(Ramakrishna)
রামকৃষ্ণদেব কলকাতার বাঙালি ছিলেন না। তাঁর মুখের ভাষাও কলকাতার বাংলা নয়। তিনি গ্রাম থেকে শহরে এসেছিলেন। কলকাতার কাছে দক্ষিণেশ্বরে রানি রাসমণির মন্দিরে তিনি পুজো করতেন। দাদার সঙ্গে এসেছিলেন সে মন্দিরে, দাদা রাসমণির নব প্রতিষ্ঠিত মন্দিরে পুজোর কাজ নিয়েছিলেন। গদাধর চট্টোপাধ্যায় দাদার সহযোগী, চালকলা বাঁধা বিদ্যে তিনি তেমন করে শিখতে চাননি। তাই দাদার প্রয়াণের পর তিনি যখন মন্দিরের কালীর প্রধান পূজক হলেন তখন তিনি শাস্ত্রমতে দেবীর পুজো করতেন না। তাঁর পুজোর পদ্ধতি নিজস্ব ও আন্তরিক। তা সংস্কৃত শাস্ত্রের দ্বারা চালিত নয় তা বাঙালি সাধকের আকুতি ও ভাবে লালিত। রামপ্রসাদের ভক্তিধারার নবরূপ কলকাতার কাছেই দক্ষিণেশ্বরে রামকৃষ্ণদেবের মধ্যে বিকাশ লাভ করেছিল। তাঁর অনুভূতির ও সেই অনুভূতি প্রকাশের ভাষা কলকাতার ভদ্রলোকদের ভাষার থেকে আলাদা।
রামকৃষ্ণদেবের প্রধান শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ। তিনি কলকাতার শিক্ষিত পরিবারের সন্তান। বাবা আইনজীবী। মা ভুবনেশ্বরী কেবল বাংলা লেখাপড়াই জানতেন না, ইংরেজিও দিব্য জানতেন। বিবেকানন্দের সহোদর মহেন্দ্রনাথ দত্তের লেখা থেকে জানা যাচ্ছে ছেলেবেলায় তাঁর দাদা নরেন মোটে ইংরেজি পড়তে চাইতেন না, মা ভুবনেশ্বরী ইংরেজি পড়াতে শুরু করেন।
আরও পড়ুন: অংবংচং: বাঙালি কি ভাষার কল্পনা হারাচ্ছে?
নরেন্দ্রর ভাষা শেখার সামর্থ ছিল, তিনি ইংরেজি, বাংলা, সংস্কৃত, হিন্দি, উর্দু বেশ বলতে পারতেন। হিন্দি-উর্দু তাঁর আইনজীবী পিতার প্রভাবে শেখা বলে মনে হয়। তাছাড়া জীবনের শেষ পর্বে কাজ চালানোর মতো ফরাসিও শিখেছিলেন। বিবেকানন্দ এক অর্থে বহুভাষী, পলিগ্লট। তাঁর আচার্য রামকৃষ্ণদেব একভাষী। তিনি অবশ্য মাঝে মাঝে কৌতুক করতেন। নরেন আর গিরিশকে ইংরেজিতে তর্ক করতে বলতেন, তিনি দেখতেন। ইংরেজি ভাষা সম্বন্ধে, আধুনিক শিক্ষা সম্বন্ধে তাঁর মনে কৌতুকের বোধ সঞ্চারিত হয়েছিল। সেই কৌতুকবোধ একরকমের আত্মরক্ষা পন্থাও (Defence Mechanism) হতে পারে।

বহুভাষী বিবেকানন্দ তাঁর আচার্যের বাংলা ভাষার কলকাতা বহির্ভূত রূপ বিষয়ে নানা ভাবে সচেতন ছিলেন। শ্রীম রামকৃষ্ণকথামৃত রামকৃষ্ণদেবের মুখের ভাষার নিদর্শন বহন করছে। এই বইটিতে শ্রীম ঠাকুরের মুখের কথা যেমন রেখেছিলেন তেমনি সেই কথার উপরে প্রয়োজন মতো ধর্মশাস্ত্রের উদ্ধৃতি সংকলন করেছিলেন। রামকৃষ্ণদেবের গ্রাম্য ভাষা শুনে পাছে কলকাতার ভদ্রলোকেরা তাঁকে ভুল বোঝে তাই তাঁর কথার উপরে শাস্ত্রবাক্যের জামা চাপানো হয়েছিল। বিবেকানন্দ কথামৃত অনুবাদের ক্ষেত্রে কতগুলি পরামর্শ প্রদান করেছিলেন। ঠাকুরের গ্রাম্যকথা যা ভদ্রলোকের কাছে কেমন-কেমন তা অনুবাদ করতে হবে সচেতন ভাবে। ইংরেজি জানা ভদ্রলোকেরা তাঁর আচার্যকে যাতে ভুল না বোঝে তাই বিবেকানন্দের এই সাবধানতা।
উনিশ শতকে ব্রাহ্মরা যে পরিশীলিত ভদ্রলোকের ধর্ম তৈরি করেছিলেন সেই ধর্মের সঙ্গে যাঁদের যোগ ছিল সেই কেশব-শিবনাথ ঠাকুরের কাছে খুবই আসতেন। বিবেকানন্দও সেই সমাজের সদস্য ছিলেন।
উনিশ শতকে ব্রাহ্মরা যে পরিশীলিত ভদ্রলোকের ধর্ম তৈরি করেছিলেন সেই ধর্মের সঙ্গে যাঁদের যোগ ছিল সেই কেশব-শিবনাথ ঠাকুরের কাছে খুবই আসতেন। বিবেকানন্দও সেই সমাজের সদস্য ছিলেন। ঠাকুরের শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেও ব্রাহ্মসমাজের সদস্যপদ কখনও ত্যাগ করেননি। এই ভদ্রলোকের ধর্ম যে বাংলা ভাষাকে অবলম্বন করেছিল তা উবু হয়ে বসা ঠাকুরের ভাষা নয়। রামকৃষ্ণদেব বাবু হয়ে বসে নয়, উবু হয়ে বসে খেতেন। গায়ে অনেক সময় কাপড় থাকত না। এই অসম্বৃত সাধককে দেবেন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ ঠিক অনুধাবন করতে পারেননি। দুজনেই জামা-কাপড়-শিথিল, গ্রামের ভাষা-বলা মানুষটিকে পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারেননি। (Ramakrishna)
ঠাকুরের জন্মশতবর্ষে অবশ্য রবীন্দ্রনাথের তাঁর সম্বন্ধে মনোভাব অনেকটাই বদলে গিয়েছিল। ভাষা তো কেবল সংযোগের উপায় নয়, ভাব ও সংস্কৃতির চিন্তন-প্রকাশ মাধ্যম। রামকৃষ্ণদেব তাঁর অনুভব ও সাংস্কৃতিক প্রকাশ দু’য়ের উপযোগী যে মুখের ভাষা ব্যবহার করতেন তা কলকাতার ভদ্রলোকদের বিচলিত করেছিল। বহুভাষী বিবেকানন্দও বিচলিত হয়েছিলেন, সেই বিচলন থেকে মুক্তি লাভে সচেষ্ট হয়েছিলেন। মুক্তি পাননি। (Ramakrishna)
এই পত্রে বিবেকানন্দ সংস্কৃত শব্দবহুল বাংলার বিরোধিতা করেছিলেন। লিখেছিলেন পণ্ডিতের ভাষায় বুদ্ধ থেকে শুরু করে তাঁর আচার্য রামকৃষ্ণদেব কেউই শিক্ষা দিতেন না।
ভদ্রলোক বিবেকানন্দ বাংলা ভাষাকে লেখার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করলেন জীবনের শেষ পর্বে। তার আগে বাংলা লিখতেন তবে জীবনের শেষ চার বছর ‘উদ্বোধন’ পত্রিকার জন্য যেভাবে তাঁকে বাংলা লিখতে হয়েছিল তা আগে কখনও হয়নি। এই পর্বে বাংলা ভাষা নিয়ে তাঁর মতামত প্রকাশ করেছিলেন একটি চিঠিতে। সেই পত্রখানি ‘উদ্বোধন’ পত্রে ‘বাঙ্গালা ভাষা’ শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। এই পত্রে বিবেকানন্দ সংস্কৃত শব্দবহুল বাংলার বিরোধিতা করেছিলেন। লিখেছিলেন পণ্ডিতের ভাষায় বুদ্ধ থেকে শুরু করে তাঁর আচার্য রামকৃষ্ণদেব কেউই শিক্ষা দিতেন না। শিক্ষা দিতেন সাধারণের মুখের ভাষায়। এতে কোনও ভুল নেই, তবে এরপর বিবেকানন্দের যে দাবি তা মেনে নিতে অসুবিধে হয়। (Ramakrishna)
বিবেকানন্দ লেখেন বাংলা ভাষার নানারূপের মধ্যে কোন ভাষা জিতছে? বিবেকানন্দের মতে ‘কলকেতার ভাষা’ জিতছে। এই জেতার কথা উঠলেই কিন্তু সমস্যা। রামকৃষ্ণদেব যে মুখের ভাষা ব্যবহার করেছিলেন তা কিন্তু কলকেতার মুখের ভাষা নয়, তা তাঁর মুখের ভাষা। মরমিয়া সাধকেরা এই ভাষা তৈরি করেছিলেন জীবনের অনুভব ও অভিজ্ঞতার সহায়তায়। সেই ভাষায় বহু প্রজন্মের পলি পড়েছে। কথামৃতের ভাষা ঠাকুরের মুখের ভাষা, কলকেতার ভাষা নয়। ঠাকুরের সেই মুখের ভাষায় কলকাতা পূর্ববর্তী বঙ্গদেশের নিজস্ব পারম্পর্যের ধারা মিলে মিশে আছে। (Ramakrishna)

এ-কথা আমরা যেন ভুলে না যাই। কলকাতা কেন্দ্রীয় নগরী হয়ে ওঠার পর শিক্ষিত বাঙালি ভদ্রলোকদের উদ্যমে বাংলা লেখার ভাষার ও মুখের ভাষার মান্য একটি রূপ গড়ে উঠেছিল। এই রূপ গড়ে তোলার ব্যবহারিক কতগুলি প্রয়োজনও ছিল। তার বাইরেও কিন্তু থেকে গিয়েছিল বাংলা ভাষার নানা রূপ। সেই ভাষারূপের শক্তি কম কিছু নয়। (Ramakrishna)
রামকৃষ্ণদেব সেই ভাষা-জমিনের উপরে তাঁর বোধবৃক্ষ স্থাপন করেছিলেন। তাঁর গূঢ় অনুভব তাঁর একভাষী সংস্কৃতির দান। সেই ভাষার জগতে আমাদের পক্ষে আর ফিরে যাওয়া অসম্ভব। তার জন্য শুধু নিজেদের ‘আনলার্ন’ করাই যথেষ্ট নয়, সেই ভাষার কাছে যেতে গেলে বিশেষ সাংস্কৃতিক পরম্পরার মধ্য দিয়ে বড়ো হয়ে উঠতে হয়। তা আর কেমন করে সম্ভব? (Ramakrishna)
কলকাতার কাছেই দক্ষিণেশ্বরে রামকৃষ্ণদেব অন্য এক বাংলা ভাষার, বাংলা ভাষার বিশেষ ভেদের প্রকাশ-ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করছিলেন। এটুকু যেন ভুলে না যাই। কমলকুমার মজুমদার ভুলে যাননি।
আমাদের কাছে থেকে যাওয়া বাংলা ভাষার এই নানাত্বকে কলকাতার মান্যতা দিয়ে যেন নষ্ট না করি। কলকাতার কাছেই দক্ষিণেশ্বরে রামকৃষ্ণদেব অন্য এক বাংলা ভাষার, বাংলা ভাষার বিশেষ ভেদের প্রকাশ-ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করছিলেন। এটুকু যেন ভুলে না যাই। কমলকুমার মজুমদার ভুলে যাননি। আধুনিকতার বাইরে অন্য বাঙালিয়ানার অনুসন্ধানী কমলকুমার রামকৃষ্ণদেবের কথায় কান পেতেছিলেন। (Ramakrishna)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
বিশ্বজিৎ রায়ের জন্ম ১৯৭৮-এ, কলকাতায়। রামকৃষ্ণ মিশন পুরুলিয়ায় স্কুলজীবন কাটিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত পড়াশুনো। উভয় পর্যায়েই প্রথম শ্রেণীতে প্রথম। বর্তমানে বিশ্বভারতীর বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেন। এবং বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক হিসেবে বাংলা সাহিত্যজগতে সুপরিচিত। রবীন্দ্রনাথ ও বঙ্গসংস্কৃতি বিষয়ে তাঁর প্রকাশিত প্রবন্ধ সংকলনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘রবীন্দ্রনাথ ও বিবেকানন্দ: স্বদেশে সমকালে’, ‘সচলতার গান’, ‘সব প্রবন্ধ রাজনৈতিক’। এর বাইরে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর মুক্তগদ্যের বই ‘ঘটিপুরুষ’, ‘অন্দরবেলা’ ও ‘ইস্কুলগাথা’ এবং পদ্যের বই ‘বিচ্ছেদ প্রস্তাব’ ও ‘গেরস্থালির পদ্য’। ‘ঘটিপুরুষ’ গ্রন্থের জন্য পেয়েছেন নীলাঞ্জনা সেন স্মৃতি পুরস্কার।
