(Iran War 2026)
আজ তেরো দিন।
গুনে দেখুন। আপনি আমি, আমরা সকলে প্রত্যক্ষ করছি ধ্বংস, রিয়েল টাইমে বসে, টেলিভিশনের পর্দায় দেখছি মানুষের মৃত্যু। নির্বিকার!— আমাদের কিছু করার নেই। আমরা ঠুঁটো জগন্নাথ।
সারা বছর ধরে আমরা যুদ্ধ দেখতে দেখতে এখন বোধশক্তিহীন।
আমদের রোজ দু’বেলা খেতে পড়তে হয়। তাই মাঝে মাঝে চমকে উঠছি, কাল রান্নার গ্যাস ফুরিয়ে গেলে ইন্ডাকশন কুকারের ব্যবস্থা করতে হবে, ভাবছি, আবার দোকানে না আকাল পড়ে।
আজও পেট্রোলের দাম বেড়েছে। বারো দিন ধরে রোজ বাড়ছে। পাম্পে দাঁড়িয়ে অনেক মানুষ, যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায়, চুপচাপ হিসাব করছে — এ মাসে কী কাটছাঁট করা যায়?
আর, একই সময়ে, সামরিক বিমান থেকে নামছে পতাকায় মোড়া কফিন। সৈনিকদের। যাদের নাম ছিল, বাড়িতে আদর দেওয়ার জন্য বাবা-মা ছিল, ভাইবোনের খুনসুটি ছিল, ল্যাজ নাড়ানো কুকুর ছিল, অর্ধেক দেখা ওয়েব সিরিজ ছিল, আর ছিল বাচ্চাদের স্কুলের পেরেন্টস-টিচার মিটিং। কফিন আসছে। কর্তারা বলছেন, আরও আসবে।
আরও পড়ুন: বিশ্বায়নের যুগেও ভাষার খুনখারাপি
বিশাল বিশাল মিটিং ঘরে — যে ঘরে সাধারণ মানুষ কখনও ঢুকতে পারে না — সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এমন মানুষরা, যাঁদের সন্তান সীমান্তের ধারেকাছে নেই। যাঁদের বাস অট্টালিকায়, চলাফেরা সাঁজোয়া গাড়িতে। তাঁদের খেয়ালে, তাঁদের রাজনীতিতে, গোটা পৃথিবী উঠেছে এক রোলার কোস্টারে — যার টিকিট সাধারণে কাটেনি। কারণ, তাদের কেউ এই যুদ্ধে যেতে প্রস্তুত নয়।
শান্তি যারা গড়ে, তাদের এক আলাদা একাকীত্ব থাকে।
দুটো পুরোনো ঘৃণার মাঝখানে দাঁড়িয়ে, দু’দিকে দুই হাত প্রসারিত করে — তারা অনুভব করে, দুই পাশ থেকে তাদের শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার সেই একাকিত্ব চিনতেন। তাই হয়তো তাঁকে সবাই দুর্বল, বোকা ভাবতো। তাঁকে নেতৃত্ব দেওয়ার পক্ষে বড্ড দুর্বল বলে অভিহিত করা হয়েছিল।
২০২৪ সালের ২৯শে ডিসেম্বর তিনি মারা যান। একশো বছর বয়সে। মানুষটা হয়তো দুর্বল, বোকা ছিলেন বলেই, হেরেও জিতে গিয়েছেন বারবার।
তাঁর একটা অসাধারণ ঘটনা গ্রন্থিত আছে ইতিহাসের পাতায়।
১৯৪৮ সাল থেকে মিশর ও ইজরায়েল চারটি ভয়াবহ যুদ্ধ লড়েছে। হাজার হাজার মানুষ মারা গিয়েছে। গোটা প্রজন্ম বড় হয়েছে একটি ভাগ করা সীমান্তের দুই পাশে — শুধু ভয় আর ঘৃণা নিয়ে।
শান্তির প্রতিটি চেষ্টা ডুবে গেছে ইতিহাসের ভার, শোক আর অহংকারের নিচে। মনে হত এই সংঘাত চিরকালের। জিমি কার্টার তা বিশ্বাস করতে অস্বীকার করলেন।
মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত এবং ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী মেনাহেম বেগিনকে আমন্ত্রণ জানানো হয় ক্যাম্প ডেভিডে — মেরিল্যান্ডের পাহাড়ে প্রেসিডেন্টের নির্জন আশ্রয়ে।
১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বরে, জর্জিয়ার মাটিতে জন্মানো এক চিনাবাদাম-চাষির ছেলে, দুজন মানুষকে আমন্ত্রণ জানালেন মেরিল্যান্ডের এক পাহাড়ি আশ্রয়ে — ক্যাম্প ডেভিডে। পরিকল্পনা ছিল তিন দিনের। হয়ে গেল তেরো দিন — আধুনিক কূটনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে যন্ত্রণাময় তেরোটি দিন।
মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত এবং ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী মেনাহেম বেগিনকে আমন্ত্রণ জানানো হয় ক্যাম্প ডেভিডে — মেরিল্যান্ডের পাহাড়ে প্রেসিডেন্টের নির্জন আশ্রয়ে।
কোনও সংবাদমাধ্যম নয়। কোনও ভাষণ নয়। পালানোর কোনও পথ নয়।

একটাই লক্ষ্য। শান্তির চুক্তি।
মেনাহেম বেগিন — ওয়ারশ গেটো হলোকস্ট থেকে বেঁচে আসা, ইরগুন যোদ্ধা, স্বজনহারা। তাঁর বিশ্বাস ছিল, ইজরায়েল দুর্বলতার বিলাসিতা কখনও করতে পারবে না। আর আনোয়ার সাদাত মিশরকে বিধ্বংসী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে নিয়ে এসেছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, তাঁর জনগণ এই অন্তহীন অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়ার মিছিল থেকে মুক্তি পাওয়ার যোগ্য।
বেগিন তিন দিনের বেশি ইজিপ্টের আনোয়ার সাদাতের সামনে বসতে পারলেন না। প্রতিটি আলোচনা পুরনো ক্ষতের কথায় ফিরে যাচ্ছিল বারে বারে। কথা এগোনো যায় না, পুরনো যুদ্ধের ভাষায় এসে থমকে দাঁড়ায়।
বেগিন তাঁর কেবিনে, সাদাত তাঁর কেবিনে। আলাদা সময়ে খাওয়া, আলাদা জায়গায়। কার্টার দুই কেবিনের মাঝখানে পায়চারি করতে থাকলেন — বেগিনের কাছে গেলে সাদাত বিশ্রাম নেন, সাদাতের কাছে গেলে বেগিন।
তিনদিন পরে দুজন আর একসঙ্গে বসতে রাজি নন। কার্টারও দমে যাওয়ার মানুষ নন। দূতের মাধ্যমে কথা চলতে থাকল, দুই নেতার। মাঝে মাঝেই বিতর্ক ছেড়ে বৈঠক থেকে রাগে উঠে বের হয়ে যান হয় আনোয়ার নয় মেনাহেম।
কার্টারের নিজের দল তাঁকে তাগিদ দিল — শীর্ষ সম্মেলন চুপচাপ শেষ করে দিন। নইলে প্রেসিডেন্সির যা একটু বাকি আছে সেটুকুও যাবে।
কার্টার অস্বীকার করলেন।

শেষ দশ দিন কার্টার তাঁদের একসঙ্গে দেখা করতেই দিলেন না। বেগিন তাঁর কেবিনে, সাদাত তাঁর কেবিনে। আলাদা সময়ে খাওয়া, আলাদা জায়গায়। কার্টার দুই কেবিনের মাঝখানে পায়চারি করতে থাকলেন — বেগিনের কাছে গেলে সাদাত বিশ্রাম নেন, সাদাতের কাছে গেলে বেগিন।
এভাবে কেটে গেল বারোটি দিন।
তারপর এল তেরোতম দিন।
কার্টার প্রতিটি ছবিতে প্রতিটি শিশুর নাম নিজের হাতে লিখলেন। তারপর বেগিনের কেবিনে হেঁটে গেলেন, হাতে হাতে ছবিগুলো দিলেন, এবং দেখলেন — বেগিন একে একে প্রতিটি ছবি দেখছেন, প্রতিটি শিশুর নাম মুখে উচ্চারণ করছেন।
দুই শিবিরের মানুষ ব্যাগ গোছাচ্ছে, ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আলোচনা ভেঙে পড়েছে। কিছুতেই কোনও রকম আপোসে আসা গেল না। সম্মেলনের শুরুর দিন, United States Institute of Peace তিনজন নেতার একটি ছবি তুলেছিল, ইতিহাসের নথিপত্র হিসেবে।
ফিরে যাওয়ার আগে বেগিন তার আট নাতি-নাতনির জন্য তিন নেতার স্বাক্ষরিত কপি চেয়েছিলেন। সাদাত ইতিমধ্যে সই করে দিয়েছেন। কার্টার অপেক্ষা করছিলেন — কোনও সমাধান না হলে সই করবেন না বলে ঠিক করেছিলেন। কিন্তু এখন শেষ বুঝে, তিনি বসলেন সই করতে। তার সচিব সুজান ক্লো ভাবলেন ছবিগুলো একটু ব্যক্তিগত করে তোলা যাক — খোঁজ নিয়ে নাতি-নাতনিদের নামগুলো জোগাড় করলেন।

কার্টার প্রতিটি ছবিতে প্রতিটি শিশুর নাম নিজের হাতে লিখলেন। তারপর বেগিনের কেবিনে হেঁটে গেলেন, হাতে হাতে ছবিগুলো দিলেন, এবং দেখলেন — বেগিন একে একে প্রতিটি ছবি দেখছেন, প্রতিটি শিশুর নাম মুখে উচ্চারণ করছেন।
কার্টার বললেন, ‘আমি বলতে চেয়েছিলাম — এই মুহূর্তে…’
বেগিন প্রথম নাতির নাম ডাকলেন। তারপর দ্বিতীয়জনের। তার গাল বেয়ে জল নামল। কার্টারেরও। তারপর বেগিন বললেন, ‘আরেকবার চেষ্টা করা যাক না কেন।’
কার্টার তখনও নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হননি। শান্তিও অব্যাহত থাকেনি। তবুও, সেই মুহূর্তে শান্তি নেমে এসেছিল। মানবিক নিরহংকার একটি মুহূর্ত। ইতিহাস সাক্ষী রইল।
বেগিন ব্যাগ নামিয়ে রাখলেন। বললেন, ‘মিস্টার প্রেসিডেন্ট, আমি শেষ একটা চেষ্টা করব।’
১৭ই সেপ্টেম্বর, ১৯৭৮। তেরো দিনের পর ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি স্বাক্ষরিত হল। মিশর হল প্রথম আরব দেশ যে, ইজরায়েলকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিল। ইজরায়েল সিনাই উপদ্বীপ ছেড়ে দিতে রাজি হল।
পরিপূর্ণ শান্তি ছিল না। এ ছিল মানবিক শান্তি — ভঙ্গুর, বিতর্কিত, অসম্পূর্ণ — কিন্তু জীবন্ত।
নোবেল কমিটি ১৯৭৮ সালের শান্তি পুরস্কার দিল মেনাহেম বেগিন ও আনোয়ার সাদাতকে। কার্টার পেলেন না — তখনও না। যে মানুষটি সব কিছু সম্ভব করেছিলেন, তার জন্য সেদিন বিশ্বের দরবারে কোনও আসন ছিল না। কার্টার তখনও নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হননি। শান্তিও অব্যাহত থাকেনি। তবুও, সেই মুহূর্তে শান্তি নেমে এসেছিল। মানবিক নিরহংকার একটি মুহূর্ত। ইতিহাস সাক্ষী রইল।

এবং এখন — ২৮শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ — ইজরায়েল এবং আমেরিকা ইরানের বিরুদ্ধে একসঙ্গে সামরিক অভিযান শুরু করল। উদ্দেশ্য — ইরানের পারমাণবিক এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করা এবং সরকার পরিবর্তন ঘটানো। প্রথম আঘাতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি নিহত হলেন।
ইরান জবাব দিল শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে — আমেরিকার দূতাবাস, সামরিক ঘাঁটি, এবং হরমুজ প্রণালীতে তেলবাহী জাহাজগুলোকে লক্ষ করে। মধ্যপ্রাচ্যের সব উড়ান বন্ধ হয়ে গেল। বিশ্ব বাণিজ্য থমকে আছে। হাজার হাজার নিরীহ মানুষ মারা যাচ্ছে। ভয়ঙ্কর ক্ষয়ক্ষতির ছবি ভেসে আসছে রিয়েল টাইমে। কয়েক বিলিয়ন ডলার খরচ হচ্ছে প্রতিদিন। দেড়শোজন ফুটফুটে বাচ্চা জ্বলেপুড়ে মরে গেল। এমনকী লেবাননে দশ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত। তবু, শান্তির কথা কেও বলে না।
সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে যে মানুষ ছেড়ে দিতে পারে জীবনের সবটুকু, কীসের যুদ্ধ, কার যুদ্ধ, কেও বলেনি তাকে। শুধু বলেছে সময় হলে ‘ভোটটা দিও আমাকে’।
সেই সাধারণ মানুষটি, যে চায় শুধু দুমুঠো শান্তি, সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে যে মানুষ ছেড়ে দিতে পারে জীবনের সবটুকু, কীসের যুদ্ধ, কার যুদ্ধ, কেও বলেনি তাকে। শুধু বলেছে সময় হলে ‘ভোটটা দিও আমাকে’।

ক্যাম্প ডেভিডের সেই পৃথিবী এখন শুধু দূর নয় — যেন অন্য কোনও সভ্যতার গল্প।
ভবিষ্যতে কী আছে?
সৎ উত্তর হল — অনিশ্চয়তাই এই মুহূর্তের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সত্য।
হতাশাবাদীরা বলছেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ, তাই বিশ্ব তেল সংকটে পড়বে। আঞ্চলিক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়বে আরও দূর দেশের প্রান্তরে।
কার্টার বিশ্বাস করতেন, মানুষ একে অপরের বিরুদ্ধে সবচেয়ে খারাপ কাজ করার পরেও, মাঝে মাঝে ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে।
ছয় হাজার বছর পুরনো সভ্যতার নিদর্শনগুলোর দিকে তাকিয়ে বলতে হবে, ‘এশিরিয়া ধুলো আজ—বেবিলন ছাই হয়ে আছে’?
মধ্যপ্রাচ্য আজ এমন একটি ক্ষত যাকে পৃথিবী ক্রমাগত গভীর করছে, আর নাম দিচ্ছে ‘কৌশল’। এটা সারবে না বিধ্বংসী হবে, তা নির্ভর করছে সেই পুরনো প্রশ্নের উপর — কোথাও কি একটা ঘর আছে? দুজন মানুষ কি সেই ঘরে হেঁটে যেতে রাজি? এবং, কেউ কি আছে যে একগুঁয়ে, ক্লান্তিহীনভাবে দরজাটা ধরে দাঁড়িয়ে থাকবে? নাকি ছয় হাজার বছর পুরনো সভ্যতার নিদর্শনগুলোর দিকে তাকিয়ে বলতে হবে, ‘এশিরিয়া ধুলো আজ— বেবিলন ছাই হয়ে আছে’?
চিত্রঋণ: উইকিমিডিয়া কমনস
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
মৌসুমীর জন্ম কলকাতায় হলেও গত তিন দশক ধরে নিউ ইয়র্কই তাঁর বাসস্থান এবং কর্মস্থান। এক্কেবারে বিশুদ্ধ ক্যালইয়র্কার। শুঁটকি মাছ থেকে চন্ডীপাঠ, Grateful Deads থেকে সুপ্রীতি ঘোষ আর এই diasporic dichotomy-র জাগলিংয়ে হাত পাকাতে পাকাতেই দিন কাবার। ভালোবাসেন বই পড়তে, ছবি আঁকতে, রান্না করতে, আড্ডা মারতে আর ক্যামেরা হাতে ছবি তুলতে। তবে সবচেয়ে ভালোবাসেন সক্কলকে নিয়ে জমিয়ে বাঁচতে!
