাতাশ বছরের এক মহিলা। অতি সাধারণ পোশাক। কাঁধে ঝোলা ব্যাগ। সারা মুখে লড়াইয়ের আলপনা। আঁচল দিয়ে মুখটা মুছে ঢুকে পড়লেন লেডিজ পার্কের ভেতরে। এখন সবে দুপুর গড়িয়ে বিকেল শুরু হচ্ছে। পার্কটা এই সময়ে ফাঁকাই থাকে। তবুও চারপাশ ভালভাবে দেখে নিলেন। দ্রুত পায়ে গাছে গাছে ঢাকা রাস্তা দিয়ে এগিয়ে গেলেন ঝিলের ধারে। বসলেন এক মহিলার পাশে। ঘোমটা দেওয়া সবুজ ফিতে-পাড় শাড়ি পরে এক সাধারণ গৃহবধূ বসেছিলেন ঝিল-পাড়ে।
‘কতক্ষণ বসে আছো পুটুদি!’
ভদ্রমহিলা ঘোমটা সরিয়ে হাসলেন, ‘আয় কল্পনা, বস, কতদিন পরে দেখলাম তোকে! হিজলি জেলেই বোধহয় শেষ দেখা হয়েছিল! চারিপাশ দেখে ঢুকেছিস তো! পুলিশ কিন্তু নজর রাখছে।’
আরও পড়ুন: বিস্মৃত পণ্ডিত জগন্নাথ তর্কপঞ্চানন
সুহাসিনী গাঙ্গুলীকে বিপ্লবীরা সবাই পুটু বলেই চেনে ও ডাকে। ছোটদের কাছে পুটুদি। কল্পনা দত্তের এক বছর আগে জেলমুক্তি হয়েছে। কিন্তু পুলিশ তাকে স্বগৃহে অন্তরীণ রাখার শর্তে মুক্তি দিয়েছে।
কল্পনা দত্ত তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, এই লেডিজ পার্কে তাঁর প্রিয় পুটুদির সঙ্গে সাক্ষাতের কথা।
‘তুমি নাকি পাগল হয়ে গিয়েছিলে?’ প্রশ্নটা করেই সুহাসিনীর হাতটা নিজের কোলের উপর তুলে নিয়ে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে কল্পনা।

‘পাগল হবার খবর কার কাছে পেয়েছিস! কে বলল এসব!’ সুহাসিনী হেসে ওঠেন।
‘না, উড়ো কথা কত কিছুই হয়! তোমার আঙুলগুলো দেখছি! দেখি ওই হাতটা! তোমার সব নখ তুলে নিয়েছিল পুলিশ! পুটুদি!’ কল্পনা সুহাসিনীর দুই হাত তুলে নিয়ে নিজের গালে চেপে ধরলেন। তাকিয়ে থাকলেন প্রিয় পুটুদির ছলছল চোখের দিকে। কী সহজ, সুন্দর, সরল এই চোখের ভাষা।
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কল্যাণী দাস, বীণা দাস, কল্পনা দত্ত প্রমুখ এক ঝাঁক মহিলা বিপ্লবী তখন বেথুন কলেজ আলো করে আছে। সুহাসিনী তখন বেথুন কলেজ থেকে স্নাতক হয়ে ‘ডিফ অ্যান্ড ডাম্ব’ ব্রিটিশ স্কুলে পড়াচ্ছেন। অসম্ভব প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা, অত্যন্ত স্মার্ট, বেপরোয়া অথচ সহজ পুটুদি সবার আদরের হয়ে উঠেছিল।
একইরকম চোখের দৃষ্টি, সেই যখন বেথুন কলেজের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে দেখা হয়েছিল। ১৯২৯ সাল। কল্পনা দত্ত তখন সবে ম্যাট্রিক পাশ করে বেথুন কলেজে ভর্তি হয়েছে। সুহাসিনী গাঙ্গুলী এসেছিলেন। কলেজের প্রাক্তনী হিসেবে এসেছিলেন তিনি। লম্বা-চওড়া চেহারা, সাধারণ গায়ের রং, চুলপেড়ে সাদা শাড়ি পরে এসে সবার সঙ্গে ঘুরে ঘুরে আলাপ করছেন। তখন বেথুন কলেজের ‘ছাত্রীসমিতি’-এর মেয়েদের সঙ্গে সরাসরি স্বাধীনতা আন্দোলনের যোগাযোগ ছিল। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কল্যাণী দাস, বীণা দাস, কল্পনা দত্ত প্রমুখ এক ঝাঁক মহিলা বিপ্লবী তখন বেথুন কলেজ আলো করে আছে। সুহাসিনী তখন বেথুন কলেজ থেকে স্নাতক হয়ে ‘ডিফ অ্যান্ড ডাম্ব’ ব্রিটিশ স্কুলে পড়াচ্ছেন। অসম্ভব প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা, অত্যন্ত স্মার্ট, বেপরোয়া অথচ সহজ পুটুদি সবার আদরের হয়ে উঠেছিল। নিজে থেকেই এগিয়ে এসে মেয়েদের সঙ্গে আলাপ করত, যেন কত পরিচিত।

‘শুনেছি, তোমাকে নাকি অকথ্য অত্যাচার করেছিল জেলে!’ কল্পনা তাকিয়ে থাকে।
‘সে তো ওরা করবেই! আরও কতজনকে কত অত্যাচার করেছিল! ছাড় ওসব কথা!’
‘ইলেকট্রিক শক্ দিয়েছিল মাথায়!’
‘হবে! তোদের এত কথা কে বলল!’
কথা হল, একজন শিক্ষিকা ওখানকার স্থানীয় স্কুলে চাকরি নিয়ে আসবে। শিক্ষিকার সঙ্গে থাকবে একজন চাকুরে স্বামী। দু’জনে একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকবে চন্দননগরে। সেখানেই ধীরে ধীরে বিপ্লবীরা আশ্রয় নেবে।
‘পুটুদি একটা কথা জিজ্ঞেস করব!’
হেসে ওঠেন পুটুদি। বিকেলের নরম রোদের মতো সেই হাসি ছড়িয়ে পড়ে পার্কের গাছে গাছে, শিমুলে, পলাশে।
কল্পনা নিজের কোলের উপর রাখা সুহাসিনীর দু’হাতে পরা শাঁখা-পলার উপর আঙুল বোলাতে বোলাতে বলে, ‘তোমাদের কি বিয়ে হয়েছিল পুটুদি? প্রশ্নটা অনেকদিন ধরে করব করব করছি! কিছু মনে কোরো না!’ পুটুদির হাত দুটো জড়িয়ে ধরল কল্পনা।
পুটুদি উদাস হয়ে তাকিয়ে আছেন অস্তমিত সূর্যের দিকে। ম্লান লালচে আভা তাঁর মুখে ছড়িয়ে পড়েছে।
আরও পড়ুুন: আধুনিক চিনের প্রথম নারী জ্যোতির্বিদ ঝেনি ওয়াং
বিপ্লবী ভূপেন্দ্র কুমার দত্তের মাথায় তখন বিরাট চিন্তা। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের কয়েকজন বিপ্লবী ফিরে এসেছে কলকাতায়। তাঁদের কলকাতায় লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। ব্রিটিশ গোয়েন্দারা পাগলের মতো খুঁজে চলেছে। একমাত্র উপায় যদি ফরাসি চন্দননগরে লুকিয়ে রাখা যায়। চন্দননগরের বিপ্লবী বসন্ত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরামর্শ করলেন। বসন্ত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন, একজন শিক্ষিকা দিন, তার সঙ্গে একজন তার স্বামী। কথা হল, একজন শিক্ষিকা ওখানকার স্থানীয় স্কুলে চাকরি নিয়ে আসবে। শিক্ষিকার সঙ্গে থাকবে একজন চাকুরে স্বামী। দু’জনে একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকবে চন্দননগরে। সেখানেই ধীরে ধীরে বিপ্লবীরা আশ্রয় নেবে। পরামর্শ মতো ভূপেন্দ্র কুমার ডাক পাঠালেন সুহাসিনী গাঙ্গুলীকে।
তখন সুহাসিনীর হাতে বিদেশে উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য স্কলারশিপ আর জাহাজের টিকিট। যুগান্তর দলের প্রধান ভূপেন্দ্র কুমার দত্তের ডাকে সুহাসিনী শাঁখা-পলা পরে, সিঁদুর লাগিয়ে চলে গেলেন চন্দননগরে
সুহাসিনী গাঙ্গুলী, জন্ম ১৯০৭ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি অধুনা বাংলাদেশের খুলনায়। বাবা অবিনাশচন্দ্র গাঙ্গুলী, মা সরলাসুন্দরী দেবী। সুহাসিনী ১৯২৪ সালে ইডেন হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে ইডেন কলেজে আই.এ. পড়ে ভর্তি হয়েছিলেন বেথুন কলেজে। বেথুন কলেজে পড়ার সময়েই ‘যুগান্তর’ দলের সঙ্গে যোগাযোগ। ভূপেন্দ্র কুমার দত্তের সান্নিধ্যে আসেন। নেতাজি সুভাষচন্দ্র তখন মাঝে মাঝেই বেথুন কলেজের ‘ছাত্রী সমিতি’-এর ছাত্রীদের সঙ্গে বসতেন। উদ্বুদ্ধ করতেন ছাত্রীদের, স্বাধীনতা আন্দোলনে শুধু ছেলেরা নয়, মেয়েদেরও এগিয়ে আসতে হবে সমান তালে। সুহাসিনীরা অপেক্ষায় থাকে আর নিজেদের প্রস্তুত করে শারীরিক ও মানসিক দৃঢ়তার পরীক্ষার জন্য।
সেই ‘আহ্বান’ যখন এল তখন সুহাসিনীর হাতে বিদেশে উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য স্কলারশিপ আর জাহাজের টিকিট। যুগান্তর দলের প্রধান ভূপেন্দ্র কুমার দত্তের ডাকে তাঁর পরামর্শে সুহাসিনী শাঁখা-পলা পরে, সিঁদুর লাগিয়ে সিঁথিতে, কপালে সিঁদুরের টিপ, স্কলারশিপের সুযোগ হেলায় ফেলে দিয়ে চলে গেলেন চন্দননগরে কাশীশ্বরী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকার পদে যোগ দিতে। তাঁর স্বামী সেজে এলেন আরেক বিপ্লবী শশধর আচার্য। শশধর আচার্য চাকরি করেন রেলে। তখন শশধরের পোস্টিং ব্যান্ডেল জংশনে। সুহাসিনী ও শশধর কত্তা-গিন্নি সেজে বাড়ি ভাড়া নিলেন।

দক্ষিণ চন্দননগরের গোন্দলপাড়া অঞ্চলে ২৫ টাকায় দোতলা একটি ফাঁকা পুরোনো বাড়ি। বাড়ির পিছনে পুকুর ও বেশ কিছুটা গাছগাছালিময় জংলা জমি। সুহাসিনীর স্কুলও পাড়ার কাছেই, জিটি রোডের ধারে হাঁটা পথ। শশধরবাবু সকালে পান চিবুতে চিবুতে অফিস যান মানকুন্ডু স্টেশন থেকে ট্রেন ধরে। তারপর সুহাসিনী দিদিমণি হেঁটে হেঁটে স্কুলে যান। ওঁদের সঙ্গে এসেছেন সুহাসিনীর ভাই সেজে হেমন্ত সরকার (কেউ কেউ বলেন তরফদার)। হেমন্ত সরকারের ছদ্মনাম দেওয়া হয় পঞ্চু গাঙ্গুলী। কয়েকদিনের মধ্যেই সুহাসিনী পাড়ায় এবং স্কুলে সবার প্রিয় হয়ে উঠলেন।
১৯৩০ সালের মে মাস। সন্ধ্যায় বসন্তবাবু কলকাতা থেকে গাড়িতে নিয়ে এলেন চারজন বিপ্লবীকে -গণেশ ঘোষ, অনন্ত সিংহ, আনন্দ গুপ্ত, মাখনলাল ঘোষাল। কিছুদিন বাদে আনলেন বিপ্লবী লোকনাথ বলকে। চট্টগ্রাম অভ্যুত্থানের পাঁচজন বিপ্লবী যাঁদের ব্রিটিশ পুলিশ হন্যে হয়ে খুঁজছে। তাঁরাই এখন ২৩ বছরের এক তরুণীর আশ্রয়ে। ভোরে উঠে সেই তরুণী রান্না করে এতজনের চা, জলখাবার ও দুপুরের খাবার, তারপর স্কুলে যায় বাইরে তালাবন্ধ করে। উপরের ঘরে দরজা-জানালা বন্ধ করে থাকে বিপ্লবীরা।
সুহাসিনী গাঙ্গুলী জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন ১৯৩৮ সালে। আর কল্পনা দত্তের জেলমুক্তি হয়েছে আজ থেকে এক বছর আগে, ১৯৪০ সালে। মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে জীবনের সোনালি দিনগুলো উৎসর্গ করেছেন দু’জন।
আত্মত্যাগী অসুস্থ বিপ্লবীরা পুটুদির স্নেহে সুস্থ হয়ে উঠছে। সবার ছদ্মনাম ঠিক হল— গণেশ ঘোষের নাম হল ‘অতুল’, অনন্ত সিংহ হল ‘সুরেন’, মাখনের নাম ‘অশোক’, আনন্দের ‘বাচ্চু’। শশধরবাবু এবং সুহাসিনী গাঙ্গুলী দু’জনেও ওদের আসল নাম জানতেন না তখনও।
গণেশ ঘোষের স্মৃতিচারণায় পাওয়া যায়- ‘আমাদের আসল নাম গোপন ছিল সুহাসিনী দেবী ও শশধর বাবুর কাছে। আমরা দোতলায় ভিতরদিকের একটা ঘরে থাকতাম। সেই ঘর এবং তার সামনে বারান্দা। বাইরে থেকে কিছু দেখা যেত না। স্বদেশী কোনও কাগজ বাড়িতে আসত না। শশধর বাবু অফিস ফেরত একটা স্টেটসম্যান কাগজ আনতেন। আমরা সেটি পড়তাম। আমরা সুহাসিনী দেবীকে বৌদি বলতাম। তিনি রান্নাবান্না নিজেই করতেন, স্কুল করতেন নিয়মিত। আমাদের যত্নের ত্রুটি ছিল না। আমরা প্রতি রাতে নিয়ম করে ছাদে পাহারা দিতাম।’ সেই বাড়িতেই গোপনে আসতেন বিপ্লবীরা। ভূপেন্দ্র কুমার দত্তের সঙ্গে আসতেন বিপ্লবী কালীপদ ঘোষ।
পার্কের গাছে গাছে পাখিরা ফিরে আসছে। প্রকৃতির শান্ত গোধূলি পাখির কলরবে মুখরিত। নীরব দুই নারী বসে আছেন হাতে হাত রেখে। সুহাসিনী গাঙ্গুলী জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন ১৯৩৮ সালে। আর কল্পনা দত্তের জেলমুক্তি হয়েছে আজ থেকে এক বছর আগে, ১৯৪০ সালে। মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে জীবনের সোনালি দিনগুলো উৎসর্গ করেছেন দু’জন।
‘পুটুদি তুমি গণেশদাদের জন্য রান্না করতে? অত জনের রান্না!’
সুহাসিনী হেসে ওঠে, ‘প্রথম প্রথম তেমন পারতাম না। তখন আমার বয়স কত আর ২৩ বছর। পাড়ার বয়স্কদের সঙ্গে কথা বলে নতুন নতুন রান্না শিখে আসতাম। গোপনীয়তার কারণে কাজের লোক রাখা যেত না। জানিস, আজও আমি মাংস খেতে পারি না! মাখনের কথা মনে পড়ে!’
চন্দননগর থানার ব্রিগেডিয়ার করালীমোহন চট্টোপাধ্যায় বসন্তকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়কে এসে খবর দিলেন- টেগার্ট রাতে চন্দননগরের গোন্দলপাড়া অঞ্চলে কোনও এক বাড়ি তল্লাশি করবেন। বসন্তকুমার সঙ্গে সঙ্গে খবর পাঠালেন, তাড়াতাড়ি চন্দননগর ছেড়ে পালাও টেগার্ট আসছে।
‘মাখন মানে শহীদ মাখনলাল ঘোষাল! জীবন ঘোষাল তো ওঁর আরেকটি নাম!’
‘হ্যাঁ! মাখন ঘোষাল আর জীবন ঘোষাল একই ছেলে। ও আমার কাছে মাংস খেতে চেয়েছিল। তখন মাসের শেষ, হাতে পয়সা ছিল না। বলেছিলাম মাইনে পেলে মাংস কিনে আনব! সেটা আগস্ট মাসের শেষের কথা। আর সেপ্টেম্বর মাসেই তো…!’
কল্পনা তাকিয়ে দেখল পুটুদির চোখে জল উপচে পড়েছে। স্থির তাকিয়ে আছেন আকাশের দিকে।
বাড়ির দোতলার ঘরে ততদিনে বিপ্লবীরা তৈরি করে ফেলেছেন কার্তুজ বানানোর ছোটখাটো ওয়ার্কশপ। পিস্তল তো ছিলই সঙ্গে। এই সময় খবর এল ২৫ আগস্ট কলকাতায় ডালহৌসি স্কোয়ারে চার্লস টেগার্টের গাড়ি লক্ষ্য করে বোমা ছোঁড়া হয়। প্রাণে বেঁচে যায় কুখ্যাত টেগার্ট। বহু বিপ্লবী ধরা পড়ে। ধরা পড়ে কালীপদ ঘোষ। অকথ্য নির্যাতনে কালীপদ ঘোষ রাজসাক্ষী হয়ে যায়। ৩১ আগস্ট রাতের অন্ধকারে কালীপদ ঘোষ গোয়েন্দাদের সঙ্গে করে এনে চন্দননগরের গোপন আস্তানাটি চিনিয়ে দেয়। কালীপদ ঘোষ শুধু ছাড়াই পান না, ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ইংল্যান্ডে পাঠিয়ে দেয়।

১লা সেপ্টেম্বর বিকেলেই চন্দননগর থানার ব্রিগেডিয়ার করালীমোহন চট্টোপাধ্যায় বসন্তকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়কে এসে খবর দিলেন- টেগার্ট রাতে চন্দননগরের গোন্দলপাড়া অঞ্চলে কোনও এক বাড়ি তল্লাশি করবেন। বসন্তকুমার সঙ্গে সঙ্গে খবর পাঠালেন, তাড়াতাড়ি চন্দননগর ছেড়ে পালাও টেগার্ট আসছে।
বিপ্লবীরা রাজি হলেন না। অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। সেই রাতেই কলকাতা থেকে ব্রিটিশ পুলিশ ভর্তি তিনটি গাড়িসহ চার্লস টেগার্ট ঢুকলেন চন্দননগরের দক্ষিণে। জিটি রোডের কাছে কাশীশ্বর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছে গাড়ি রেখে রাতের অন্ধকারে হেঁটে ঢুকলেন গোন্দলপাড়ায়। রাতেই ঘিরে ফেললেন সেই দোতলা বাড়ি।
পাঁচিল ডিঙিয়ে পুকুর পাড়ে নামতে গিয়ে আওয়াজ হয়। মুহূর্তে জ্বলে ওঠে সার্চ লাইট। টেগার্ট চিৎকার করে ওঠে- ফায়ার! গুলি ছোটে। বিপ্লবীরাও পাল্টা গুলি চালায়। গুলির লড়াই চলে কিছুক্ষণ।
