(Gautam Biswas Interview)
গৌতম বিশ্বাস
কথোপকথনে সংকেত ধর
দিনরাত তাঁদের প্রচেষ্টা থাকে মানুষকে সুস্থ করে তোলার, মৃত্যুকে হারিয়ে জীবনকে উদযাপন করার। কিংবদন্তি চিকিৎসক ও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে তাই প্রতি বছর ১লা জুলাই পালন করা হয় ডক্টরস ডে। তবে স্টেথোস্কোপ, ছুরি, কাঁচি ছাড়াও বহু ডাক্তারের থাকে নিজস্ব কিছু শখ বা নেশা। বিশিষ্ট ইএনটি বিশেষজ্ঞ গৌতম বিশ্বাস যেমন ডাক্তারি পেশায় নাম করার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে লালন করে চলেছেন তাঁর ফটোগ্রাফির শখটিও। ডাক্তারি, ছবি তোলার শখ, এই সমস্ত নিয়েই আজ বাংলালাইভ তাঁর মুখোমুখি।
সংকেত ধর: আপনি মেডিকেল কলেজ থেকে ছুরি, কাঁচি বয়ে রোগীর বাড়ি নিয়ে গিয়ে নাকি ওটি করেছিলেন। ওই ঘটনাটা কি সত্যি? আরেকবার বলা যায় আমাদের পাঠকদের জন্য?

গৌতম বিশ্বাস: এই প্রশ্নটা অনেকটা সিনেমাটিক শোনাচ্ছে। তবে কোনও মেডিকেল কলেজের ছুরি কাঁচি নিয়েই আমরা বাইরে গিয়ে অস্ত্রোপচার বা ওটি করতে পারি না। এই ব্যাপারটা বেআইনি। এতে আমার জেল পর্যন্ত হতে পারে। আমার মনে হয়, আপনি বোধহয় জানতে চাইছেন, নিজের ঘর থেকে সরঞ্জাম নিয়ে গিয়ে কখনও হাসপাতালে ওটি করেছি কি না। হ্যাঁ সেটা করেছি, প্রায়ই করি। আমার মতো বহু ডাক্তারই এইভাবে নিজের খরচে কিছু সরঞ্জাম নিয়ে গিয়ে ওটি করে থাকেন নিয়মিত। এই ধরনের ঘটনা আমাদের কাছে খুব একটা অভিনব নয়। তবে হ্যাঁ, একটা সার্জারি করতে পারার যে আনন্দ, তার সঙ্গে অন্য কিছুর তুলনা হয় না। সেই সার্জারিটা মেডিকেল কলেজে করছি না বাইরে করছি, সেটা ম্যাটার করে না একজন সার্জেনের কাছে, আমার অন্তত এটাই মনে হয়।
সংকেত ধর: ইএনটি নিয়ে তো কাজ দীর্ঘদিন। শুনতে বা কথা বলতে অক্ষম রোগীদের দেখার অভিজ্ঞতাটা একটু শেয়ার করবেন?

গৌতম বিশ্বাস: হ্যাঁ, ইএনটিতে আমার কাজের অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিনের। ১৯৯৮ সালে এমএস পড়তে ঢুকি। ২০০১ সালে পাশ করার পর বিভিন্ন কলেজ, হাসপাতালে কাজ করেছি। বর্তমানে মুর্শিদাবাদ মেডিকেল কলেজে কাজ করছি। ফলে সেদিক থেকে প্রায় ৩০ বছর কাজের অভিজ্ঞতা হয়ে গেল। শুনতে ও কথা বলতে অক্ষম রোগীদের মধ্যে বেশিরভাগই শিশু হয়।
তাঁরা প্রথম যখন দেখাতে আসে ও আমি যখন বুঝতে পারি, শিশুটি ভবিষ্যতে শুনতে বা কথা বলতে পারবে না, তখন স্বাভাবিকভাবেই পরিস্থিতিটা বেশ দুঃখজনক হয়। এদের মধ্যে কিছু রোগীকে সারিয়ে তুলতে গেলে একধরনের ইমপ্ল্যান্ট সার্জারি করার নিয়ম রয়েছে। সার্জারির পর ফিজিওথেরাপি ও নানা চিকিৎসাও চালিয়ে যেতে হয়। সেই সব মিলিয়ে খরচটা প্রায় ১০-১৫ লাখের কোঠায় গিয়ে পৌঁছায়। অনেক সময় মানসিক ভারসাম্যহীন রোগীও থাকেন এদের মধ্যে। ফলে সব মিলিয়ে তাদের বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড় করানোটা বেশ কষ্টদায়ক পদ্ধতি।

সংকেত ধর: আপনার এমন একটা অপারেশন সম্পর্কে জানতে চাই, যেটা আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে সাফল্যের তৃপ্তি দিয়েছিল ।
গৌতম বিশ্বাস: সত্যি বলতে সাফল্য কথাটা খুব আপেক্ষিক। হ্যাঁ, কিছু কিছু অপারেশনের পর ভাল লাগার একটা অনুভূতি তৈরি হয়। অনেক সময় অপারেশন করতে গিয়ে বেশ টিম ওয়ার্ক করতে হয়, বা হয়তো অপারেশনের আগে নির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাব থাকে বা বাইরে থেকে জোগাড় করা যন্ত্রপাতি দিয়ে করা একটি জটিল অপারেশন শেষমেশ সফলভাবে করে ফেলতে পারার মধ্যে একটা ভাল লাগার অনুভূতি কাজ করে। যেমন, নয় মাসের একটি মেয়ের মাথার টিউমারের অপারেশন আমাকে সেই তৃপ্তির অনুভূতি দিয়েছিল। মেয়েটির ব্রেনসমেত সেই টিউমার বাইরের দিকে বেরিয়ে এসেছিল। অপারেশনটা করতে বেশ অনেকখানি টিমওয়ার্ক লেগেছিল আমার।

সেই বাচ্চাটি এখন পুরোপুরি সুস্থ। বর্তমানে ওর তিন বছর বয়স। কিন্তু আমার চেহারাটা ওর কাছে ভয়ের হয়ে গিয়েছে। আমাকে দেখলেই ও পালিয়ে যায়। তবে, নয় মাস বয়স থেকে ছয় মাস ধরে ওকে ট্রিটমেন্ট করে আমি যে সারিয়ে তুলেছি, এই ব্যাপারটা আমাকে মানসিকভাবে খুব শান্তি দেয়, যে আমি একটা ভাল কাজ করেছি।
এছাড়াও আমি বেশ কিছু অপারেশন করেছি, যেগুলো সার্জিক্যালি খুব চ্যালেঞ্জ। যেহেতু হেডনেক রিজিয়নে অপারেশন করি, তাই ক্যারোটিড বডি টিউমার, থাইরয়েড টিউমারের মতো বড় বড় অপারেশন করতেই হয়। এগুলোর নাম বলে হয়তো সাধারণ মানুষকে এর গুরুত্ব বোঝানো কিছুটা মুশকিল। তবে ওই বাচ্চা মেয়েটিকে সুস্থ করে তুলতে পেরেছি, এ কথা মনে পড়লে আজও খুব ভাল লাগে।

সংকেত ধর: শহরাঞ্চলের তুলনায় জেলা বা গ্রামাঞ্চলের স্বাস্থ্য পরিষেবা গত ১০-২০ বছরে কতটা উন্নত হয়েছে বলে মনে হয়?
গৌতম বিশ্বাস: দেখুন আমি আদ্যন্ত কলকাতার ছেলে। এনআরএস থেকে এমবিবিএস করে, আরজি কর থেকে এমএস করেছি। আরজি করেই অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে প্রোমোশন পেয়েছিলাম। তার এক বছরের মাথায় বহরমপুরের মুর্শিদাবাদ মেডিকেল কলেজে বদলি হই। তখন মেডিকেল কলেজের যা কাঠামো ছিল, তা একটা গ্রামের থেকেও খারাপ বলা যেতে পারে।

আমার মনে আছে, প্রথম ছয় মাস আমরা একটা গাছের তলায় বসে থাকতাম। কারণ, বসার কোনও জায়গা ছিল না। সেই পরিস্থিতি থেকে আজকের পরিস্থিতির অনেকটাই ফারাক। আজ ২০-২৫টি ওটি হচ্ছে প্রতিটি বিভাগে, কিছু কিছু বিভাগে প্রায় ১৫০টাও ওটি হচ্ছে, যেহেতু ওদের ম্যান পাওয়ার বেশি। এছাড়া নতুন নতুন স্টুডেন্ট আসছে, পিজিটি আসছে, ফলে সামগ্রিকভাবে ডাক্তারের সংখ্যা বেড়েছে, মেডিকেল কলেজের এনভায়রনমেন্টও তৈরি হয়েছে। গত ১৫ বছরে এই উন্নতি আমার কাছে বিশাল উন্নতি। কোনও রাজনৈতিক দিক না দেখেই আমি এই কথা বলছি। এই জিনিস আমার চোখের সামনেই হয়েছে।
সংকেত ধর: ছবি তোলার শখ কি তরুণ বয়স থেকেই? ডাক্তারি ব্যস্ততার মাঝে সময় পান কীভাবে?

গৌতম বিশ্বাস: সত্যি বলতে, আমি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। ছোটবেলায় তাই ছবি তোলাটা একরকম বিলাসিতা ছিল। ১৭-১৮ বছর বয়সে আর্থিক সমস্যাতেও কাটাতে হয়েছে। ফলে, সিরিয়াস ফটোগ্রাফির সুযোগ পেয়েছি অনেক পরে। ডাক্তারি পড়া শেষ করে, আফটার ফোর্টি, ফটোগ্রাফি শুরু করি। আমার কাছে, সার্জারি যেমন একটা আর্ট, ফটোগ্রাফিও তেমন একটা আর্ট। একটা ল্যান্ডস্কেপ তোলাটাও তাই খুব গুরুত্বপূর্ণ আমার কাছে।

শিল্পের এই ছোট ছোট শিক্ষাগুলো আমরা বাড়ি থেকেই পেতাম আমাদের মায়েরা নিজে হাতে সেলাই করত, দিদিরা গান শিখত, বিভিন্ন কালচারাল প্রোগ্রামে পাড়ায় নাটক হত, আমি নিজে যেমন ছবি আঁকতাম, ওয়ার্ক এডুকেশনের খাতা তৈরি করতাম। এগুলো কারও কাছে শিখে নয়, নিজেদের মনের আনন্দেই করতাম। ফলে, ফটোগ্রাফিতেও সেভাবেই আসা। এরপর ডিএসএলআর হাতে এল। পরে একটা সময় যখন দেখলাম, এটাই আমাকে মেন্টাল স্যাটিসফ্যাকশন দিচ্ছে, তখন নেশার জায়গায় চলে গেল ছবি তোলা। সিরিয়াস ফটোগ্রাফি করতে বেশিরভাগ সময় তাই একাই যাই। এছাড়া, ফটোগ্রাফির জগতে আমি প্রবেশ করেছি বার্ড ফটোগ্রাফি দিয়ে। ফলে, পাখি আমার কাছে একটা ‘সফট কর্নার’ বলতে পারেন।
কাজের চাপ যথেষ্টই থাকে। আমি আমার বিভাগের এইচওডি। তাই রোগী দেখার পাশাপাশি প্রচুর প্রশাসনিক কাজের দিকে নজর রাখতে হয়। এছাড়া রোজকার ওটি তো আছেই। প্রতিদিন নিয়ম করে ছাত্রছাত্রীদের ক্লাসও নিতে হয়। ফলত আমার কাছে সময় খুব দামি জিনিস। তবে এসবের মাঝে ফটোগ্রাফি একটু অন্যরকম সুখ নিয়ে আসে। যখন দেখি, আমার তোলা ছবি আর পাঁচজনের ভাল লাগছে, তখন ভিতর ভিতর একটা মেন্টাল স্যাটিসফ্যাকশন অনুভব করি। এই স্যাটিসফ্যাকশনই আমাকে পরর্বতী কাজের এনার্জিও জোগায়।

সময় ব্যাপারটা আসলে নিজের হাতে পুরোটাই। ব্যক্তিগত সময়ে আপনি সিনেমা দেখতে যাবেন না গান শুনবেন, সম্পূর্ণ আপনার ব্যাপার। আমার তেমনই ছবি তোলাটা শখ হয়ে গিয়েছে একরকম। আমার সম্প্রতি যে প্রদর্শনী হয়েছে, তার ছবিগুলো বছরের পর বছর মাসের পর মাস ডিএসএলআর ক্যামেরা নিয়ে অবজেক্টের পিছনে ফোকাস করে তবেই তোলা। এছাড়াও কাছেপিঠের মধ্যেই ফটোগ্রাফির প্রচুর রসদ পেয়ে যাই। ফলে গোটা ব্যাপারটা নেশার মতো হয়ে গিয়েছে।
সংকেত ধর: আপনার সাম্প্রতিক প্রদর্শনী নিয়ে কিছু বলুন।

গৌতম বিশ্বাস: আমার সাম্প্রতিক প্রদর্শনী হয়েছিল মূলত আমার বার্ড ফটোগ্রাফির উপর। তার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘সিম্ফনি অব উইংস’। বাংলায় নাম ছিল ‘বিহঙ্গ মোর’। শান্তিনিকেতনের ‘কৃত্তিকা আর্ট স্পেস’ গ্যালারিতে এই প্রদর্শনী হয়েছিল। আমার ছবির প্রদর্শনী করার ব্যাপারে অনেকটাই ভূমিকা রয়েছে আমার স্ত্রীর মানে ডঃ দোলনচাঁপা দাশগুপ্তের।

তাঁর সঙ্গে আমার প্রায় প্রতি রাতেই ঝগড়া হত, কেন ছবিগুলোর প্রদর্শনী করছি না, তা নিয়ে। ডাক্তারির পাশাপাশি দোলনচাঁপার আরেকটি পরিচয়, সে সাহিত্যিক। ফলে ছবিগুলোর ভিতরকার গল্প নিয়ে একটা ভিন্ন ধরনের সিরিজের পরিকল্পনাও রয়েছে। এছাড়াও, প্রজাপতির ছবি নিয়ে আরেকটি প্রদর্শনী মে মাসেই হয়ে গেল যোগেন চৌধুরী সেন্টার ফর আর্ট-এ। ‘কোকুন টু ক্যানভাস’ ছিল ওই প্রদর্শনীর নাম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষ্যে তাঁকে উৎসর্গ করেই আয়োজন করা হয়েছিল প্রদর্শনীটির।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত