Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

বাসন্তিকা

সুভদ্রকল্যাণ

মার্চ ৩১, ২০২৬

Classical Music
Bookmark (0)
Please login to bookmark Close
(Classical Music)

সমাজমাধ্যমের ভালমন্দ নিয়ে বহু বিতর্ক। তবু, এর কল্যাণেই ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত সাধারণ মানুষের কাছে তাও কিছুটা পৌঁছোয়। সমাজ মাধ্যমে কিছু শিল্পী নিয়মিত জনসমক্ষে আসেন। নিজেদের কাজ তুলে ধরেন। কিছু পেজও দায়িত্ব নিয়ে বিগত সময়ের কিংবদন্তী শিল্পীদের স্বল্পশ্রুত উপস্থাপনা ফের শোনার সুযোগ করে দেয়। সোশাল মিডিয়াতে ‘অ্যাক্টিভ’ শিল্পীদের কেউ কেউ পেজগুলোর পোস্ট শেয়ারও করেন। তাতেও লাভ বৈকি ক্ষতি হয় না।

গত বছর দোলে যেমন। তবলাবাদক ও ঐতিহাসিক ডঃ অনীশ প্রধান শেয়ার করলেন শোভা গুর্তু এবং নির্মলা দেবীর দ্বৈত-কণ্ঠে হোরিগান– ‘যমুনা তট শ্যাম খেলে হোরি’। পোস্টটা ভাইরাল হয়। এক ইনস্টাবাসী বন্ধু সেটা শুনে বলেছিলেন, ‘শুনেছি অবশ্যই, ভাইরাল হয়েছিল তো!’ সাংগীতিক উৎকর্ষের জন্য না হলেও, শুধু বিপুল শেয়ারের ফলেই তো শোভা গুর্তু এবং নির্মলা দেবী সেই বন্ধু পর্যন্ত পৌঁছোতে পেরেছিলেন! সমাজমাধ্যমকে তাই, কীভাবেই বা অস্বীকার করি?


আরও পড়ুন: ঘরে ফেরার গান


তবে, সংগীত সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সোশাল মিডিয়ার চেয়ে ব্যক্তিগত স্মৃতিই এগিয়ে থাকবে। বিগত সময়ের গানবাজনা নিয়ে এখন কথাবার্তা তত হয় না। সেই সময়ের মানুষও তো আজ খুব বেশি নেই – প্রণাম করব, পা কোথায়? আমাদের প্রজন্মে সঙ্গীত নিয়ে আলোচনা হয় ঠিকই, কিন্তু তাত্ত্বিকতার ভারে হারিয়ে যায় ইতিহাসের প্রাসঙ্গিকতাও। দীর্ঘ দু’দশক ধরে শাস্ত্রীয় সংগীতের অনুষ্ঠান শুনছি। কুমারপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ‘কুদরৎ রঙ্গিবিরঙ্গী’, ‘মজলিস’ ইত্যাদি পড়েও সে আসর সম্পর্কে ধারণা হয়েছে। বহু সময় আসরে গিয়ে দেখেছি, বয়সের তোয়াক্কা না করেই নামী নামী ওস্তাদ অনুষ্ঠান মাত করে দিচ্ছেন। যেন বাঁ হাতের খেল। শুধু তো আমি নয়, আমার সুহৃদদের অনেকেই তার প্রমাণ পেয়েছেন। এই কয়েক বছর আগে পর্যন্তও। সেসব অভিজ্ঞতার কথা তাঁরা কেউ বলেন না। সময়ের ফেরে সেগুলো নিশ্চয়ই নিছক গল্পকথা হয়ে যায়নি?