সেদিন ছাদে পাহারায় ছিলেন বিপ্লবী আনন্দ গুপ্ত। সে নজর করে টর্চের আলো আর হেলমেট বাড়ির চারপাশে। দৌড়ে নেমে এসে খবর দেয়। বিপ্লবীরা তুলে নেয় পিস্তল আর কার্তুজ। সিদ্ধান্ত নেয় সবাই, এখনই রাতের অন্ধকারে বাড়ির পিছনের জঙ্গল আর পুকুরের পাশ দিয়ে পালিয়ে যেতে হবে। পাঁচিল ডিঙিয়ে পুকুর পাড়ে নামতে গিয়ে আওয়াজ হয়। মুহূর্তে জ্বলে ওঠে সার্চ লাইট। টেগার্ট চিৎকার করে ওঠে- ফায়ার! গুলি ছোটে। বিপ্লবীরাও পাল্টা গুলি চালায়। গুলির লড়াই চলে কিছুক্ষণ।
অসংখ্য রাইফেলের বিরুদ্ধে পাঁচটি পিস্তল ও গুটিকয়েক কার্তুজ। কার্তুজ শেষ হয়ে যায় বিপ্লবীদের। গোলাগুলি বন্ধ হয়। ভোর হল। ব্রিটিশ পুলিশ বাড়ির ভেতরে ঢোকে। প্রথমেই শশধর এবং সুহাসিনীর উপর একযোগে চলল চড়, ঘুষি, লাথি, বন্দুকের গুঁতো, বুটের তলায় থেঁতলে গেল আঙুল। কোনও নারী পুলিশ নয়, পুরুষ পুলিশই অত্যাচার চালাল সুহাসিনীর উপর। কারও কারও লেখায় উল্লেখ আছে, চার্লস টেগার্ট নিজে সুহাসিনীকে অত্যাচার করেন। চড় লাথি ঘুষি চলে ২৩ বছরের একটি মেয়ের উপর।
আরও পড়ুন: বিশ্বায়নের যুগে ভাষার খুনখারাপি
ভোর হয়। পাড়ায় সবাই ভেবেছিল ডাকাত পড়েছে। ভোর হতেই একে একে সবাই জড়ো হয় বাড়ির সামনে। বাড়ির ভিতর থেকে ব্রিটিশ পুলিশ পিছমোড়া করে বাঁধা বন্দিদের মাটিতে হেঁচড়ে টানতে টানতে বাইরে আনে। ক্ষতবিক্ষত অচৈতন্য সুহাসিনী সহ গণেশ ঘোষ, আনন্দ গুপ্ত, লোকনাথ বল, অনন্ত সিংহ, শশধর আচার্যকে।
ঠোঁটের কোণে জমাট রক্ত, কালশিটে গালে, চোখের তলায়, রক্তাক্ত সুহাসিনী। গণেশ ঘোষের সারা শরীর জুড়ে রক্ত-ছাপ। আনন্দ গুপ্তের আঙুল থেঁতলানো। লোকনাথ বলের মুখ দেখে চেনা যাচ্ছে না। পা বেয়ে নেমে আসছে রক্তধারা। অজ্ঞান শশধর আচার্য দড়ি দিয়ে বাঁধা। ততক্ষণে চন্দননগরে খবর ছড়িয়ে পড়েছে, ডাকাত নয়, বিপ্লবীদের ধরতে চার্লস টেগার্ট নিজে এই কাজ করেছে। লোক জড়ো হয় কাতারে কাতারে। মাখনলালকে পাওয়া যায় না। পুকুরে জাল দিতেই ভেসে ওঠে মাখনলালের দেহ। গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত।
সুহাসিনী গাঙ্গুলী কোনও দলেই আর যোগ দেননি। কিন্তু সমস্ত দলের জন্য তাঁর দরজা খোলা ছিল। অনেক তরুণ নেতৃত্ব তাঁর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।
‘পুটুদি তোমাদের বিয়ে হয়েছিল?’ আবার প্রশ্নটা করলেন কল্পনা।
সুহাসিনী তাকান। শূন্য দৃষ্টি। ধীরে ধীরে বলেন, ‘সরকারি নথিতে আমি বিবাহিত যে!’
বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে কল্পনা।
‘হুঁ। তুমি তো এখন কর্পোরেশন স্কুলে শিক্ষকতা করছ। সেখানেও তো…!’
কল্পনা পুটুদির হাত দুটো জোরে চেপে ধরে বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর উঠল। সুহাসিনী গাঙ্গুলী নিজের ঝোলা ব্যাগ থেকে গণেশ ঘোষের চিঠির বান্ডিল কল্পনাকে দিল। কল্পনা চারিদিকে তাকিয়ে ব্যাগে ভরে নিয়ে সুহাসিনীকে প্রণাম করে দ্রুত পার্কের অন্ধকারে হারিয়ে গেলেন।

কল্পনার সঙ্গে এই সাক্ষাতের এক বছর পরেই ১৯৪২ সালে সুহাসিনী গাঙ্গুলী আবার গ্রেফতার হন। কল্পনা দত্ত তখন কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। পরে কমিউনিস্ট নেতা পি.সি. জোশীকে বিয়ে করে হবেন কল্পনা জোশী। সুহাসিনী গাঙ্গুলী কোনও দলেই আর যোগ দেননি। কিন্তু সমস্ত দলের জন্য তাঁর দরজা খোলা ছিল। অনেক তরুণ নেতৃত্ব তাঁর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করার সময় তাঁর বাড়ি থেকে বিভিন্ন চিঠি ও কাগজপত্র পায়।
১৯৪৫ সালে তাঁর জেলমুক্তি হয়। শশধর আচার্য ফরাসি সরকারের তাগিদ ও সুপারিশে এক বছর পরেই ১৯৩১ সালে জেল থেকে ছাড়া পায়। তাঁর সম্পর্কে আর বিশেষ কোনও খবর পাওয়া যায় না। সুহাসিনী গাঙ্গুলী শেষ দিন পর্যন্ত হাতে পলা-শাঁখা পরে সিঁথিতে সিঁদুর নিয়ে একা সমাজের এক কোণে কাটিয়ে দিলেন। এক ভয়ঙ্কর মিথ্যার সত্যকে বুকে আগলে রেখে এই আত্মত্যাগ- তাঁর স্বপ্নের দেশের মানুষ কতটুকু মনে রেখেছে?
সুহাসিনী গাঙ্গুলী, কল্পনা দত্তদের সময়ে ‘নারী দিবস’ বলে কোনও দিন উদযাপন করার প্রশ্ন ছিল না। তাঁরা পুরুষের হাত ধরেই একসঙ্গে লড়াই করেছিলেন, স্বসম্মানে। যে বিষয় বিলুপ্ত হতে থাকে, সেই বিষয়টি নিয়েই ‘দিবস’ পালনের হিড়িক দেখা যায় ইদানীং। তাই আজ বিস্মৃত সুহাসিনী গাঙ্গুলীদের কথা বারবার উচ্চারণ করা খুবই জরুরি।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
আঞ্চলিক ইতিহাস ও বিস্মৃত বাঙালি রজত চক্রবর্তীর চর্চার প্রিয় বিষয়। বর্তমান পত্রিকা, ভ্রমণআড্ডা, হরপ্পা, পরম্পরা, মাসিক কৃত্তিবাস, নতুন কৃত্তিবাস ইত্যাদি নানা পত্রিকায় তাঁর লেখালেখি দেখা যায়। পঞ্চাননের হরফ, গৌরপ্রাঙ্গনের গোরা, আশকথা পাশকথা, পান্থজনকথা তাঁর উল্লেখযোগ্য বই। বাংলার হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের খোঁজে 'ধুলো মাটি বাংলা' প্রকাশিতব্য।
