(Ishwar Chandra Vidyasagar)
কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছিলেন, বিদ্যাসাগরের মুখের ভাষা খুব মার্জিত, ভদ্রলোকি ছিল না। সেই সময় গ্রাম থেকে কলকাতায় বা কলকাতা সংলগ্ন অঞ্চলে যাঁরা এসে বাঙালির চিন্তার স্রোতধারাকে বিভিন্নভাবে গতিময় করে তুলছিলেন, তাঁদের অনেকেই ‘কলকেতার ভাষা’ ব্যবহার করতেন না। বিদ্যাসাগরও তাঁর মুখের ভাষায় নিজস্বতা বজায় রেখেছিলেন। বাংলা ভাষাশিক্ষার প্রাইমার ‘বর্ণপরিচয়’-এর দুই খণ্ডের রচয়িতা বিদ্যাসাগরকে গোপালের মতো সুবোধ বালক ভাবা বাঙালির অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল। তাঁর মুখের ভাষার খবর না রেখেই বেশির ভাগ বাঙালি মনে করেন, তিনি ‘বর্ণপরিচয়’-এর মাধ্যমে বাংলা ভাষার মান্য ও ভদ্র একটি রূপ তৈরি করেছিলেন।
এ-কথা ভুল নয়। আবার, বিদ্যাসাগর ভাষা নিয়ে যা ভাবতেন, তার সবটুকু এতে ধরা পড়ছে না। সামাজিক স্থিতাবস্থাকে বজায় রাখা ‘গুড বয়’ ইমেজ বিদ্যাসাগর বহন করতে চাননি, তাঁর সংস্কার আন্দোলন সমাজের প্রচলিত ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করেছিল। স্ত্রীশিক্ষার প্রসার ও বিধবা বিবাহের আইনি উদ্যোগ সামাজিক স্থিতাবস্থা বিরোধী। তবু বিদ্যাসাগরকে সামাজিকভাবে গ্রহণ করার জন্য তাঁকে ঘিরে দুর্দান্ত সব অতিকথা একদিকে ‘গুড বয়’ ইমেজকেই অন্যভাবে পোক্ত করেছে। যেমন, মাতৃভক্তি কিম্বা পড়ার জন্য জান-প্রাণ নিবেদন, এ-সবই বাঙালির চোখে গুড বয় বা ভাল ছেলে-র বৈশিষ্ট্য।
আরও পড়ুন: অংবংচং – প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব
বিদ্যাসাগরের ডানপিটে স্বভাবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নদী ডিঙিয়ে মায়ের কাছে যাওয়া কিংবা রাস্তার আলোয় পড়ার অতিকথা গড়ে উঠেছে। একদিকে এইসব কাজ দুর্দান্ত, কিন্তু ‘গুড বয়’ ইমেজ বিরোধী নয়। ভাল ছেলেরাই তো মায়ের জন্য আকুল হয়, আর প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যায়।
কথায় উপকথায় ঘেরা বিদ্যাসাগরের জীবন নিয়ে উত্তাল নদী ডিঙনো বা রাস্তার আলোয় পড়ার গল্প যত ছড়িয়েছে, চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর আলু বিক্রি করে খেতে চাওয়ার গল্প ততটা জনপ্রিয় হয়নি। এই আলু বিক্রি করে পেট চালানোর কথা ভাবা, বিদ্যাসাগরের বাস্তব কাণ্ডজ্ঞানের পরিচয়বাহী। প্রদ্যুম্ন ভট্টাচার্যের মতো ভাবুক বিদ্যাসাগরের কাণ্ডজ্ঞান সম্পর্কে গভীর কথা বললেও, আম-বাঙালি তেমন করে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি।

আবার, বিদ্যাসাগরের এই কাণ্ডজ্ঞান আরেক দিকে মারও খেয়েছে। বিদ্যাসাগরের বিধবাবিবাহের প্রকল্প মহৎ কিন্তু অসফল। বিধবার শরীর যে স্বামীমৃত্যুর পর পাষাণবৎ হয়ে যায় না, এই বোধ বিদ্যাসাগরের কাণ্ডজ্ঞানপ্রসূত। আবার বাঙালি পুরুষেরা বিধবাবিবাহের প্রকল্পকে ব্যর্থ করে দেবে, সে কাণ্ডজ্ঞান যেন তাঁর নেই। অথবা সেই কাণ্ডজ্ঞানের পরিচয় দিয়ে সংস্কার কার্য থেকে নিশ্চেষ্ট হলে, মেয়েদের শরীর পাষাণবৎ হয়ে যায় না, এই কাণ্ডজ্ঞানপ্রসূত সক্রিয়তাকে অস্বীকার করা হয়।
বাঙালি সমাজের পুরুষেরা বিদ্যাসাগরের দরদি মনের সুযোগ নিয়েছিল। পুরস্কারের লোভে বহু বাঙালি যুবা বিধবাবিবাহ করেছিল, শেষ অবধি বহু ক্ষেত্রেই বিধবাবিবাহ দেওয়ার পর করুণাসাগরকে সেই দম্পতির সংসার টাকা দিয়ে টানতে হয়।
বিদ্যাসাগরের জীবৎকালে তা প্রকাশিত হয়নি। মৃত্যুর পরে রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর উদ্যোগে তা প্রকাশ পেয়েছিল। রামেন্দ্রসুন্দর অবশ্য সেই খাতার সব শব্দ ছাপার হরফে আনতে দ্বিধা করেছিলেন।
এ খুব কাজের কথা নয়। বিনয় ঘোষ এ-নিয়ে ফুট কেটেছিলেন। এসবের জন্যই হয়তো শেষ অবধি ভদ্রলোকের সামাজিক সীমা ডিঙিয়ে বিদ্যাসাগরের স্বেচ্ছা নির্বাসন। সাঁওতালরা তাঁকে তুই-তোকারি করতেন ভালবেসে, পরম সমাদরে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর লেখায় সে বড় মধুর হয়ে ফুটে উঠেছিল। জীবনের শেষের দিকে বিদ্যাসাগর নানা সামাজিক আন্দোলন সম্বন্ধে নীরব ছিলেন। সক্রিয়তা থেকে নীরবতার এই কাহিনিকে অনেকে আবার তাঁর ‘ইংরেজ ভজা’ মনের প্রকাশ বলে ভেবেছেন, কেউ কেউ তাঁর শ্রেণিচরিত্র নির্দেশ করতে চেয়েছেন। সবই যেন তাঁর শ্রেণিস্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই সব নানাবিধ প্রতিক্রিয়ার সূত্রে ‘বর্ণপরিচয়’ বইয়ের বিপরীতে বিদ্যাসাগরের একটি শব্দ-সংকলন প্রয়াসের কথা ভাবতে ইচ্ছে করে। বিদ্যাসাগরের সেই ‘শব্দ-সংগ্রহ’, ‘বর্ণপরিচয়’-এর প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগের মতো বিদ্যালয়ে ভাল ছেলে তৈরি করার জন্য সংকলন করা হয়নি। বিদ্যাসাগরের ‘শব্দ-সংগ্রহ’ তাঁর করা বাংলা শব্দের অভিধান কল্প একটি সংকলন। অসম্পূর্ণ। বিদ্যাসাগরের জীবৎকালে তা প্রকাশিত হয়নি। মৃত্যুর পরে রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর উদ্যোগে তা প্রকাশ পেয়েছিল। রামেন্দ্রসুন্দর অবশ্য সেই খাতার সব শব্দ ছাপার হরফে আনতে দ্বিধা করেছিলেন।

তাঁর মনে হয়েছিল কোনও কোনও শব্দ অশ্লীল। বিদ্যাসাগর অবশ্য শব্দ সংকলনের সময় এইরকম বাছ-বিচার করতেন না। তাঁর তো কেবল ভদ্রলোকের সমাজে মন ও জীবন আটকে থাকেনি। নিজের জীবন আর কাণ্ডজ্ঞান দিয়ে বুঝেছিলেন ভদ্রলোকের শব্দসীমার মধ্যে বাংলা ভাষা আটকে থাকে না। বাংলা ভাষার ব্যবহারের সীমা আরও বিস্তৃত। ভদ্রলোকের মুখের কথার বাইরে কায়িক শ্রমনিষ্ঠ অন্য বাঙালির মুখের কথা সচল ও সরব। তাছাড়া বাংলা ভাষায় এমন কিছু কিছু শব্দ আছে, অনুকার ও ধ্বন্যাত্মক এই দুই শ্রেণিতে পরবর্তীকালের প্রচলিত ব্যাকরণে যা বিভাজিত, যেগুলি বাংলা ভাষার একান্ত নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বহন করছে। একটা-দুটো নমুনা দেওয়া যাক।
ক-দিয়ে বিদ্যাসাগর কনকন, কনকনানি, কনকনিআ, কনকনানিআ এই শব্দগুলি সংকলন করেছিলেন। বাংলা মুখের ভাষায় আমরা ‘দাঁত ব্যথা করছে’ না বলে ‘দাঁত কনকন করছে’ বলি। ডাক্তারবাবুকে ব্যথার চরিত্র বোঝানোর জন্য মোক্ষম শব্দ। আবার ঠান্ডার বিশেষণ হিসেবেও এটি ব্যবহার করা যায়। তখন অবশ্য বিশেষণ করার জন্য বিভক্তি যোগ করতে হয়। ‘কনকনে ঠান্ডা’ বলি বা লিখি।
বিদ্যাসাগর তাঁর শব্দ-সংকলনে খানকি, খানকিপনা, খানকিগিরি-কে অনায়াসে রেখেছিলেন। অশ্লীল বলে বাদ দেননি। গু, মুত, মুতা, মুতান, হড়হড়ানি বাদ যায়নি। শারীরিক বর্জ্যের লোকায়ত নাম ও কাজ বাদ দেবেন কেন? মানুষেরই তো শরীর।
বিদ্যাসাগর ‘কনকন’-এর সঙ্গে বিভক্তিযুক্ত শব্দকেও এখানে জায়গা দিয়েছেন। কনকনানি, কনকনিআ, কনকনানিআ এই তিনটি কনকন শব্দের শেষে ই আর ইআ যোগে তৈরি। প্রশ্ন হল, এই ই আর ইআ কি কলকাতার বাঙালিরা যোগ করেন নাকি কলকাতার বাইরের। বিদ্যাসাগর কলকাতার বাইরের কোনও অঞ্চলকে নির্দিষ্ট করেননি। এর একটা কারণ হতে পারে, কলকাতা আর কলকাতার বাইরে এই জাতীয় ভাগ মেদিনীপুর থেকে কলকাতায় চলে আসা বিদ্যাসাগরের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়।
