(Ranvir Sachdeva)
‘Are You Born With AI?’ বইটি রণবীর সচদেবের লেখা। লেখকের বয়স? মাত্র আট বছর। যে বয়সে আর পাঁচটা শিশু টিভিতে কার্টুন দেখে বা মোবাইলে গেম খেলে, সে বয়সে AI জগতের নাড়িনক্ষত্র জেনে ফেলেছে রণবীর।
সম্প্রতি গ্যালগোটিয়াস ইউনিভার্সিটির ভুয়ো উদ্ভাবনের দৌলতে খবরের শিরোনামে দিল্লির আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স সামিট। নয়তো যতই এআই ঘরে ঘরে ঢুকে পড়ুক, ‘আদার ব্যাপারী’দের কাছে এখনও এই ধরনের সামিট ‘জাহাজের খবর’-এর মতো। গ্যালগোটিয়াসের ন্যক্কারজনক কাজে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ভেসে যাচ্ছে নিন্দায়। নিন্দার তোড়ে ভেসে গিয়েছে খুদে প্রযুক্তিবিদ রণবীরও। কারোর সেভাবে চোখেই পড়েনি তাকে। অথচ, এত বড় এআই সামিটে সে-ও কিন্তু ছিল।
আরও পড়ুন: নহি যন্ত্র, মোরা AI
রণবীরকে গবেষক বললে বিন্দুমাত্র অত্যুক্তি করা হয় না। আট বছরের গবেষক? আশ্চর্য হলেও এ ডাহা সত্যি। বর্তমানে সে প্রাচীন ভারতীয় দর্শনের সঙ্গে আধুনিক এআইয়ের ‘ভাব’ করাতে ব্যস্ত। সাধারণ মানুষ রোজ এআই দিয়ে যা যা করে থাকে, সেসবের জন্য আরও ভালো মডেল বানাতে চায়। বিস্তর পড়ছে তার জন্য। ইন্ডিয়ান এআই সামিটে এসব কথাই বলে গেল। দর্শকাসনে বসে শুনলেন গুগলের সুন্দর পিচাই, ওপেনএআই-এর স্যাম অল্টম্যানসহ বিশ্বের নামিদামি সংস্থার কর্তারা।

সামার প্রোজেক্ট করতে গিয়ে সে বানিয়েছিল মঙ্গলযানের একটি প্রাথমিক মডেল। নাসা-র জেট প্রপালসন ল্যাব সেই মডেলকে স্বীকৃতি জানিয়েছে। গুগল থেকে ‘রেসপন্সিবল এআই’ কোর্স শেষ করে বানিয়ে ফেলেছে আস্ত চ্যাটবট।
আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নের ITU160 সামিটে ভারতের তরফে রাষ্ট্রদূত ছিল রণবীর। এছাড়াও, ECB সাসটেইনেবল ইয়ুথ, সিটি ওয়ান ইনিশিয়েটিভ এবং চক্র ডায়ালগস ফাউন্ডেশনের সম্মেলনেও প্রযুক্তি রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব সামলেছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে, রণবীর বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ অংশগ্রহণকারী হিসেবে রাষ্ট্রসংঘের ৭৯তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেয়। সামিটটি ছিল ভবিষ্যত পৃথিবী নিয়ে। (Ranvir Sachdeva)

ডিজিটাল দুনিয়ায় ডুবে থাকতে থাকতেই এআই জগতটা ভালবেসে ফেলে রণবীর। মাত্র তিন বছর বয়স থেকেই কোডিং শেখা শুরু। যে বয়সে সাধারণত নাচ, গান শেখা শুরু করে অনেক শিশু। মাত্র ছয় বছর বয়সে তাঁর নাম ‘এশিয়া বুক অব রেকর্ডস’-এ। কারণ, সে টেড এক্সের সর্বকনিষ্ঠ মোটিভেশনাল স্পিকার। (Ranvir Sachdeva)
এআই এল শুনলেই অনেকে ‘গেল গেল’ রব তোলেন। তাদের জন্য সে মিহি গলায় কিন্তু স্পষ্ট উচ্চারণে বার্তাও দেয়। তাঁর মতে, এআই মানেই চাকরি যাওয়া নয়।
২০২৩ সালে অ্যাপল স্টোর উদ্বোধন করতে দিল্লিতে আসেন টিম কুক। তাঁর সঙ্গে দেখা করতে বাবার হাত ধরে পৌঁছে গিয়েছিল খুদে এআই বিশেষজ্ঞ। টিম রণবীরকে আমন্ত্রণ জানান ক্যালিফোর্নিয়াতে অ্যাপল হেডকোয়ার্টারে ওয়ার্ল্ডওয়াইড ডেভেলপার কনফারেন্সে যোগ দেওয়ার জন্য। গত বছর ভারত সরকার জাতীয় শিক্ষাক্রমের (NEP2020) পাঁচ বছর পূর্তি উদযাপন করে। সেখানেও বক্তৃতা দেওয়ার বিশেষ আমন্ত্রণ পেয়েছিল সে।

এআই নিয়ে বক্তৃতায় সে তরুণদের প্রবল উৎসাহ জুগিয়েছিল। ডিজিটাল দুনিয়ায় নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কাজে এগিয়ে আসতে বলে। এআই এল শুনলেই অনেকে ‘গেল গেল’ রব তোলেন। তাদের জন্য মিহি গলায় কিন্তু স্পষ্ট উচ্চারণে বার্তাও দেয়। তাঁর মতে, এআই মানেই চাকরি যাওয়া নয়। ‘রেসপন্সিবল এআই’ উদ্ভাবনে জোর দিতে হবে। রেসপন্সিবল অর্থাৎ দায়িত্বশীল। দায়িত্বজ্ঞানহীন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নয়। দায়িত্ববোধ থেকে এআই তৈরি করলে, সাধারণ মানুষের কোনও ক্ষতি হবে না। বরং উপকার হবে ঢালাও। (Ranvir Sachdeva)
এখনকার দিনে অনেকেরই অভিযোগ, ছোটরা সারাক্ষণ মোবাইলে মুখ গুঁজে থাকে। রিলের যুগে তো হালে রুটিনের একটা ‘পিরিয়ড’ও বরাদ্দ ক্যামেরার সামনে অঙ্গভঙ্গি করার জন্য। রণবীরও সম্ভবত এই সব ‘দোষে’ দুষ্ট। তারপরও তাঁকে কিছুতেই ফেলা যায় না ওই ব্র্যাকেটে। কারণ, সে পাঠক তো বটেই, লেখকও। আস্ত একটা বই লিখে ফেলেছে আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স নিয়ে। বানিয়ে ফেলেছে একাধিক জটিল এআই মডেল। (Ranvir Sachdeva)

২০২২ সাল। গ্লোবাল রিডিং চ্যালেঞ্জে প্রতিযোগী হিসেবে যোগ দেয় রণবীর। জিতে ফেরে স্বর্ণপদক। বয়স তখন মাত্র ৪ বছর। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে তার লেখা বইও ভাল লাগবে আট থেকে আশি সকলের। যদিও বইয়ের ভূমিকায় লেখকের মন্তব্য, ‘আমি প্রযুক্তি ভালবাসি আর এআই নিয়ে বেশ আগ্রহী। ক্লাসে এআই নিয়ে পড়ানোর পর আমি নিজে থেকে এই নিয়ে পড়াশোনা শুরু করি। তখনই দেখলাম, ৫-৯ বছরের বাচ্চাদের এআই বোঝার জন্য স্কুলের বই যথেষ্ট নয়। আমি তাই মজার ছলে এআই বোঝাতে বই লেখার কথা ভাবলাম।’ (Ranvir Sachdeva)
সে যখন ঘরে, স্কুলে বা বন্ধুদের সঙ্গে থাকে, তখন আর পাঁচটা শিশুর মতোই। ব্যাট ঘুরিয়ে ছক্কা হাঁকাতে ভালবাসে। স্কুলের আন্ডার টেন ক্রিকেট টিমের মেম্বার। এছাড়াও, দাবা, স্ক্র্যাবলে তাকে হারানো বেশ মুশকিল।
বই প্রকাশের পর লেখককে অভিনন্দন জানিয়েছেন স্বয়ং রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। ব্যক্তিগতভাবে চিঠি লিখে জানিয়েছেন, ‘এআই-এর সাহায্যে আরও ভাল বিশ্ব নির্মাণের জন্য আমরা তোমার উপর নির্ভর করছি!’ (Ranvir Sachdeva)
দিনরাত প্রযুক্তি নিয়ে মেতে থাকা একটি বাচ্চার জীবনযাপন আর পাঁচটি বাচ্চার থেকে আলাদা— এ কথা মনে হতে পারে অনেকের। কিন্তু আদতে রণবীরকে এআই সম্মেলনের বাইরে দেখলে আলাদা করা মুশকিল। সে যখন ঘরে, স্কুলে বা বন্ধুদের সঙ্গে থাকে, তখন আর পাঁচটা বাচ্চার মতোই। ব্যাট ঘুরিয়ে ছক্কা হাঁকাতে ভালবাসে। স্কুলের আন্ডার টেন ক্রিকেট টিমের মেম্বার। এছাড়াও, দাবা, স্ক্র্যাবলে তাকে হারানো বেশ মুশকিল। (Ranvir Sachdeva)

দুই বছর আগেই কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছিল, রণবীর ৬ বছরের বাচ্চা হলেও, ওর ব্রেন ১৪ বছর বয়সি কিশোরের মতো। বর্তমানে অবশ্য হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে মেশিন লার্নিং কোর্সের পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত। এআই ও রোবোটিক্সের সার্টিফিকেট ওর আগেই বাগানো হয়ে গিয়েছে। (Ranvir Sachdeva)
টেড এক্স-এর মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাজার হাজার মানুষকে ছয় বছরের রণবীর অনায়াসে বুঝিয়ে দিতে পারে কোনটা কনভারসেশনাল এআই, কোনটা জেনারেটিভ এআই। কখন অ্যালেক্সা প্রথম এআই-টার মতো কাজ করে, কখন দ্বিতীয়টার মতো। শ্রোতাদের সামনেই সে হাসিমুখে ঘোষণা করে— ‘আমি আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স নিয়ে জন্মেছি। শুনে অবাক লাগছে?…’ (Ranvir Sachdeva)
রেডিয়ো, টিভি, মোবাইল যুগের প্রজন্ম হয়ে AI যুগের প্রজন্মকে বোঝা খানিক শক্তই। তবে সে যে এক ক্ষণজন্মা প্রতিভা, তা বুঝতে রকেট সায়েন্স লাগে না। সুন্দর ভবিষ্যত পেতেই তাকে সংরক্ষণ করা দরকার।
সে ও তাঁর প্রজন্ম সত্যিই এমন এক পৃথিবীতে জন্মেছে, যেখানে চতুর্দিকে প্রযুক্তি ও এআইয়ের রমরমা। ফলে সে এআই নিয়ে জন্মেছে বা এআইয়ের সঙ্গে জন্মেছে, এ কথায় ভুল নেই। রেডিয়ো, টিভি, মোবাইল যুগের প্রজন্ম হয়ে এআই যুগের প্রজন্মকে বোঝা খানিক শক্তই। তবে সে যে এক ক্ষণজন্মা প্রতিভা, তা বুঝতে রকেট সায়েন্স লাগে না। সুন্দর ভবিষ্যত পেতেই তাকে সংরক্ষণ করা দরকার। (Ranvir Sachdeva)
তথ্যসূত্র: Are You Born With AI, টাইমস অব ইন্ডিয়া, সানডে গার্জিয়ান, টেড এক্স, এএনআই, AI for Good, UN, ITU, DD News
ছবি সৌজন্য: রণবীর সচদেব ইনস্টাগ্রাম, এআই
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
বইয়ের প্রতি অগাধ ভালবাসা। প্রিয় ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও প্রিয় বিষয় বাংলার আঞ্চলিক সংস্কৃতি। সাধারণ নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষদের জীবনধারা হয়ে উঠেছে আগ্রহের কেন্দ্র। হিন্দুস্থান টাইমস বাংলা ও এবিপি আনন্দে জীবনযাপন ও স্বাস্থ্য বিভাগের সাংবাদিক ছিলেন। পড়াশোনা অর্থনীতি নিয়ে।