কিছুটা সেই আক্ষেপ থেকেই এই লেখা লিখতে বসা। সমাজমাধ্যম রইল তার জায়গায়। আপাতত স্মৃতিই ভরসা। ঘটনাটা দোল উপলক্ষেই। তখন আমার বয়স বারো কি তেরো। প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে সেই ঘটনা মনের ভিতর উজ্জ্বল।

Classical Music
বিদুষী গিরিজা দেবী

সে বছর আইটিসি সঙ্গীত রিসার্চ আকাদেমির হলে বসন্তোৎসব পালনের কথা। অনুষ্ঠান সন্ধ্যেয়। সকাল থেকেই তোড়জোড় হচ্ছে। ছাত্রছাত্রীরা নানারকম ফুল দিয়ে সাজিয়েছে মঞ্চের চারপাশ। সুন্দর আলপনা দেওয়া, হলঘরে প্রবেশের পথে। চেয়ারগুলো ঢেকে দেওয়া সাদা চাদরে। মঞ্চের সামনে মাটিতে ফরাসে বা সোফায় বসবেন আকাদেমির গুরুরা। তাঁদের পিছনে ছাত্ররা ও সাধারণ শ্রোতৃবৃন্দ। সবার পিছনে বয়স্ক অভ্যাগতরা। আমিও তখন সেখানে ছাত্র। সবার সঙ্গে মিলেমিশে মঞ্চ-প্রস্তুতির কাজ করতাম ভালবেসে।

অনুষ্ঠান শুরু হল সন্ধ্যা ছ’টায়। এক এক করে এলেন গুরুরা। পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী যে-কোনও অনুষ্ঠানে পৌঁছতেন সবার আগে। এবারেও ব্যতিক্রম হল না। এলেন উস্তাদ মশকুর আলি খাঁও। এরপর একে একে পণ্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, পণ্ডিত অরুণ ভাদুড়ি এবং বিদুষী শুভ্রা গুহ। শতবর্ষ অতিক্রান্ত অতিবৃদ্ধ শিল্পী উস্তাদ আব্দুল রাশিদ খাঁ, এলেন সবার শেষে। হুইলচেয়ারে বসিয়ে তাঁকে নিয়ে এলেন তাঁর নাতি, তবলাশিল্পী জনাব বিলাল খাঁ, অর্থাৎ আমাদের বিলাল ভাই।

বয়স অনেক হওয়া সত্ত্বেও গিরিজা দেবী বা আব্দুল রাশিদ খাঁকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতেন। নিজে সঙ্গীতশিল্পী ছিলেন না। কিন্তু তাঁর সঙ্গে মিশলে তা মনেই হত না। বৈঠকী অনুষ্ঠানে অতিথিদের প্রত্যেককে উঠে দাঁড়িয়ে আপ্যায়ন করতেন। কেউ বসবার জায়গা না পেলে, বসার ব্যবস্থাও করে দিতেন। কাজের প্রতি ইন্টিগ্রিটি শেখা যেত মাথুর সাহেবকে দেখে।

সেই সময় পণ্ডিত উল্লাস কশালকর সম্ভবত কলকাতায় ছিলেন না, থাকলে তিনিও আসতেন। গুরুরা সবাই কিন্তু সব অনুষ্ঠানে আসতে পারতেন না। কেউ ব্যস্ত থাকতেন অন্যত্র কোনও আসরে, কেউ বা শিক্ষাদানে। কিন্তু, সেদিন বিদুষী গিরিজা দেবীর একক ঠুমরি নিবেদন। সেই জন্যই হয়তো সবাই এলেন। গিরিজা দেবী, অর্থাৎ আকাদেমির সবার শ্রদ্ধেয়া আপ্পাজি, প্রতিষ্ঠানের প্রায় সব অনুষ্ঠানেই অংশ নিতেন। তবে তাঁর প্রধান পরিচায়ক ঠুমরি-দাদরাই শুধু গাইবেন, এমন সাধারণত কমই ঘটত। বসন্তোৎসব উপলক্ষে উপরি পাওনা হোরিগান বা চৈতির আশাই বা কীভাবে ত্যাগ করা সম্ভব?

তৎকালীন অধ্যক্ষ শ্রী রবি মাথুর অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার মুহূর্তে এসে পৌঁছলেন। আপাদমস্তক সজ্জন ব্যক্তি। তাঁর উচ্চপদ ও তথাকথিত ক্ষমতা কোনওদিন আমাদের কাউকে বিব্রত করেনি। বরং ভরসা জুগিয়েছে। বাচ্চাদের খুব ভালবাসতেন। তাদের সঙ্গে হাসি-মজা করতেন। আমরা দেখা করতে গেলে বরাদ্দ থাকত চকোলেট। বয়স অনেক হওয়া সত্ত্বেও গিরিজা দেবী বা আব্দুল রাশিদ খাঁকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতেন। নিজে সঙ্গীতশিল্পী ছিলেন না। কিন্তু তাঁর সঙ্গে মিশলে তা মনেই হত না। বৈঠকী অনুষ্ঠানে অতিথিদের প্রত্যেককে উঠে দাঁড়িয়ে আপ্যায়ন করতেন। কেউ বসবার জায়গা না পেলে, বসার ব্যবস্থাও করে দিতেন। কাজের প্রতি ইন্টিগ্রিটি শেখা যেত মাথুর সাহেবকে দেখে।

Classical Music
শিল্পী উস্তাদ আব্দুল রাশিদ খাঁ

অনুষ্ঠানের প্রথম ভাগে অয়ন সেনগুপ্তের সেতার। অয়নদার সেদিনের কাফি আজও ভুলিনি। যন্ত্রসঙ্গীতে মূলস্রোতের রাগ হিসেবে কাফিকে কমই ধরা হয়। জিলা কাফি, বা কাফি কানাড়ার প্রচলন অপেক্ষাকৃত বেশি। তন্ত্রকারীর বাজ বজায় রেখেও অয়নদা যেভাবে ঠুমরির আঙ্গিক সেদিন সেতারে ফুটিয়ে তুলেছিল, তা শুনে সব ধরণের শ্রোতাই প্রশংসা করেন মুক্তকণ্ঠে। অয়নদা এখন ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ সেতারশিল্পী। সাংগীতিক পরিভাষায় তার হাতের মিঠাস অতুলনীয়। রাগের গাম্ভীর্য এবং শুদ্ধতা বজায় রেখে দ্রুতগতির তানেও তার জুড়ি মেলা ভার।

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় শিল্পী কুমার মার্দুর গাইলেন রাগ ধন-বসন্ত। তেমন জমল না। বোদ্ধা শ্রোতারা রীতিমতো অভিযোগ করলেন, ধন-বসন্ত রাগে ধ্যানেশ্রী এবং বসন্তের যোগ তাঁর গায়নে সঠিকভাবে পাওয়া যায়নি। অল্পকাল পড়ে সঙ্গীতজগত থেকেও তাঁর বিদায় ঘটে। সে যে আজ কোথায়, তা হয়তো তাঁর বাড়ির লোকও জানে না।

প্রতি অনুষ্ঠানের মতোই গাইতে বসার সময় আপ্পাজি যেমন বলতেন, তেমনই বললেন– ‘কাউকেই আমার প্রণাম জানানোর নেই। আমার অনেক বয়স হয়েছে, তোমরা সবাই আমার চেয়ে বয়সে ছোট। শুধু ভাইয়াকে প্রণাম জানাই, কারণ উনিই একমাত্র এখানে আমার চেয়ে বড়। তোমাদের সবাইকে আমার স্নেহ, ভালবাসা।’ ভাইয়া, অর্থাৎ আব্দুল রাশিদ খাঁ।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে মঞ্চে এলেন গিরিজা দেবী। তবলায় বসলেন শ্রী সঞ্জয় অধিকারী, সারেঙ্গিতে জনাব সারওয়ার হুসেন, এবং হারমোনিয়ামে পণ্ডিত জ্যোতি গোহো। তানপুরায় আপ্পাজির দুই শিষ্যা দু’দিকে, সুচেতাদি, এবং অপরাজিতাদি। সারেঙ্গিতে সারওয়ারভাই সুর ধরলেন। সঞ্জয়কাকুর তবলা মেলানো শেষ হলেই গান শুরু হওয়ার পালা।

প্রতি অনুষ্ঠানের মতোই গাইতে বসার সময় আপ্পাজি যেমন বলতেন, তেমনই বললেন– ‘কাউকেই আমার প্রণাম জানানোর নেই। আমার অনেক বয়স হয়েছে, তোমরা সবাই আমার চেয়ে বয়সে ছোট। শুধু ভাইয়াকে প্রণাম জানাই, কারণ উনিই একমাত্র এখানে আমার চেয়ে বড়। তোমাদের সবাইকে আমার স্নেহ, ভালবাসা।’ ভাইয়া, অর্থাৎ আব্দুল রাশিদ খাঁ।

Classical Music
পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী

এরপর বললেন, তিনি কাফি রাগে একটি ঠুমরি গাইবেন। শর্ত দিলেন সামনের সারিতে বসা আকাদেমির গুরুদের– ‘আমি একা গাইব না। তোমরা সবাই আমার সঙ্গে গাইবে। বুদ্ধবাবু তো সরোদ আনেননি, আনলে তিনি হয়তো সঙ্গে বাজাতেন। কিন্তু, তিনিও গাইবেন। ভাইয়া, আপনিও গাইবেন, আমার আবদার রইল। তোমরা সবাই নিজের নিজের ঢঙেই গেয়ো। তবেই তো মজা!’ 

ঠিক হল, আপ্পাজি এক আবর্তন গাইবেন, এক আবর্তন বঢ়হৎ করবেন, আর তারপর মাইক ঘুরবে। প্রত্যেকে এক এক আবর্তন করে বিস্তার করবেন। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত গাইতে রাজি হলেন। খাঁ সাহেবও গাইবেন, কথা দিলেন।

ঘরানার নাম করলাম ইচ্ছে করেই, যাতে এঁদের স্বতন্ত্র সাংগীতিক পরিচয়ের ধারণা পাওয়া যায়। তখনও বয়সে তরুণ, আকাদেমির বৃত্তিধারী ও উঠতি গুরু ওঙ্কার দাদারকারের ওপর ভার পড়ল মাইক নিয়ে সবার কাছে যাওয়ার। কাফি রাগে আপ্পাজি শুরু করলেন, ‘তুম তো করত বরজোরি।’

উপরোক্ত ঘটনা থেকে বোঝা যায়, হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে এই ব্যাপারটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব কতখানি! বেনারসের ঠুমরি সম্রাজ্ঞী গিরিজা দেবী গাইবেন পূরব-অঙ্গের ঠুমরি, আর তাঁর সঙ্গে যোগ দেবেন গোয়ালিয়র ঘরানার আব্দুল রাশিদ খাঁ, পাতিয়ালা ঘরানার অজয় চক্রবর্তী, কিরানা ঘরানার মশকুর আলি খাঁ, আগ্রা ঘরানার শুভ্রা গুহ, সহসওয়ান ঘরানার অরুণ ভাদুড়ি, এমনকি শাজাহানপুর ঘরানার বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত পর্যন্ত!

ঘরানার নাম করলাম ইচ্ছে করেই, যাতে এঁদের স্বতন্ত্র সাংগীতিক পরিচয়ের ধারণা পাওয়া যায়। তখনও বয়সে তরুণ, আকাদেমির বৃত্তিধারী ও উঠতি গুরু ওঙ্কার দাদারকারের ওপর ভার পড়ল মাইক নিয়ে সবার কাছে যাওয়ার। কাফি রাগে আপ্পাজি শুরু করলেন, ‘তুম তো করত বরজোরি।’

মাইক প্রথমে এল অজয় চক্রবর্তীর কাছে। আপ্পাজির পথে কয়েক পা এগিয়েই তিনি বাঁক নেন তাঁর নিজস্ব ঢঙে। পাতিয়ালার ঠুমরি কিছু কম প্রসিদ্ধ নয়, কিন্তু পূরবের সঙ্গে মিল না থাকায় দুই ধারাকে মেলানো যথেষ্ট কঠিন। অজয় চক্রবর্তী বলেই তা সম্ভব হয়েছিল। এমনভাবে তিনি গাইলেন, এমনই পটুতার সঙ্গে, যে দুই ধারার মধ্যে সামান্যতম ফাঁকও ধরা পড়ল না আর। মঞ্চ থেকে আপ্পাজিও তারিফ করলেন খুব। এরপর মাইক এল মশকুর আলি খাঁর কাছে। কাজটা শক্ত। ঠুমরির জন্য আলাদা করে কিরানার খুঁটি খুব মজবুত নয়। কিরানা প্রধানত খেয়ালেরই ঘরানা। মশকুর আলি খাঁ তাও গাইলেন, এবং খেয়ালের অঙ্গে স্বরবিস্তার করেই। শুভ্রা গুহও গাইলেন তাঁর মতো, এমনকি অরুণ ভাদুড়িও। শুভ্রা গুহর গায়নে আগ্রার নিজস্ব রাগ-বঢ়হতের কিছু অঙ্গ ঝিলিক দিয়ে যায়। আগ্রার ঢঙ মূলত ভারী চালের খেয়ালের। পূরব-অঙ্গের ঠুমরির সুরের চলনেও চঞ্চলতা কম, তাই আগ্রার বাহুল্যহীন, সোজাসাপ্টা গায়কির সঙ্গে তা সুন্দরভাবে মিশে গেল। বুদ্ধদেব দাশগুপ্তকে আমি ওই একবারই সামনে থেকে গান গাইতে শুনেছিলাম। তাঁর গানের তালিম এমনই যে, গান শুনে একবারও মনে হয়নি, তাঁর গায়নে কোথাও তিনি সরোদকে অনুকরণ করার চেষ্টা করছেন।

আরও বেশ কিছু গানের পর আপ্পাজির কাছে অনুরোধ এল বিখ্যাত হোরিগান, ‘রঙ ডারুঙ্গী’, গাইবার। গিরিজা দেবীর গলায় যাঁরা ‘রঙ ডারুঙ্গী’ শুনেছেন, তাঁরা জানেন সে অভিজ্ঞতার স্বাদ। আমার প্রজন্মে আমি সেই বিরল কয়েকজনের একজন যে, একাধিকবার সামনে বসে গিরিজা দেবীকে এই গান গাইতে শুনেছি।

সবশেষে মাইক এল আব্দুল রাশিদ খাঁর কাছে। আগেই বলেছি, খাঁ সাহেব তখন শতবর্ষ অতিক্রান্ত। বয়স প্রায় একশো পাঁচ। ওই বয়সে গলায় অতখানি ওজন এবং সুরের স্থায়িত্ব সচরাচর দেখা যায় না। মধ্যসপ্তকে বিস্তার করার সময় গোয়ালিয়রের ঢঙে খাঁ সাহেব যখন বন্দিশ ভরতে ভরতে যাচ্ছেন। বন্দিশ আদা করার সে কায়দা দেখে সবাই রীতিমত স্তব্ধ। বঢ়হৎ করতে করতে খাঁ সাহেব হঠাৎই ‘বরাজোরি’র ‘ব’ ধা-এ উচ্চারণ করে, ‘রা’-তে নিখাদ থেকে ঠেলে তারার রেখাব ছুঁলেন। ‘জো’-তে সা থেকে ঠেলে উঠলেন তারার কোমল গান্ধারে। ক্ষণিকের জন্য হলেও সারা ঘরে তখন একটা চাপা উত্তেজনা। তারপর ‘রি’তে রেখাব হয়ে খাঁ সাহেব যেই ফিরে এলেন সা-এ,  আকাদেমির গুরুরা তো বটেই, সারা ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যেখানে যত সঙ্গীতবোদ্ধা, সবাই একসঙ্গে ‘কেয়াবাৎ’, ‘মাশাল্লাহ’, ‘সুভানাল্লাহ’ প্রভৃতি তারিফে ভরিয়ে দিলেন ঘর। আপ্পাজিও মঞ্চ থেকে হাত জোড় করে প্রণাম জানালেন খাঁ সাহেবকে।

Classical Music
পণ্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সঙ্গে লেখক

আরও বেশ কিছু গানের পর আপ্পাজির কাছে অনুরোধ এল বিখ্যাত হোরিগান, ‘রঙ ডারুঙ্গী’, গাইবার। গিরিজা দেবীর গলায় যাঁরা ‘রঙ ডারুঙ্গী’ শুনেছেন, তাঁরা জানেন সে অভিজ্ঞতার স্বাদ। আমার প্রজন্মে আমি সেই বিরল কয়েকজনের একজন যে, একাধিকবার সামনে বসে গিরিজা দেবীকে এই গান গাইতে শুনেছি।

গানের প্রথম দুকলি একটু লিখে দিই –

রঙ ডারুঙ্গী নন্দকে লালন-পে,

রঙ ডারুঙ্গী, হাঁ, রঙ ডারুঙ্গী রে।

মধ্যসপ্তকে দু-তিন আবর্তন জুড়ে ঘুরল ‘রঙ ডারুঙ্গী’। ঠেকা চলছে ঠেকার মতো, খাঁ সাহেব চলছেন হাতির চালে। ‘নন্দ কে লালন পে’ গাওয়ার সময়ও তাই। লয়ের নানা মারপ্যাঁচের মাধ্যমে বিভিন্ন অসম্ভব বিন্যাসের সাহায্যে ফিরছেন ঠেকার মুখে। এই করতে করতেই আচমকা মুখড়া ধরলেন তারায়। ছন্দে একটু ঝুল নিয়ে ‘রঙ ডারুঙ্গী রে’ বলে ওই ছন্দেই নিজেও যেন দুলে উঠলেন।

এই গান মধ্য সপ্তকের মধ্যমকে সা মেনে গাওয়া হয়। গানের মুখড়া মূলত মধ্যমের আশেপাশেই। সুরের বৈচিত্র্য থাকা সত্ত্বেও এই গানের প্রাণ তার ছন্দে। গাইবার সময় গানের কথা যে ছন্দে বাঁধা, সেই চার-চার ছন্দেই ‘রঙ ডারুঙ্গী’ শব্দ দুটো নিয়েই প্রথম কিছুক্ষণ খেলতেন আপ্পাজি। ছন্দ ছেড়ে বেরোতেনও, কিন্তু ঠেকার নড়চড় হত না। অবাক হয়ে দেখতাম, কী নিপুণ দক্ষতার সঙ্গে প্রতিবারই তীরে এসে নাও ভিড়িয়ে দিতেন। মাইক যখন খাঁ সাহেবের কাছে এল, উনিও দেখি ছন্দ ছেড়েই বিস্তার শুরু করলেন। মধ্যসপ্তকে দু-তিন আবর্তন জুড়ে ঘুরল ‘রঙ ডারুঙ্গী’। ঠেকা চলছে ঠেকার মতো, খাঁ সাহেব চলছেন হাতির চালে। ‘নন্দ কে লালন পে’ গাওয়ার সময়ও তাই। লয়ের নানা মারপ্যাঁচের মাধ্যমে বিভিন্ন অসম্ভব বিন্যাসের সাহায্যে ফিরছেন ঠেকার মুখে। এই করতে করতেই আচমকা মুখড়া ধরলেন তারায়। ছন্দে একটু ঝুল নিয়ে ‘রঙ ডারুঙ্গী রে’ বলে ওই ছন্দেই নিজেও যেন দুলে উঠলেন। কাফিতে খাঁ সাহেবের বিস্তার শুনে ঘরে সবাই মজেই ছিলেন, এবার যে কী হল, তা নিশ্চয়ই আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

অনুষ্ঠান শেষে আপ্পাজি মঞ্চ থেকে নেমে এসে খাঁ সাহেবের পা ছুঁয়ে প্রণাম করলেন।

ভাবলে অবাক লাগে, এমন আসরে নিজে উপস্থিত ছিলাম। তখন রিল বানানোর উন্মাদনা ছিল না, থাকলে আজ ওই অনুষ্ঠান লোকের হাতে হাতে ঘুরত। হয়তো ভালই হত। কিছু শিক্ষার্থীর সাহায্য হত। সাধারণ মানুষ আব্দুল রাশিদ খাঁর নাম জানতে পারতেন। আবার হয়তোবা কিছুই হত না। কিন্তু, চাইলেই হাতের কাছে পেয়ে যাওয়ার চেয়ে, স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বিরল মুহূর্তগুলো একটু দূর থেকে উপভোগ করার যে আনন্দ, তা কি সমাজমাধ্যম দিতে পারত? আমার কাছে এর উত্তর হ্যাঁ ও না, দুটোই!

মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

Picture of সুভদ্রকল্যাণ

সুভদ্রকল্যাণ

সুভদ্রকল্যাণ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক ভারতীয় ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের স্নাতকোত্তর। বর্তমানে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে দ্বিতীয় স্নাতকোত্তর করছেন। স্তরের ছাত্র। বাংলা ও ইংরাজি উভয় ভাষাতেই তাঁর লেখা সংগীত ও সাহিত্য বিষয়ক বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ প্রকাশ পেয়েছে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। বহু বিশিষ্টজনের সাক্ষাৎকার সংগ্রহ করেছেন, সেগুলিও প্রকাশিত ও সমাদৃত। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাঁর লেখা কবিতা প্রকাশ পেয়েছে। মূলত ইংরাজি ভাষায় কবিতা লেখেন সুভদ্রকল্যাণ। তাঁর আরেকটি পরিচয় রাগসঙ্গীতশিল্পী হিসেবে। সংগীতশিক্ষা করেছেন আচার্য শঙ্কর ঘোষ, পণ্ডিত বিক্রম ঘোষ, পণ্ডিত উদয় ভাওয়ালকর, ডঃ রাজিব চক্রবর্তী প্রমুখ গুরুর কাছে। পেয়েছেন একাধিক পুরস্কার ও সম্মাননা।
Picture of সুভদ্রকল্যাণ

সুভদ্রকল্যাণ

সুভদ্রকল্যাণ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক ভারতীয় ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের স্নাতকোত্তর। বর্তমানে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে দ্বিতীয় স্নাতকোত্তর করছেন। স্তরের ছাত্র। বাংলা ও ইংরাজি উভয় ভাষাতেই তাঁর লেখা সংগীত ও সাহিত্য বিষয়ক বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ প্রকাশ পেয়েছে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। বহু বিশিষ্টজনের সাক্ষাৎকার সংগ্রহ করেছেন, সেগুলিও প্রকাশিত ও সমাদৃত। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাঁর লেখা কবিতা প্রকাশ পেয়েছে। মূলত ইংরাজি ভাষায় কবিতা লেখেন সুভদ্রকল্যাণ। তাঁর আরেকটি পরিচয় রাগসঙ্গীতশিল্পী হিসেবে। সংগীতশিক্ষা করেছেন আচার্য শঙ্কর ঘোষ, পণ্ডিত বিক্রম ঘোষ, পণ্ডিত উদয় ভাওয়ালকর, ডঃ রাজিব চক্রবর্তী প্রমুখ গুরুর কাছে। পেয়েছেন একাধিক পুরস্কার ও সম্মাননা।

One Response

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Subscribe To Newsletter

কথাসাহিত্য

হেমেন্দ্রকুমার রায়
বিতস্তা ঘোষাল
নীলাঞ্জন দরিপা

সংস্কৃতি

আহার

অমৃতা ভট্টাচার্য
ইন্দ্রনাথ রুদ্র
অমৃতা ভট্টাচার্য

বিহার

কলমকারী

ফোটো স্টোরি

উপন্যাস

বিতস্তা ঘোষাল
বিতস্তা ঘোষাল
বিতস্তা ঘোষাল
[adning id="384325"]
[adning id="384325"]

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.
  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.
  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.
  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).
  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

 

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com