উনিশ শতকে কলকাতা ব্যবসা বাণিজ্যের কেন্দ্র, সাহেবি প্রশাসনের রাজধানী শহর, তবু হয়তো বিদ্যাসাগরের কল্পনায় মুখের বাংলায় তিনি অঞ্চলগত ভাগ করছেন না। নানা দিক থেকে আসা মুখের বাংলাকে তাঁর সংকলনে অঞ্চলের চিহ্ন ছাড়াই ঠাঁই দিচ্ছেন। একসময় ‘গ্রাম্য শব্দ’ এভাবে কিছু শব্দকে চিহ্নিত করা হত। কলকাতা যেন শহর, তার বাইরে গ্রাম। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘বাঙ্গালা ভাষা’ নামের প্রবন্ধে মনের ভাবকে স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার প্রয়োজনে ‘গ্রাম্য শব্দ’-কেও ব্যবহার করতে আগ্রহী ছিলেন।

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, ‘বাঙ্গলা ভাষার সম্পূর্ণ অভিধান প্রস্তুত করিতে হইলে কেবল সাহিত্যে ব্যবহৃত শব্দের দিকে দৃষ্টি রাখিলে চলিবে না। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে, বিশেষতঃ পল্লীসমাজে প্রচলিত শব্দ-নিচয়কেও গ্রহণ করিতে হইবে।’ বিদ্যাসাগরের শব্দ-সংকলন সে-কাজই করেছে। পরে অবশ্য গ্রাম্য এই বিশেষণটিকে আরও নির্দিষ্ট করার চল হল। সতীশচন্দ্র ঘোষ সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকায় ‘গ্রাম্য-শব্দ-সংগ্রহ’ নামক প্রবন্ধের উপশিরোনাম দিয়েছিলেন ‘বরিশাল জেলায় প্রচলিত’। অর্থাৎ তাঁর গ্রাম্য শব্দের গ্রামগুলি বরিশাল জেলার।
বিদ্যাসাগর তাঁর শব্দ-সংকলনে খানকি, খানকিপনা, খানকিগিরি-কে অনায়াসে রেখেছিলেন। অশ্লীল বলে বাদ দেননি। গু, মুত, মুতা, মুতান, হড়হড়ানি বাদ যায়নি। শারীরিক বর্জ্যের লোকায়ত নাম ও কাজ বাদ দেবেন কেন? মানুষেরই তো শরীর। সেই শরীরের অস্তিত্ব তো বিদ্যাসাগর স্বীকার করতেন। ভাব-বিহ্বল হয়ে মানুষকে তিনি অবয়বহারা, শরীর-শূন্য করে তোলেননি। বিদ্যাসাগরের শব্দ-সংকলনে মুখের ভাষায় আরবি-ফারসি উৎসজাত শব্দও বাদ পড়েনি। তিনি এমন কাজ করেছিলেন বলেই পরবর্তীকালে বাংলা ভাষার চর্চাকারীরা সাহস করে নানা শব্দ সংকলন করেছিলেন। শব্দ তো শব্দই, তার আবার জাত-বেজাত! মানুষের জীবন তো সব কিছু নিয়েই। গোটা মানুষ, গোটা জীবন কেনই বা বাদ দেব আমরা!
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্য়মে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
বিশ্বজিৎ রায়ের জন্ম ১৯৭৮-এ, কলকাতায়। রামকৃষ্ণ মিশন পুরুলিয়ায় স্কুলজীবন কাটিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত পড়াশুনো। উভয় পর্যায়েই প্রথম শ্রেণীতে প্রথম। বর্তমানে বিশ্বভারতীর বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেন। এবং বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক হিসেবে বাংলা সাহিত্যজগতে সুপরিচিত। রবীন্দ্রনাথ ও বঙ্গসংস্কৃতি বিষয়ে তাঁর প্রকাশিত প্রবন্ধ সংকলনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘রবীন্দ্রনাথ ও বিবেকানন্দ: স্বদেশে সমকালে’, ‘সচলতার গান’, ‘সব প্রবন্ধ রাজনৈতিক’। এর বাইরে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর মুক্তগদ্যের বই ‘ঘটিপুরুষ’, ‘অন্দরবেলা’ ও ‘ইস্কুলগাথা’ এবং পদ্যের বই ‘বিচ্ছেদ প্রস্তাব’ ও ‘গেরস্থালির পদ্য’। ‘ঘটিপুরুষ’ গ্রন্থের জন্য পেয়েছেন নীলাঞ্জনা সেন স্মৃতি পুরস্কার।
