(Rituparno Ghosh)
রাতুল শঙ্কর ঘোষ
কথোপকথনে: আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়
রাতুলবাবু, আপনি ঋতুপর্ণ ঘোষ পরিচালিত ‘উৎসব’ ছবিটিতে একটি অন্যতম মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেছেন, এটি আপনার জীবনের সম্ভবত প্রথম অভিনয়ও! আজ ৩০ মে, তাঁর মৃত্যুদিন, আজকের এই আলোচনাও সেই সূত্রেই। কিছু প্রশ্নের মাধ্যমেই আমরা আপনার চোখে চিনে নিতে চাই মানুষটিকে…শুরু করা যাক তাহলে…
আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়: ‘উৎসব’ ছবিতে জয় চরিত্রটি কীভাবে আপনার হয়ে উঠল? এই ছবিতে সুযোগ পাওয়ার গল্পটা সংক্ষিপ্তভাবে শুনে নেওয়া যাক…
রাতুল শঙ্কর: এ এক মজার গল্প। আমি তখন কলেজে পড়ি, হঠাৎ একদিন মা বললেন যে, ঋতু একটা ছবি করছে। তোকে একটা রোলে ভেবেছে। পরে জানতে পারি, ঋতুদা মাকে বলেছিলেন, ‘উৎসব বলে একটা ছবি করছি, এখানে একটি চরিত্রে রাতুলকে ভেবেছি। রাতুলকে যদি এই রোলে রাজি করাতে পারিস, তাহলে তোরও একটা চরিত্র থাকবে ছবিতে…’। এরপর ঋতুদা সরাসরি আমাকে ফোন করার প্রস্তাব দিলে, মা বারণ করে দেন এবং বলেন তিনি নিজে কথা বলে জানাবেন। মজার বিষয় হচ্ছে মা ভয় পেয়েছিলেন আমাকে আচমকা জিজ্ঞাসা করলে আমি যদি মুখের উপর না করে দিই!
অর্থাৎ পুরো বিষয়টা উলটো। এই ছবিতে আমার রাজি হওয়ার উপর নির্ভর করছিল মায়ের চরিত্রটা!

তো যাইহোক, মা যখন এসে প্রস্তাবটা আমাকে দিলেন, আমার একটাই রিয়্যাকশন, ‘অসম্ভব’! কারণ অভিনয়ের জগতটা আমার ভীষণ বোরিং লাগত। ছোটবেলা থেকেই মায়ের সঙ্গে শুটিং-এ যেতাম, গ্রিনরুমে বসে লেখাপড়া শেষ করতাম, মা শট দিতেন আর ঘুরে ঘুরে দেখে যেতেন আমি পড়ছি কি না! কিন্তু সবকিছুর পরও খুব বোরিং লাগত এই অভিনয়ের বিষয়টা। গরমের মধ্যে একই জিনিস বারবার করতে হচ্ছে! তাই শুরুতেই না বলে দিই আমি।
এরপর মাথার মধ্যে চলতে থাকে বিষয়টা, তারপর হঠাৎই গিয়ে মাকে বলি, যে ঋতুদা বলেছিলেন না? ঋতুদাকে হ্যাঁ বলে দাও। আমি করব। ভাবটা যেন, ওঁকে আমি উদ্ধার করছি! এভাবেই শুরু। এবং আরও একটা ইন্টারেস্টিং বিষয় হচ্ছে আমি তখন সেন্ট জেভিয়ার্সে মাস কমিউনিকেশন এবং ভিডিয়োগ্রাফি নিয়ে পড়ছি। খুব অদ্ভুত সব কোইন্সিডেন্স। আমি কলেজে যা পড়ছি, সেগুলোই সিনেমায় তখন হাতেনাতে করছি, শিখছি, দেখছি! এবং সত্যিই আমি ক্লাস টুয়েলভের পর এমবিএ করব ঠিক করেছিলাম! বাইরে কোথাও গিয়ে পড়ব, যেভাবে বাকি বন্ধুরা পড়ছে!
আরও পড়ুন: ঋতুপর্ণ ও উনিশে এপ্রিল
আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়: তাহলে তো এক অর্থে চরিত্রটা আপনার বাস্তব জীবন ঘিরেই গড়ে ওঠা বলে মনে হচ্ছে!
রাতুল শঙ্কর: সেটা না হলেও অদ্ভুত সব মিল! মানে ধরো, আমি এমবিএ পড়তে না গিয়ে ফিল্ম স্টাডিজ জয়েন করলাম। জয়ের চরিত্রটা আবার ভীষণভাবে ফিল্মমেকার হতে চায়, অথচ ওর বাবা জোর করে ওকে এমবিএ করতে পাঠাচ্ছেন। অদ্ভুত সব মজার লিঙ্ক এখানে!
এই ছবির গোটা সময়টা আমার সবচেয়ে বেশি উপভোগ্য সময় বলে মনে হয়। নিজের শুটের অংশ হয়ে গেল, আর বাড়ি ফিরে গেলাম এরকম হত না! ইউনিটের সঙ্গে সারাদিন থাকতে শুরু করলাম, আগে যা বোরিং লাগত, তখন আস্তে আস্তে সেটার প্রতিই ভালবাসা বাড়তে লাগল। খুব ন্যাচারালি হয়ে উঠছে সবকিছু।
আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়: পরিচালকের আসনে যদি আপনি নিজেকে ভাবেন, এই ছবিতে কোথাও কি মহিলা চরিত্রদের বিশেষভাবে প্রকট করে তোলা হয়েছে বলে মনে হয় আপনার? ছবির মূল ছ’জন মহিলা চরিত্রের প্রত্যেকের স্বভাব ও ভাবনার দিক ভীষণভাবে আলাদা করে গড়ে তোলা হয়েছে। যেখানে পুরুষ চরিত্রগুলি বেশিরভাগই সাপোর্ট করে গেছে গল্পের স্বার্থে। এর পিছনে কোনও বিশেষ বার্তা আছে বলে মনে করেন আপনি?
রাতুল শঙ্কর: কারেক্ট! একদমই তাই এবং এটাই ঋতুদার স্পেশালিটি ছিল। উনি যেভাবে মহিলা চরিত্রদের ফুটিয়ে তুলতে পারতেন, আই থিঙ্ক হি ওয়াজ দি বেস্ট। মানে এভাবে ছোট ছোট জিনিস, যেগুলো আমরা দৈনন্দিন দেখি, জানি, এক্সপিরিয়েন্স করি বা শুনি, সেই জিনিসগুলোকে ওভাবে সেলুলয়েডে তুলে ধরাটা! আমার এখনও মনে হয় এটা একমাত্র ঋতুদার পক্ষেই সম্ভব ছিল।

উনি যেভাবে রিলেট করতে পারতেন, এবং ওঁর মহিলা চরিত্ররা হ্যাজ অলওয়েজ বিন ভেরি স্ট্রং ইন হিজ পার্ট। ইট ইজ সাচ এ গুড কোশ্চেন। ইনফ্যাক্ট, তোমার সবকটা প্রশ্নই আমার এত ভাল লেগেছে! সচরাচর এই প্রশ্নগুলো তো পাই না এভাবে! প্রশ্নে বোঝা যাচ্ছে যে তুমি কতটা খুঁটিয়ে দেখেছ।
আরেকটা বিষয় না বললেই নয়, ঋতুদা খুব অদ্ভুতভাবে স্ক্রিপ্ট পড়তেন। যে পড়াটা ভীষণভাবে ইনফ্লুয়েন্স করত। স্ক্রিপ্ট শুনতে শুনতেই হয়তো তুমি ওই চরিত্রের অংশ হয়ে উঠছ! শুধু এই কারণেই ঋতুদার ব্রিফের পর গিয়ে ধরতাম মন্টুমামাকে (সুমন্ত মুখার্জি)। তিনি তখন অ্যাসিস্ট করতেন। সহজভাবে তিনি পুরোটা আবার পড়ে শোনালে এই দুজনের পড়া একত্রে নিয়ে আমি আমার মতো করে ভাবতাম বিষয়টাকে। যেমন ধরো উৎসব-এ আমার বলাটা নিজের একদম পছন্দ হয়নি!
ওঁর একটা অন্যতম গুণ, ছবিতে অতিরিক্ত সংলাপ রাখতেন না। জীবনে যা ঘটছে রোজ, সেটাই তুলে ধরতেন সেলুলয়েডে। এমন কিছু নয়, যা মাথার উপর দিয়ে চলে গেল! অথচ কী পাওয়ারফুল সেসব কাজ!
আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়: কিন্তু ওই সময়টা আপনার যে চরিত্রটা, তার বয়স অনুযায়ী ওটা তো গলা ভাঙারই সময়… তাই না?
রাতুল শঙ্কর: না, গলার আওয়াজ ঠিক না, আমি বলতে চাইছি কথা বলার ধরণটা, যেটা নিয়ে অনেকেই প্রশংসা করলেও আমার ব্যক্তিগতভাবে ভাল লাগেনি।
আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়: কিন্তু ছবির আগে-পরে দর্শকরা আপনাকে চেনেন না, তাঁদের তো কোথাও আরোপিত মনে হয়নি বিষয়টা!
রাতুল শঙ্কর: দেখো, আমি ছবি তো অত করিনি, উৎসব-এর পঁচিশ বছর পর গত বছরে ‘চেকইন চেক আউট’ ছবিটি করলাম। আমার মূলত মিউজিক নিয়ে কাজ! কিন্তু সেই ফিল্ডেও আমি অসম্ভব খুঁতখুঁতে। আমি কখনও নিজের কাজে সন্তুষ্ট হতে পারি না। এক্ষেত্রেও বিষয়টা তেমনই ছিল। তবে ঋতুদা কিছু একটা ভেবেই হয়তো কাজটা ভালবেসেছিলেন। ওঁর একটা অন্যতম গুণ, ছবিতে অতিরিক্ত সংলাপ রাখতেন না। জীবনে যা ঘটছে রোজ, সেটাই তুলে ধরতেন সেলুলয়েডে। এমন কিছু নয়, যা মাথার উপর দিয়ে চলে গেল! অথচ কী পাওয়ারফুল সেসব কাজ! ঋতুদা একটা অভিমানের দৃশ্যেও জানতেন, একজন মহিলার চুড়ির শব্দটা কতটা হলে কিছু না বলেই বুঝিয়ে দেওয়া যাবে। এবং এর চেয়ে কম শব্দে ইমপ্যাক্টটা হত না, তার চেয়ে বেশি হলেও অতিরিক্ত লাউড হয়ে যেত!
এত সুন্দর, আমার মনে হয় উৎসব সত্যি ঋতুদার অন্যতম সেরা কাজ, নট বিকজ আই ওয়াজ আ পার্ট অফ ইট, উৎসব ওঁর অন্যতম সেরা কাজ! আমার এই দুটোই উইক পয়েন্ট, ‘উৎসব’ আর ‘আবহমান’!

আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়: এই ছবির নাম উৎসব, অথচ মূল গল্পটি কেবলই পরিবারকে ঘিরে। তাদের অর্থনৈতিক ওঠাপড়া, সাংসারিক সমস্যা এবং ফেলে আসা সিদ্ধান্তের চারপাশে ঘুরেছে এই ছবি। এই ছবিতে দুর্গাপুজো কি কেবলই পরিবারটিকে এক জায়গায় আনার একটি ছুঁতো? নাকি তার চেয়েও বেশি কিছু?
রাতুল শঙ্কর: আমার না মনে হয়, উৎসবটাও এই ছবির আরেকটা চরিত্র! হ্যাঁ মানে, সবাই আছে, উৎসবও আছে। ইভেন্ট হিসাবে নয়। ও একটা চরিত্র এখানে! কারণ সে আসছে, সে পঞ্চমী, ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী হয়ে চলেও যাচ্ছে। রোজ একটা আলাদা সকাল, রোজ একটা আলাদা ঢাকের শব্দ। তুমি যদি তার মিউজিকও শোনো, দেবুদা এত সুন্দর মিউজিক করেছেন যেখানে প্রত্যেকদিনের ঢাকের আলাদা শব্দটাও ফুটিয়ে তুলেছেন। আমার কাছে এই ছবিতে উৎসব এমন এক চরিত্র, যে এসেছে, থেকেছে এবং সবাই যখন ফিরে গেছে, সেও ফিরে গেছে। অ্যাজ ইফ, উৎসব বলে পরিবারের লোকেরা এসেছে তা নয়, বরং পরিবারের লোকেদের সঙ্গে সময় কাটাতে যেন উৎসব এসেছে এখানে।
আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়: ছবিতে আপনার মায়ের ভূমিকায় যিনি, তিনিই আপনার বাস্তবের মা। জয় হিসাবে কি এই জায়গায় কোনও অ্যাডেড অ্যাডভান্টেজ পেয়েছেন আপনি?

রাতুল শঙ্কর: না, তেমন কোনও বিষয় না। আমি আর মা কখনও আলাদাভাবে রিহার্স করিনি। একদিনও বসিনি আমরা। এই ছবিতে আমাদের প্রথম শটটা ছিল, যেখানে ফেলে যাওয়া সানগ্লাসটা আমি দিতে গেছি এবং বড়দের আলোচনা শুনতে পাওয়ার পর যেখানে মায়ের আউটবার্স্টটা হচ্ছে। ভাবতে পারবে না কী ন্যাচেরালি শটটা হয়েছিল! যেখানে মা বলছেন, ‘আমার সঙ্গে সবাই কেন এরকম করে!’ আর আমি বলছি ‘সব ঠিক করে দেব!’ খুব কঠিন শট, খুবই। বরং এই জায়গায় অনেক ডায়লগ থাকলে বিষয়টা সহজ হতে পারত। ওরকম একটা সিনে অনেক সংলাপ এসে যাওয়ার একটা লোভ ছিল। কিন্তু ঋতুদা আনেননি। সেখানে এসে শুধু দাঁড়িয়ে ওইটুকু সান্ত্বনা দেওয়া! মায়েরও ওটা সবচেয়ে প্রিয় দৃশ্য। কাজেই কোনও কিছু নিয়েই যে খুব ভেবেছি তা নয়। সবটাই কেমনভাবে যেন হয়ে গেছে। আমি নিজেও মানুষটা সেরকম। আই অলওয়েজ গো উইথ দা ফ্লো…
পরে যখন মানুষের সঙ্গে কথা হয়েছে, চিঠি পেয়েছি, সবাই বলেছেন এমন ঘটনা তাঁদের পরিবারেও ছিল এবং তাঁরা কী প্রচণ্ডভাবে সেটা রিলেট করতে পেরেছেন! ঋতুদার এই ম্যাজিক জাস্ট অস্বাভাবিক!
আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়: এই ছবিতে জয়ের মা অর্থাৎ পারুল চরিত্রটি সাধারণ দর্শকের কাছে মূল চরিত্র হয়ে উঠেছে নানা কারণে। তাঁর মাতৃত্বের সঙ্গে তাঁর ফেলে আসা সম্পর্কের টানাপোড়েন চলেছে শুরু থেকে শেষ অবধি। একজন পুরুষ পরিচালকের পক্ষে এতটা ধৈর্য্যশীলভাবে একজন মাকে জিতিয়ে দেওয়া, এ কি কেবলই ঋতুপর্ণসুলভ? নাকি অন্য কোনও পরিচালকের পক্ষেও এটা সম্ভব বলে মনে করেন আপনি?

রাতুল শঙ্কর: একদম। ঋতুদা এটা যেরকমভাবে ডিল করবেন, আমার মনে হয় না ওই সময় যাঁরা পরিচালকরা ছিলেন, তাঁরা কেউই এভাবে এটাকে ডিল করতে পারবেন। আই অ্যাম বিইং ভেরি অনেস্ট, ঋতুদা ওয়াজ এ ডিফারেন্ট লিগ। ইনফ্যাক্ট ওয়াজ বলব না, ‘ইজ’, বিকজ হি ইজ স্টিল দেয়ার।
এখানে পারুলের চরিত্রটা মানে ওর কি হচ্ছে? শি অ্যাকচুয়ালি সিইং হিস্ট্রি রিপিট ইটসেলফ। কারণ ওঁর সঙ্গেও এটা ঘটেছে। একই জিনিস। অথচ দেখো, এখানে এই চরিত্রটা কিন্তু ভিন্ডিক্টিভ লাগেনি। আমাদের একসঙ্গে দেখলেই দুজনকে আলাদা জায়গায় পাঠিয়ে দেওয়া বা যে দুশ্চিন্তা মায়ের, সেটাও কিন্তু খারাপ অর্থে না। এটা একপ্রকার পজেসিভনেস। তিনি চান না আমাদের সঙ্গেও সেটাই ঘটুক যা তাঁদের সঙ্গে হয়েছে। হয়তো শম্পার কোথাও দূরে বিয়ে হয়ে যাবে। আমি পড়তে বাইরে চলে যাব, কিন্তু তখনও মায়েরই মতো কেউ শম্পার পাশে দাঁড়াবে না, এটাই মায়ের চিন্তার জায়গা।
সে সময়ে দাঁড়িয়ে এমন রিস্কি একটা অনুষঙ্গ ছবিতে আনা, এবং সেটাকে এত অপূর্ব সামলানো! তুমি বিশ্বাস করবে না, পরে যখন মানুষের সঙ্গে কথা হয়েছে, চিঠি পেয়েছি, সবাই বলেছেন এমন ঘটনা তাঁদের পরিবারেও ছিল এবং তাঁরা কী প্রচণ্ডভাবে সেটা রিলেট করতে পেরেছেন! ঋতুদার এই ম্যাজিক জাস্ট অস্বাভাবিক!
আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়: ছবিতে জয়-এর মা অর্থাৎ পারুলের মতো মুখ্য চরিত্রের জীবনসঙ্গীকে একবারের জন্যও পর্দায় আনা হল না। তাঁর ছেলেবেলার প্রেমকেও দেখা গেল কেবল একটি দৃশ্যেই। সেই সময় দাঁড়িয়ে দর্শকদের জন্য এটা কি দুঃসাহসিকতা নয়?

রাতুল শঙ্কর: কারেক্ট! কিন্তু ভেবে দেখো, ওই চরিত্রটা সম্পর্কে বা তাঁর স্বভাব সম্পর্কে বুঝতে কি কোথাও অসুবিধা হয়েছে? ঋতুদা কী স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন চরিত্রটি! ওই যে বললাম, এই জিনিসটা ঋতুদাই করতে পারতেন। আমি জানি না, আর কেউ এটা করতে পারতেন কি না। ওঁর ধরো শুধু রেফারেন্স আসছে, তাও কেবল একটা ফোন কল, তাতেও কোনও সরাসরি সংলাপ নেই। কিচ্ছু না। এভাবে এই ট্রিটমেন্টটা করা এবং সেটাকে এরকম সফলভাবে, অকল্পনীয়! এই যে আরেকটা চরিত্র তৈরি করে ফেলা, যাঁকে আমরা শুরু থেকে শেষ অব্দি দেখলামই না। তিনি কীরকম দেখতে, কিছুই জানলাম না। কিন্তু কী পাওয়ারফুল একটা এক্সিস্টেন্স! এটাই ঋতুদার ম্যাজিক!
আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়: উৎসব ছবিটি ফিরে ফিরে দেখলে, এমন অনেক দৃশ্য আমরা দেখতে পাই, যেখানে প্রশ্নের বা উত্তরের কোনও প্রত্যুত্তর আমরা আশা করলেও তা ছবিতে নেই। এই নিঃশব্দতা কিছুটা কাব্যিক এবং চলচ্চিত্রে খানিক অস্বাভাবিকও সেই সময়ের নিরিখে। এই স্তব্ধতা আপনার কাছে অভিনেতা হিসাবে কতটা প্রয়োজনীয় মনে হয়েছে?

রাতুল শঙ্কর: ভীষণ। মানে, কী বলব! আমার মনে হয় যেকোনও ছবি, সেটা ফুটে ওঠে বা দাঁড়ায় তার মোমেন্টসগুলো দিয়ে। মানে একটা পুরো ছবির সব কটা ডায়ালগ, সব কটা সিন নিয়ে তো একটা ছবির গড়ে ওঠা, কিন্তু কোথাও এখানে বাড়তি কথা নেই। ঋতুদা কুড ক্রিয়েট দিজ মোমেন্টস থ্রু সাইলেন্স! যেটা বলছ কোনও প্রত্যুত্তর নেই… মানে এমনভাবে তুমি ছবিটার মধ্যে ঢুকে যাচ্ছ যে তুমি উত্তরগুলো কিন্তু নিজেই দিচ্ছ, নিজেই পেয়ে যাচ্ছ।
মানে সত্যি আমার যে কী প্রিয় ওই সিনটা, মা আর টিটো মামার (দীপঙ্কর দে) নিচে ঠাকুরদালানে দেখা হওয়াটা, মা ওই যে প্রদীপ জ্বালাচ্ছেন, টিটো মামা ফিরে এলেন! শিশির চরিত্রটা কী পিভোটাল একটা চরিত্র! শুরু থেকে শেষ অব্দি! অথচ মাত্র দু মিনিটের আলো-আঁধারিতে তাঁর অস্তিত্ব গোটা ছবিতে। শিশির এখানে ফ্রেঞ্চ টোস্টের কথা বলছেন, মে বি মায়ের আর ওঁর এই ফ্রেঞ্চ টোস্টের হয়তো কোনও পুরনো ভাল স্মৃতি রয়েছে। অথচ সেটা কোথাও ডিসক্লোসড হচ্ছে না। এই যে ক্যানভাসের একটা ছোট্ট কোণে রঙ করে পুরোটা সাদা ছেড়ে দেওয়া দর্শকের জন্য, যে সে যা ইচ্ছা রঙ করে নেবে, এটাই তো ম্যাজিক!
ভাল লাগা আর ভালবাসার মধ্যের সূক্ষ্ম লাইনটা মুছে যাচ্ছে। ধরে নাও ইন্সটাগ্রাম, যেখানে তুমি কিছু লাইক করতে চাও, অথচ ভিজ্যুয়ালি সেখানে লাভ পড়ছে, লজিকালি ইউ আর লাইকিং সামথিং বাট দি ভিজুয়াল ইস ইউ আর লাভিং ইট! এই মাঝের লাইনটা খুব ব্লারি হয়ে গেছে।
আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়: ছবিতে জয় সদ্য প্রাপ্তবয়স্ক এক যুবক। যিনি তাঁর এক তুতো বোনের সঙ্গে একটি প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছেন। তাঁর মায়ের মুখে সেই দুশ্চিন্তা গোটা ছবি জুড়েই ছড়িয়ে আছে। সেই দুশ্চিন্তা খানিক পুনরাবৃত্তির ভয়। কিন্তু সে ভয় কি কোথাও গিয়ে সন্দেহের জায়গায় পৌঁছে যাওয়া স্বাভাবিক ছিল না? গল্পে তা কখনই যায়নি। জয় এবং জয়ের তুতো বোনের মধ্যে হাত ধরা আর প্রণামের দৃশ্য ছাড়া কোথাওই সেই লাগামও ভাঙেনি… অথচ তারামণ্ডলের যে ঘটনার উল্লেখ আরও কম বয়সের কথায় রয়েছে, সেই আন্দাজে বয়সের সঙ্গে এই প্রেম আরও ঘন হয়ে যাওয়াই কি কাম্য ছিল না?

রাতুল শঙ্কর: হয়তো! তবে খুব ক্লোজ হওয়ার কোনও জায়গা ছবিতে ছিল না। মানে গল্পগুজব বা কথা বলার দিক দিয়েও। যোগাযোগ কম, আজকের মতো ফোন নেই মানুষের হাতে! আসলে আমাদের স্কুল কলেজের সময়েও ভালবাসায় দেখা হওয়াটাও খুব বড় বিষয় ছিল। এই দুটো চরিত্র যে রোজ ফোনে কথা বলত এমনটাও কিন্তু নয়, পুজোর সময় ওই একবার দেখা হওয়াটাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
আসলে আজকের দিনে একটা সমস্যা কী জানো? ভাল লাগা আর ভালবাসার মধ্যের সূক্ষ্ম লাইনটা মুছে যাচ্ছে। ধরে নাও ইন্সটাগ্রাম, যেখানে তুমি কিছু লাইক করতে চাও, অথচ ভিজ্যুয়ালি সেখানে লাভ পড়ছে, লজিকালি ইউ আর লাইকিং সামথিং বাট দি ভিজুয়াল ইস ইউ আর লাভিং ইট! এই মাঝের লাইনটা খুব ব্লারি হয়ে গেছে। তবে চরিত্র দুটোর টান কিন্তু গোটা ছবি জুড়েই বোঝা গেছে। কিন্তু কোথাও একটা থ্রেসোল্ড ছিল। সেটা তারা দুজনেই বুঝত।
আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়: ঋতুপর্ণ ঘোষের সিনেমায় পুরুষ চরিত্রদের স্মোকিং, এক অন্যতম মোটিফ হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রায় সর্বত্র। অথচ জয়ের মতো একজন যুবক, যার বেড়ে ওঠা বিদেশে, সে গোটা ছবিতে কোথাও লুকিয়েও একটি সিগারেট খায়নি। কোথাও কি এই চরিত্রটির মধ্যে কিছুটা ইনোসেন্স বজায় রাখতে চেয়েছেন পরিচালক?

রাতুল শঙ্কর: এটা ছিল। এটা ছিল। আমাকে ঋতুদা জিজ্ঞেসও করেছিলেন। স্পেশালি ওই সিনটা যেখানে আমি একটা বেঞ্চে বসে আছি আর অর্পিতা প্ল্যানেটরিয়ামের প্রসঙ্গটি তুলছে। ‘অমল ধবল’ গাইছে ও। ওই সিনটায়। আমায় জিজ্ঞাসা করেছিলেন ‘তুই সিগারেট খাস? সিগারেট খেতে পারবি?’
আমি বলেছিলাম, ‘না’। তখন ঋতুদা বলেন, “না তাহলে রাখা যাবে না। ভাবছিলাম তোকে এই সিনে একটা সিগারেট দেব। কিন্তু তুই যদি না খাস মানে তোর যদি খাওয়ার অভ্যেস না থাকে, তাহলে সেটা বোঝা যাবে! ওভাবে রাখা যাবে না…”
অতএব ঋতুদার মাথায় যে আসেনি, তা কিন্তু নয়!
আমি পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করে দিয়েছিলাম। যা হয়েছিল খুব ন্যাচেরালি হয়েছিল। হয়তো কিছুটা বয়সের কারণেও এসব মাথায় আসেনি। ইনপুট দেওয়ার তো সাহস হত না, কিন্তু জিজ্ঞাসা করারও ইচ্ছা হয়নি কখনও।
আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়: হ্যাঁ, এইটাই প্রশ্ন ছিল, এত বড় একটা বাড়িতে এই বয়সি একজন ছেলে, কোথাও গিয়ে একবার লুকিয়ে হলেও স্মোকিং-এর সিন এল না কেন!
রাতুল শঙ্কর: ঠিক! এবং ওই বয়সে ওটাই খুব স্বাভাবিক। থাকাটাই খুব স্বাভাবিক ছিল।
আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়: গোটা ছবিতে একমাত্র শিশির চরিত্রটি ছাড়া সকলেই আপনার পূর্বপরিচিত এবং আত্মীয়। অথচ ছবিতে আপনার মা এবং এক বোন ছাড়া কারুর সঙ্গে আপনার সরাসরি কোনও সংলাপ নেই। কখনও পরিচালককে জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছা করেছিল, এটি কেন?
রাতুল শঙ্কর: না, কখনওই না। একদমই মনে হয়নি। ছবিতে আমার সব কথোপকথনই মা আর অর্পিতার সঙ্গেই ছিল। আর একটা বোধহয় ঋতুদির সঙ্গেও ছিল, ওই যে ডিভোর্সের চিঠিটা দিতে যাই যখন ঘরে।
না আমার এই প্রশ্নটাও মনে হয়নি। আমি পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করে দিয়েছিলাম। যা হয়েছিল খুব ন্যাচেরালি হয়েছিল। হয়তো কিছুটা বয়সের কারণেও এসব মাথায় আসেনি। ইনপুট দেওয়ার তো সাহস হত না, কিন্তু জিজ্ঞাসা করারও ইচ্ছা হয়নি কখনও।
তবে তুমি দেখবে, সবার সঙ্গে সবার কথা না থাকলেও, বা সংলাপ না থাকলেও পারস্পরিক সম্পর্কগুলো খুব পরিষ্কার। খুবই। কে কাকে নিয়ে কী ভাবছে, সবই ফুটে উঠেছে। চরিত্রগুলো একদম কাচের মতো পরিষ্কার।

আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়: ছবিতে দরজার এবং জানলার ব্যবহার আমরা প্রবলভাবে দেখতে পাই। এই বন্ধ বা খোলা দরজার আড়ালে কি সম্পর্কের দূরত্ব বোঝাতে চেয়েছেন পরিচালক?
রাতুল শঙ্কর: অনেস্টলি, আমি সেরমভাবে ভাবিনি। হয়তো জানিওনা। হতে পারে ঋতুদা পার্পাসফুলি এটা করেছেন। তবে আমার যেটা মনে হয়েছে খুব, সব চরিত্রগুলিই বাড়ি ফিরেছে নিজেদের মধ্যে এক-একটা বন্ধ দরজা নিয়ে। এই পুজোয় এসে কারুরটা খুলেছে, কারুর দরজা তখনও বন্ধ, কারুরটা হাওয়া দিলেই খুলে যাবে। প্রত্যেকে তাঁদের একটা করে জার্নি লুকিয়ে রেখেছেন এই দরজার পিছনে।
২৬ বছর হয়ে গেল ‘উৎসব’-এর। এখন এই চরিত্রগুলি কোথায়? তারা কী করছে? এইসব প্রশ্নের উত্তর একমাত্র ঋতুদাই দিতে পারতেন। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, সেসব ঋতুদার সঙ্গেই চলে গেছে… উৎসব-এর অধিকাংশজনই এখনও বেঁচে, পঁচিশ বছর পর তাঁদের নিয়ে আবার একটি ছবি হতেই পারত না কি?
এখানে বুম্বাদার একটা জার্নি রয়েছে, আমার চরিত্রে একাধিক টার্ময়েল, ঋতুদির ডিভোর্সের উপর পুরো বাড়ির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। তাই আমার মনে হয় দরজাগুলো খুব সিম্বলিক এখানে।

আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়: এবার শেষের পথে… শেষতম প্রশ্ন, খুবই সাধারণ একটা প্রশ্ন। মানুষ ঋতুপর্ণ ঘোষের কাছে যদি আরেকবার কোনও কিছু জিজ্ঞাসা করতে চান ‘উৎসব’ নিয়ে, সেই প্রশ্নটি কী হবে?
রাতুল শঙ্কর: সে প্রশ্ন হয়তো এই ছবি নিয়ে হত না। ঋতুদাকে বলতাম যে তোমায় এখন খুব দরকার ছিল। অনেকের হয়ে তোমার অনেক কিছু বলার ছিল, দেখানোর ছিল। আরও কত ভাল ভাল কাজ হতে পারত।
সেদিন অর্পিতার সঙ্গে কথাও হচ্ছিল, ২৬ বছর হয়ে গেল ‘উৎসব’-এর। এখন এই চরিত্রগুলি কোথায়? তারা কী করছে? এইসব প্রশ্নের উত্তর একমাত্র ঋতুদাই দিতে পারতেন। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, সেসব ঋতুদার সঙ্গেই চলে গেছে… উৎসব-এর অধিকাংশজনই এখনও বেঁচে, পঁচিশ বছর পর তাঁদের নিয়ে আবার একটি ছবি হতেই পারত না কি? তবে সেই কেমিস্ট্রি ঋতুদা ছাড়া কেউ হ্যান্ডেল করতে পারতেন না।
মনে পড়ে, এই ছবির প্রিমিয়ার হয়েছিল আটলান্টিক সিটিতে, সেখানে ঋতুদা আমাকে ডেকে পরের ছবির প্রস্তাব শোনান, সেই চরিত্রটি একেবারেই আমার ধাঁচের নয় দেখে আমি না বলি সরাসরি। এখান থেকেই আমাদের সম্পর্কে একটা ঠান্ডা বিষয় ঢুকে যায়। এই সমস্যা চলে দীর্ঘদিন! একই ঘরে কাজের সূত্রে দেখা হলেও আমাদের কথা হত না বহুদিন। তার বহুদিন পর, ‘চিত্রাঙ্গদা’র ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক রেকর্ডিং-এর সময়, একটি সামান্য কথায় পুরো বরফ ভেঙে দেন ঋতুদা। সমস্ত কিছু নর্মাল হয়ে যায়! এতটাই নর্মাল যে মনে হয় কিছুই তো ছিল না এতদিন! এমনই মানুষ ছিলেন ঋতুদা! ভাবি সেদিন হ্যাঁ বলে দিলে হয়তো আমার জীবনটা অন্য পথে গড়াত… কিন্তু যা হয় ভালর জন্যই। কেবল ওঁর চলে যাওয়াটা খুব খারাপ। খুব মিস করি ঋতুদাকে…
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
One Response
lekhata mon chuye gelo