(The Odyssey)
| পরিচালনা | ক্রিস্টোফার নোলান |
| চিত্রনাট্য | ক্রিস্টোফার নোলান |
| প্রযোজক | এমা থমাস ও ক্রিস্টোফার নোলান |
| মুখ্য অভিনয় | ম্যাট ডেমন, টম হল্যান্ড এবং অ্যান হ্যাথাওয়ে |
| মূল কাহিনি | হোমারের বিখ্যাত মহাকাব্য ‘ওডিসি’ |
| রেটিং | ৬.৫/১০ |
‘Tell me about a complicated man.
Muse, tell me how he wandered and was lost
when he had wrecked the holy town of Troy,
and where he went, and who he met, the pain
he suffered in the storms at sea, and how
he worked to save his life and bring his men
back home. He failed to keep them safe; poor fools,
they ate the Sun God’s cattle, and the god
kept them from home…’
Iliad’s The Odyssey (Translated by Emily Wilson, 2018)
শুরুর কথা
এক দেশের মাটিতে আমি জন্মেছি, আর বহু বছর আগে আরেক দেশকে নিজের ইচ্ছায় দত্তক নিয়েছি। তাই সবসময়ই আমি এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে ফিরি। প্রতিটি ফেরার মধ্যে লুকিয়ে থাকে একটা টান, ফিরে যাওয়ার এক আকুতি। এই কারণেই অডিসিউসের কাহিনি আমাকে কখনও ছেড়ে যায় না। তাঁর যাত্রা তো শুধু ঘরে ফেরা নয়; প্রতিটা দ্বীপ, প্রতিটা বাধা পেরিয়ে তিনিও প্রশ্ন করেন, তাঁর ঘর আসলে কোথায়, আর এই ফেরাটাই বা কার জন্য।
আরও পড়ুন: এসকোবার, আত্মঘাতী গোল ও বিশ্বকাপ
নোলানের ‘দ্য অডিসি’ নিয়ে আমার প্রত্যাশা অন্যরকম ছিল। বিশাল বাজেট, তারকাবহুল কাস্ট, সত্তর বছর পর হলিউডে প্রথম বড় মাপে অডিসি রূপায়ণ। এত কিছু থাকা সত্ত্বেও ছবিতে সবচেয়ে বেশি যা প্রয়োজন ছিল, সেটাই ছিল না। কারণ, হোমারের কাব্য অন্তরের দর্শন যাত্রা, বাইরের নয়।
মিথের শিকড়: ট্রয় থেকে ইথাকা

অডিসিউসের যাত্রা ট্রয়ের যুদ্ধেরই উত্তরাধিকার। তিন দেবী হেরা, অ্যাথেনা, আফ্রোদিতির মধ্যে কাকে ‘সবচেয়ে সুন্দরী’ খেতাব দেওয়া হবে, তার বিচারক ছিল ট্রয়ের রাজপুত্র প্যারিস। আফ্রোদিতি এই খেতাব জেতেন স্পার্টার রানি হেলেনের ভালবাসা পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে, যদিও হেলেন তখন রাজা মেনেলাউসের স্ত্রী। সেই থেকে দশ বছরের যুদ্ধ, আর অডিসিউসেরই কৌশলে তৈরি কাঠের ঘোড়ায় ট্রয়ের পতন। যুদ্ধজয়ের অহংকারে তিনি সাইক্লপসকে অন্ধ করে দেবতার রোষে পড়েন। সেই অভিশাপ তাঁকে ঠেলে দেয় দশ বছরের ভবঘুরে জীবনে।
নোলানের সিনেমায় হেলেন চরিত্রে লুপিটা নিয়ঙ্গোর কাস্টিং নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে, তার একটি অংশ ভুল তথ্যের উপর দাঁড়িয়ে বলে আমার মত। হোমার নিজে হেলেনের রূপের কোনও বর্ণনা দেননি; কাব্যে তাঁকে অস্পষ্টভাবে ‘শুভ্র-বাহু’ আর ‘সুন্দর-কেশী’ বলা হয়েছে, সোনালি চুলের কথাও কোথাও নেই।
‘স্বর্ণকেশী হেলেন’ এসেছে মধ্যযুগীয় শিল্পকলা আর আধুনিক সিনেমা থেকে, হোমারের পাঠ থেকে নয়। নোলান তাঁর মুখে যে গভীর ক্ষতচিহ্ন এঁকেছেন, সেটাও কাব্যে নেই। এ এক সচেতন সংযোজন, যা হেলেনকে স্রেফ নিখুঁত সৌন্দর্যের প্রতীক করে রাখেনি, বরং করে তুলেছে যুদ্ধের রেখে যাওয়া গভীর শোক আর মানসিক যন্ত্রণার আরেক উত্তরসূরি। এই একটি সিদ্ধান্তে সিনেমাটা যে সাহস দেখিয়েছে, বাকি ছবিতে তার প্রতিধ্বনি খুব কম।

অডিসিউস: রুক্ষ, অহংকারী, নিজেকে চেনার এক দীর্ঘ পথ
অডিসিউস নিখুঁত বীর নন। হোমার তাঁকে ‘বহু-কৌশলী’ (পলিট্রোপোস) বলেন। ধূর্ত, বহুরূপী এবং অহংকারের প্রমাণও কাব্যেই স্পষ্ট। সাইক্লপসকে অন্ধ করে জাহাজে ওঠার পরেও নিজের আসল নাম চিৎকার করে জানানো নিছক দম্ভ, আর এই একটি মুহূর্তই তাঁকে পসেইডনের দীর্ঘ অভিশাপের মুখে ঠেলে দেয়। তাই তাঁর যাত্রাটা আসলে বাইরের অভিযান নয়— আলস্য, কামনা, লোভ, অহংকার, ক্রোধ, ঈর্ষার মতো সর্বজনীন মানবিক দুর্বলতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেকে চেনার এক দীর্ঘ প্রক্রিয়া।
প্রশ্ন হল, নোলান এই আত্ম-অনুসন্ধানের ভাষাটা পর্দায় অনুবাদ করতে পেরেছেন কি না। পারেননি। এই ধরনের রূপক যাত্রা পর্দায় জীবন্ত হয় দৃশ্য আর নীরবতার ভাষায়, সংলাপ দিয়ে ব্যাখ্যা করে নয়। আর এই জায়গায় নজির আগেই তৈরি হয়ে আছে।
লোটাস দ্বীপ আর ক্যালিপসোর বন্দিত্বে আলস্যের প্রলোভন, সার্সিতে কামনার টান, হেলিওসের গরু খাওয়ার লোভ, সাইক্লপসের গুহায় বিশুদ্ধ অহংকার, পসেইডনের অবিরাম রোষে ক্রোধ, বিবাহপ্রার্থীদের মধ্যে ঈর্ষা। প্রতিটা বাধা তাঁকে নিজেরই দুর্বলতাগুলোর সামনে দাঁড় করায়; ইথাকায় ফেরার সময় তিনি সেই মানুষ, যিনি এই দুর্বলতাগুলো আংশিকভাবে চিনতে ও জয় করতে শিখেছেন।
প্রশ্ন হল, নোলান এই আত্ম-অনুসন্ধানের ভাষাটা পর্দায় অনুবাদ করতে পেরেছেন কি না। পারেননি। এই ধরনের রূপক যাত্রা পর্দায় জীবন্ত হয় দৃশ্য আর নীরবতার ভাষায়, সংলাপ দিয়ে ব্যাখ্যা করে নয়। আর এই জায়গায় নজির আগেই তৈরি হয়ে আছে। কুব্রিকের ‘২০০১: আ স্পেস অডিসি’ নামেই হোমারকে স্মরণ করে, আর প্রায় নিঃশব্দে দৃশ্য ও সুর দিয়ে মানুষের আত্ম-উত্তরণের গল্প বলে।

কোপোলার ‘অ্যাপোক্যালিপস নাউ’-এ একটা নদী-যাত্রাই ভিতরকার নৈতিক পতনের রূপক হয়ে ওঠে। হের্ৎসগের ‘আগিরে, দ্য র্যাথ অফ গড’ দেখায়, একজন মানুষের ক্রমবর্ধমান উন্মত্ততা দিয়ে সাম্রাজ্যের লোভ-অহংকারের গোটা ছবি আঁকা যায় বিশাল সেট ছাড়াই। এই সিনেমাগুলোর শক্তি সংযমে, যতটা কথায় বলা যায় না, ততটাই বলে দেয় নীরবতা। নোলান ঠিক এই সংযমেই ব্যর্থ বিশাল বাজেট থাকা সত্ত্বেও। ওই সিনেমাগুলো নীরবতায় যা অর্জন করেছিল, নোলান তা সংলাপের আধিক্যে হারিয়ে ফেলেন।
গঠনের দিক থেকেও একই সমস্যা ফিরে ফিরে আসে। ইথাকা আর সমুদ্রযাত্রার মধ্যে যে ক্রস-কাটিং করা হয়েছে, তা কখনও সেই আকাঙ্ক্ষা আর উৎকণ্ঠার জমাট বাঁধা অনুভূতি তৈরি করতে পারে না, যা এই দ্বৈত-বয়ানের দরকার ছিল। দৃশ্যগুলো ঠিক সেই মুহূর্তেই কেটে যায়, যখন তারা সত্যিকারের উত্তেজনা তৈরি করতে শুরু করে। যেন ছবির লক্ষ্য শুধু এগিয়ে যাওয়া, কোনও দৃশ্যকে স্বাভাবিক পরিণতি পর্যন্ত শ্বাস নিতে দেওয়া নয়। সম্পাদনার এই তাড়াহুড়ো সংযমের অভাবের আরেকটি প্রমাণ। নোলান যেন নিজেই ভয় পান— একটুও থামলে দর্শক আগ্রহ হারাবে।
‘বেন-হার’, ‘দ্য টেন কমান্ডমেন্টস’, ‘ক্লিওপেট্রা’র মতো মহাকাব্যিক সিনেমাগুলি যখন তৈরি হয়েছিল, তখন প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা ছিল অনেক বেশি। তবু তাদের পোশাক আর সেটে এক সত্যিকারের ভার অনুভূত হত।
কেন এই গল্প আজও প্রাসঙ্গিক, আর নোলান কেন সেটা ধরতে পারেননি
তিন হাজার বছর পরেও অডিসি প্রাসঙ্গিক, কারণ এই মহাকাব্যের দর্শন। পরিচয়, প্রলোভনের সামনে দুর্বলতা, ঘরে ফেরার আকুতি সময়নিরপেক্ষ। সাইক্লপস, সাইরেন, হেডিস আজও আমাদের জীবনে হাজির থাকে নিজের নিজের রূপে, একরোখা জেদ, লক্ষ্যচ্যুত করা মোহ, ফেলে আসা মানুষদের মুখোমুখি হওয়ার মুহূর্ত নিয়ে। ঠিক এই কারণেই অডিসি বানানো সহজ কাজ নয়। শুধু দানব আর সমুদ্রযাত্রা দেখালে হয় না, দর্শকদের জীবনের সেই লড়াইগুলোও ছুঁতে হয়।

নোলান তাঁর চেনা কৌশলে এগিয়েছেন। বিশাল ক্যানভাস, IMAX-বান্ধব দৃশ্যায়ন, তারকাবহুল কাস্ট। আর সেই বিশালতার আড়ালে কাব্যের আসল প্রাণ, অডিসিউসের ভিতরের বদল হারিয়ে গেছে। ‘বেন-হার’, ‘দ্য টেন কমান্ডমেন্টস’, ‘ক্লিওপেট্রা’র মতো মহাকাব্যিক সিনেমাগুলি যখন তৈরি হয়েছিল, তখন প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা ছিল অনেক বেশি। তবু তাদের পোশাক আর সেটে এক সত্যিকারের ভার অনুভূত হত।
‘দ্য অডিসি’-র ভাঙা প্রাসাদ দেখলে মনে হয় কার্ডবোর্ডের বাক্স ভাঙছে, মঞ্চনাটকের রূপায়ণে যেমনটা লাগে। বার্গম্যানের ‘দ্য সেভেন্থ সিল’, বার্তোলুচ্চির ‘দ্য লাস্ট এম্পেরর’, কুরোসাওয়ার ছবিগুলো প্রমাণ করে গেছে মহাকাব্যিক গল্পের জন্য বিশাল সেট লাগে না, লাগে এমন সুর আর দৃশ্যভাষা যা নীরবেও হৃদয়ে বাজে। এখানেই ‘দ্য অডিসি’ সবচেয়ে বেশি হতাশ করে।

দোষ শুধু বাজেটের নয়। ম্যাট ড্যামন, অ্যান হ্যাথাওয়ে, টম হল্যান্ড, রবার্ট প্যাটিনসন, শার্লিজ থেরন, জেন্ডায়া, লুপিটা নিয়ঙ্গোর মতো বড় বড় সব নাম নিয়ে কাস্ট সাজানো হলেও চরিত্রগুলো এত সীমিত পরিসরে বাঁধা যে, তারকারা পর্দায় শুধু ‘উপস্থিত’ থাকেন, চরিত্রের গভীরে ঢোকেন না। সংলাপের মূল সমস্যা আধুনিক আমেরিকান উচ্চারণে নয়, তার কারিগরিতে। যা দর্শক এমনিতেই দেখছেন, চিত্রনাট্য তা মুখে বলে ব্যাখ্যা করে দেয়। আবেগ অনুভব করানোর বদলে বর্ণনা করা হয়। মহাকাব্য রূপায়ণে এর চেয়ে বড় ক্ষতি আর কিছু হয় না। এমন গল্পের গভীরতা লুকিয়ে থাকে যা বলা হয় না, তার মধ্যে। এই কারণেই টেলেমেকাসের বড় হয়ে ওঠার মধ্যে যে রাজত্ব-দায়িত্বের নীরব পাঠ হোমার লিখেছিলেন, নোলানের সিনেমায় তা সংলাপের স্তরেই আটকে থাকে, হৃদয়ে বাজে না।
অস্কারজয়ী এলেন মিরোজনিক প্রায় ৫,৩০০টি পোশাক তৈরি করেছেন ব্রোঞ্জ যুগের প্রত্নতাত্ত্বিক নথি ঘেঁটে। যদিও দুঃখের বিষয়, এই ছবির হয়তো লক্ষ্যই ছিল, দর্শক যেন পোশাক লক্ষ না করেন, ফলে এত পরিশ্রম পর্দায় প্রায় অদৃশ্য।
এই ব্যর্থতার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ ছবির রাজনৈতিক স্তরে। যুদ্ধ, আগ্রাসন আর ক্ষমতার নৈতিক মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার একটা প্রয়াস আছে, বিশেষত দ্বিতীয়ার্ধে টেলেমেকাস আর অডিসিউসের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। কিন্তু এই রাজনৈতিক-দার্শনিক স্তরটি কখনওই পূর্ণাঙ্গ রূপ পায় না। কারণ, সংলাপ আবেগ আর অর্থ ব্যাখ্যা করে দেয়, অনুভব করতে দেয় না। শাসনের দায়, যুদ্ধের অপরাধবোধ, ক্ষমতার উত্তরাধিকার নিয়ে গভীর প্রশ্নগুলো নিছক সংলাপের স্তরে থেকে যায়, চরিত্রের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে দর্শকের কাছে সঞ্চারিত হয় না। ফলে শাসনক্ষমতা আর যুদ্ধোত্তর অপরাধবোধের যে গভীর বার্তা কাব্যে নিহিত, তা সিনেমায় বুদ্ধিবৃত্তিক ইঙ্গিত হয়েই থেকে যায়, শুধু বলা হয়, দেখানো হয় না।
পোশাকের কাজ ব্যতিক্রম। অস্কারজয়ী এলেন মিরোজনিক প্রায় ৫,৩০০টি পোশাক তৈরি করেছেন ব্রোঞ্জ যুগের প্রত্নতাত্ত্বিক নথি ঘেঁটে। যদিও দুঃখের বিষয়, এই ছবির হয়তো লক্ষ্যই ছিল, দর্শক যেন পোশাক লক্ষ না করেন, ফলে এত পরিশ্রম পর্দায় প্রায় অদৃশ্য।

ভূপ্রকৃতিতে একটা জায়গা সত্যিকারের ব্যতিক্রম হয়ে ওঠে, সেটি হল হেডিসের দৃশ্য। আইসল্যান্ডের ভিকের কালো বালির সৈকতে শুট করা এই দৃশ্যে মৃতদের ছায়ামূর্তিরা বালির নিচ থেকে ওঠে। হিয়েরোনিমাস বসের নরকচিত্রের মতো এক দুঃস্বপ্নের রূপ নেয়। কিন্তু এই একটা দৃশ্যের তীব্রতা বাকি সিনেমার সঙ্গে মেলে না। সামগ্রিকভাবে, এই ভূদৃশ্য তাই অসম মনে হয়।
সঙ্গীত পরিচালক লুডভিগ গোরানসনের কথা আলাদাভাবে বলতে হয়। ওপেনহাইমার আর টেনেটের পর এই ছবিটি নোলানের সঙ্গে তাঁর তৃতীয় কাজ। এবারও তিনি প্রথাগত অর্কেস্ট্রার পথে হাঁটেননি, বরং ভাঙা ধাতু আর গং দিয়ে এক অদ্ভুত কোরাস বানিয়েছেন, যা কখনও আসল যন্ত্রের শব্দে, কখনও সিন্থেসাইজারে রূপান্তরিত হয়ে শোনা যায়। অডিসিউসের ধনুকের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন বীণার ছন্দময় টঙ্কার— এক সহজ, প্রায় লোকজ মোটিফ, যা প্রতিবার ফিরে এসে চরিত্রটাকে চিনিয়ে দেয় সংলাপ ছাড়াই। সাইরেনের মোহময় আকর্ষণ বোঝাতে ফিরিয়ে এনেছেন প্রাচীন গ্রিক বাদ্যযন্ত্র আউলোস, যার তীক্ষ্ণ, নাকি সুর সত্যিই গা ছমছমে প্রলোভনের অনুভূতি তৈরি করে এবং এই একটি জায়গায় সঙ্গীত একাই যা বলবার তা বলে দেয় সংলাপের সাহায্য ছাড়া।
হেলেনের কাস্টিং, তাঁর মুখের ক্ষতচিহ্ন, হেডিসের সেই দৃশ্য প্রমাণ করে, নোলান জানতেন কীভাবে ঝুঁকি নিতে হয়। কিন্তু গোটা সিনেমা জুড়ে সেই ঝুঁকি নেওয়ার সাহসটা ধরে রাখতে পারেননি।
এই সিদ্ধান্তগুলো নিঃসন্দেহে মৌলিক আর সাহসী। তাই প্রথাগত মহাকাব্যিক আবহসঙ্গীতের বদলে একটা সত্যিকারের অচেনা শব্দজগৎ তৈরি করে। তবে এই মৌলিকতাই মাঝে মাঝে বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে যুদ্ধ আর ঝড়ের দৃশ্যগুলোয়, ধাতু আর গংয়ের সেই স্তরায়িত শব্দ এত ঘন হয়ে ওঠে যে দৃশ্যের নিজস্ব আবেগ, এমনকি মাঝে মধ্যে সংলাপও, তার নিচে চাপা পড়ে যায়। সঙ্গীত যখন দৃশ্যকে সাহায্য না করে নিজেই মনোযোগ দাবি করে, তখন কানের ক্লান্তি বেড়ে যায়। অভিনবত্ব প্রশংসনীয়, কিন্তু সংযমের ঘাটতি ফিরে আসে এখানেও, সংলাপ আর সম্পাদনার মতো। নতুনত্বের নেশায় গোরানসন মাঝে-মধ্যে ভুলে যান, ছবিতে সঙ্গীতের কাজ দৃশ্যকে তুলে ধরা, নিজেকে জাহির করা নয়।
সাইরেনের গান আসলে কী, এই প্রশ্নের উত্তরে সিনেমার অডিসিউস যা বলেন, তার সারমর্ম হল— সাইরেনের গান আসলে সেই জিনিস যা মানুষ সবচেয়ে বেশি চায়, অথচ যা পেলে সবচেয়ে বেশি অনুশোচনা হয়। শেষমেশ বোঝা যায়, মানুষ যা সবচেয়ে বেশি চায়, তা আসলে সেই জিনিস, যা সে একদিন পেয়েও হারিয়ে ফেলেছিল। সংলাপটি সুলিখিত, কাব্যিকও, কিন্তু এটাও সেই একই সমস্যার উদাহরণ যা গোটা সিনেমা জুড়ে ফিরে আসে। আমার মনে হয়েছে, সাইরেনের গানের রহস্য আর টান দর্শককে অনুভব করানোর বদলে, সিনেমা সেটা মুখে বলেই বুঝিয়ে দেয়।

শেষ রায়
‘দ্য অডিসি’ আমার কাছে শূন্যগর্ভ। দৃশ্যের আড়ম্বর আছে, হৃদয়ের স্পর্শ নেই। হোমারের কাব্য অন্তর্যাত্রার কথা বলে। নোলানের সিনেমা তার বহিরাবরণটা ধরতে পারে, ভিতরের রূপান্তরের কাহিনিটি নয়। যে মহাকাব্য কয়েক হাজার বছর ধরে মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে কথা বলে চলেছে, সেই গল্প নিয়ে খেলতে গিয়েও ছবিটি আমার হৃদয়ের কোনও তার ছোঁয়নি।
এটা আরও বেশি হতাশাজনক, কারণ এই ব্যর্থতা প্রতিভার অভাবে হয়নি, হয়েছে সাহসের ঘাটতিতে। হেলেনের কাস্টিং, তাঁর মুখের ক্ষতচিহ্ন, হেডিসের সেই দৃশ্য প্রমাণ করে, নোলান জানতেন কীভাবে ঝুঁকি নিতে হয়। কিন্তু গোটা সিনেমা জুড়ে সেই ঝুঁকি নেওয়ার সাহসটা ধরে রাখতে পারেননি। বরং ফিরে গেছেন নিরাপদ, ব্যাখ্যাসর্বস্ব সংলাপের আশ্রয়ে। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে ফেরার মধ্যে দিয়ে আমার জীবনে যে অডিসিউসকে আমি বারবার খুঁজে পাই, আমার মতো যারা প্রতিটি ফেরায় একটু বদলে যায়, প্রতিটা ঘরকেই খানিক অচেনা আর খানিক আপন মনে করে, নোলানের ছবিতে সেই অডিসিউসকে আমি খুঁজে পাইনি।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত