(Egg In Literature)
রান্নাঘরের তাকে বা ফ্রিজের ভিতর সযত্নে রাখা আপাতনিরীহ সাদামাটা এক খাদ্যবস্তু ডিম। অথচ এই খাবারটির কাছে সাহিত্য জগতের ঋণ মোটেই কম নয়। মাছ-মাংস আর শাক-সবজির জগতকে দু’দিকে ঠেলে প্রাচীন যুগ থেকে সাহিত্যের অন্দরে জাঁকিয়ে রাজত্ব করছে সে। পাতলা এক খোলসের ভিতরে জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে জীবন যুগিয়ে গিয়েছে প্রাচীন থেকে আধুনিক বহু সাহিত্যকে। কখনও হয়ে উঠেছে সৃষ্টির প্রতীক, কখনও বা নিরন্তর সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। কাহিনিকারদের কলমের সৌজন্যে তাই ডিম চার হাজার বছর ধরে নট আউট সাহিত্যের আঙিনায়।
সাহিত্যের প্রসঙ্গ উঠলে প্রথমেই আসে পৌরাণিক সাহিত্য। পৃথিবীর দূরদূরান্তের সংস্কৃতি, যাদের মধ্যে সেভাবে আদৌ কোনও যোগাযোগ বা সদ্ভাব নেই, ডিম হয়ে উঠেছে তাদের সংযোগসূত্র। হিন্দুদের পৌরাণিক সাহিত্যে উল্লেখ পাওয়া যাবে ব্রহ্মাণ্ডের। আক্ষরিকভাবে দেখলে তার অর্থ ‘ব্রহ্ম ডিম’, যার ভিতর পোরা এই গোটা জগৎ সংসার। আবার চিনের পুরাণে আদিম ডিম থেকে জন্ম নিচ্ছেন পাঙ্গু। খোলস ভেঙে বেরিয়ে তিনি আলাদা করে দিচ্ছেন আকাশ ও মাটিকে। গ্রিক সৃষ্টিতত্ত্বে অর্ফিক এগ-এর আবরণ ভেঙে বেরিয়ে আসছেন প্রথম দেবতা।

আবার, ফিনল্যান্ডের মহাকাব্য ‘কালেভালা’-য় আকাশ দেবী ইলমাতারের হাঁটুর উপর পাড়া ডিম থেকে জন্ম নিচ্ছে আমাদের পৃথিবী। সেই ডিমের খোলস দেখতে দেখতে বদলে যাচ্ছে মাটি আর আকাশে, কুসুম হয়ে উঠছে সূর্য। আকারের সুবাদে আর স্বধর্মের মহিমায় আপাতনিরীহ খাদ্য উপাদান সম্মানিত হচ্ছে জগৎ-গর্ভ রূপে।
অ্যান্ডি উইয়ারের ছোটগল্প ‘দ্য এগ’-এর কাহিনি ডিমকে পৌঁছে দেয় এক অন্য আধ্যাত্মিকতার স্তরে। সেই কাহিনি মতে, এখন পর্যন্ত বেঁচে থাকা বা ভবিষ্যতে জন্ম নেবে এমন প্রতিটি মানুষ আসলে একই আত্মা। তারা বারবার জন্ম নিয়ে এগিয়ে চলেছে কোনও এক চূড়ান্ত পরিণতির দিকে। সায়েন্স ফিকশনের ভাষায় প্রাচীন মহাকাব্যের মহাজাগতিক ডিমের কাহিনিটিই ফিরে আসে নতুন রূপে।
পৌরাণিক সাহিত্য ছেড়ে লোককথার আঙিনায় এলে ডিমেরা উঁকি মারে ঈশপের কাহিনি থেকে। সোনার ডিম পাড়া রাজহাঁস লোভের করুণ পরিনতি শিখিয়ে দেয় ছোট্ট বয়সেই। সৌভাগ্যের উৎস ভেবে রাজহাঁসের পেট চিড়ে ফেলেছিল এক কৃষক। তারপর তাঁর জীবনে চিরতরে নেমে আসা দুঃখ চিনিয়ে দেয় চাহিদার চৌকাঠে কখন হোঁচট খেতে হয়।

আধুনিক বিশ্বখ্যাত সাহিত্যে এই চৌকাঠের আরেক অনন্য বয়ান পাওয়া যাবে খানিক অন্য রূপে। ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অফ সলিচুড’-এ অসংখ্য ছোট ছোট করুণ বিভ্রম সাজাচ্ছেন গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ। একটি বিভ্রমে উপকরণ হিসেবে বেছে নিচ্ছেন ডিমকেই। উপন্যাসে এক পরিবারের মুরগিরা একদিন একশোটি সোনার ডিম পেড়ে বসে। সুপ্রাচীন লোককথার নিয়তিপথ ধরে মুরগি-মালিক উরসুলা স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন দিন বদলের। দীর্ঘদিনের অধরা সৌভাগ্য এবার তাঁর হস্তগত হবে বলে কথা। সেই আনন্দে ভাসতে ভাসতে ইমারত গড়ে তোলেন দামি দামি সব ইচ্ছের। অবশেষে যখন ডিমগুলো গলাতে বসেন, দেখা যায়, সেগুলো আদৌ সোনার ডিম নয়। বাইরের খোলসটাই যা সোনালি। ডিমের ভঙ্গুর খোলসের মতোই মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে চুরমার হয় স্বপ্ন। বাস্তব ও কল্পনার মাঝের ফিনফিনে পর্দা ডিমের আবরণের মতো গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যায়।
পৌরাণিক সাহিত্যে যেমন ডিম বিশ্বাসের রূপক, তেমনই আধুনিক সাহিত্যে কখনও কখনও ধর্মরাজনৈতিক প্রতীক। জোনাথন সুইফটের ‘গালিভার্স ট্র্যাভেলস’-এ লিলিপুট আর ব্লেফাসকু-র রাজ্য যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে একটি ছোট্ট প্রশ্নকে কেন্দ্র করে। প্রশ্নটি হল— সিদ্ধ ডিমের খোলস বড় প্রান্ত থেকে ভাঙা উচিত না ছোট প্রান্ত থেকে?
লোককথার পাশাপাশি শিশুসাহিত্যও অল্প বয়সের মূল্যবোধ নির্মাণে বড় ভূমিকা নেয়। ডিম সেই পরিসরে হাজির হয় ভাঙনের ভয় আর যত্নের মূল্য বুঝিয়ে দিতে। হাম্পটি-ডাম্পটির কথাই ধরুন— মানুষের মতো দেখতে ডিম দুটো যেইমাত্র দেওয়ালের উপর থেকে পড়ে গেল, অমনি রাজার সব ঘোড়া আর সৈন্যরা ছুটল তাদের উদ্ধার করতে। কিন্তু ছুটলে কী হবে, ভাঙা ডিম মুখ থেকে বেরনো কথা বা তীর থেকে ছোঁড়া বাণের মতো, চাইলেও আর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায় না।
শুধু তো হাম্পটি-ডাম্পটি নয়, সুকুমার রায়ের ‘তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম’ও ঘুমপাড়ানির ছলে সেই অসম্ভবের কথা বলে। ননসেন্স কৌতুকে মুড়ে পরিবেশন করে এক আজগুবি জগত, ঘুমের দেশে না গেলে যার নাগাল মেলে না সহজে। আবার, জে কে রাউলিংয়ের হ্যারি পটার সিরিজে ড্রাগনের ডিমের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসা ধাঁধাঁর সমাধান করতে হয় হ্যারিকে। প্রাচীন ডিম রহস্যের ঐতিহ্য এখানে জোট বাঁধে আধুনিক ফ্যান্টাসির সঙ্গে।

পৌরাণিক সাহিত্যে যেমন ডিম বিশ্বাসের রূপক, তেমনই আধুনিক সাহিত্যে কখনও কখনও ধর্মরাজনৈতিক প্রতীক। জোনাথন সুইফটের ‘গালিভার্স ট্র্যাভেলস’-এ লিলিপুট আর ব্লেফাসকু-র রাজ্য যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে একটি ছোট্ট প্রশ্নকে কেন্দ্র করে। প্রশ্নটি হল— সিদ্ধ ডিমের খোলস বড় প্রান্ত থেকে ভাঙা উচিত না ছোট প্রান্ত থেকে? আদতে এই আপাতনিরীহ প্রশ্নের আড়ালে লুকিয়ে থাকে খ্রিস্টধর্মের ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট বিভাজন নিয়ে লেখকের কঠিন কটাক্ষ। মতাদর্শগত যুদ্ধের আড়ম্বরকে আপাততুচ্ছ অথচ নিখুঁত চিত্রকল্পে বেঁধে ফেলার রসদ জোগায় ডিম।
শুধু ধর্ম-পুরাণ-রাজনীতি দিয়ে সাহিত্যে ডিমের রাজত্ব ব্যাখ্যা করলে অনুল্লেখিত থেকে যাবে ডিমের আসল রূপটি। ডিমের ভিতরেই তো সঞ্চিত থাকে মাতৃত্ব বা পিতৃত্বের মহার্ঘ অনুভূতি। ড.সিউস-এর ‘হর্টন হ্যাচেস দ্য এগ’-এ হাতি হর্টন ঝড়-জল সহ্য করে, উপহাস ও বন্দিদশায় ভেঙে না পড়ে একটি পরিত্যক্ত পাখির ডিমকে নিজের ওম প্রদান করে। হাজার ঝঞ্ঝা সত্ত্বেও ডিমের উপর থেকে সে সরে যায় না। কারণ, সে কথা দিয়েছে ওই ভ্রূণের প্রাণরক্ষার। প্রতিশ্রুতিরক্ষার পাশাপাশি ডিম যেন তখন পিতৃত্বের সংজ্ঞানির্ধারক।
মার্গারেট অ্যাটউডের ‘ব্লুবিয়ার্ডস এগ’ আবার পুরনো এক রূপকথাকে গড়ে তোলে নতুনভাবে। এক খুনি স্বামী তাঁর স্ত্রীর হাতে একটি ডিম দিয়ে নির্দেশ দেয়, ‘ওই’ দরজার ভিতরে কখনও উঁকি না দিতে। অ্যাটউডের কলমে ডিমটি হয়ে ওঠে স্ত্রীর দমিয়ে রাখা প্রজ্ঞার সূচক।
পিতৃত্ব-মাতৃত্বের সংজ্ঞানির্মাণ ছাড়াও নারী-পুরুষের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের সাক্ষীও তো থাকে এই আপাতজড় পদার্থটি। টমাস হার্ডি-র ‘জুড দ্য অবস্কিওর’ উপন্যাসে খামারের ভিতরকার এক রীতি ডিম মারফত হয়ে ওঠে যৌন নিবেদনের সংকেত। জুডকে দেখার পর আরাবেলা নিজের স্তনবিভাজিকায় একটি ডিম রাখেন। যেন ভাবী ছানাটিকে ওম দিচ্ছেন। আদতে, আরাবেলার ছিল অন্য আরেক উদ্দেশ্যও। সেই উদ্দেশ্যের মায়ায় বাঁধা পড়েন জুড। এক অন্তরঙ্গ আলাপের সাক্ষী হয়ে ওঠে দুই বুকের মাঝে থাকা ভাবী সন্তান ও তার সাদা আপাতজড় আবরণ।

মার্গারেট অ্যাটউডের ‘ব্লুবিয়ার্ডস এগ’ আবার পুরনো এক রূপকথাকে গড়ে তোলে নতুনভাবে। এক খুনি স্বামী তাঁর স্ত্রীর হাতে একটি ডিম দিয়ে নির্দেশ দেয়, ‘ওই’ দরজার ভিতরে কখনও উঁকি না দিতে। অ্যাটউডের কলমে ডিমটি হয়ে ওঠে স্ত্রীর দমিয়ে রাখা প্রজ্ঞার সূচক। হয়ে ওঠে স্বামীর প্রকৃত চরিত্র সম্পর্কে সে যা কিছু আন্দাজ করে কিন্তু নিজের কাছে স্বীকার করে না, তারই নীরব সাক্ষী।
উষ্ণতার পাশাপাশি সম্পর্কের শীতলতা ও ব্যর্থতার ভারও বহন করতে হয় ডিমকে। ইরানি সাহিত্যিক কাভেহ আকবরের ‘মার্টার!’ উপন্যাসে প্রধান চরিত্র সাইরাসের বাবা এক খামার-কর্মী। তাঁর কাজ মুরগির কুপ থেকে সবচেয়ে ভাল ডিমগুলো বেছে আনা। দিনের পর দিন সেই কাজ করতে করতে এখন তিনি নির্ভুলভাবে কাজ করে চলেন। তাঁর এই নির্ভুল স্বভাবের সঙ্গে জুড়ে যায় একধরনের যান্ত্রিকতা, এক গভীর নির্লিপ্তি। কাজ করার এই অভ্যাসের নিচেই চাপা পড়ে যায় সাধারণ মানবিক বিশৃঙ্খলা। চাপা পড়ে যায় জীবনের ওঠানামার সহজ তরঙ্গস্রোত। ডিমের ঘরের শীতলতাই যেন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর এবং তাঁর সন্তান সাইরাসের জীবনে। শীতল হয়ে যায় যোগাযোগ, কঠিন হয়ে যায় পিতা-পুত্রের অঙ্ক।

শেরউড অ্যান্ডেরসনের ছোট গল্প ‘দ্য এগ’-এ একইভাবে এক অনামী চরিত্র প্রথমে মুরগির খামার চালাত। পরে সে রেস্তোরাঁ চালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু প্রতিবারই অবাধ্য ডিমের কাছে তাঁর সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়। কখনও ডিম থেকে বেরোয় বিকৃত ছানা, কখনও খদ্দেরের সামনে ডিম নিয়ে স্টান্ট দেখানোর চেষ্টা বিফলে যায়। একের পর এক উচ্চাকাঙ্ক্ষার স্বপ্ন ধসে পড়ে। আর এহেন ধস যেন আমেরিকান স্বপ্নের অন্তর্নিহিত ফাঁকির রূপক হয়ে ওঠে। বিশ্বের সবচেয়ে ‘উন্নত’ দেশের মানুষগুলোর স্বপ্ন-রূপকের ভার বয়ে চলে সামান্য এক ডিম।
একটি রবিন পাখির বাসা থেকে ডিম তুলে নেওয়ার মুহূর্তের মধ্যে লেখক ওয়াল্ট হুইটম্যান দেখেছেন সদ্যজাত জীবনের সৌন্দর্য। রুডইয়ার্ড কিপলিং আবার ‘দ্য এগ শেল’ কবিতায় জলে ভাসতে থাকা ভাঙা ডিমের খোলসে ধরে রেখেছেন জীবনের গভীর ও ব্যাপক অসহায়তা।
শীতলতা ও ব্যর্থতার প্রসঙ্গ এলে ভঙ্গুরতার কথাও বলতে হয়। রবার্ট ফ্রস্টের ‘দ্য এগ অ্যান্ড দ্য মেশিন’ কবিতায় প্রকৃতির ভঙ্গুরতার প্রতীক ডিম রুখে দাঁড়িয়েছে দ্রুত এগিয়ে চলা যন্ত্রসভ্যতার বিরুদ্ধে। টি এস এলিয়টের ‘আ কুকিং এগ’ কবিতায় পচে যাওয়া ডিম হয়ে উঠেছে সময়, স্মৃতি আর ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের প্রতীক। একটি রবিন পাখির বাসা থেকে ডিম তুলে নেওয়ার মুহূর্তের মধ্যে লেখক ওয়াল্ট হুইটম্যান দেখেছেন সদ্যজাত জীবনের সৌন্দর্য। রুডইয়ার্ড কিপলিং আবার ‘দ্য এগ শেল’ কবিতায় জলে ভাসতে থাকা ভাঙা ডিমের খোলসে ধরে রেখেছেন জীবনের গভীর ও ব্যাপক অসহায়তা।
ডিম স্বভাবতই ভঙ্গুর, ক্ষণস্থায়ী। অথচ একটি নতুন জীবনের প্রতিশ্রুতি বয়ে আনে। নিশ্চয়তা না দিলেও সেই প্রতিশ্রুতি প্রতিটি প্রাণের বেঁচে থাকার যাত্রায় বড় পাথেয়। সম্ভাবনা আর ভঙ্গুরতার দ্বৈত সত্তা নিয়েই ডিমের আবহমান চলন। মানবদেহ থেকে প্রাণীশরীর, প্রাচীন থেকে আধুনিক যেখানেই প্রাণের কথা এসেছে, সেখানেই ডিমের প্রসঙ্গ এসেছে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে। সম্ভবত এই অনিবার্য উপস্থিতিই সমাজ-জীবনের দর্পণস্বরূপ সাহিত্যেও ডিমকে দীর্ঘস্থায়ী এক রূপক করে তুলেছে। সাহিত্যের নেপথ্যচারী লেখকের মস্তিষ্কপ্রসূত ভাবনা বা কলমশরীরের কালিও কালে কালে তাই হয়ে উঠেছে ডিম ও ডিমের গর্ভের প্রতিরূপ!
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত