(Probal Dasgupta)
মা প্রয়াত হওয়ার পর শোকাহত ছিলাম বেশ কিছুদিন। সেই সময় মোবাইলে হঠাৎ তাঁর একটি মেসেজ। সুন্দর একটি বার্তা লিখে পাঠিয়েছিলেন অধ্যাপক প্রবাল দাশগুপ্ত। অমন গভীর দুঃখে খানিকটা প্রলেপ দিয়েছিল তাঁর সেই মেসেজ। আজ তাঁর স্মৃতিলেখ লিখতে বসে মনে পড়ছে সেই মেসেজের কথাটা।
অধ্যাপক প্রবাল দাশগুপ্তের সঙ্গে আমাদের পারিবারিক পরিচয় অনেকদিনের। প্রবালবাবুর বাবা অরুণ দাশগুপ্ত ছিলেন আমার বাবা সুভদ্রকুমার সেনের সহকর্মী। বাবার সঙ্গে প্রবালবাবুর পরিচয় কতদিনের, তা সঠিকভাবে বলতে না পারলেও, ১৯৮০ সাল থেকে তো হবেই। দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বা নিত্য যোগাযোগ না থাকলেও পরিচয় ছিল যথেষ্ট। দুজনেই দুজনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।
আরও পড়ুন: রায়বাবুর সই করা চেক কখনও ব্যাঙ্কে ফেলেননি শংকর
ভাষাতত্ত্বে দুজনের গবেষণার জগৎ সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। তাঁদের মধ্যে খুব বেশি একাডেমিক আদানপ্রদান কোনওদিনই দেখিনি। তবে আমার পিতামহ সুকুমার সেনের সঙ্গে প্রবালবাবু একবার দেখা করতে এসেছিলেন। ১৯৮৪ সালের কথা। পরে সেই গল্প প্রবালবাবুই একাধিকবার করেছিলেন আমাকে। এছাড়া ২০০১ সালে বাবার কাছেও একবার এসেছিলেন, সঙ্গে ছিল ছোট আবীর ও অধ্যাপক মীনা দাঁ। দুজনের মধ্যে সেদিন অনেক বিষয়ে কথা হয়েছিল। সেই আমার প্রবালবাবুকে প্রথম দেখা। সেদিনের আগে ২০০০ সালে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল চিঠির মাধ্যমে। বাক্যতত্ত্ব কীভাবে সহজ করে বুঝে নেওয়া যাবে, তা লিখেছিলেন চিঠিতে। তারপর বহুবার বহু জায়গায় দেখা হয়েছে, যদিও তাঁর ঘনিষ্ঠ বলয়ে কোনওদিন প্রবেশ করিনি।
গত কয়েক বছর খানিক ঘনিষ্ঠতা বেড়েছিল দুজনেই একটি সরকারি কমিটিতে থাকায়। নানা বিষয়ে তখন আলোচনা হয়েছে। উপলব্ধি করেছি ওঁর গভীর পাণ্ডিত্য। আমার চাকরির পদোন্নতিতে দু-দুবার উনি ইন্টারডিউ বোর্ডে ছিলেন। সত্যি বলতে কী, তখন বেশ ভয় লেগেছিল। তবে এত সহজ করে প্রশ্ন করেছিলেন যে, ভয় কেটে গিয়েছিল।

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের প্রজন্মে বাঙালি ভাষাতাত্ত্বিকদের সার্থক উত্তরাধিকারী ছিলেন প্রবাল দাশগুপ্ত। যদিও তাঁর গবেষণা ও লেখালেখি সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের প্রজন্মের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। প্রবালবাবুর বাবা অরুণ দাশগুপ্ত এবং মা মানসী দাশগুপ্ত দুজনেই ছিলেন কৃতী অধ্যাপক। অরুণ দাশগুপ্ত ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের অধ্যাপক। অন্যদিকে মানসী দাশগুপ্ত শ্রীশিক্ষায়তন কলেজের অধ্যক্ষ ও পরবর্তীকালে বিশ্বভারতীর রবীন্দ্রভবনের অধ্যক্ষ। বিদ্যাচর্চায় বাবা-মায়ের আগ্রহই হয়তো অল্প বয়সে সঞ্চারিত হয়েছিল পুত্রের মধ্যে।
ছোটবেলায় প্রবালবাবুর কিছুটা সময় কেটেছিল আমেরিকায়। তখন অরুণ দাশগুপ্ত উচ্চতর গবেষণার জন্য মার্কিন মুলুকে। ১৯৫৭ থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত মার্কিন মুলুকে কাটিয়ে, কলকাতায় ফিরে ভর্তি হন সেন্ট লরেন্স হাই স্কুলে। পরে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজিয়েট স্কুলে। এরপর সংস্কৃত কলেজে ভাষাতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা, ও পুনের ডেকান কলেজে স্নাতকোত্তরের পাঠ।
বাংলা ও ইংরেজিতে বাক্যতত্ত্বের সঙ্গে ন্যায়দর্শনের গভীর সম্পর্কের দিকটি সঠিকভাবে অনুধাবন করেছিলেন অধ্যাপক দাশগুপ্ত। ঐতিহ্যের প্রতি ছিল গভীর টান।
স্নাতকোত্তর শেষ করে উচ্চতর গবেষণার জন্য ফের আমেরিকা গিয়েছিলেন। ১৯৮০ সালে গবেষণার কাজ সেরে দেশে ফিরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাতত্ত্ব বিভাগে লেকচারার হিসেবে যোগ দেন। তবে খুব বেশিদিন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেননি প্রবালবাবু। দীর্ঘ বেশ কিছু বছর প্রথমে পুনের ডেকান কলেজ, ও তারপর হায়দ্রাবাদের কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। ২০০৬ সালে ফের কলকাতায় ফিরেছিলেন, যোগ দেন ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিক্যাল ইনস্টিটিউটে। ২০১৮ সালে সেখান থেকেই তিনি অবসর নেন।
বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব, বাক্যতত্ত্ব ও পরবর্তীকালে আকরণবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা বাংলা রূপতত্ত্ব ও পদানুতত্ত্ব নিয়ে প্রবাল দাশগুপ্তর গবেষণা ও লেখালেখির অসংখ্য নজির রয়েছে। বাংলা ও ইংরেজিতে বাক্যতত্ত্বের সঙ্গে ন্যায়দর্শনের গভীর সম্পর্কের দিকটি সঠিকভাবে অনুধাবন করেছিলেন অধ্যাপক দাশগুপ্ত। ঐতিহ্যের প্রতি ছিল গভীর টান।

সংস্কৃত কলেজের ছাত্র হলেও বরাবর ছিলেন গভীর যুক্তিবাদী। বিশেষ করে পাশ্চাত্যের যুক্তিবাদের প্রতি ছিল প্রবল আকর্ষণ। জীবনের দু-দফায় চার চার আট বছর মার্কিন দেশে বসবাস করার ফলেই হয়তো পাশ্চাত্যের যুক্তিবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন, এর সঙ্গে তাঁর যুক্ত হয়েছিল গভীর প্রজ্ঞা ও মেধা। ঐতিহ্যের প্রতি টান, যুক্তিবাদী মন ও মেধা এই তিনের সংস্পর্শের জন্যই অধ্যাপক দাশগুপ্ত ভারতীয় ন্যায় দর্শনের সঙ্গে চমস্কীয় বাক্যতত্ত্বের অদৃশ্য যোগাযোগটি দেখতে পেয়েছিলেন।
প্রসঙ্গক্রমে, সংস্কৃত কলেজে বন্ধু হিসেবে পেয়েছিলেন বিখ্যাত দার্শনিক অরিন্দম চক্রবর্তীকে। একাধিক ভাষার উপরে দক্ষতা ছিল প্রবাল দাশগুপ্তের। বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি সংস্কৃত, পালি, মারাঠী, অল্পবিস্তর রাশিয়ান-ফরাসী-জার্মান ভাষার প্রতি আগ্রহ ছিল।
এসপেরান্ত আসলে একটি কৃত্রিম ভাষা, যা ১৮৮৭ সালে তৈরি করেছিলেন লাইজের জামেনহপ। অধ্যাপক দাশগুপ্তের কাছ থেকে এসপেরান্ত চর্চা ছিল ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি দিক।
তবে প্রবাল দাশগুপ্তের পরিচয় অসম্পূর্ণ থেকে যাবে তাঁর এসপেরান্ত চর্চার কথা উল্লেখ না করলে। এ ব্যাপারে তিনি সত্যিই আন্তর্জাতিক। প্রবাল দাশগুপ্তের বিদ্যাচর্চার একটি প্রধান দিক হল তাঁর এসপেরান্ত চর্চা। বাংলা ও ইংরেজির মতোই এসপেরান্ত ভাষায় তিনি অনর্গল কথা বলতে পারতেন। মাত্র ১৪ বছর থেকে তিনি এসপেরান্ত চর্চায় যুক্ত ছিলেন। ‘ইউনিভার্সাল এসপেরান্ত অ্যাসোসিয়েশন’ বা ‘আকাদেমিও দে এসপেরান্ত’ সভাপতি হওয়ার মতো বিরল সম্মান অধ্যাপক প্রবাল দাশগুপ্ত অর্জন করেছিলেন।
এসপেরান্ত আসলে একটি কৃত্রিম ভাষা, যা ১৮৮৭ সালে তৈরি করেছিলেন লাইজের জামেনহপ। অধ্যাপক দাশগুপ্তের কাছ থেকে এসপেরান্ত চর্চা ছিল ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি দিক। এই ভাষার অধিকার তাঁর দৃষ্টিতে ছিল মানবাধিকার চর্চার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বরাবরই মানবাধিকার চর্চার প্রতি অধ্যাপক দাশগুপ্তের প্রবল আগ্রহ ছিল।

আসলে প্রবালবাবু শুধু ভাষাবিদ ছিলেন না, ছিলেন প্রকৃত অর্থেই একজন চিন্তাবিদ। শুধু ভারতের নয়, বিভিন্ন দেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক ঘটনাবলী নিয়ে সবসময় ভাবিত থাকতেন। কোনও দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না হলেও, রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিলেন। প্রবাল দাশগুপ্তের আরও একটি দিক ছিল তাঁর অনুবাদের কাজ। অনুবাদ চর্চার সঙ্গে সারা জীবন জড়িত থেকেছেন। অনুবাদচর্চার প্রতি আকর্ষণ সম্ভবত এসেছিল এসপেরান্ত চর্চা থেকে। বাংলা থেকে এসপারেন্ত, এসপারেন্ত থেকে বাংলা প্রচুর অনুবাদ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়, মানসী দাশগুপ্তের রচনা এসপেরান্ত ভাষায় তিনি অনুবাদ করেছেন।
এসপেরান্ত ছিল প্রবালবাবুর কাছে ভাষার সীমানাকে ভেদ করে বিশ্বজনীন এক সম্পর্ক তৈরি করার সুযোগ। কোনও ভাষার উপরে অন্য ভাষার আগ্রাসনের বরাবরই বিরোধী ছিলেন। ভাষিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মুখ ছিল এসপারেন্ত ভাষা। কারণ এই ভাষা আদলে কৃত্রিম হলেও ব্যাকরণের দিক থেকে অত্যন্ত সহজ ও সরল, যা মানুষ সহজেই শিখতে ও ব্যবহার করতে পারবে। দেশ কালের সীমানা ছাড়িয়ে সমগ্র মানব জাতির সাধারণ ‘বুলি’ হয়ে উঠবে একদিন এসপেরান্ত। হয়তো এইরকম বিশ্বাস এবং আশায় ভর করেই আমাদের দেশে প্রবাল দাশগুপ্ত বা বাদল সরকার সারাজীবন ব্যাপৃত থেকেছেন এসপারেন্ত চর্চায়।
মাত্র ১৮ বছর বয়সে ‘Linguistic Society of India’-র জার্নালে ভারতীয় ভাষাতত্ত্ব নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ লিখে বিদ্বৎসমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ইংরেজি ও বাংলা মিলিয়ে বহু প্রবন্ধ এবং একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন।
‘ভাষা’, ‘জিজ্ঞাসা’, ‘প্রমা’, ‘অমৃতলোক’, ‘আলোচনা চক্র’ প্রভৃতি পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করতেন প্রবালবাবু। মাত্র ১৮ বছর বয়সে ‘Linguistic Society of India’-র জার্নালে ভারতীয় ভাষাতত্ত্ব নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ লিখে বিদ্বৎসমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ইংরেজি ও বাংলা মিলিয়ে বহু প্রবন্ধ এবং একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন।

বাংলায় তাঁর প্রথম প্রকাশিত বই ‘কথার ক্রিয়াকর্ম’ (১৯৮৭)। পরবর্তীকালে লিখেছেন ‘ছিন্ন কথায় সাজিয়ে তরণী’ (২০১০), ‘ভাষার বিন্দুবিসর্গ’ (২০১২), ‘মেরুর প্রার্থনা বিষুবের উত্তর’ (২০১৫), ‘ভাষার আকৃত চেহারা’ (২০২৫) এবং ‘সম্বোধনের সন্ধানে’ (২০২৬)।
ইংরেজি গ্রন্থগুলির মধ্যে দুটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য ‘Exploration in Indian Sociolinguistics’ (১৯৯৫), ‘After Etymology: Towards a Substantivist linguistics’ (২০০০)। তাঁর মতো এমন উচ্চস্তরীয় চিন্তাবিদের প্রয়াণ বাঙালির সংস্কৃতি জগতকে রিক্ত করল নিঃসন্দেহে।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত