Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

শিল্প ও শিল্পী-প্রাণ হরেন ঘোষ

Haren Ghosh
Bookmark (0)
Please login to bookmark Close
(Haren Ghosh)

বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিক থেকেই শিল্প-সংস্কৃতি জগতের সৃষ্টিক্ষেত্রে বৈচিত্র্য আসতে শুরু করেছিল, এবং তা বিস্তার লাভও করছিল দ্রুতগতিতে। এই বৈচিত্র্যের সহায়ক হয়েছিল, ক্রমশ আসতে থাকা নানা প্রযুক্তিগত উন্নতি। এদিকে সমাজ-রাজনীতিতেও দেখা যাচ্ছিল নতুন নতুন বাঁকবদল এবং তার প্রভাব পড়ল শিক্ষা-শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতে। এইসব সৃষ্টিশীলতাকে ঘিরে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এক ধরনের জাতীয়তাবাদী ভাবনা প্রকাশ পেতে লাগল। শুধুমাত্র নিছক বিনোদন নয়, এই জগতের একের পর এক প্রতিভাবানেরা, তাঁদের সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে আপন স্বকীয়তাকে তুলে ধরতে সচেষ্ট হলেন।

কোনওকালেই এসব ব্যাপারে পৃষ্ঠপোষকের অভাব ঘটেনি বাংলায়। সেই রাজা-জমিদারদের ভূমিকা থেকে শুরু করে পরবর্তীকালের শিল্পরসিকদের উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে বরাবর চোখে পড়েছে। তবে বহুদিন যাবৎ তা ছিল একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির ভেতরে। সেখানে মূলত কাজ করেছিল ব্যক্তিগত ভাল-মন্দ লাগার বিষয়টি। সংগঠিত পেশাদারি মনোভাব সে ভাবে ছিল না। প্রথম যিনি নিজেকে এভাবে চেনালেন, তিনি হরেন্দ্রলাল ঘোষ। তাঁকে প্রথমবার একজন ‘ইম্প্রেসারিও’ বা ‘প্রমোদ-পরিচালক’ (হেমেন্দ্রকুমার রায়ের তরজমা) হিসেবে চিহ্নিত করা গেল।


আরও পড়ুন: শান্তিনিকেতনে খ্রিস্ট জন্মোৎসব ও রবীন্দ্রনাথ


বাংলা তো বটেই, গোটা ভারতের মধ্যে হরেন ঘোষই প্রথম ইম্প্রেসারিও হয়ে অবতীর্ণ হন। ইউরোপ-আমেরিকায় এই নজির আগে থেকেই ছিল। সেখানে ইম্প্রেসারিওদের আলাদা মর্যাদা ছিল। যেমন রাশিয়ার সার্জ পাবলোভিচ ডায়াঘিলেফ বা আমেরিকার সালোমন হুরক (জাতে ইহুদি) ইম্প্রেসারিও হিসেবে বিশ্বখ্যাত ছিলেন তখন। এঁরা সঙ্গীত-নাটক-নৃত্য-চিত্রকলা ইত্যাদি ক্ষেত্রে তুলে নিয়ে এসেছিলেন একাধিক অসামান্য শিল্পীদের। তাঁদের নিয়ে নানা দেশ ঘুরে, একই সঙ্গে একাধিক শিল্পী-প্রতিভা ও শিল্পকলার বিকাশ ঘটিয়েছিলেন। যেমন, ডায়াঘিলেফ-এর উদ্যোগে বিশ্ব চিনেছে আনা পাবলোভা, ভাসলাভ নিজিনস্কি, কার্সাভিনার মতো নৃত্যশিল্পী, লিয়ন বাকসট, এম লারিয়োনভের মতো নাট্যশিল্পী বা ইগর স্ট্রাডিনস্কির মতো সঙ্গীত ব্যক্তিত্বদের।

এইসব ইম্প্রেসারিওদের গভীর শিল্পবোধ ছিল। তাই, প্রতিভা-অন্বেষণে দৃষ্টি ছিল প্রখর ও যথার্থ। ডায়াঘিলেফ নিজে একজন সাহিত্যিক ছিলেন। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হত ‘The World of Art’ নামে শিল্পকলা-বিষয়ক একটি উচ্চমানের পত্রিকা। শিল্প-প্রদর্শনীরও আয়োজন করতেন তিনি। তাঁর বক্তব্য ছিল, ‘আর্টের একমাত্র কর্তব্য আনন্দ দান করা এবং তার একমাত্র হাতিয়ার সৌন্দর্য।’ এরকমই গুণাবলীর অধিকারী ছিলেন হরেন ঘোষ। বিশ্বখ্যাত ইম্প্রেসারিওদের সঙ্গে যে তাঁকে একাসনে বসানো যায়, সে কথা ‘শিল্পগত-প্রাণ হরেন ঘোষ’ নিবন্ধে অকপটে লিখেছেন হেমেন্দ্রকুমার রায়।

Haren Ghosh
বিশ্বখ্যাত ইম্প্রেসারিওদের সঙ্গে তাঁকে একাসনে বসানো যায়

১৮৯৫ সালের ৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশে যশোহরের মামাবাড়িতে জন্ম হরেন্দ্রলাল ঘোষের। পৈতৃক বাড়ি কলকাতার বউবাজারে মদন বড়াল লেনে। সেখানেই বেড়ে ওঠা। মেধাবী ছাত্র হরেন ঘোষ হেয়ার স্কুলে পড়ার সময় প্রথম নজর কাড়েন একজন দক্ষ ফুটবলার হিসেবে। প্রসঙ্গত, এই স্কুলের মাঠেই ১৮৭৮-৭৯ সালে প্রথম বাঙালি ফুটবলার হিসেবে নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী সহপাঠীদের নিয়ে এদেশীয়দের মধ্যে ফুটবল খেলা চালু করেছিলেন।

খেলা ছাড়াও আরও অনেক বিষয়ে প্রতিভা ছিল হরেন ঘোষের। ১৯১১-১২ সালে একটি স্কুল ম্যাগাজিন বের করে ফেললেন। সেখানে দেখা গেল তাঁর সম্পাদনা ও লেখালেখির ক্ষমতা। হেডমাস্টারমশাই শ্রদ্ধেয় ঈশানচন্দ্র ঘোষ দারুণ প্রশংসা করেছিলেন পত্রিকাটির। হরেন ঘোষের এক স্কুল-সহপাঠী প্রদ্যোতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় পরবর্তীকালে একটি লেখায় উল্লেখ করেছিলেন, ‘অধুনা প্রত্যেক কলেজ, স্কুল মাসে মাসে পত্রিকা প্রকাশ করে থাকেন। আমরা সেই হিসেবে হরেনকে অগ্রদূত রূপে গণ্য করতে পারি। যত দূর স্মরণে আসছে যে, হরেন কলেজে পড়ার কালে একখানি উপন্যাস লেখে এবং তাহা তখনকার দিনে আট আনা সিরিজ রূপে প্রকাশিত হয়’ (তখন একই মূল্যের বিভিন্ন লেখকের বই একটি সিরিজ হিসেবে বেরোত)।

কলেজ ছাড়ার কয়েক বছর বাদে, ১৯২৪ সালে বীরেন মিত্রর লেখা ইংরেজি নাটক ‘শকুন্তলা’ মঞ্চস্থ হল এম্পায়ার থিয়েটারে। নাটকের পরিচালক হরেন ঘোষ, এতে সম্ভ্রান্ত ঘরের পুরুষদের সঙ্গে মহিলাদেরও অভিনয় করিয়ে আলোড়ন ফেলে দিলেন।

ইস্কুলে থাকতেই হরেন্দ্রলাল নাট্যপ্রতিভাও দেখিয়েছিলেন। তাঁর পরিচালনায় বিদ্যালয়ে অভিনীত হয়েছিল ‘রণ-ভেরী’ নামে একটি নাটক, যার পেছনে কাজ করেছিল জাতীয়তাবাদী ভাবনা। শুরু থেকেই স্বদেশচেতনা কাজ করত হরেন ঘোষের মধ্যে, যা বজায় থেকেছে আজীবন।

স্কুল শেষ করে ভর্তি হলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে। সেখানেও হরেন্দ্রলালের অভিনয় ও পরিচালনায়, মঞ্চস্থ হয়েছিল শেক্সপিয়ারের নাটক, এবং তা দারুণ প্রশংসিত হয়। এভাবেই তাঁর বৈচিত্র্যময় জ্ঞান ও বোধের পরিধির ধীরে ধীরে বিকাশ ঘটতে লাগল। নাট্য-নেশা প্রবল হয়েছিল কলেজ জীবনে। বউবাজার ক্লাব, ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটে নিয়মিত যাওয়া ও নাটক নিয়ে মাতামাতি শুরু হল। গোড়া থেকেই তাঁর মধ্যে প্রমোদ-পরিচালকের বীজটা পোঁতা ছিল। কারণ, ছাত্রাবস্থা থেকেই শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেয়ে, শিল্পোদ্যোগীর ভূমিকা নিতেই বেশি পছন্দ করছেন।

Haren Ghosh
হেমেন্দ্রকুমার রায় ছিলেন তাঁর অত্যন্ত কাছের মানুষ

কলেজ ছাড়ার কয়েক বছর বাদে, ১৯২৪ সালে বীরেন মিত্রর লেখা ইংরেজি নাটক ‘শকুন্তলা’ মঞ্চস্থ হল এম্পায়ার থিয়েটারে। নাটকের পরিচালক হরেন ঘোষ, এতে সম্ভ্রান্ত ঘরের পুরুষদের সঙ্গে মহিলাদেরও অভিনয় করিয়ে আলোড়ন ফেলে দিলেন। নাটকটিও হয়েছিল অসাধারণ। তখন থেকেই তাঁর নজর ও চিন্তাধারা ছিল সুদূরপ্রসারী। তাই ‘শকুন্তলা’-র এহেন সাফল্য দেখে তিনি নাটকটি বিলেতে গিয়ে করার পরিকল্পনা করলেন। যদিও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

১৯২৬ সালে অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়ার জন্যে ইউরোপ গেলেন হরেন ঘোষ। কয়েক মাস সেখানে থাকার সময় তিনি আকৃষ্ট হয়েছিলেন চলচ্চিত্র-শিল্পের প্রতি। নিজের গরজে শিখলেনও অনেক কিছু, বিশেষ করে ক্যামেরার বিষয়ে। ফলত একজন দক্ষ ফটোগ্রাফার হয়ে উঠেছিলেন তিনি। দেশে ফিরে ‘সেন্ট্রাল অটোমোবাইল স্টোর্স অ্যান্ড বিজনেস সেন্টার’ নামে একটি দোকান খুললেন ধর্মতলায়― ‘রিগ্যাল’ সিনেমার উল্টোদিকে ১৪০, কর্পোরেশন স্ট্রিটের ঠিকানায় (বর্তমানে এস এন ব্যানার্জি রোড)। এ দোকানে আড্ডা বসত শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের এক ঝাঁক তরুণ প্রতিভাবানের, যাঁদের সবার ভাবনাতেই ছিল নতুন কিছু করার ইচ্ছে।

১৯৩১ সালে বীরেন্দ্রনাথ সরকার যখন ‘চিত্রা’ সিনেমা (পরে ‘মিত্রা’) বা হরিপ্রসন্ন পাল ‘ছবিঘর’ প্রেক্ষাগৃহের জন্ম দিলেন, তখন সব ক্ষেত্রেই হরেন ঘোষের প্রাণপাত সহযোগিতা ছিল।

রোজগারের কারণে যতই ব্যবসা খুলুন, হরেন ঘোষের নেশার জগৎ তো শিল্প-সংস্কৃতি। ফলে, দোকানের এই প্রতিভা সমাবেশই হরেন ঘোষকে নিয়ে গেল তাঁর আসল ইচ্ছের দুনিয়ায়। আড্ডার নিয়মিত সদস্য ছিলেন বীরেন্দ্রনাথ সরকার, যতীন্দ্রনাথ (ছোটাই) মিত্র, অমর মল্লিক, চারু রায়, প্রফুল্ল রায় (চিত্র পরিচালক), ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় (বড়), হেমচন্দ্র চন্দ্র, প্রেমাঙ্কুর আতর্থী, দীনেশরঞ্জন দাস প্রমুখ। প্রখ্যাত অভিনেতা ধীরাজ ভট্টাচার্য ‘যখন নায়ক ছিলাম’ বইতে এই আড্ডার প্রসঙ্গে লিখেছিলেন— ‘বলা বাহুল্য হবে না, পরবর্তীকালে বিখ্যাত নিউ থিয়েটার্সের পরিকল্পনা ওই আড্ডাঘরেই জন্মলাভ করে।’

এর পরেই চিত্রজগতে প্রবেশ করলেন হরেন ঘোষ। তৈরি করলেন ‘আর্য ফিল্মস’। অফিস হল ১৮৩, ধর্মতলা স্ট্রিট (বর্তমান লেনিন সরণি), যা পরে চলে যায় ৮ ধর্মতলা স্ট্রিটে অর্থাৎ ‘ওয়াচেল মোল্লা’ বিল্ডিং-এ। এই চিত্রপ্রযোজক সংস্থা তৈরি করল ‘বুকের বোঝা’ নামে একটি নির্বাক ছবি। কাহিনিকার হরেন ঘোষ ও পরিচালক নীতিন বসু। এটিই নীতিনবাবুর প্রথম পরিচালিত ছবি। হরেন ঘোষের নজর সর্বদাই ছিল উঠতি প্রতিভাবানের প্রতি এবং জহুরির চোখে ঠিক জহরটি আবিষ্কার করছেন।

Haren Ghosh
নিজের সম্পাদনায় ‘Four Arts Annual’ নামে একটি অসামান্য বার্ষিক পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন

দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, বাণী দত্ত, গৌরী ওঝা, রেণুকা ঘোষ, বোকেন চট্টোপাধ্যায় অভিনীত ‘বুকের বোঝা’ মুক্তি পায় ১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। ছবিটি অবশ্য বেশিদিন চলেনি। ‘আর্য ফিল্মস’ও কিছু দিন পরে বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু, চলচ্চিত্রজগতে পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ হয়নি হরেন ঘোষের। ১৯৩১ সালের ২৮ নভেম্বর ‘বড়ুয়া ফিল্ম ইউনিট’ প্রযোজিত ও দেবকীকুমার বসু পরিচালিত ‘অপরাধী’ নামে যে নির্বাক ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল, তার নির্মাণের ব্যাপারেও সক্রিয় ভূমিকা ছিল হরেনবাবুর। প্রমথেশচন্দ্র বড়ুয়ারও এটি ছিল প্রথম প্রযোজিত ছবি। অভিনয়েও ছিলেন তিনি।

স্যার বীরেন্দ্রনাথ সরকারের সঙ্গে যথেষ্ট ঘনিষ্ঠতা ছিল হরেন ঘোষের। বিলেত থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে এসে তিনি নতুন উদ্যোগের সন্ধানে ছিলেন। ‘বুকের বোঝা’ ছবির শুটিংয়ে নিয়মিত আসতেন, সঙ্গে হরেনবাবুর উৎসাহ তো ছিলই। এই সব মিলিয়েই সরকারমশাই চিত্র প্রযোজনার দিকে ঝুঁকলেন। জন্ম নিল ‘নিউ থিয়েটার্স’। ১৯৩১ সালে বীরেন্দ্রনাথ সরকার যখন ‘চিত্রা’ সিনেমা (পরে ‘মিত্রা’) বা হরিপ্রসন্ন পাল ‘ছবিঘর’ প্রেক্ষাগৃহের জন্ম দিলেন, তখন সব ক্ষেত্রেই হরেন ঘোষের প্রাণপাত সহযোগিতা ছিল।

হেমেন্দ্রকুমার লিখছেন, ‘বিভিন্ন ললিতকলা সম্পর্কীয় আলোচনা সেই সচিত্র বার্ষিকী দু’খানিকে বিচিত্র ও অপূর্বরূপে অলঙ্কৃত করে তুলেছিল। সে রকম বার্ষিকী বাংলাদেশে আর বেরিয়েছে বলে জানি না।’

শুধু কি এটুকুই? এক জায়গায় বসে যাতে চলচ্চিত্র সংক্রান্ত চর্চা করা যায়, সেই উদ্দেশ্য নিয়ে একটি ‘সিনেমা লাইব্রেরি’ গড়ে তুলেছিলেন হরেন ঘোষ। সেই সময়ে যা ছিল এক অভিনব ভাবনা! কিন্তু উপযুক্ত সহযোগিতার অভাবে কিছু দিন চলে, তা বন্ধ হয়ে যায়। এদেশের নতুন নতুন শিল্প ও শিল্পী অন্বেষণে সারা জীবন ছুটে বেড়িয়েছেন হরেন ঘোষ। নিছক অনুষ্ঠান-আয়োজন বা প্রযোজনা নয়, নির্দিষ্ট শিল্প-বিকাশের আনুষঙ্গিক ক্ষেত্রগুলির উন্নতি ঘটানো ও ভারতীয় শিল্প-সংস্কৃতিকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেওয়াই ছিল তাঁর লক্ষ্য।

এসবের পাশাপাশি, সাহিত্যজগতেও নিয়মিত যোগাযোগ থাকায়, বহু কবি-লেখকের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন হরেন ঘোষ। হেমেন্দ্রকুমার রায় ছিলেন তাঁর অত্যন্ত কাছের মানুষ। হেমেন্দ্রকুমার লিখেছেন, তাঁর সম্পাদিত ‘নাচঘর’ পত্রিকা প্রকাশের ব্যাপারে কতখানি সক্রিয় সহায়তা ছিল ‘হরেনের’। মাঝে মাঝেই একেকটা গল্প লিখে তাঁকে শোনাতেন হরেনবাবু। হেমেন রায়ের বক্তব্য, ‘গল্পগুলির ভেতরে বস্তু ছিল।’ ললিতকলাও হরেন ঘোষের আওতার বাইরে থাকেনি। নিজের সম্পাদনায় ‘Four Arts Annual’ নামে একটি অসামান্য বার্ষিক পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। পর পর দু’বছরে দু’টি সংখ্যা বেরিয়েই অবশ্য তা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু তাতেই দেখা গেছে হরেন ঘোষের শিল্প-মেধার ঔজ্জ্বল্য।

Haren Ghosh
উদয় শঙ্কর ও হরেন ঘোষ

হেমেন্দ্রকুমার লিখছেন, ‘বিভিন্ন ললিতকলা সম্পর্কীয় আলোচনা সেই সচিত্র বার্ষিকী দু’খানিকে বিচিত্র ও অপূর্বরূপে অলঙ্কৃত করে তুলেছিল। সে রকম বার্ষিকী বাংলাদেশে আর বেরিয়েছে বলে জানি না। ওই বার্ষিকীর মধ্যেই পাওয়া যায় হরেন্দ্রনাথের শিল্পী মন ও গভীর রসানুভূতির সুন্দর পরিচয়। ইংরেজি রচনাতেও তাঁর হাত ছিল পাকা।’

হেমেন্দ্রকুমার যখন ‘নাচঘর’ পত্রিকার সম্পাদনা থেকে সরে আসেন, তার পর অনেক দিন পত্রিকাটি আর বেরোয়নি। ১৯৪০ সালে হরেন ঘোষের ভাই ধীরেন্দ্রলাল ঘোষ, সাহিত্যিক সুশীল রায়, সাংবাদিক গোপাল ভৌমিক প্রমুখ মিলে আবারও যখন ‘নাচঘর’ প্রকাশের উদ্যোগ নিলেন, তখন হরেনবাবু তাঁর ধর্মতলার অফিসের একটা জায়গা ছেড়ে দিয়েছিলেন পত্রিকার দপ্তর হিসেবে। সেই সময় ইম্প্রেসারিও হরেন ঘোষের খ্যাতি দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু তাঁর সাদাসিধে আন্তরিক ভাবটি একই রকম বজায় ছিল।

সাধারণ ধুতি পাঞ্জাবী পরে সৌম্যশান্ত মূর্তি নিয়ে তিনি তাঁর টেবিলে বসে কাজ করতেন এবং তার চারপাশে এসে ভিড় জমাতেন নর্তক-নর্তকী, অভিনেতা-অভিনেত্রী, গায়ক-গায়িকা ও সাহিত্যিক-শিল্পীর দল।

গোপাল ভৌমিক ‘মানুষ হরেন ঘোষ’ নিবন্ধে সেই সময়ের কথা লিখতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘… এই খ্যাতি-জনিত কোন অহংকারের দেওয়াল নিজের চারিদিকে তুলে দিয়ে নিজেকে সাধারণের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে হরেনদাকে কোন দিনই দেখিনি। সাধারণ ধুতি পাঞ্জাবী পরে সৌম্যশান্ত মূর্তি নিয়ে তিনি তাঁর টেবিলে বসে কাজ করতেন এবং তার চারপাশে এসে ভিড় জমাতেন নর্তক-নর্তকী, অভিনেতা-অভিনেত্রী, গায়ক-গায়িকা ও সাহিত্যিক-শিল্পীর দল। দেখতাম সকলেই তাঁর প্রতি সমান শ্রদ্ধার ভাব পোষণ করতেন এবং তিনিও সকলকে গ্রহণ করেন উদারচিত্তে। কোন সময় তাঁর ব্যবহারে কোন কৃত্রিমতা বা অসৌজন্যের পরিচয় পাইনি কোনদিন।’

এই সব কিছুর মধ্যে হরেন ঘোষ, তাঁর সেরা অবদান রেখে গেছেন ভারতীয় নৃত্যশিল্পের দুনিয়ায়। হেমেন্দ্রকুমার রায়ের সান্নিধ্য তাঁকে এই দিকে আকৃষ্ট করেছিল। আমরা জানি, সাহিত্য-সঙ্গীত ছাড়াও হেমেন রায় ছিলেন নৃত্য-বিশারদ। তাঁর কাছ থেকেই হরেনবাবু জানতে পারেন, এককালে ভারতীয় উপমহাদেশে থাকা অসামান্য সব নৃত্যশৈলীর কথা। যার নিদর্শন ছড়িয়ে আছে অজন্তা-সহ ভারতের অজস্র গুহাচিত্রে। কিন্তু, পরবর্তীকালে তা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ল অঞ্চল-ভিত্তিক। এক-একটা জায়গার নৃতাশৈলী গড়ে ওঠার পেছনে ছিল শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী সেই অঞ্চলের মানুষদের জীবনযাত্রার ধরন, ঘাত-প্রতিঘাত, প্রেম-বিরহ ও প্রতিবাদী চেতনা।

হরেন ঘোষ শুরু করলেন ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রতিভাবান নৃত্যশিল্পী ও শৈলীর অন্বেষণ এবং প্রথমেই পেয়ে গেলেন সেরা রত্নটিকে। এক সুঠাম-দেহী, লম্বা, কাটা-কাটা চোখমুখের, সুদর্শন তরুণের সঙ্গে যোগাযোগ হল তাঁর। কথা বলেই বুঝলেন একজন খাঁটি নৃত্যশিল্পীর সন্ধান পেয়েছেন তিনি। ছেলেটি ইংল্যান্ড থেকে সবে ভারতে এসেছেন। জন্মসূত্রে বাঙালি। কিন্তু, নৃত্য-শিক্ষা ও প্রদর্শন সবই তাঁর বিলেতে। আনা পাভলোভার সঙ্গে নাচের অনুষ্ঠান করে যে দেশে তখনই তাঁর দারুণ সুনাম। কিন্তু, নিজের দেশে কেউ তাঁকে তখনও অবধি চেনেন না।

মুম্বাই হয়ে কলকাতা এসে হরেনবাবুর সঙ্গে যোগাযোগ হল তাঁর। হরেন ঘোষ তাঁকে সঙ্গে করে হেমেন্দ্রকুমার রায়ের কাছে নিয়ে গিয়ে কিছু পরামর্শ চাইলেন। এ ব্যাপারে হেমেন রায় লিখছেন, ‘একদিন একটি তরুণ ও সুশ্রী যুবককে নিয়ে আমার বাড়িতে এসে বললেন, দাদা, এঁর নাম উদয়শঙ্কর, ইনি নৃত্যশিল্পী। ইনি কলকাতায় নাচ দেখাতে চান, কিন্তু এখানে কেউ এঁকে চেনে না। আমলও দেয় না। কেমন করে এঁকে পরিচিত করা যায়, তাই নিয়ে আপনার সঙ্গে পরামর্শ করতে এসেছি।’ হেমেন্দ্রকুমার অতি উৎসাহের সঙ্গে যা বলার বলেছিলেন।

রসিকতা করে অবন ঠাকুর বলেছিলেন, ‘বলো কী হরেন, পুরুষ মানুষ আবার নাচবে কি? আমি তো জানি, মেয়েরাই নাচে, আর পুরুষ মানুষকে নাচায়।’

শুরুতে উদয়শঙ্করের কিছু নৃত্য-নমুনা প্রদর্শনের কথা ভাবলেন হরেন ঘোষ। ঠিক করলেন ‘এলিট’ সিনেমার উল্টোদিকে ‘অ্যাকাডেমি অফ ওরিয়েন্টাল আর্টস’ প্রেক্ষাগৃহে এই নৃত্যশিল্পীর ‘ড্যান্স রিসাইট্যাল’-এর অনুষ্ঠানটি করবেন। তখন ওই সংস্থার দায়িত্বে শিল্পী-গুরু অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। হলটি ব্যবহারের জন্য অনুমতি নিতে যখন তাঁর কাছে যান হরেনবাবু, সব শুনে প্রথমে রসিকতা করে অবন ঠাকুর বলেছিলেন, ‘বলো কী হরেন, পুরুষ মানুষ আবার নাচবে কি? আমি তো জানি, মেয়েরাই নাচে, আর পুরুষ মানুষকে নাচায়।’ তখনকার নামকরা চিত্র-পরিচালক পশুপতি চট্টোপাধ্যায় তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন এ কথা। তিনি অন্যতম আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে সেই অনুষ্ঠানটিও দেখেছিলেন। উদয়শঙ্করের নৃত্যশৈলী দেখে পশুপতিবাবুর মনে হয়েছিল, ‘অজন্তা আর্ট যেন মূর্ত হয়ে আমাদের সামনে উপস্থিত হয়েছে।’

পরের পর্বে সমাপ্য

মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

Picture of অভীক চট্টোপাধ্যায়

অভীক চট্টোপাধ্যায়

জন্ম ১৯৬৫-তে কলকাতায়। বেড়ে ওঠা চন্দননগরে। স্কুল জীবন সেখানেই। কলকাতার সিটি কলেজ থেকে স্নাতক। ছোটো থেকেই খেলাধূলার প্রতি আগ্রহ। গান শেখাও খুব ছোটো থেকেই। তালিম নিয়েছেন রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের কাছেও। দীর্ঘদিন মার্কেটিং পেশায় যুক্ত থাকার পর, গত বারো বছর ধরে পুরোপুরি লেখালেখি, সম্পাদনার কাজে যুক্ত। পুরনো বাংলা গান, সিনেমা, খেলা ইত্যাদি বিষয়ে অজস্র প্রবন্ধ লিখেছেন। আনন্দবাজার পত্রিকা, এই সময়-সহ বহু পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লেখেন। সম্পাদিত বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য উত্তমকুমারের "হারিয়ে যাওয়া দিনগুলি মোর", হেমন্ত মুখোপাধ‍্যায়ের "আনন্দধারা", রবি ঘোষের "আপনমনে", মতি নন্দীর "খেলা সংগ্রহ"। লিখেছেন "সংগীতময় সুভাষচন্দ্র" বইটি। সাত বছর কাজ করেছেন "মাতৃশক্তি" ও "জাগ্রত বিবেক" পত্রিকায়। বর্তমানে নিজস্ব লেখালিখি ও সম্পাদনা নিয়ে ব্যস্ত।
Picture of অভীক চট্টোপাধ্যায়

অভীক চট্টোপাধ্যায়

জন্ম ১৯৬৫-তে কলকাতায়। বেড়ে ওঠা চন্দননগরে। স্কুল জীবন সেখানেই। কলকাতার সিটি কলেজ থেকে স্নাতক। ছোটো থেকেই খেলাধূলার প্রতি আগ্রহ। গান শেখাও খুব ছোটো থেকেই। তালিম নিয়েছেন রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের কাছেও। দীর্ঘদিন মার্কেটিং পেশায় যুক্ত থাকার পর, গত বারো বছর ধরে পুরোপুরি লেখালেখি, সম্পাদনার কাজে যুক্ত। পুরনো বাংলা গান, সিনেমা, খেলা ইত্যাদি বিষয়ে অজস্র প্রবন্ধ লিখেছেন। আনন্দবাজার পত্রিকা, এই সময়-সহ বহু পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লেখেন। সম্পাদিত বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য উত্তমকুমারের "হারিয়ে যাওয়া দিনগুলি মোর", হেমন্ত মুখোপাধ‍্যায়ের "আনন্দধারা", রবি ঘোষের "আপনমনে", মতি নন্দীর "খেলা সংগ্রহ"। লিখেছেন "সংগীতময় সুভাষচন্দ্র" বইটি। সাত বছর কাজ করেছেন "মাতৃশক্তি" ও "জাগ্রত বিবেক" পত্রিকায়। বর্তমানে নিজস্ব লেখালিখি ও সম্পাদনা নিয়ে ব্যস্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Subscribe To Newsletter

কথাসাহিত্য

অমর মিত্র
বিতস্তা ঘোষাল
হেমেন্দ্রকুমার রায়

সংস্কৃতি

আহার

অমৃতা ভট্টাচার্য
ইন্দ্রনাথ রুদ্র
অমৃতা ভট্টাচার্য

বিহার

কলমকারী

ফোটো স্টোরি

উপন্যাস

বিতস্তা ঘোষাল
বিতস্তা ঘোষাল
বিতস্তা ঘোষাল
[adning id="384325"]
[adning id="384325"]

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.
  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.
  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.
  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).
  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

 

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com