(Anup Kumar)
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে এবং তাঁর লিপে ‘জীবনপুরের পথিক রে ভাই’ আজও অমর হয়ে আছে বাঙালি মননে। তরুণ মজুমদার পরিচালিত ‘পলাতক’, ‘ঠগিনী’ ও ‘নিমন্ত্রণ’ -তিনটি ছবিতেই নায়কের ভূমিকায় অনবদ্য অভিনয় তাঁর! যদিও অধিকাংশ দর্শকের কাছেই তাঁর পরিচয় কমেডিয়ান বা পার্শ্বঅভিনেতা হিসাবে, তবুও পেশাদারী নাট্যমঞ্চ থেকে রেডিও নাটক বা রূপোলী পর্দা, যখনই সুযোগ পেয়েছেন নিজের জাত চিনিয়েছেন। তিনি অভিনেতা, নাট্যকার ও নির্দেশক অনুপকুমার।
মাত্র আট বছর বয়সেই শিশু অভিনেতা হিসাবে প্রথম কাজ কিংবদন্তি ধীরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলির ‘হাল-বাংলা’ ছবিতে। জন্ম উত্তর কলকাতায়, বাবা-মায়ের দেওয়া নাম সত্যেন দাস। তবে চলচ্চিত্র জগতে পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর নাম পাল্টে করে দেওয়া হল অনুপকুমার। বাবা ধীরেন দাস ছিলেন সেকালের রঙ্গমঞ্চের গায়ক ও সুরকার। বারো বছর বয়সে স্টার থিয়েটারে মহেন্দ্র গুপ্তের কাছে তাঁকে নিয়ে গেলেন বাবা। সেখানেই মাসে কুড়ি টাকা মাইনে হিসাবে পেশাদার রঙ্গমঞ্চের সঙ্গে যুক্ত হলেন তিনি। এরপর একে একে বিশ্বরূপা, শ্রীরঙ্গম, কাশী বিশ্বনাথ মঞ্চে দাপিয়ে অভিনয় করতে লাগলেন পরের কয়েক বছর।
ইতোমধ্যেই বেশ কতগুলি ছবিতেও অভিনয় করা হয়ে গিয়েছে তাঁর। যাত্রিকের ‘পলাতক’ ছবিতে তিনি বোহেমিয়ান, আবার তরুণ মজুমদারের ‘দাদার কীর্তি’-তে ভোম্বলদা। ছবির শুরুতে কৌতুক অভিনেতা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করলেও, শেষ পর্যন্ত উত্তীর্ণ হলেন বলিষ্ঠ এক মেন্টর রূপে। ‘বসন্ত বিলাপ’, ‘অমৃতকুম্ভের সন্ধানে’, ‘ফুলেশ্বরী’, ‘নিমন্ত্রণ’, ‘আলোর পিপাসা’, ‘বালিকা বধূ’ -এক একটি ছবি অনুপকুমারের মুকুটে যেন এক একটি পালক।
ভিডিও: অনন্য অরুন্ধতী: জন্মশতবর্ষে ফিরে দেখা (১৯২৪-১৯৯০)
‘পথে হল দেরি’ থেকে ‘সাগরিকা’, ‘অগ্নি পরিচয়’ থেকে ‘রাজদ্রোহী’, উত্তমকুমারের সঙ্গে প্রায় পঞ্চাশটির বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন অনুপকুমার। এই সময় থেকেই কৌতুক চরিত্রাভিনেতা হিসাবে তাঁর পরিচিতি বাড়তে থাকে। তরুণ মজুমদার, রাজেন তরফদার, মৃণাল সেন, অজয় কর, তপন সিনহা, চিত্ত বসু, দীনেন গুপ্তের মতো দিকপাল পরিচালকদের সঙ্গে একের পর এক কাজ করে গেছেন তিনি।
বাংলা ছবির পাশাপাশি ‘সব্যসাচী’, ‘চন্দ্রশেখর’, ‘কিতনে পাশ কিতনে দূর’, ‘মহাশয়’ সহ মোট ছ’টি হিন্দি ছবিতেও কাজ করেছেন।
১৯৭৬ সালে ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হল ভাড়া নিয়ে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘নূরজাহান’ নাটকটি মঞ্চস্থ করার আয়োজন করেন অনুপকুমার। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আগুন লেগে সেই উদ্যোগ সফল হয়নি। তবে দমে যাননি অনুপ। পেশাদারী মঞ্চে তাঁর অভিনীত ‘শ্যামলী’, ‘হঠাৎ নবাব’, ‘ছদ্মবেশী মল্লিকা’, ‘অঘটন’, ‘জয় মা কালী বোর্ডিং’, ‘রাম শ্যাম যদু’, ‘শ্রীমতী ভয়ংকরী’ এবং শেষের দিকে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘চন্দনপুরের চোর’ নাটকে তাঁর অভিনয়ের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
ভিডিও: আলো-ছায়ায় হারাধন – জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ্য
প্রায় পঞ্চাশের উপর নাট্য প্রযোজনায় তিনি কাজ করেছেন। ১৯৮৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমি নাট্যক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য তাঁকে পুরস্কৃত করে। দীনবন্ধু পুরস্কারে সম্মানিত হন ১৯৯৬ সালে ও প্রবীণ নাট্যব্যক্তিত্ব হিসাবে সংবর্ধিত হন ১৯৯৭ সালে।
চলচ্চিত্রে ১৯৬৪ সালে ‘পলাতক’ ছবির জন্য পান বি এফ জে এ পুরস্কার। ১৯৭১ সালে ‘নিমন্ত্রণ’ ছবির জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসাবে জাতীয় পুরস্কারেও ভূষিত হন তিনি। অভিনেতৃ সংঘের যে সংগ্রামী ইতিহাস, ন্যূনতম মজুরির দাবিতে টেকনিশিয়ানদের ধর্মঘট – সেই আন্দোলনেও মূল কাণ্ডারী হয়ে টেকনিশিয়ানদের পাশে দাঁড়ান তিনি। গোটা ইন্ডাস্ট্রি চিনত পরোপকারী অনুপকুমারকে। আজ তাঁর জন্মদিনে তাঁর প্রতি আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণাম!