(Bus Tram Coupon)
১৯৮৩ থেকে মোটামুটি ১৯৮৬-৮৭ সাল পর্যন্ত এমন একটা সময়। বাজারে হঠাৎ খুচরো পয়সার খুব আকাল দেখা দিল। ফলে খুচরো পয়সার অভাবে হাটে-বাজারে দৈনিক কেনাবেচার ক্ষেত্রে এক ভীষণ সংকট তৈরি হল।
আরও পড়ুন: বাসের টিকিট-ই যেন বিজ্ঞাপনের মিনি লিফলেট
একদিকে ক্রেতা চায় টাকা ভাঙিয়ে যতটা সম্ভব খুচরো পয়সা হাতে পেতে, অন্যদিকে বিক্রেতাও চায় বিক্রীত জিনিসের সঠিক দামটাই নগদে হাতে নিতে। এ নিয়ে দোকান-বাজারে দৈনিক বচসা যেন লেগেই থাকত।
এটা শুধু যে দোকান-বাজারের ব্যাপার ছিল, তা নয়। রোজকার বাসে-ট্রামে টিকিট কাটার ক্ষেত্রেও একই সমস্যা, একই কথা-কাটাকাটি।

বাজারে খুচরো সংকট যে এই প্রথম দেখা দিল তা তো নয়, স্বাধীনতার পর থেকে বেশ কয়েকবার এমন অবস্থা দেখা দিয়েছে আর ভারত সরকারকে তার মোকাবিলা করার জন্য নতুন নতুন ব্যবস্থা অবলম্বন করতে হয়েছে। তার সঙ্গে রাজ্য সরকারগুলিকেও স্থানীয়ভাবে কিছু কিছু পন্থা অবলম্বন করতে হয়েছে।
কিন্তু এমন তো হবার নয়। রোজকার বাসে-ট্রামে, হাটে-বাজারে পাইকারি বা খুচরো কেনাবেচা অথবা ব্যবসা-বাণিজ্য বজায় রাখার জন্য যে পরিমাণ খুচরো পয়সার প্রয়োজন হয়, তার সাথে সমতা বজায় রেখেই ট্যাঁকশালগুলোয় সেই পরিমাণে নানা ধাতুর খুচরো টাকাপয়সা তৈরি হয়ে থাকে। এর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেল তখন বাজারে তামা ও নিকেল-এর দাম হঠাৎ খুব বেড়ে গেছে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারত সরকার প্রথম এক পয়সা থেকে এক টাকা পর্যন্ত যে মুদ্রাগুলো বাজারে এনেছিল সেগুলো তৈরি হয়েছিল ব্রোঞ্জ, তামা ও নিকেল আর বিশুদ্ধ নিকেল দিয়ে।
দেখা গেল, ইতিমধ্যেই সারা দেশে চালু থাকা তামা ও নিকেলের তৈরি মুদ্রায় যে পরিমাণ ধাতু আছে তা গালিয়ে ফেলে বিক্রি করলে যা বাজার মূল্য হবে, তা ওই মুদ্রার বিনিময় মূল্যের থেকে বেশি। ফলে এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী দালাল লাগিয়ে বাজার থেকে প্রচুর পরিমাণে অমন ধাতুতে তৈরি মুদ্রা অল্প বাট্টার বিনিময়ে রাতারাতি সরিয়ে গোপনে গলিয়ে বিক্রি করে মোটা মুনাফা করতে লাগল।

এছাড়াও বাজারে একটা গুজব ছড়াল যে, কেউ কেউ মোটা লাভের বিনিময়ে এমন সব ধাতু সীমান্ত দিয়ে আমাদের কোনও পড়শি দেশে রপ্তানি করে দিচ্ছে। এমন সত্যি-মিথ্যা নানা গুজবে মানুষ তখন দিশেহারা।
এই সমস্যার সুরাহা করার জন্য বিভিন্ন বাস সংগঠনগুলি রাজ্য সরকারের পরিবহন দফতরের সাথে আলোচনায় বসে ঠিক করল যে, এই সংকটের মোকাবিলায় তারা বাসে কুপন চালু করবে। অর্থাৎ টিকিট কাটার পর ভাড়া বাদ দিয়ে বাকি যা ফেরৎ দিতে হবে তা যতটা সম্ভব খুচরোয় দিয়ে বাকিটা সেই অংকের Coupon বা Due Slip-এ মেটাবে। যাত্রীরা পরবর্তী কোনও যাত্রায় ওই কুপন দিয়ে তার ভাড়ার টাকা কিছুটা মেটাতে পারবেন।

সমস্যা কিন্তু থেকেই গেল। বিভিন্ন বাস সংগঠনের অধীনে আলাদা আলাদা বিভিন্ন রুটের বাস চলে। ফলে কোন এক বাস সংগঠনের বাসের কুপন অন্য কোনও সংগঠনের অধীন বাসে চলবে না। ফলে অফিস টাইমে যাত্রীকে সময় ব্যয় করে দাঁড়িয়ে থাকতে হত, কখন ওই রুটের বাস আসবে তার জন্য। তবে যাদের অধীনে একাধিক রুটের বাস চলে, তাদের ক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধা পাওয়া যায়।
এরপর ছিল ‘গোদের ওপর বিষফোঁড়া’। সরকারি বাসের কুপনে আবার ওই কুপন ব্যবহার করার শেষ তারিখ ছাপানো থাকত। যেমন ‘Valid upto 15.10.84’ এমন।

এ ব্যাপারে ট্রাম কোম্পানিই বা বাদ যায় কেন। তারাও চালু করল কুপন। তবে তাদের কুপনেও বেসরকারি বাসের মতোই ব্যবহারের কোনও সময়সীমা থাকত না। সবচেয়ে বড় কথা, ওই কুপন ট্রামের যে কোনও রুটের গাড়িতেই গ্রহণযোগ্য ছিল।
এ তো গেল চলতি খুচরো সমস্যা মোকাবিলার একটি সাময়িক প্রচেষ্টা। এদিকে দেশে জনসংখ্যার ক্রমবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে খুচরো টাকা পয়সারও বিপুল চাহিদা। তা মেটাতে সরকারকেও নতুন কিছু চিন্তা ভাবনা করতে হয়েছিল। তাই তো আমরা দেখতে পাই যে, এর পরই সরকারি ট্যাকশাল থেকে বিশুদ্ধ তামা বা নিকেলের পরিবর্তে কপার-নিকেল, নিকেল-ব্রাশ, অ্যালুমিনিয়াম-ম্যাগনেসিয়াম প্রভৃতি তুলনায় কম দামের শঙ্কর ধাতু ব্যবহার শুরু হল।

এছাড়াও, আকারে চালু মুদ্রা থেকে অপেক্ষাকৃত ছোট, ক্রমশ আরও ছোট ও পাতলা মুদ্রা বাজারে ছাড়া হল। এমন ধাতুর বাজারমূল্য ওই মুদ্রার মূল্যমান-এর থেকে বেশি নয়। ফলে তা আর গলিয়ে কোনও লাভ হবে না।

সরকার এই ব্যবস্থা নেওয়ার পর ধীরে ধীরে খুচরোর আকাল কমতে থাকল। মানুষের হাতে পর্যাপ্ত খুচরো আসার পর তাই বাসে-ট্রামে কুপন দেওয়ার ব্যবস্থাও উঠে গেল। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল জনসাধারণও। পরিবহন জগতে যুগে যুগে এমন কত যে ঘটনা ঘটে চলে, তার ঠিক নেই।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্য়মে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত