(CJP Protest)
দিল্লির যন্তর মন্তর। কাঠের পাটাতনের এক পাশে স্থির বসে আছেন কঙ্কালসার এক ব্যক্তি। মুখে পরিচিত স্নিগ্ধ হাসি। অনশনরত সোনম ওয়াংচুক। পাশে কালো টি-শার্ট আর শুকনো মুখে বসে শান্ত, মৃদুভাষী যুবক। এই যুবকই একটা মিম পেজের দৌলতে দেশকে তোলপাড় করে দিয়েছে। আন্দোলনের প্রধান নেতৃত্ব, অভিজিৎ দীপকে।
পাটাতন ঘিরে আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রী, আছেন তাদের অভিভাবকরাও। সারাদিনই চলছে স্লোগানের কর্মসূচি, তারই মাঝে কখনও বসছে কবিতা সভা, কখনও ‘রঙ দে বসন্তী’র গান মাতিয়ে রাখছে দৃশ্যপট। তরুণ-তরুণীরা আরশোলার মুখোশ পরে জমায়েত করছে। হাতে ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাকার্ড, মুখে স্লোগান, চারদিকে ক্যামেরা আর স্মার্টফোনের ভিড়। অভিনব রাজনৈতিক নাট্যমঞ্চ।

চাকরিপ্রার্থী ও বেকার যুবকদের কয়েক মাস আগে ‘আরশোলা’ বলে কটাক্ষ করেন ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত। বেকারত্বের সমস্যায় জর্জরিত দেশে ক্ষমতাসীন সরকারি প্রতিনিধির এহেন মন্তব্যের প্রতিবাদে সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত অভিজিৎ তখন মজার ছলেই ভারতীয় জনতা পার্টির নামের আদলে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে একটি মিম পেজ বানিয়েছিলেন। মুহূর্তেই মধ্যেই পেজটি ভাইরাল হয়ে যায়, আরশোলার পরিচয়কে অস্ত্র করে নিট পরীক্ষার স্ক্যাম আর স্কুলস্তরের শিক্ষার দুরবস্থার প্রতিবাদের সঙ্গে মিলে যায় এই ‘ককরোচ’দের কর্মসূচি।
আরশোলাদের আমরা দৈনন্দিন জীবনে অবাঞ্ছিত প্রাণী হিসেবে দেখতেই অভ্যস্ত। বাড়ির কোণে, আনাচে-কানাচে তাদের বাস। হাজার চেষ্টা করলেও তাদের নির্মূল করা বেশ কষ্টসাধ্য। আন্দোলনকারীদের কাছে এই টিকে থাকার ক্ষমতাই হয়ে উঠেছে প্রতিরোধের রূপক। যুক্তি সহজ— বারবার মারার চেষ্টা সত্ত্বেও যেমন আরশোলা টিকে থাকে, তেমনই রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক অবহেলার মধ্যেও দেশের যুবসমাজ নিজেদের অস্তিত্বের লড়াই চালিয়ে যেতে সক্ষম। রাজনৈতিক ইতিহাসে এই কৌশল নতুন নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ব্ল্যাক পিপল থেকে এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়, বহু প্রান্তিক সম্প্রদায়ই অপমানসূচক সম্বোধনকে প্রতিরোধের প্রতীকে রূপান্তর করেছে। ককরোচ জনতা পার্টিও সেই ঐতিহ্যের উত্তরসূরি।
শুরুর দিকে মূলত ডিজিটাল পরিসরের থাকলেও, সরকারপন্থীদের কটাক্ষ উপেক্ষা করে আন্দোলন শীঘ্রই রাস্তায় নেমে আসে। অভিজিৎ ফিরে আসেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে, হাতে আম্বেদকরের আত্মজীবনী নিয়ে বিমানবন্দর থেকে পৌঁছে যান যন্তর মন্তরের অবস্থানে। কিছু দিনের মধ্যে ছাত্রছাত্রী, চাকরিপ্রার্থী, অভিভাবক ও তরুণ কর্মজীবী সেখানে জড়ো হন। প্রধান দাবি ছিল, জাতীয় স্তরের বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অন্যান্য অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত, এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ।

আগে আম আদমি পার্টির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও, এই আন্দোলনে অভিজিৎ বারবার অনুরোধ করেছিলেন কোনও দলীয় পতাকা বা রাজনৈতিক দলের চিহ্ন অবস্থানে না রাখতে। তার বদলে ফুল, আরশোলার মুখোশ, স্লোগান, কবিতা আর গান হোক আন্দোলনের হাতিয়ার। প্রায় দুই মাস এই আন্দোলন চলার পর, সোনম ওয়াংচুক ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আমরণ অনশনের সিদ্ধান্ত নেন।
নোয়াম চমস্কি লিখেছিলেন, আধুনিক পুঁজিবাদী রাষ্ট্র টিকে থাকে সম্মতি নির্মাণের মাধ্যমে। সংবাদমাধ্যম, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ভাষা, এমনকি দৈনন্দিন সাধারণ বোধ, সবকিছুর মধ্য দিয়েই শাসকশ্রেণি নিজের আধিপত্যকে স্বাভাবিক বলে প্রতিষ্ঠা করে।
গত সপ্তাহে দিল্লি পুলিশের নেতৃত্বে ককরোচ পার্টির আন্দোলনের উপর লাঠিচার্জ করা হয়। সোনম ওয়াংচুককে একরকম জোর করে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে। অভিজিতের মুখে কালি ছোঁড়া হয়। অসংখ্য তরুণ-তরুণীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন সাদা কাপড় ঢেকে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয়। কিন্তু এতকিছুর পরেও প্রতিবাদ থেমে থাকেনি। হাসপাতালের বেডে শুয়েও সোনম অনশন ভাঙেননি, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অনশন চালিয়ে যাওয়ার সংকল্প তাঁর। ২০শে জুলাই সংসদ অভিযানের জন্য কিছুক্ষণের ‘ছুটিও’ চেয়েছেন তিনি।
এহেন পরিস্থিতিতে অনেকেই এই আন্দোলনের পদ্ধতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কঠোর মার্ক্সবাদীদের অনেকে যেমন ‘ককরোচ’দের আন্দোলনকে দেখছেন উদারপন্থী মধ্যবিত্তের নৈতিক প্রতিবাদ হিসেবে। এই ধরনের প্রতীকী বিক্ষোভ রাষ্ট্রের ক্ষমতার কাঠামোকে প্রশ্ন করে না, শুধু রাষ্ট্রের কাছে ন্যায়বিচারের আবেদন জানায়। শোষণের অর্থনৈতিক ভিত্তি কিংবা পুঁজিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে কোনও সংগঠিত রাজনৈতিক লড়াই এটা নয়। প্রতিবাদটি তাই তাঁদের চোখে এক ধরনের ‘পারফরমেটিভ ডিসেন্ট’, যেখানে প্রতিবাদের দৃশ্যমানতাই মুখ্য, পরিবর্তনের বাস্তব রাজনৈতিক কৌশল নয়।

এই সমালোচনার ঐতিহাসিক ভিত্তিও রয়েছে। ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনের একটি বড় অংশ বরাবরই গান্ধিবাদী রাজনীতিকে শ্রেণি সমঝোতার রাজনীতি হিসেবে দেখেছে। মার্ক্সবাদ ঠিক এই ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রকে শাসক শ্রেণির আধিপত্য রক্ষার যন্ত্র হিসেবে দেখে। অহিংস নৈতিক আবেদন, প্রতীকী প্রতিবাদ কিংবা রাষ্ট্রের বিবেকের কাছে আর্জিকে সেখানে বিপ্লবী রাজনীতির বিকল্প নয়, তার সীমাবদ্ধ রূপ বলেই বিবেচনা করেছে বামপন্থীরা। বর্তমান কংগ্রেসি উদারনীতি ব্যক্তি স্বাধীনতা, সাংবিধানিক মূল্যবোধ এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্নকে অগ্রাধিকার দিলেও, সম্পদের পুনর্বণ্টন কিংবা শ্রেণিশক্তির প্রশ্নকে এড়িয়েই চলে।
নোয়াম চমস্কি লিখেছিলেন, আধুনিক পুঁজিবাদী রাষ্ট্র টিকে থাকে সম্মতি নির্মাণের মাধ্যমে। সংবাদমাধ্যম, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ভাষা, এমনকি দৈনন্দিন সাধারণ বোধ, সবকিছুর মধ্য দিয়েই শাসকশ্রেণি নিজের আধিপত্যকে স্বাভাবিক বলে প্রতিষ্ঠা করে। সেই কারণেই প্রতিরোধও কেবল কারখানার গেটে বা সংসদের বাইরে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা গড়ে ওঠে সংস্কৃতিতে, ভাষায় এবং জনপরিসরে, কিন্তু সেই আধিপত্য যখন মানুষের ধৈর্যের সীমা লঙ্ঘন করে যায়, তখন মানুষ প্রতিবাদের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। একটি মিমও কখনও কখনও এই সাংস্কৃতিক আধিপত্যে ফাটল ধরাতে পারে।
বিংশ শতাব্দীর কমিউনিস্ট আন্দোলনে ‘ইউনাইটেড ফ্রন্ট’ বা ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের ধারণা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। মতাদর্শগত পার্থক্য বজায় রেখেও, বৃহত্তর বিপদের মুখে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল শক্তির মধ্যে কৌশলগত ঐক্য গড়ে তোলার প্রশ্ন উঠে আসে।
রোজা লুক্সেমবুর্গও বিপ্লব ও সংস্কারের সম্পর্ককে দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক হিসেবে দেখেছিলেন। তিনি মনে করতেন, মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রাম এবং গণআন্দোলনের অভিজ্ঞতাই ভবিষ্যতের বৃহত্তর রাজনৈতিক চেতনা নির্মাণ করে। আন্দোলনের মূল্য কেবল তার তাৎক্ষণিক ফলাফলে নয়, মানুষের রাজনৈতিক কল্পনাশক্তিকে প্রসারিত করতে পারার মধ্যেই তার সাফল্য।
ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই তর্ক আরও প্রাসঙ্গিক। যখন রাষ্ট্র ক্রমশ কেন্দ্রীভূত, কর্পোরেট স্বার্থনির্ভর এবং হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদের নিরিখে নিজের আধিপত্যকে সুসংহত করছে; যখন সংবাদমাধ্যম, বিশ্ববিদ্যালয়, বিচারব্যবস্থা থেকে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলিও ক্রমশ নিয়ন্ত্রণের আওতায় চলে যাচ্ছে; তখন প্রতিরোধের প্রতিটি ভাষাকেই নিছক উদারনৈতিক দুর্বলতা বলে উড়িয়ে দেওয়া কি আদৌ রাজনৈতিক পরিসরে ফলপ্রসূ? ইতিহাস বলছে, ফ্যাসিবাদ সমাজের নৈতিক পরিসরকে পুনর্গঠন করার প্রকল্প। ফ্যাসিবাদী শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধও তাই বহুমাত্রিক হতে বাধ্য।

বিংশ শতাব্দীর কমিউনিস্ট আন্দোলনে ‘ইউনাইটেড ফ্রন্ট’ বা ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের ধারণা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। মতাদর্শগত পার্থক্য বজায় রেখেও, বৃহত্তর বিপদের মুখে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল শক্তির মধ্যে কৌশলগত ঐক্য গড়ে তোলার প্রশ্ন উঠে আসে। জর্জি দিমিত্রভ ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামে এই ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার উপর বিশেষ জোর দিয়েছিলেন। তার অর্থ এই নয় যে কমিউনিস্টরা নিজেদের মতাদর্শ বিসর্জন দেবেন, বরং গণতান্ত্রিক পরিসর রক্ষাই যেন হয়ে ওঠে সেই দীর্ঘমেয়াদী সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার শর্ত।
আজকের ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মতাদর্শগত বিশুদ্ধতার প্রতিযোগিতাকে বিসর্জন দিতে হবে। কংগ্রেসি উদারনীতি ও মার্ক্সবাদ এক নয়, কখনও ছিলও না। কিন্তু কোনও কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র যখন নাগরিক স্বাধীনতা, ভিন্নমত এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেই ক্রমশ সংকুচিত করে, তখন প্রতিটি গণতান্ত্রিক প্রতিরোধ, সে যত সীমিতই হোক, বৃহত্তর সংগ্রামের সম্ভাবনা।
ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন হয়তো এখনই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটাবে না, হয়তো রাষ্ট্রক্ষমতাও দখল করবে না। কিন্তু সোনম ওয়াংচুক, অভিজিৎ দীপকে এবং আরশোলার মুখোশ পরা ছাত্রছাত্রীদের এই প্রতিবাদ মানুষকে সংগঠিত করেছে।
বাস্তব পরিস্থিতির সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণেই আন্দোলনের সাফল্য, বিমূর্ত মতাদর্শগত বিশুদ্ধতায় নয়। আজ এই মুহূর্তে একান্ত প্রয়োজন বৃহত্তর পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে একত্রিত হওয়া। শ্রেণিশোষণের বিরুদ্ধে আপসহীন থেকেও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার প্রশ্নে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং যে কোনও ফ্যাসিবাদবিরোধী জন-উদ্যোগের প্রশ্নে একে অপরের পাশে দাঁড়াতে দ্বিধা করলে চলবে না। প্রতিটি প্রতিবাদ বিপ্লব না হলেও, মানুষের মধ্যে ভয় ভাঙার একটি সম্ভাবনা তৈরি করে। আর এই প্রতিবাদের সমষ্টি থেকেই একদিন রাজনৈতিক বোধ তৈরি হবে, যেখানে শ্রেণিহীন সমাজই হবে ইতিহাসের আগামী বাস্তব সম্ভাবনা।

ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন হয়তো এখনই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটাবে না, হয়তো রাষ্ট্রক্ষমতাও দখল করবে না। কিন্তু সোনম ওয়াংচুক, অভিজিৎ দীপকে এবং আরশোলার মুখোশ পরা ছাত্রছাত্রীদের এই প্রতিবাদ মানুষকে সংগঠিত করেছে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস জুগিয়েছে। আজ সেই সাহসের বড় প্রয়োজন।
তথ্যসূত্র
১. Manufacturing Consent by Noam Chomsky
২. Social Reform or Revolution by Rosa Luxembourg
৩. The United Front againt Fascism by Georgi Dimitrov
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত