(Panchanan Karmakar)
শ্রাবণ মাস। সকাল থেকেই অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। কাদামাখা পথে হুগলী নদীর ধার ধরে হেঁটে আসছে এক গ্রামের যুবক, বংশবাটি থেকে চুঁচুড়া সদরে। শতচ্ছিন্ন ছাতা মানছে না। কাঁধে ভারি ঝোলা। বুকের ভেতর প্রবল উত্তেজনা। ১৭৭৮ সালের শ্রাবণের এই ঘোর বর্ষায় পথে নেমেছে যুবক। ঘরে বউ সুধারানী আর মা-বাপ শত কোটি দেবতার নাম আউড়ে চলেছে। ভাই গদাধর বেশ কিছুটা পথ এগিয়ে দিয়ে গেছে- সাবধানে যাস ভাই! সব ভালোয় ভালোয় মিটলে হয়! (Panchanan Karmakar)
পঞ্চানন জড়িয়ে ধরে ভাইকে, ‘সব বর্ণগুলো ঠিক-ঠাক ছাপায় আসবে তো রে ভাই? তিন-চার বছরের দিনরাত্তির পরিশ্রম!’
সুধারানীর চোখের জল যেন আকাশ ভেঙে পড়ছে। বাংলা হরফ নির্মাণের এক ঐতিহাসিক দিন আজ। (Panchanan Karmakar)
আরও পড়ুন: বিস্মৃত পণ্ডিত জগন্নাথ তর্কপঞ্চানন
চুঁচুড়ায় জন অ্যান্ড্রুজের ছোট্ট বাড়িতেই প্রেস। বৃটিশরা তখনও তাদের এলাকায় প্রেস খুলতে দিত না। অগাষ্টাস হিকির অবস্থা কী হয়েছিল সবাই জানে। বৃটিশদের দুর্ণীতির ও অত্যাচারের খবর প্রকাশ পাওয়ার ভয়ে ছাপাখানা খুলতে দিতে চায়নি বৃটিশরা। তাই জন অ্যান্ড্রুজ পর্তুগিজদের এলাকায় খুলেছিল একটি ছোট্ট প্রেস ও সঙ্গে বইয়ের দোকান। এখন পাল্টেছে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর নীতিও। হেস্টিংস বুঝেছে একটা এলাকাকে করায়ত্ত করতে হলে, প্রথমেই দখল করা দরকার ভাষা ও শিক্ষা। ব্যবসা, বাণিজ্য, ধর্ম প্রচার ও রাজনৈতিক কারণে ভাষাকে দখল করা জরুরি। শেখাও জরুরি। ওয়ারেন হেস্টিংস একছত্র অধিপতি তখন এই বাংলার। দু’জন প্রাচ্যবিদ রাইটার এসেছে কলকাতায় রাইটারের চাকরি নিয়ে। ন্যাথানিয়াল ব্রাসো হালেদ আর চার্লস উইলকিন্স। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওরিয়েন্টাল স্টাডিজের ভাষাবিদ উইলিয়াম জোন্সের সান্নিধ্যে থাকা হালেড ও উইলকিন্স ফার্সী শিখেই এসেছে। শিখেছে সংস্কৃত। (Panchanan Karmakar)
পঞ্চানন কর্মকারের ঝোলায় ছোট ছোট লোহার পাত। পাঞ্চ কাটা। এক দেড় ইঞ্চি ছোট ছোট লোহার টুকরোর মাথায় খোদাই করা অআকখ বাংলা বর্ণমালা। ছাপা হবে প্রথম বাংলা হরফ ছাঁদ। ফন্ট, টাইপ ফেস, এইসব কথা পঞ্চানন কর্মকার বোঝে না। সে শুধু বোঝে নকশা। এক একটা হরফ মানে এক একটা নকশা। (Panchanan Karmakar)

গভর্ণর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস দায়িত্ব দিয়েছেন ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর দুই রাইটারকে, সাহেবদের জন্য বাংলা গ্রামার বই ছাপাতে। দুই প্রাচ্যবিদ ন্যাথ্যানিয়াল ব্রাসো হালেদ ও চার্লস উইলকিন্স দিনরাত এক করে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তের দলিল-দস্তাবেজ, পুঁথি যোগাড় করলেন। পড়াশোনা করলেন। দেখলেন একেক অঞ্চলের বাংলা হরফের গড়ন একেক রকম। খাগের কলম দিয়ে তখন লেখা হত তুলট কাগজে বা তালপাতায়। আঁশে আটকে যেত খাগের কলমে লিখতে গিয়ে। ফলে তৈরি হত আঁকাবাঁকা টিকি-দাড়ি বাংলা হরফের। সেই ছাঁদ নকল করত ছাত্ররা। ফলে এক এক এলাকায় এক একরকম হরফছাঁদ চলছিল। হালেদ এবং উইলকিন্স সাহেব পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন জেলার ও এলাকার দলিল-দস্তাবেজ ঘেঁটে, বিভিন্ন পুঁথি পড়ে, বিভিন্ন পন্ডিতদের সঙ্গে আলোচনা করে তৈরি করলেন একটি সুমঞ্জস্য বাংলা হরফছাঁদ। ওঁরা কাগজের উপর নকশা করার মতো করে হরফগুলি লিখলেন। উইলকিন্স ছিলেন নিজেই একজন দক্ষ লিপিকার। বাংলার মেঠো পথে ঘুরে বেড়িয়ে ও পড়াশোনা করে বুঝেছেন ইংরেজি হরফের কাঠিন্য এই বাংলা হরফের গড়নে নেই। বাংলা হরফে দরকার গাঙ্গেয় মাটির নরম পেলবতা আর বাংলা মায়ের লালিত্য। বাংলার জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা শিল্পীর হাতের কাজেই থাকবে সেই সুষমা। হালেদ এবং উইলকিন্স খোঁজা শুরু করলেন ছেনি হাতুড়ি দিয়ে নকশা করা বাংলার শিল্পীকে। (Panchanan Karmakar)
“পঞ্চানন বোঝে এই হরফের ছাঁদকে আরও সুন্দর, আরও কোমল, আরও ঢলোঢলো অনেকটা মায়ের মতো করা দরকার। করবে পঞ্চানন। তবে এখন উৎকণ্ঠা। ছাপা হলে কেমন দেখতে হবে বাংলা হরফ। “
হুগলীর বংশবাটি তথা বাঁশবাড়িয়ার রাজা নৃসিংহদেব তখন গড়ে তুলছেন বংশবাটি এখনকার বাঁশবেড়িয়া। সেখানেই দুর্ভিক্ষপীড়িত ও বর্গী উৎখাত মানুষেরা বসতি তৈরি করছে। রাজবাড়ির বাসন-কোসনে নকশা করার কাজ করে শম্ভু কর্মকার। শম্ভু কর্মকারের দুই ছেলে পঞ্চানন কর্মকার ও গদাধর কর্মকার। পঞ্চানন জন্মেছিল ১৭৫০ সালে জিরাটে বর্গী আক্রমণের সময়। নবজাতক পঞ্চাননকে কোলে নিয়েই শম্ভু কর্মকার স্বপরিবারে চলে আসে বংশবাটিতে। অল্প বয়স থেকেই পঞ্চানন কর্মকারের নকশার কাজ, নাম লেখার ডিজাইন খুব মনে ধরেছে রাজার। চারিদিকে প্রশংসা ছড়িয়ে পড়েছে। চুঁচুড়া, চন্দননগর থেকে অর্ডার আসছে। রাজা নৃসিংহদেবের কাছ থেকে খবর গেল হালেদের কাছে, পঞ্চানন কর্মকারের নাম। মুন্সী খুশমতকে নিয়ে হালেদ ও উইলকিন্স হাজির হল ১৭৭৫-১৭৭৬ সাল নাগাদ বাঁশবাড়িয়ায় পঞ্চাননের বাড়িতে একদিন। পঞ্চাননের বয়স তখন ২৫ বা ২৬। (Panchanan Karmakar)

১৭৭৮ সালের বর্ষাকালের সকালে অঝোর বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে ঢুকল পঞ্চানন অ্যান্ড্রুজের প্রেসে। বুকের ভেতর উত্তেজনা ও উৎকণ্ঠা। সাহেবদের করা হরফের ডিজাইনের বাড়তি টিকি-দাড়ি-খাঁজ কমিয়ে আরও সহজ সরল করেছে পঞ্চানন। যদি সাহেবদের না পছন্দ হয়। পঞ্চানন বোঝে এই হরফের ছাঁদকে আরও সুন্দর, আরও কোমল, আরও ঢলোঢলো অনেকটা মায়ের মতো করা দরকার। করবে পঞ্চানন। তবে এখন উৎকণ্ঠা। ছাপা হলে কেমন দেখতে হবে বাংলা হরফ। (Panchanan Karmakar)
আরও পড়ুন: বিস্মৃত বিপ্লবী কল্পনা দত্ত
বাংলা লিপির প্রথম ছাপার নমুনা পাওয়া যায় ১৬৬৭ সালে, আমস্টারডামে। বইটির নাম সংক্ষেপে বলা হয় “চায়না ইলাস্ট্রেটা”। লেখক- আতানাসি উস কির্থে। ১৬৯২ সালে প্যারিসে ছাপা একটি বইয়ে বাংলা লিপি দেখতে পাওয়া যায়। বইটির বিষয়বস্তু ছিল ভারতবর্ষ। (Panchanan Karmakar)
কিন্তু ছিল না সচল হরফ নির্মাণের বিষয়টি। ছিল না বঙ্গদেশে বাংলা ভাষার মুদ্রণের ক্ষেত্রে সামঞ্জস্যপূর্ণ সর্বজনীন একটি বাংলা লিপির গড়ন। সেই হরফছাঁদ তৈরি করল পঞ্চানন কর্মকার। প্রথম বাঙালি হরফ নির্মাতা অক্ষরশিল্পী, যাঁর তৈরি হরফ ছাপা হচ্ছে বাংলার মাটিতে। (Panchanan Karmakar)

চুঁচুড়ার অ্যান্ড্রুজের ছোট্ট প্রেসে ততক্ষণে এসে গেছে হালেদ ও উইলকিন্স। সাজিয়ে ফেলেছে পঞ্চাননের তৈরি বর্ণমালা। পঞ্চানন একটু দূরে উবু হয়ে বসে। ভিজে গেছে সর্বাঙ্গ। বাইরে প্রবল বৃষ্টি। অ্যান্ড্রুজ মেসিন রেডি করেছে। প্রচণ্ড শব্দে নেমে এল মেসিনের চাকতিতে লাগানো ব্লক, সাদা পাতার উপর। ছাপা হয়েছে প্রথম বর্ণমালা সঠিকভাবে। উল্লাসে জড়িয়ে ধরল হালেদ ও উইলকিন্স পঞ্চানন কর্মকারকে। ১৭৭৮ সালের জুলাই মাসে বর্ষা ঘনঘোর এক দিনে চুঁচুড়া শহরের একটি ছোট্ট ঘরে নির্মাণ হল বাংলা মুদ্রণ লিপি। প্রথম বাংলা গ্রামার বই A Grammar of The Bengal Language by Nathaniel Brassey Halhed, এই বই এর ভূমিকায় হালেদ উল্লেখ করল না পঞ্চানন কর্মকারের নাম। হরফ নির্মাণের সম্পূর্ণ কৃতিত্ব দিয়ে গেল উইলকিন্সকে। পঞ্চানন কর্মকার থেকে গেল অনুল্লেখ, উপেক্ষিত ইতিহাসের পাতায়। (Panchanan Karmakar)
“১৮০১ সালে উইলিয়াম কেরির ডাকে পঞ্চানন কর্মকার এক-প্রকার পালিয়ে এল শ্রীরামপুরে। শ্রীরামপুর মিশন প্রেসে পঞ্চাননকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিল উইলিয়াম কেরি, মার্শম্যান ও ওয়ার্ড। এইখানে এসে জড়ো হল পন্ডিত রামরাম বসু।”
উইলকিন্স, এর পর চলে যায় ইংল্যান্ডে। যাওয়ার সময় পঞ্চানন কর্মকারের জন্য একটি চাকরির ব্যবস্থা করে গেল ফোর্ট উইলিয়ামের ছাপাখানায় বাংলা হরফ নির্মাণের প্রধান হিসেবে। আরেক মুদ্রণ বিশেষজ্ঞ কোলব্রুকের অধীনে পঞ্চাননের চাকরি। কিছুদিন চাকরি করার পর পঞ্চানন বুঝতে পারে দমবন্ধ অবস্থা। সে শিল্পী। সে কামার নয়। বেতনভুক কর্মী হতে চায় না। সে তৈরি করতে চায় আরও সুন্দর বাংলার মায়ের মতো লাবণ্যময় বর্ণমালা। কিন্তু কোলব্রুকের তত্ত্বাবধানে সেই স্বাধীনতা সে পাচ্ছে না। পঞ্চাননের নাম তখন ছাপাখানার জগতে পরিচিত নাম। কিন্তু পঞ্চাননের শিল্পীমন অস্থির। বাংলা হরফকে করতে হবে আরও চিকন সুন্দর ঠিক মায়ের মতো। (Panchanan Karmakar)

১৮০১ সালে উইলিয়াম কেরির ডাকে পঞ্চানন কর্মকার এক-প্রকার পালিয়ে এল শ্রীরামপুরে। শ্রীরামপুর মিশন প্রেসে পঞ্চাননকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিল উইলিয়াম কেরি, মার্শম্যান ও ওয়ার্ড। এইখানে এসে জড়ো হল পন্ডিত রামরাম বসু। পঞ্চানন কর্মকার খুশমতো মুন্সীর হাতের লেখা অনুযায়ী তৈরি করেছিল প্রথম হরফ। এখন মুহুরী কালিপ্রসাদ রায়ের সুন্দর হাতের লেখা অনুযায়ী তৈরি করল খুব সুন্দর এক-একটি লিপি দিয়ে বাংলা বর্ণমালা। ১৮০১ সালের, ৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চাননের তৈরি সুন্দর বাংলা হরফে প্রথম ছাপা হল কেরী সাহেবের অনুবাদে নিউ টেস্টামেন্ট। (Panchanan Karmakar)
শ্রীরামপুরে বটতলার কাছে তৈরি করল নিজের বাড়ি ও হরফ নির্মাণের ফাউন্ড্রি। দেবনাগরী, ওড়িয়া, মারাঠি, হরফ তৈরি হচ্ছে এখানে। পঞ্চাননের আফশোস চিনা হরফটি কাটতে পারেননি। তার আগেই অসুস্থ হয়ে যান তিনি। ১৮০৪ সালে পঞ্চানন কর্মকার শ্রীরামপুরে নিজের বাড়িতে মারা যাযন। উইলিয়াম কেরি বলেছিলেন, তোমার কথা ইতিহাসে লেখা থাকবে পঞ্চানন, বাঙালি ভুলবে না। (Panchanan Karmakar)
আরও পড়ুন: মাস্টারমশাই জ্যোতিষচন্দ্র, এক বিস্মৃত জ্যোতিষ্ক (পর্ব – ৩)
পঞ্চানন কর্মকারের তৈরি বর্ণমালার সংস্কার করলেন পঞ্চাননের নাতি কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে এসে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। ১৮৫০ সালে সেই সংস্কারের পূর্ণ রূপ দেখল বাঙালি “বর্ণপরিচয়”বইতে। যদিও “বর্ণপরিচয়”-এর আগে বাংলা লিপির বা হরফছাঁদের নানা সংস্কার দেখা যায় বিভিন্ন ছোটদের শিক্ষাগ্রন্থে।
১৮২১ সালে ছাপা হয় রাধাকান্ত দেব প্রণীত বাঙ্গলা শিক্ষাগ্রন্থ। ১৮৩০ সালে ‘শিশুবোধক’ এবং ১৮৩৬ সালে বালকের ‘প্রথম পড়িবার বহি’ প্রকাশ হয়। প্রকাশক- কলিকাতা ট্রাস্ট সোসাইটি। (Panchanan Karmakar)
১৮৪০ সালে ‘শিশুসেবধি’ নামে শিশুপাঠ্য প্রকাশিত হয়। ১৮৪৬ সালে ‘বর্ণমালা’ শিশুপাঠ্য প্রকাশ করছে স্কুল বুক সোসাইটি। তবে শেষ পর্যন্ত বাংলা মুদ্রণে বিদ্যাসাগরের সংস্কার করা বর্ণমালা বাঙালির হয়ে উঠেছে। ডিজিটাল বিশ্ব আসার আগে বাংলা বর্ণমালা বাঙালি ব্যবহার করেছে লেখা ও পড়ায় বিদ্যাসাগর প্রণীত ‘বর্ণপরিচয়’ অনুসারে। ডিজিটাল বিশ্বে আজ ইউনিকোড লিপির ব্যবহার। কিন্তু মূল উৎসে আছে প্রথম হরফছাঁদ নির্মাতার অবদান।
পঞ্চানন কর্মকার আজ এক বিস্মৃত বাঙালি হিসেবে থেকে গেলেন ইতিহাসের মলিন ধুলোয়। অথচ তাঁর তৈরি স্বাধীন মুক্ত বাংলা হরফ ছাঁদের উপর দাঁড়িয়ে আছে বাংলা ভাষার ইমারত। (Panchanan Karmakar)
বিশেষ দ্রষ্টব্য: উপরিউক্ত লেখার বানান বা বাক্যের কোনও সংশোধন বা পরিবর্ধন, পরিমার্জন করা হয়নি।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত