(Human Alternative)
যা হুকুম ক’রবো অন্ধের মতো তখনই তা তামিল করবে, এমন কোনও সত্তার দখল পাওয়ার ইচ্ছা আমরা বোধহয় নগরসভ্যতার আদিকাল থেকে মনের মধ্যে পুষে এসেছি। পুরাণে বর্ণিত ‘কৃত্যা’, আরব্য উপন্যাসের ‘জীন’ সবাই এই ইচ্ছারই প্রতিফলন। বাস্তব জীবনেও প্রথমে পশুদের উপরে, তারপরে দাস-দাসীদের উপরে, সবশেষে যন্ত্রের উপরে আমরা এই ইচ্ছা খাটিয়েছি। প্রথম দিকে যন্ত্রগুলো ছিল সরল, ‘বুদ্ধিহীন’, তাঁতযন্ত্র, শস্য পেষাইয়ের কল, কাপড় বা কাগজ ছাপানোর মেশিন, লোহা পেটাই আর ঢালাইয়ের যন্ত্র ইত্যাদি।
এগুলো প্রথমে হাতে, তারপরে একে একে জল বা বাতাস প্রবাহে, বাষ্প দিয়ে, শেষে কয়লা, তেল, নদীবাঁধ বা পরমাণুর শক্তি থেকে পাওয়া বিদ্যুৎ ব্যবহার করে চালানো হত। উনবিংশ শতকে ইউরোপ জুড়ে, বিশেষত ব্রিটেনে শিল্পবিপ্লবের যে বিশাল ঢেউ উঠেছিল তার প্রাণ ছিল এই বিদ্যুৎ। এর জয়গানে সবাই মুখর থাকলেও শুধুমাত্র মুনাফা তোলার জন্য বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির এই অন্ধ প্রয়োগের ভয়ঙ্কর ফলাফলের দিকটা কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীদের কয়েকজনের চোখে ধরা পড়েছিল। তাই মেরি শেলীর কল্পনায় বিজ্ঞানী ফ্রাঙ্কেন্স্টাইন এই বিদ্যুতের প্রয়োগে যে আজ্ঞাবাহ কৃত্রিম মানুষ সৃষ্টি করলেন, সে এক দানবে পরিণত হয়ে তাঁকেই শেষ করতে উদ্যত হল। কৃত্রিম বুদ্ধি নিয়ে মানুষের কৌতূহল আর আতঙ্কের বোধহয় সেই শুরু।
আরও পড়ুন: মনুষ্য বিকল্প: AI কি ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী
বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকের শেষে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হল। এই যুদ্ধে তথাকথিত উন্নত সভ্য দেশগুলির বীভৎস মুখগুলো সামনে এল, পুঁজির লাগামছাড়া গতির কাছে মানুষের জীবনের, যে কোনও দাম নেই, সে কথা বিশ্ববাসীর বুঝতে বাকি রইল না। বিশেষ করে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে তার বিধ্বংসী ফল দেখেও যখন এই গতি কমার বদলে আরও বেড়ে গেল তখন আবার সৃষ্টিশীল, অনুভূতিশীল মানুষরা পৃথিবী জুড়ে বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির অপব্যবহারের ভয়াবহ সম্ভাবনা নিয়ে সরব হয়ে উঠলেন। (Human Alternative)
১৯২০ সালে চেক নাট্যকার কারেল চাপেক একটি নাটক লেখেন, ১৯২১ সালে সেটি মঞ্চস্থ হয়। এই নাটকেই প্রথম ‘রোবট’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়, চেকভাষায় ‘রোবোতা’ অর্থাৎ ‘দাসশ্রম’ থেকে শব্দটির উদ্ভব। নাটকের নাম ‘রসামের সার্বজনীন রোবট’। এখানে রসাম নামে এক বৃদ্ধ বিজ্ঞানী মূলত ঈশ্বরকে চ্যালেঞ্জ জানাবার জন্য কৃত্রিম মানুষ বা রোবট সৃষ্টি করলেন। কিন্তু তাঁর ছেলে সেই রোবট উৎপাদনকে এক মস্ত কারখানায় পরিণত করে, রোবটদের ক্রমাগত খাটিয়ে, বিশ্বজোড়া এক বাণিজ্য সাম্রাজ্য তৈরি করলেন। (Human Alternative)

একসময় সেই রোবটরা বুঝতে পারে, মানুষদের থেকে তাদের ক্ষমতা সবদিক দিয়েই বেশি। তখন তারা সমস্ত মানবজাতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এই যুদ্ধে মানুষ আর রোবট উভয়েই শেষ হয়ে গেল, শুধু একজন মানুষ, একটি স্ত্রী রোবট আর একটি পুরুষ রোবট টিকে থাকল। দেখা গেল, এই দুই রোবটের মধ্যে নতুন এক আবেগের উদ্ভব হয়েছে যার নাম প্রেম, আর এই স্ত্রী রোবট এবার সন্তানের জন্ম দিতে চলেছে। (Human Alternative)
১৯২৫ সালে রচিত ‘রক্তকরবী’র সঙ্গে কোথাও একটা আশ্চর্য সম্পর্ক যেন খুঁজে পাওয়া যায়। এক কথোপকথনে নাট্যকার বলেছিলেন, ‘মানুষের মস্তিষ্কের ফল এখন মানুষের হাতছাড়া হয়ে গেছে, এটাই বিজ্ঞানের পরিহাস’। (Human Alternative)
প্রথমে এই বুদ্ধির প্রকাশ ছিল আমাদের প্রাত্যহিক জীবন থেকে অনেক দূরে। বিশাল সব যন্ত্র, সেগুলো বিজ্ঞানী আর প্রযুক্তিবিদরা তাঁদের কাজের জন্যে চালাতেন বিভিন্ন বিশেষ কৃত্রিম ভাষায়।
রোবট, কৃত্রিম মানুষ, যন্ত্রমানব, এদের উন্নতিতে বা সমস্ত কাজে এদের প্রয়োগে আমাদের শ্রম লাঘব হবে, বিশেষ করে একঘেয়ে, শ্রমসাধ্য কাজ আর কোনও মানুষকে করতে হবে না, তাতে আমাদের জীবনের মান অনেক উন্নত হবে, এই ব্যাপারগুলো যেমন আমাদের আকর্ষিত করে তার পাশাপাশি একটা অস্বস্তি থেকেই যায়, কেবলই মনে হয় এদের কি সত্যিই বুদ্ধি আছে? সে বুদ্ধি কি আমাদের চেয়েও অনেক বেশি? (Human Alternative)
এই দুশ্চিন্তা আগে আসেনি। অথচ গত শতকের ষষ্ঠ দশক থেকেই যান্ত্রিক বুদ্ধির সঙ্গে আমরা ক্রমাগত আরও বেশি বেশি করে পরিচিত হয়ে চলেছি। প্রথমে এই বুদ্ধির প্রকাশ ছিল আমাদের প্রাত্যহিক জীবন থেকে অনেক দূরে। বিশাল সব যন্ত্র, সেগুলো বিজ্ঞানী আর প্রযুক্তিবিদরা তাঁদের কাজের জন্যে চালাতেন বিভিন্ন বিশেষ কৃত্রিম ভাষায়। তারা ছিল যেন এই জগতের ডাইনোসর। (Human Alternative)

সত্তরের দশকের শেষ থেকে, বিশেষ করে আশির দশকে এসে এই অবস্থার বিবর্তন শুরু হল। শতকের শেষ দশকে বৈদ্যুতিন প্রযুক্তির বৈপ্লবিক উন্নতি কৃত্রিম বুদ্ধির জগতেও ওলটপালট ঘটাল। কৃত্রিম বুদ্ধি এসে গেল আমাদের ঘরে ঘরে, আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে। একটু একটু করে আমরা কখন যেন এই বুদ্ধির উপরে পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে উঠলাম। তখন এই দুশ্চিন্তা আমাদের এতটা পীড়িত করেনি। মাঝে মধ্যে শুধু কিছু বিজ্ঞাননির্ভর কল্পকাহিনি আর চলচ্চিত্র আমাদের উস্কে দিতে চেষ্টা করেছে, তবে ওই পর্যন্তই। (Human Alternative)
আজ বিষয়টা এক সংকটের জায়গা নিয়েছে। বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ, বিভিন্ন রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রপুঞ্জের সরকার কৃত্রিম বুদ্ধি নিয়ে গবেষণা, নতুন নতুন ক্ষেত্রে সেই গবেষণার প্রয়োগ, এসবের উপরে নানা বিধিনিষেধ জারি করেছেন বা করার কথা ভাবছেন। সবাই বলছেন কৃত্রিম বুদ্ধি আজ স্বাধীন, সৃষ্টিশীল হয়ে উঠেছে। (Human Alternative)
গান লিখে, সুর দিয়ে, বিভিন্ন লোকের গলায় গেয়ে শোনাচ্ছে, ফিল্ম বানাচ্ছে, টেলিফোনে এমন গলায় কথা বলছে যে চেনা মানুষের থেকে আলাদা করা যাচ্ছে না।
আগে যা যা করত সেগুলো আরও অনেক তাড়াতাড়ি করছেই, পাশাপাশি ছবি আঁকছে, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক লিখছে। গান লিখে, সুর দিয়ে, বিভিন্ন লোকের গলায় গেয়ে শোনাচ্ছে, ফিল্ম বানাচ্ছে, টেলিফোনে এমন গলায় কথা বলছে যে চেনা মানুষের থেকে আলাদা করা যাচ্ছে না। বিজ্ঞানের প্রবন্ধ আর সন্দর্ভ বা পেপার লিখে দিচ্ছে, এমনকী বিজ্ঞানের নতুন সম্ভাবনার কথা বলে দিচ্ছে, ডাক্তারি আর ওকালতিও নাকি তার আয়ত্তে এসে গেছে। শীঘ্রই মানুষের আর প্রয়োজন থাকবে না। কৃত্রিম বুদ্ধি সবকিছুর দখল নিয়ে নেবে। (Human Alternative)
নিছক কৌতূহলের বশে একটা ছোট পরীক্ষা করে দেখলাম। হাতের কাছে আর কিছু নেই তাই WhatsApp খুলে তার কৃত্রিম বুদ্ধি ‘মেটা’কে ব’ললাম ‘জীবন’ নিয়ে কবিতা লিখতে। পলকে লিখে দিল এই কবিতা –
জীবন এক রঙিন পাখি,
উড়ে যায় সময়ের হাওয়ায়,
খুঁজে ফেরে সুখের ঠিকানা,
তবুও থামে না এক মুহূর্তও।

‘পাখি’ নিয়ে কবিতা লিখল –
পাখি, আকাশের মুক্ত বিহঙ্গ,
উড়ে যায়, দূর নীলাঞ্চলে,
স্বাধীনতা তার, আনন্দের ডানা,
গায় সে গান, হৃদয়ের জ্বালা।
আরেকবার লিখতে ব’ললে লিখলো –
পাখি, তুমি আকাশের রানী,
উড়ে যাও দূর নীল গগনে,
তোমার ডানা মেলে, হৃদয় খোলে,
গায় তুমি গান, আনন্দের জোয়ারে।
জ্ঞানের ব্যাপারেও উদাহরণ দিই। আমার নাম ইংরাজিতে দিয়ে খুঁজলে মোটামুটি ঠিক উত্তর পাচ্ছি, কিন্তু বাংলায় দিলে সদ্যপ্রয়াত জ্যোতির্ময় দত্তের বিবরণ দিচ্ছে!
সৃষ্টিশীলতার দিক দিয়ে এইসব কবিতা বোধহয় কোনও স্কুলের দেওয়াল পত্রিকাতেও জায়গা পাবে না! শুধু তাই নয়, একই বিষয় নিয়ে দুইবার লিখতে হলেই যান্ত্রিকতা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, ‘গায় তুমি গান’ এই অর্থহীন বাক্যাংশ সমেত। তাই কোনও মানুষ কবির থেকে একে আলাদা করা যায় না, এ কথাটা কি বিশ্বাসযোগ্য? (Human Alternative)
এ তো গেল সৃষ্টিশীলতার কথা। জ্ঞানের ব্যাপারেও উদাহরণ দিই। আমার নাম ইংরাজিতে দিয়ে খুঁজলে মোটামুটি ঠিক উত্তর পাচ্ছি, কিন্তু বাংলায় দিলে সদ্যপ্রয়াত জ্যোতির্ময় দত্তের বিবরণ দিচ্ছে! দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘স্বপ্নপ্রয়াণ’ দিয়ে খুঁজলে বলছে সেটি নাকি জ্যোতির্ময় দত্তের লেখা একটি বিখ্যাত কবিতা যার কয়েকটি লাইন–
স্বপ্নপ্রয়াণ, হে স্বপ্নপ্রয়াণ,
কেন তুমি এল না আর?
বাস্তবের কঠিন হাতে
স্বপ্নের মৃত্যু হল কার?
মন্তব্য আশা করি নিষ্প্রয়োজন! পর্বতের এই মূষিক প্রসবের কারণ, যে কোনও যন্ত্রের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিও মানুষের দেওয়া নির্দেশ অনুযায়ীই কাজ করে। তফাৎ শুধু একে, একই কাজের প্রত্যেক রকমফেরের জন্য নির্দেশাবলী প্রত্যেকবার শেখাতে হয় না, একবার শেখালে কাজের বিভিন্ন রূপগুলিকে কীভাবে সম্পন্ন করা যায়, সেটা এ ‘নিজে’ শিখে ফেলে। (Human Alternative)
মানুষ যখন কবিতা লেখে, তখন সে নিজের অভিজ্ঞতা আর আবেগের মধ্যে দিয়ে পাওয়া কোনও বোধকে রূপ দিতে চায়। ‘কবিতার মতো দেখতে’ কিছু একটা বানাতে চায় না।
আসলে কিন্তু শিখতে কী করে হবে সেটাও ওকে মানুষই শিখিয়ে দেয়, ওর কাছে একটা বিশাল তথ্য ভাণ্ডার আছে। প্রতি মুহূর্তে সেটা আবার আন্তর্জালের থেকে তথ্য সংগ্রহ করে বেড়েই চলেছে, কাজের জন্য সেই ভাণ্ডার ব্যবহারই এই শিক্ষার ভিত্তি। যখন ওকে কবিতা লিখতে বলা হচ্ছে তখন ও এই তথ্যভাণ্ডার থেকে খুঁজে দেখছে কবিতা কীরকম ‘দেখতে’ হয়। তারপরে যে বিষয়, যেমন পাখি, নিয়ে লেখার নির্দেশ আছে, সেই শব্দটিকে ঢুকিয়ে কবিতার মতো দেখতে একটা কিছু দিচ্ছে। (Human Alternative)
মনে রাখতে হবে, মানুষের তথ্যভাণ্ডার শুধু অধীত বিদ্যা বা জ্ঞান থেকে আসে না, সেটার একটা বড় উৎস প্রাত্যহিক জীবনের অভিজ্ঞতা। আমাদের বিভিন্ন ইন্দ্রিয় সেই তথ্যকে আলাদা আলাদাভাবে নিয়ে আবার একটা সম্পূর্ণতা দেয়। আন্তর্জাল থেকে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে তার মূলগত প্রভেদ আছে। কিন্তু এহ বাহ্য, এই সবকিছুর উপরে আছে মানুষের বোধ, যার মূলে আবার আছে মানুষের ইচ্ছা। মানুষের দুটি ইচ্ছা সর্বদা জাগরূক, একদিকে সে পারিপার্শিক সমাজের মধ্যে নিজের জায়গা খোঁজে, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় আর অন্যদিকে চায় নিজের অস্তিত্বের কোনও অংশ, সন্তান, শিষ্য, সৃষ্টি, এমনকি প্রাত্যহিক ব্যবহার্য কোনও বস্তুর মধ্যে দিয়ে নিজের স্বতন্ত্র অমরতার পথ খুঁজে পেতে। (Human Alternative)

এই দুই ইচ্ছার সংঘাত-প্রতিঘাতে তৈরি হয় যাবতীয় আবেগ, অনুভূতি আর বোধ। বলাই বাহুল্য, কৃত্রিম বুদ্ধিসম্পন্ন কোনও যন্ত্রের এই বোধ থাকা সম্ভব নয়। মানুষ যখন কবিতা লেখে, তখন সে নিজের অভিজ্ঞতা আর আবেগের মধ্যে দিয়ে পাওয়া কোনও বোধকে রূপ দিতে চায়। ‘কবিতার মতো দেখতে’ কিছু একটা বানাতে চায় না। ঠিক তেমনই, মানুষ ডাক্তার অন্য এক মানুষের চিকিৎসা করে সেই মানুষটাকে বাঁচানোর জন্য। তথ্যভাণ্ডার থেকে মিলিয়ে সবচেয়ে লাগসই উত্তরটা খুঁজে পাওয়ার জন্য নয়। (Human Alternative)
কৃত্রিম বুদ্ধি মানুষের বুদ্ধিতেই চলে। তার সমস্ত অপকীর্তি মানুষের মাথা থেকেই বেরিয়েছে। তাই এই বুদ্ধি প্রয়োগের জন্য কোটি কোটি লোকের কর্মনাশের সম্ভাবনা নিয়ে রাষ্ট্রপ্রধানরা যে বিরাট দুর্ভাবনা দেখাচ্ছেন আসলে সেটা কুমিরের কান্না ছাড়া আর কিছু না। কৃত্রিম বুদ্ধিসম্পন্ন যন্ত্রের হাতে মানবজাতির ধ্বংসের যে আতঙ্ক জাগানো হচ্ছে, তাও বিশ্বের পুঁজিসম্রাটদের সর্বগ্রাসী লোভকে ঢাকা দেওয়ার এক কৌশলমাত্র। এরকম যন্ত্র নিয়ে মানুষের মধ্যে যে ভয় থাকে, তাকেই উস্কে দেওয়া। মাঝে মাঝেই ভবিষ্যদ্বাণী আসছে, যেমন আজ সকালে দেখলাম সামনের বছরে নাকি ৯৯ শতাংশ চাকরি কৃত্রিম বুদ্ধি নিয়ে নেবে। আবারও প্রশ্ন, কৃত্রিম বুদ্ধি কি নিজে থেকে এই চাকরিগুলো নিয়ে নেবে, না তাকে ব্যবহার করে পুঁজিপতিরা বিশ্বজুড়ে এই ছাঁটাই চালাবে? (Human Alternative)
সমস্ত উন্নত দেশগুলিতে যথেষ্ট উপার্জনের অভাবে যুবসমাজের একটা বড় অংশ আর সন্তানের জন্ম দিতে চাইছে না। ফলে সবজায়গায় জনসংখ্যা দ্রুতহারে কমছে।
সবশেষে আরও গোলমেলে একটা প্রশ্ন থেকে যায়। সবজায়গায় কৃত্রিম বুদ্ধির প্রয়োগ করে, মানুষের সমস্ত কায়িক আর বৌদ্ধিক শ্রমের প্রয়োজন তুলে দিয়ে, খুব সস্তায় সব জিনিসের উৎপাদন বিশাল বৃদ্ধি পাবে। ফলে কাগজে কলমে মুনাফাও এযাবৎ কালের সব নিরিখে বহুগুণ ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু সেই সব মাল কিনবে কে? মানুষের যদি উপার্জনই না থাকে, তবে তো ক্রয়ক্ষমতাও থাকবে না। যে বাজার নিয়ে সবার এত মাতামাতি, সেই বাজারই তো লোপ পেয়ে যাবে।
আরও ভয়ঙ্কর একটা দিক আছে। সমস্ত উন্নত দেশগুলিতে যথেষ্ট উপার্জনের অভাবে যুবসমাজের একটা বড় অংশ আর সন্তানের জন্ম দিতে চাইছে না। ফলে সবজায়গায় জনসংখ্যা দ্রুতহারে কমছে। কৃত্রিম বুদ্ধি আরও ব্যাপকভাবে ব্যবহারের জন্য যদি বেকারত্ব বিশ্বব্যাপী সর্বত্রগামী হয়, তবে নিশ্চিতভাবে মানুষ সন্তানের জন্ম দেওয়া বন্ধ করতে বাধ্য হবে। কৃত্রিম বুদ্ধি নয়, মানবজাতি ধ্বংস হবে মানুষের লোভের হাতে। মানুষেরই সৃষ্ট বাজার আর মুনাফা নামের দুই আত্মঘাতী মিথ্যার পিছনে দৌড়ে। (Human Alternative)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
আলোকময় দত্ত ২০১৭ সালে সিনিয়র প্রফেসর পদে সাহা ইনস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স থেকে অবসর নেওয়ার পর রাজা রামান্না ফেলো হিসাবে সেন্ট্রাল গ্লাস অ্যান্ড সেরামিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটে তিন বছর অতিবাহিত করেন। বর্তমানে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের এমেরিটাস অধ্যাপক।
