(Machu Picchu)
উরুবাম্বা নদী পেরোতে পেরোতে, স্বর্গীয় প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম পেরুর রেল স্টেশন। সেখান থেকে শুরু হল আমাদের দীর্ঘপ্রতীক্ষিত রেল যাত্রা। উঠে পড়ি গিয়ে ট্রেনে। বাতানুকুল কামরায় শরীর এলিয়ে কাচের জানলায় চোখ রাখি। উরুবাম্বা নদীর পাহাড় কেটে নুড়ি পাথরের উপর দিয়ে বয়ে চলা। সামনের টি-টেবিলে পেরু রেলের দেওয়া সুদৃশ্য কাচের বোতলে স্থানীয় লিকার, আর গুডি ব্যাগে একটি শট গ্লাস, সঙ্গে যাত্রাপথের জন্য কিছু খাবার দাবারও। মূলত কিনোয়ার স্ন্যাকস। কিনোয়া কুকিজ আর কিনোয়া গ্র্যানোলা বার। উত্তেজনায় মন কানায় কানায় পূর্ণ। লাল মুকুলিত কিনোয়ার ক্ষেত দেখেছি আসার পথে। জন চিনিয়েছে সে গাছ।
রেলের মধ্যেই অভিনব নৃত্যগীত পরিবেশনা চলছে। মুখোশ পরে সে নাচকে র্যাম্প শো বললেও ভুল হবে না। সুবেশী তরুণ-তরুণী উলের শীত পোশাকের পসরা সাজিয়ে চোখের সামনে মেলে ধরছে সেই কামরাতেই। সে-ও এক অভিনব পর্যটন শিল্পের চাহিদা মেনেই। প্রচুর ইউরোপিয়ান কিনছেও তা। অভূতপূর্ব মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি। আমরা পৌঁছলাম মাচু পিচুতে।
আরও পড়ুন: ইনকাদের অন্দরমহল পেরুতে পেরু-তে
এবারের ট্রিপের বৃহত্তম উদ্দেশ্য মাচু পিচু। কত পাহাড়, নদী, সমুদ্র পেরিয়ে সেই ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে হয়। কবে পড়েছিলাম নবনীতাদির (নবনীতা দেবসেন) ‘আমি মাচু পিচু যাবই’। পেরুর সাহিত্য সম্মেলনে গিয়ে রথ দেখা ও কলা বেচা চাই তাঁর। মেয়েদের কোনও বারণ শোনেননি, যতই শ্বাসকষ্টের অসুবিধা থাকুক। উচ্চতাজনিত শ্বাসকষ্ট আমারও হয়, দুবার তার শিকার অরুণাচল আর কৈলাস-মানস সরোবর গিয়ে। তবে এবছর তা আর হয়নি ওষুধের কল্যাণে বা ঈশ্বরের কৃপায়। তাই মাচু পিচু উত্তরণে আমি পাশ করে গেছি এবার।

কুজকো এসেছি যে কারণে, সেই মাচু পিচু তো যাবই কয়েকদিনের মধ্যে, কিন্তু তার আগে সেই বিশাল ইনকা সাম্রাজ্যের স্থপতির কথায় কান রাখি। পাহাড়ের উপর মাচু পিচু যে কতখানি সুন্দর আর নান্দনিকতায় পূর্ণ, তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস হয় না। আর তার মূলে দক্ষিণ আমেরিকার ইনকা সাম্রাজ্যের বিখ্যাত সম্রাট এবং ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্য নির্মাতা পাচাকুতি (Pachacuti/Pachacutec)। কেচুয়া ভাষায় ‘পাচাকুতি’ অর্থ ‘যিনি পৃথিবীকে রূপান্তরিত করেন’।
বাসের টিকিট কেটে রেখেছিল আমাদের গাইড জন। সকাল সকাল হোটেল থেকে হেঁটে বাসে গিয়ে ওঠা। পাকদন্ডী পথে বাস ঘুরতে ঘুরতে ক্রমশ উঠতে থাকে উঁচুতে। আধঘণ্টা এভাবে বাসে যাওয়ার পর মাচু পিচুর টিকিট হাতে পাওয়া গেল।
পাচাকুতি আক্ষরিক অর্থেই ইনকাদের ভাগ্য এবং ইতিহাস বদলে দিয়েছিলেন। তাঁর আমলেই বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের একটি, বিখ্যাত প্রাচীন শহর মাচু পিচু, আনুমানিক ১৪৫০ সাল নাগাদ, তৈরি হয়েছিল বলে প্রত্নতাত্ত্বিকদের বিশ্বাস। সে যুগে চুন, কয়লা, সিমেন্ট কিছুই ব্যবহার না করে নির্মিত হয়েছিল এই প্রাসাদোপম নগরী। ইনকাদের রাজধানী কুজকো থেকে ৭০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮০০০ ফুট উচ্চতায় এই শহর আন্দিজ পবর্তের চুড়োয়। অতএব পাহাড়ে চড়তেই হবে তার সম্বন্ধে সম্যক ধারণা পেতে গেলে। দক্ষিণ আমেরিকার অন্যতম প্রধান প্রত্নতাত্ত্বিক কেন্দ্র, আর পেরুর সবচাইতে আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান এটি। তাই ট্যুরিস্ট উপচে পড়ছে।
বাসের টিকিট কেটে রেখেছিল আমাদের গাইড জন। সকাল সকাল হোটেল থেকে হেঁটে বাসে গিয়ে ওঠা। পাকদন্ডী পথে বাস ঘুরতে ঘুরতে ক্রমশ উঠতে থাকে উঁচুতে। আধঘণ্টা এভাবে বাসে যাওয়ার পর মাচু পিচুর টিকিট হাতে পাওয়া গেল। এবার শুরু পদযাত্রা। সার্কিট ১ ও সার্কিট ৩-এর টিকিট কেটেছিলাম আমরা। প্রথমে সার্কিট ৩, পরে সার্কিট ১। মাচু পিচুর টিকিট ৬ মাস আগে থেকেই কেটে রাখতে হয়। নয়তো সেখানে পৌঁছে ওই টিকিট পাওয়া খুব দুষ্কর।

বিশ্বের ভ্রমণপিপাসুদের অন্যতম ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশন ইনকাদের এই শহর। কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারেরও আগে তৈরি। দুটি পর্বত শৃঙ্গ, মাচু পিকচু এবং হুয়ানা পিচুর মধ্যে একটি সরু স্থানে অবস্থিত ইনকানগরীটি। স্প্যানিশ ভাষায় Machu Picchu, কেচুয়া ভাষায়, মাচু মানে ‘বৃদ্ধ’ আর পিকচু হল ‘শৃঙ্গ’। পেরুর উরুবাম্বা নদীর সঙ্গে আগেই দেখা হয়েছে। নদীর উপত্যকার উপরে একটি পর্বতচুড়োয় অবস্থিত এই শহর।
বিশ্বের সেই সপ্তম আশ্চর্যের একটি দেখতে তো যাচ্ছি, কিন্তু একটি হাঁটুর অবস্থা শোচনীয়। গ্রুপের মধ্যে সবাই মধ্যবয়সী, অনেক বড়রাও সামিল এই যাত্রায়। তাই মুখে হাসি ফুটিয়ে, বুকে বল সঞ্চয় করে তেজে ভরা মন নিয়ে ‘জয় মা কালী’ বলে রওনা দিলাম সবাই। পায়ে হেঁটে কিছুদূর গিয়ে টিকিট হাতে পাওয়ার পালা।

জীবনে কোনওদিন কোনও ট্যুরিস্ট স্পটে এত ভিড় দেখিনি। যেন আক্ষরিক অর্থেই মেলাতলা। পাহাড়ের মাথায় মাচু পিচু ঘন সবুজ আন্দিজ পর্বতমালার কোল ঘেঁষে আজও স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে যেন রহস্য ঘিরে আছে। কোথাও সবুজ রঙ গাঢ়, তো কোথাও হালকা। এর নামই বুঝি ভঙ্গিল পর্বত। মানে যাকে বলে ফোল্ডেড মাউন্টেন।
এই দুর্গম স্থানে, পাহাড়ের এত উঁচুতে ইনকাদের সেটলমেন্ট কেন, তার উত্তর পাইনি। বড় দুর্গম সে রাস্তা। সেখানে কেমন করে হ্যাবিট্যাট গড়ে ওঠে, আর তাও আবার অত যুগ আগে, সেটাই বিস্ময়কর। শুধু বসতি গড়লেই তো হল না, বাঁচার জন্য জল চাই। চাষাবাদের জন্য জমি চাই। ঘরবাড়ি না হয় পাহাড় কেটে শিলা এনে… হ্যাঁ সত্যিই পাথরের দেওয়ালের ঘেরাটোপে তাদের ঘরবাড়ি ছিল। কোনও সিমেন্ট, চুন বা আঠা ছাড়া পাথরগুলো এত নিখুঁতভাবে বসানো হয়েছে যে, এর জোড়ের মাঝে একটি ছুরিও ঢোকানো যাবে না। স্তম্ভিত হই জনের মুখে শুনে।

দুর্গম এই পাহাড়ি আবহে ইনকাদের ছিল নিখুঁত কৃষি ব্যাবস্থা। পাহাড়ের খাড়া ঢালে ধাপ কেটে তৈরি হয়েছিল কৃষিজমি বা টেরেস, যা পাহাড়ে মাটির ক্ষয় রোধ করে ফসল ফলাতে সাহায্য করত। ছিল ইনকাদের রাজার ঘরবাড়ি, ঘরের সঙ্গে লাগোয়া বাথরুম।
১৪৫০ সালের দিকে ছিল ইনকা সভ্যতার স্বর্ণযুগ। তখনই ইনকা রাজা পাচাকুতির আমলে স্বপ্নের নগরী মাচু পিচু তৈরি হয়। কিন্তু মাত্র ১০০ বছরেরও কম সময়ে মানবসৃষ্ট এই শহর স্প্যানিশদের আক্রমণের উপর্যুপরি ঝড়ঝাপটা সামলাতে সামলাতে পরিত্যক্ত হয়ে যায়। কালের স্রোতে হারিয়ে গেলেও হারায়নি তার পুনরাবিষ্কারের ঐকান্তিক অনুসন্ধান। কয়েকশো বছর অজ্ঞাত থাকার পর ১৯১১ সালে মার্কিন ঐতিহাসিক হিরম বিংহ্যাম এটিকে পুনরুদ্ধার করে আবার সমগ্র বিশ্বের নজরে নিয়ে আসেন।

বিশাল এবং রাজকীয় এই ইনকানগরী ঘুরে দেখতে সময় লেগে যাবে হয়তো দু’দিন। তিনটি সার্কিট আছে মাচু পিচু পরিক্রমার। আমরা দুটি সার্কিটের টিকিট কেটেছিলাম একবেলায় যাতে দেখা যায়। পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে ধাপে ধাপে সিঁড়ি উঠে গেছে ক্রমশ উপরের দিকে। আর সে সিঁড়ির ধাপ বেশ উঁচু। এহেন সময় ক্ষীণ জানু বঙ্গললনার ফিজিওথেরাপিস্টের অমোঘ বাণী মাথায় এল। ‘Up with the good, down with the bad’ উপরে যখন চড়বে তখন ঈশ্বরের কাছে যাচ্ছ, তাই ভাল পা আগে। নিচে যখন নামছ তখন নরকের দিকে, তাই খারাপ পা আগে… কাজে দিয়েছে এবার তা। অক্ষরে অক্ষরে মেনে প্রায় পাঁচ-ছশো সিঁড়ি চড়েছি ও উঠেছি।
বারবার মনে পড়ছিল ‘সূর্যদেবের বন্দি’, যার মূল বিষয় ছিল ইনকা সভ্যতার এক দল পুরোহিতের হাতে বন্দি প্রোফেসর ক্যালকুলাসকে উদ্ধার করা। অপহৃত বিজ্ঞানীকে বাঁচাতে টিনটিন, ক্যাপ্টেন হ্যাডক ও পোষ্য কুট্টুস দক্ষিণ আমেরিকার পেরুর দুর্গম জঙ্গল ও পাহাড়ে রোমাঞ্চকর অভিযান চালায়।
দূর থেকে চোখ রেখেছি পাহাড় চুড়োর সুউচ্চ ইনকাদের সূর্য স্তূপে। সবচাইতে উল্লেখযোগ্য হল পালিশ করা পাথর দ্বারা নির্মিত এই শহরের প্রধান স্থাপত্য হল ইন্তিওয়াতানা বা সূর্য স্তুপ, যেটি ইনকাদের কাছে অতি পবিত্র এবং একই সঙ্গে জ্যোতির্বিজ্ঞানীয় এক স্থাপনা। কেচুয়া ভাষায় ‘ইন্তিওয়াতানা’ শব্দের অর্থ ‘সূর্যকে বেঁধে রাখার খুঁটি’। সেটি একাধারে সূর্য ঘড়ি বা সান ডায়াল, আবার অন্যদিকে ইনকাদের ক্যালেন্ডারও। ইনকা জ্যোতির্বিদরা এর মাধ্যমে ঋতু পরিবর্তন, বছর গণনা এবং চাষাবাদের সঠিক সময় নির্ধারণ করতেন।
ইনকারা বিশ্বাস করত, এই পাথরটির মাধ্যমে সূর্যকে তার কক্ষপথে ধরে রাখা যায়, কিন্তু স্প্যানিশরা যখন ইনকা সাম্রাজ্য আক্রমণ করে, তখন ইনকাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ভেঙে দেওয়ার জন্য এই ধরনের পবিত্র পাথর ধ্বংস করে ফেলে। সৌভাগ্যবশত মাচু পিচুর দুর্গম অবস্থানের কারণে স্প্যানিশরা এটি খুঁজে পায়নি, যার ফলে ইন্তিওয়াতানাটি আজও অক্ষত রয়েছে।

কিন্তু হলে কী হবে, স্বাস্থ্য অত্যন্ত দুর্বল ছিল ইনকাদের আর প্রত্যন্ত এলাকায় রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতাও গড়ে ওঠেনি। ইউরোপীয়দের নিয়ে আসা নতুন রোগের বিরুদ্ধে ইনকাদের স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা ছিল না। তাই ইনকারা তাদের স্বপ্নের নগরী, ধর্মীয় ভাবাবেগ, সংস্কৃতিগত ঐতিহ্য কিছুই এই অঞ্চলে ধরে রাখতে পারেনি। যারা পালিয়ে গিয়েছিল, তাদের হাতেই ধরা রইল ব্যাটন। এখনও কিছু পরিবার আছে, যারা জন্মসূত্রে ইনকাদের উত্তরসূরি। তারাই বাঁচিয়ে রেখেছে ইনকা লোকসংস্কৃতির পরম্পরা। তাদের হাতের কাজে, গানে, নাচে, পুজো আচ্চায় ক্ষীণ হয়েও যেন লোপ পায়নি সেই আবহমান ধারা।
বারবার মনে পড়ছিল ‘সূর্যদেবের বন্দি’, যার মূল বিষয় ছিল ইনকা সভ্যতার এক দল পুরোহিতের হাতে বন্দি প্রোফেসর ক্যালকুলাসকে উদ্ধার করা। অপহৃত বিজ্ঞানীকে বাঁচাতে টিনটিন, ক্যাপ্টেন হ্যাডক ও পোষ্য কুট্টুস দক্ষিণ আমেরিকার পেরুর দুর্গম জঙ্গল ও পাহাড়ে রোমাঞ্চকর অভিযান চালায়।
আমাদের ইতুপুজোর মতো ইনকাদের ‘ক্যাপাক রায়মি’ উৎসবের সূচনা নির্দেশ করত এই সূর্যালোক। এই রায়মি শব্দটি সূর্যের পুজো সংক্রান্তই, তা অবনীন্দ্রনাথের ‘বারব্রত’ পড়ে আগেই জেনেছিলাম।
ইনকাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও উৎসবের সঙ্গে এই স্তুপের গভীর সংযোগ ছিল। গুহার ভিতরে একটি টানেল আকৃতির জানালা রয়েছে, যা ইনকা কাঠামোর মধ্যে অনন্য। পেরু দক্ষিণ গোলার্ধে। আর এই জানালা এমনভাবে ডিজাইন করা যাতে ডিসেম্বর সলস্টিসে, মানে দক্ষিণ গোলার্ধের জন্য বছরের দীর্ঘতম দিনে এবং ক্ষুদ্রতম রাতের কাছাকাছি, মাত্র কয়েক দিনের জন্য সূর্যরশ্মি সেই সূর্য স্তূপের জানালার ভিতরে প্রবেশ করে একটি নির্দিষ্ট কোণে।
শুধু তাই নয়, আমাদের ইতুপুজোর মতো ইনকাদের ‘ক্যাপাক রায়মি’ উৎসবের সূচনা নির্দেশ করত এই সূর্যালোক। এই রায়মি শব্দটি সূর্যের পুজো সংক্রান্তই, তা অবনীন্দ্রনাথের ‘বারব্রত’ পড়ে আগেই জেনেছিলাম। যাই হোক, পাহাড়ের চুড়োয় অবস্থিত হওয়ায় এখান থেকে চারপাশের উপত্যকা খুব সুন্দরভাবে দেখা যায়। সূর্যের উপাসনা মানেই চাষাবাদের সঙ্গেও ইনকাদের যে নিবিড় সংযোগ ছিল, তা বোঝা গেল এরপরেই।

প্রত্নতাত্ত্বিক খনন এবং মাটি পরীক্ষা গবেষণায় দেখা গেছে, এখানে প্রতি বছর প্রায় ১,৮০০ মিলিমিটার (৭১ ইঞ্চি) বৃষ্টি হত, যা শস্য উৎপাদনের জন্য যা পর্যাপ্ত বৃষ্টির থেকেও বেশি। তাদের জমিতে জলসেচের দরকার পড়ত না। অতিরিক্ত জলের নিকাশী ব্যবস্থাও ছিল উন্নতমানের। এই যে ধাপ চাষের ব্যাপারটি নিজের চোখে দেখলাম, সেই ধাপ বা সোপানগুলো স্তরবিশিষ্ট ছিল, যার নিচের স্তর হল বড় পাথর ও নুড়ির আর উপরের স্তর বালি এবং নুড়ির। একেবারে উপরের স্তরে উর্বর মাটির স্তর। এই স্তরের মাটি উরুবাম্বা নদীর উপত্যকা থেকেই যে বাহিত, তা বোঝা যায়। সে নদী এক পাহাড়ি চুড়ো থেকে একেবারে খাড়াভাবে নিচে পাদদেশে গিয়ে মিশেছে গিরিখাতে।
সমগ্র নগরটিতে কী নেই? যেমন আছে আবাসন, পুজোর স্থান এবং গুদাম, তেমনই ছিল উন্নতমানের চাষাবাদের সুবিধা। আবারও সেই পুবমুখী সূর্যমন্দির লক্ষ করা গেল। আর দেখা গেল পাথরের সংযোগস্থলে একটি ত্রিভুজাকার ফাঁক, যাকে ‘সাপের দরজা’ (Serpent’s Door) বলে বিশ্বাস করত ইনকারা।
পানীয় জল সরবরাহ হত পাহাড়ি ঝরনা থেকে। এছাড়াও যে পরিমাণ চাষযোগ্য জমি ছিল, তাতে উৎপন্ন ফসলে শহরের মোট জনসংখ্যার চারগুণ মানুষের খাদ্যের সংস্থান সম্ভব ছিল। আর এর মূলে হল মেঘের আবরণে থাকা দুই পাহাড়ের সংযোগস্থলে এর ভৌগোলিক অবস্থান। ক্লাউড ফরেস্টের ঘেরাটোপে থাকায় বৃষ্টিস্নাত ছিল এই নগরসভ্যতা। এটাই মাচু পিচুর পরিবেশের প্রাকৃতিক বিশেষত্ব। সমগ্র নগরটিতে কী নেই? যেমন আছে আবাসন, পুজোর স্থান এবং গুদাম, তেমনই ছিল উন্নতমানের চাষাবাদের সুবিধা। আবারও সেই পুবমুখী সূর্যমন্দির লক্ষ করা গেল। আর দেখা গেল পাথরের সংযোগস্থলে একটি ত্রিভুজাকার ফাঁক, যাকে ‘সাপের দরজা’ (Serpent’s Door) বলে বিশ্বাস করত ইনকারা।

মাচু পিচুর মাথায় পাহাড়ের উপর সারি সারি উট বা ভেড়া জাতীয় ছোট ছোট দুধ-সাদা লামাদের দেখে ফের মনে পড়ল টিনটিনের গল্প। ক্যাপ্টেন হ্যাডক এই প্রাণীটির সঙ্গে মজা করতে গেলে, রেগে গিয়ে লামা তার মুখে থুতু ছুঁড়ে মারে। হ্যাঁ, আমাদের জনও সাবধান করে দিল, লামার কাছাকাছি না যেতে, বা তার সঙ্গে অহেতুক বাক্যালাপে লিপ্ত না হতে। তবে বড় সুন্দর এই লোমশ প্রাণীর স্বভাব বেশ নিরীহ। আত্মরক্ষার জন্য এমন করতেই পারে সে। একে তো আমরা তার গায়ের নরম লোমের জন্য ফিদা হয়ে গেছি, তায় আবার আলপাকার (লামার জাতভাই) মাংসের খুব কদর পেরুতে, দেহে কম ফ্যাট বলে।
পেরুর জাতীয় পশু ভিকুনা লামারই আরেক প্রজাতি। এদের ভেড়া বলব না উট, তা নিয়ে আমি আজও মহাসংশয়ে। একই গোত্রের লামা (Llama), আলপাকা (Alpaca), ভিকুনা (Vicuña) আর গুয়ানাকো (Guanaco) এই মোট চার প্রজাতির গোবেচারা প্রাণীর খুব কদর এই দেশে।

সবুজ আন্দিজের কোল ঘেঁষা সুন্দরী মাচু পিচু-কে বিদায় দিতে হবে ভেবেই কষ্ট হল। ১৯৪৩ সালে পেরুর এই প্রাচীন ইনকানগরী ভ্রমণের পর পাবলো নেরুদা একটি কবিতা লেখেন, আর সে কবিতার বঙ্গানুবাদ করেছিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়। চোখের সামনে সেই কবিতাই যেন ভেসে উঠছিল সেই মুহূর্তে।
‘পাথরের উপর পাথর: মানুষ, কোথায় সে ছিল?
বায়ুর উপর বায়ু: মানুষ, কোথায় সে ছিল?
সময়ের উপর সময়: মানুষ, কোথায় সে ছিল?
তুমিও কি তখন ছিলে, নিষ্পত্তিহীন মানুষের
ফাঁপা ঈগলের ছোট্ট ভগ্নাংশ’…
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত