(Language Crisis)
রোজ কত কী দিবস পালন হয় চারপাশে, হবেই তো, না হলেই গোলমাল, জীবন থেমে যাওয়ার ইঙ্গিত। রোজ নতুন সূর্য উঠছে, একটা নতুন দিন। নতুন জীবনের আশ্বাস, বেঁচে থাকার, ভাল লাগার, ভালবাসার এই জীবন যাপন। আবার দিনের শেষে সূয্যি গেলে পাটে আঁধার নামে, একটি দিনের ইতি। সেই দিনের সঙ্গে সঙ্গেই অনেক জীবন লৌকিক থেকে অলৌকিকে হারিয়ে যায়। জীবনের চাকা এইভাবেই ঘুরে চলে।
একুশে ফেব্রুয়ারি
জীবনকে যেমন ভাবে আমরা উদ্যাপন করি, মৃত্যুও তেমন ভাবায়, কাঁদায় আমাদের। একুশে ফেব্রুয়ারি প্রসঙ্গে হঠাৎ জীবনমৃত্যু, দিনযাপনের ব্রতকথা কেন? একুশে ফেব্রুয়ারি, আমাদের বাড়িতে সত্যিই বিশেষ দিন। ওপার বাংলা থেকে আসা ঠাকুমা, বাবা-কাকাদের কাছে যেমন রক্ত রাঙানো, তেমনই আমার দাদার জন্মদিনও বটে।
তখন অনেক ছোট, যৌথ পরিবারের রাতের আড্ডা ছিল জম্পেশ, সবাই মিলে ছড়িয়েছিটিয়ে বসে আড্ডা হত। বড়রা কথা বলতেন বাঙাল ভাষায়, আরও zoom in করে বলতে হয় ময়মনসিংহের ভাষায়। মিষ্টি লাগত, সব কথা বুঝতামও না। কাকু বলেছিলেন, ‘তরা এই ভাষা শেখনের প্রচেষ্টাও করস না, এখন হাসতাছস, পরে দ্যাখবি, হারায়ে গেসে এই ভাষা, তোদের জীবন থ্যাইক্যা৷ তখন কষ্ট হইব’৷ সত্যিই হারিয়ে গেছে, সেই বোল, সেই ভাষা, আশা ভরসা সবটুকুই। আমাদের ভাইবোনদের কাছ থেকে এবং পরবর্তী সব প্রজন্ম থেকে তো বটেই।
কিন্তু এ তো মাত্র আমার পারিবারিক চালচিত্র।

সেই চালচিত্র থেকে হঠাৎ কুড়িয়ে পাওয়া, কাকুর একটা প্রশ্ন এখনও কানে বাজে৷ ‘আচ্ছা, জানিস পৃথিবীতে কত ধরনের ভাষা চালু আছে?’, ‘উফ, খালি প্রশ্ন করো কেন?’ পড়া ধরছেন বা জ্ঞান বিতরণে সদাই ব্যস্ত বড়রা। এটা ভাবলেই আমরা ছোটরা এরকমভাবে বিরক্তি প্রকাশ করতাম। তখন মশগুল সুরজিতের গোল, থাপার বাই সাইকেল কিক, অমিতাভ-ধর্মেন্দ্র, রেখা-হেমার নতুন ‘বই’-তে বা বিশ্বনাথ গুন্ডাপ্পার স্কোয়ার ড্রাইভে।
কাকু বলেই যেতেন, মন দিয়ে শুনি বা না শুনি। বোধহয় জানতেন, বোঝাই জাহাজ ডুবে গেলেও একদিন তলানির খোঁজে, দম ধরে, বের করে আনবে, বা ওই তলানিটুকুই থেকে যাবে সঞ্চয় হিসেবে।
যেমন করে আমাদের হিমালয় সমুদ্রের তলা থেকে এখনও বেড়েই চলেছে আর লম্বা হচ্ছে একটু একটু করে, যদিও তোর বা আমার নজরে পড়ছে না। তেমনই অনেক ভাষা বেড়ে উঠছে, পরিণত, পরিপক্ক হচ্ছে; আবার অনেক ভাষার মৃত্যু হচ্ছে অকালেই, অনাদরে অবহেলায়৷
‘শোন, প্রাণীদের মতো ভাষাদেরও জীবন আছে, রোজ নতুন ভাষাদের জন্ম হচ্ছে, আবার কত ভাষাদের মৃত্যু ঘটছে৷ তারাদের মতো ঝরে যাচ্ছে, আবার নতুন তারা ঝিকমিক করে উঠছে ওই অমাবস্যার রাতে৷ অনেক অনেক যুগ পেরিয়ে অনেক পুরনো ভাষা বেঁচে আছে, তারা এখনও বড় হচ্ছে। যেমন করে আমাদের হিমালয় সমুদ্রের তলা থেকে এখনও বেড়েই চলেছে আর লম্বা হচ্ছে একটু একটু করে, যদিও তোর বা আমার নজরে পড়ছে না। তেমনই অনেক ভাষা বেড়ে উঠছে, পরিণত, পরিপক্ক হচ্ছে; আবার অনেক ভাষার মৃত্যু হচ্ছে অকালেই, অনাদরে অবহেলায়৷’ (Language Crisis)

কত কত ভাষা
সারা বিশ্বে সাত হাজারটিরও বেশি বিভিন্ন ভাষা প্রচলিত আছে। এর মধ্যে বিশ্বের পঞ্চাশ শতাংশ মানুষ মাত্র ২৩টি ভাষা ব্যবহার করে। ইংরেজি, ম্যান্ডারিন চাইনিজ এবং হিন্দি হল বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত কথ্য ভাষা, আমার মাতৃভাষা বাংলা রয়েছে ষষ্ঠ স্থানে৷ চল্লিশ শতাংশের উপর ভাষার অস্তিত্ব এখন বিপন্ন৷ হাজার বা আরও কম মানুষ সে ভাষা ব্যবহার করে। আর সেই সব প্রান্তিক মানুষদের মধ্যে যদি জন্মহার না বাড়ে, তাহলে এখনকার এই হাজার মানুষ কাল আরও কমতি। আস্তে আস্তে প্রজন্মের হাত ধরে বড় হওয়ার সুযোগ না পেয়ে হারিয়ে যাবে কালের গহ্বরে৷ (Language Crisis)
হোমো স্যাপিয়েন্স প্রজাতির প্রাণীদের যদি আমরা আমাদের পূর্ব-পুরুষ হিসেবে মেনে নিই, তাহলে তাঁদের হাত ধরেই ৭০ হাজার বছর ধরে মানব সভ্যতা বেড়ে উঠেছে। শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রসার ঘটেছে তাদের ভাষা ও রোজকার জীবন ধারণের মধ্যে দিয়ে৷ (Language Crisis)
আমরা জাতি-প্রজাতি, পরিবেশ বাঁচানোর জন্য লড়াই করছি। আন্দোলনে নেমেছি জলবাযু দূষণের প্রতিবাদে, জীব উদ্ভিদ বাঁচানোর প্রচেষ্টা করছি। কিন্তু ভাষা বাঁচানোর আন্দোলন কোথায়? যে ভাষা সভ্যতা ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক, তাকে বাঁচাবে কে?’
১৯৯৩ সালে সুইডেনের স্টকহোমের নোবেল প্রাইজ নেওয়ার মঞ্চে দাঁড়িয়ে আমেরিকার লেখক টনি মরিসন বলছেন, ভাষাই মানুষের জীবন এবং এই ভাষাই বিশ্বজুড়ে সংস্কৃতি ও সভ্যতার ধারাকে বহমান নদীর মতো এগিয়ে নিয়ে চলে। আমাদের কান্না হাসির দোল দোলানো জীবন, আমাদের বর্ণমালা, পছন্দের শব্দ, নির্বাচিত নীরবতা, অপ্রতিরোধ্য ভাষা জ্ঞানের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়৷ (Language Crisis)
ভাষার জীবন
মানুষ বা জীবজগতের মতো, ভাষারও প্রাণ আছে৷ আছে জন্ম, আছে মৃত্যু, চক্রাকারে৷ পৃথিবী বিখ্যাত ভাষাবিদরা এই নিয়ে সততই গবেষণা করে চলেছেন। দু’জন মানুষকে খুব কাছ থেকে দেখেছি যাঁরা শব্দের কাছে নতজানু সবসময়৷ আদরে যত্নে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়াস মৃতপ্রায় ভাষাদের। নিউ ইয়র্কের বব হোলম্যান ২০১০ সালে ভাষাবিদ ড্যানিয়েল কফম্যান আর জুলিয়েট ব্লেভিন্স-এর সঙ্গে গড়ে তোলেন ‘এনডেনজারড ল্যাংগুয়েজ অ্যালায়েন্স’। (Language Crisis)

ববের ভাষায়, ‘আমরা শিক্ষা বলতে বুঝি সাদা কালো কিছু অক্ষর। তার মধ্যে এতটাই ডুবে আছি যে, শব্দের শক্তি এবং শব্দের মধ্যে থাকা ইন্দ্রিয়ের জাদু ভুলে গেছি। আমরা জাতি-প্রজাতি, পরিবেশ বাঁচানোর জন্য লড়াই করছি। আন্দোলনে নেমেছি জলবাযু দূষণের প্রতিবাদে, জীব উদ্ভিদ বাঁচানোর প্রচেষ্টা করছি। কিন্তু ভাষা বাঁচানোর আন্দোলন কোথায়? যে ভাষা সভ্যতা ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক, তাকে বাঁচাবে কে?’ (Language Crisis)
বব ভাষার সংরক্ষণের জন্য লড়াই করছেন, বাঁচাতে চাইছেন সংস্কৃতিরই আত্মাকে মননকে? তিনটি পর্বের ডকুমেন্টারি ‘অন দ্য রোড উইথ বব হোলম্যান: অ্যা পোয়েটস জার্নি ইনটু গ্লোবাল কালচারস অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজেস’ পশ্চিম আফ্রিকা এবং ইজরায়েলের কিছু মৃতপ্রায় ভাষাকে কেন্দ্র করে৷ (Language Crisis)
ডেভিড ক্রিস্টাল, ক্লদ হ্যাগেজ এবং পল লুইসের মতো বিখ্যাত ভাষাবিদরাও গত কয়েক দশক ধরে ভাষার জন্ম-মৃত্যু নিয়ে গবেষণা করছেন। Ethnologue-এর মতো বিস্তৃত তালিকার বই প্রকাশ হচ্ছে, যাতে বর্তমানে বিশ্বের পরিচিত সমস্ত ভাষাগুলির সূচি ও তথ্য প্রকাশ পাচ্ছে নিয়মিতভাবে।
ববের মতো তবে হাল ছাড়ে না অনেকেই, সব কিছু উপেক্ষা করেও তাঁরা নিজেদের মতো গবেষণা, লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন৷ ডেভিড ক্রিস্টাল, ক্লদ হ্যাগেজ এবং পল লুইসের মতো বিখ্যাত ভাষাবিদরাও গত কয়েক দশক ধরে ভাষার জন্ম-মৃত্যু নিয়ে গবেষণা করছেন। Ethnologue-এর মতো বিস্তৃত তালিকার বই প্রকাশ হচ্ছে, যাতে বর্তমানে বিশ্বের পরিচিত সমস্ত ভাষাগুলির সূচি ও তথ্য প্রকাশ পাচ্ছে নিয়মিতভাবে। (Language Crisis)
আমার বন্ধু, নর্থ টেক্সাস ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সাদাফ মুন্সী বলছিলেন, ‘পাকিস্তানের উত্তরের এক প্রত্যন্ত গ্রামের কথা। কয়েক ঘর মানুষ আছে মাত্র৷ তারা চলে গেলে হারিয়ে যাবে মানব সভ্যতার একটা টুকরো৷ বারবার দৌঁড়ে গিয়ে নথিবদ্ধ করছেন সেই ভাষার ব্যাকরণ।’ অবাক হয়ে যাই যখন অন্যদিকে, বড় শহরে, বর্ধিষ্ণু এক সমাজে থেকেও আমরা প্রতিনিয়ত হত্যা করে চলেছি আমাদের মাতৃভাষাকেই৷ (Language Crisis)

ভাষার মৃত্যু
ভাষা মারা যাওয়ার অনেক উপায় আছে। মানুষ যদি তাদের ভাষায় কথা না বলে, সেই সম্প্রদায় পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ভাষাকে পৌঁছে না দিতে পারে, তাহলেই ধীরে ধীরে মৃত্যুমুখে এগিয়ে যাবে ভাষা। হয়তো নজরে পড়ছে না, হিমালয়ের বেড়ে ওঠাটা যেমন পড়ে না, কিন্তু বাড়ছে সে৷ ঠিক নিচের দিকে যাওয়াটাও হঠাৎ করে নজরে হয়তো আসে না। কিন্তু যে ভাষা বাবা মায়ের কাছ থেকে সন্তানদের কাছে পৌঁছতে গিয়ে বারবার হোঁচট খায়, সেই ভাষা শেষ পর্যন্ত নিজেই একটি জীর্ণ সংস্করণ হয়ে উঠবে৷ দেশভাগের জন্য যেমন এক প্রজন্মের ব্যবধানেই আমি হারিয়ে ফেলেছি আমার ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’। (Language Crisis)
পৃথিবীর অনেক দূর প্রান্তে যেতে হবে না, ঘরের কাছে সুন্দরবনের দিকে গেলেই হবে। সেখানে একেকটা দ্বীপ তলিয়ে যাচ্ছে, বঙ্গোপসাগর গ্রাস করে নিচ্ছে সেই সব জমি, তার সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে সেইসব মানুষের জীবিকা, জীবনযাপন ও ভাষা। তারা প্রাণের দায়, জীবন রক্ষার্থে ছড়িয়ে পড়ছে অন্য ভিনদেশে, ভিনজমিতে। মনে পড়ে যাচ্ছে কুড়মিদের আন্দোলন। পুরুলিয়া থেকে হাওড়া উজিয়ে এসে আন্দোলন। সরকারের নাকের ডগায়, যদি টনক নড়ে। বিভিন্ন রাজ্যের উপজাতিদের ভাষাও সংকটে। যেমন ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশ। একইভাবে মরে যাচ্ছে ভারতের দুই উপকূলের অনেক ভাষা। এক নির্দিষ্ট প্রজাতি থেকে জন্ম হচ্ছে মিশ্র প্রজাতির ও মিশ্র ভাষার৷ (Language Crisis)
এই বিশ্বায়নের যুগে প্রতিনিয়ত সুশৃঙ্খলভাবে চলছে লুঠতরাজ৷ নৃশংসভাবে ভাষাদের খুনখারাপি চলছে। মনে রাখা দরকার, ভাষা খুন করা পাপ৷ ভাষাই আমাদের পরিচয়, আমাদের পরিত্রাণ৷
ওয়েলস এবং আয়ারল্যান্ডের বিভিন্ন জনজাতির মধ্যে যা ঘটেছিল, ঠিক তার মতো। তাদের স্বতন্ত্রতা, তাদের ভাষার বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষাও ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে থাকে৷ এছাড়াও, অনেক ভাষা আছে পৃথিবীর দুর্গম থেকে দুর্গমতম জায়গায়, সেখানে ব্যবহার হয় না কোনও লিখিত নথি বা নেই কোনও সংগঠিত বর্ণমালা। ফলে সেই ভাষাও হারিয়ে যেতে পারে অচিরেই। (Language Crisis)

ভাষা দীর্ঘজীবী হোক
‘We die. That may be the meaning of life. But we do language. That may be the measure of our lives.’ টনি মরিসনের সঙ্গে সহমত হয়ে আরও একটা কথা বলি, এই বিশ্বায়নের যুগে প্রতিনিয়ত সুশৃঙ্খলভাবে চলছে লুঠতরাজ৷ নৃশংসভাবে ভাষাদের খুনখারাপি চলছে। মনে রাখা দরকার, ভাষা খুন করা পাপ৷ ভাষাই আমাদের পরিচয়, আমাদের পরিত্রাণ৷ তাই, ভাষা দিবস দীর্ঘজীবী হোক। (Language Crisis)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
মৌসুমীর জন্ম কলকাতায় হলেও গত তিন দশক ধরে নিউ ইয়র্কই তাঁর বাসস্থান এবং কর্মস্থান। এক্কেবারে বিশুদ্ধ ক্যালইয়র্কার। শুঁটকি মাছ থেকে চন্ডীপাঠ, Grateful Deads থেকে সুপ্রীতি ঘোষ আর এই diasporic dichotomy-র জাগলিংয়ে হাত পাকাতে পাকাতেই দিন কাবার। ভালোবাসেন বই পড়তে, ছবি আঁকতে, রান্না করতে, আড্ডা মারতে আর ক্যামেরা হাতে ছবি তুলতে। তবে সবচেয়ে ভালোবাসেন সক্কলকে নিয়ে জমিয়ে বাঁচতে!
