(Rustic cooking)
শীত ফুরিয়ে গেল। পাতা খসিয়ে দিল গাছেরা। অজস্র ঝরা পাতার ভিড়ে ভোর থেকে ছাতারেরা চেঁচামেচি করে শান্ত ভোরগুলোকে জাগিয়ে দেয়। সেই ভোরে বোরো চাষের মাঠে মাঠে জলের পাম্প চলে। বকের দল গোড়ালি ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ধানের গোছার আশেপাশে। সাদা আর সবুজে মিশে এ এক আরেকরকমের বসন্তদিন।

আসলে বসন্ত অনেক রকমের। শীতের মেলা আর পালাপার্বণ পেরিয়ে এই ফাল্গুনের জেগে ওঠা। একদিকে শেষ শীতের গন্ধ, আরেকদিকে নতুন পাতা আর আমের মুকুলেরা। এইসব নিয়ে ফাগুনের দিন যেন কোন যুগসন্ধিক্ষণের কাব্যের মতো জেগে থাকে একা একা।

একেকদিন খুব ভোরে উঠলে একটা শান্ত আলো ছড়িয়ে থাকে এদিক সেদিকে। পিয়ালে আমে পাতাবাদামের গাছে সেই আলোর স্পর্শ দেখতে পাবে তুমিও। ওরা প্রত্যেকে যেন নিবিড় করে এই বসন্তদিনের রূপরসগন্ধকে ছুঁতে চাইছে। এই চাওয়াকে ব্যক্তিগত বলাই ভাল। গাছগাছালির ব্যক্তিগত স্বর আসলে ডালে ফুলে পল্লবে জেগে উঠছে প্রতিনিয়ত। তাই হয়তো তাকে ব্যক্তিগত বলতে অস্বস্তি হয়। কিন্তু সেও তো নিবিড় এক যাপনই। সে তার ব্যক্তিগত উৎসবের মতো। তাকে ঠিক মানুষের ব্যক্তিগত’র ধারণায় ধরতে চাওয়া উচিত হবে না।

এই ঔচিত্যের এপারে দাঁড়িয়ে আমি বসন্তের ভোরকে বুঝতে চাই একেকদিন। মানুষের এত রকমের উচ্ছ্বাস ছাড়াও বসন্ত কিন্তু নিজের মতো করেই সেজে উঠতে জানে। তবে, ফুরিয়ে আসা শীতের পৃথিবীকে সে ভোলে না। জরা আর যৌবনের কী অপূর্ব সংযোগ! একথা আর কেউ না জানুক রান্নাঘর জানে। মধ্যবিত্তের বাজার জানে। ওই যে আটপৌড়ে শাড়ি পরা মাসি ঝুড়ি পেতে বসেছে! ওর ছড়িয়ে পড়া বাঁশের ঝুড়িতে পরিপাটি বাজার সাজানো আছে। কেয়ারি করা বাগানের চেয়ে সেও কম কিছু নয়।
আরও পড়ুন: বনজ কুসুম: পর্ব – [১] [২] [৩] [৪] [৫] [৬] [৭] [৮] [৯] [১০] [১১] [১২] [১৩] [১৪] [১৫] [১৬] [১৭] [১৮] [১৯] [২০] [২১]
একদিকে শিমের বীজ, বুড়িয়ে আসা শিস পালঙের গোছা – অন্যদিকে কচি কচি ছোলার গাছ, পাকা কুল, লালচে আভার নরম নিমের পাতা। এই মিলেমিশে যাওয়া জীবনকে ও কেমন করে সাজিয়ে তুলেছে গার্হস্থ্যের ছন্দে! আসলে পৃথিবী এমনই হয়তো। বসন্তের সকালেও মানুষকে সে মনে করিয়ে দিতে চাইছে, ফুরিয়ে ফেলা জীবনের ওপারে আরেকখানা মুকুলঝরানো দিন অপেক্ষা করে আছে।

এই দেখো না, রান্নাঘর থেকে বাজারের ঝুরি সে কথাই তো বলছে। ঘোর শীতে আমগাছের ওই মগডালে যে কাঠশিমের লতা মাথা তুলেছিল! তার শুকনো ডালের উপরে এখন বোলের গন্ধে মৌমাছিদের আনাগোনা। লাল লাল কাঠশিমের বীচি আমগাছের তলায় গড়াগড়ি যাচ্ছে। মোচ্ছব শেষে এ যেন কোন বৈরাগীর ধুলোট। কেউ যদি কুড়িয়ে নিল সে ভাল কথা। যদি নাও কুড়ায়, ধুলোয় মিশে ধুলো হতেও ওর আপত্তি নেই।

বসন্তের দিন জীবনের সেই নিগূঢ় সুরটিকেই বুঝি ফুটিয়ে তুলতে চাইছে। শিমুলে পলাশে অশোকে কাঞ্চনে রঙের এই বাড়াবাড়িটুকু নিয়েই প্রকৃতির ব্যক্তিগত দিনযাপন। আগত গ্রীষ্মদিন ওর এই জৌলুষ ফুরিয়ে ফেলতে বাধ্য করবে, একথা কে না জানে! তবুও এই মুহূর্তের চেয়ে দামী আর কিছু নেই। এই যেমন মনুষ্যজীবন। যতক্ষণ আছ, এই বসন্তের সকালটুকু তোমার। ছাতারদের কিচিরমিচির পেরিয়ে সেই ব্যক্তিগত সকালকেই ছুঁতে চাইছি আসলে, ফাল্গুনের সকালকে। (Rustic cooking)
হলদেটে পেঁয়াজকলি আর স্বাদ ফুরিয়ে আসা ফুলকপির ঝোলকে আমার তাই যত্ন করে রাঁধতে ইচ্ছে করে একেকদিন। বাজারের কচি কচি লালতে শাক, সে তো আছেই। তার স্বাদ আর গৌরব নিয়েই সে আছে। তবু এই ফুরিয়ে আসা পেঁয়াজকলি আর ফুলকপিদের অবহেলা করি কেমন করে! বসন্ত নিজেই তো জেগে আছে যুগসন্ধির ব্যকুলতায়। ভাল থেকো বসন্তদিন।
মরে আসা নদীর সোঁতায় আঁচল ভরে আগুন রঙা মন্দার ভাসিয়ে দিতে ইচ্ছে করে তাই। সে ফুল ভেসে ভেসে যদি নাও যায়! যদি শ্যাওলার আগলে ওর চলা থেমে যায়! তবুও। এই থেমে যাওয়ার মধ্যে জেগে থাকা মন্দারের আলো শীত ফুরনো বসন্তদিনের মতো।

হলদেটে পেঁয়াজকলি আর স্বাদ ফুরিয়ে আসা ফুলকপির ঝোলকে আমার তাই যত্ন করে রাঁধতে ইচ্ছে করে একেকদিন। বাজারের কচি কচি লালতে শাক, সে তো আছেই। তার স্বাদ আর গৌরব নিয়েই সে আছে। তবু এই ফুরিয়ে আসা পেঁয়াজকলি আর ফুলকপিদের অবহেলা করি কেমন করে! বসন্ত নিজেই তো জেগে আছে যুগসন্ধির ব্যকুলতায়। ভাল থেকো বসন্তদিন। ফাগুনদিনের রান্নাঘরকে এমন করে মানবিক স্বরে আর কেইবা চেনাতো তুমি ছাড়া!
ব্রকোলি-চিংড়ি মাখা
উপকরণ: ব্রকোলি, সামান্য চিংড়ি, দুই চার কোয়া রসুন, কাঁচা লঙ্কা, শুকনো লঙ্কা, পেঁয়াজ, নুন, হলুদ, সর্ষের তেল।

পদ্ধতি: ইদানীং গ্রামে গ্রামে ফুলকপির পাশাপাশি ব্রকোলি চাষ হচ্ছে। গ্রামের হাটে বাজারেও তাই ব্রকোলি পাওয়া যায়। তেমনই একটি রান্না ব্রকোলি দিয়ে। নিতান্ত সাদাসিধা। এই রান্নার জন্য ব্রকোলির ফুলগুলি কেটে ছোটো টুকরো করে নিন। রসুন ছাড়িয়ে নিন। চিংড়ি নুন-হলুদ মাখিয়ে রাখুন। তেল গরম হলে অল্প তেলে কাঁচালঙ্কা, রসুন এবং ব্রকোলি সাঁতলে তুলে নিন। ব্রকোলির জল যেন আর না থাকে। ভাজা ভাজা ভাব হবে কিন্তু পুড়বে না।

ওই কড়াইয়েই আরেকটু তেল দিয়ে চিংড়ি গুলো ভেজে তুলে নিন। ব্রকোলি এবং চিংড়ি একটু ঠান্ডা হলে হালকা করে বেটে নিন। এবারে আরেকটি পাত্রে তেল গরম করুন। একটি শুকনো লঙ্কা ভেজে নিন। ভাজা লঙ্কা আর নুন ভাল করে মেখে, পেঁয়াজ কুচিয়ে ভাল করে মিশিয়ে নিন। এই নুন, শুকনো লঙ্কা আর কাঁচা পেয়াজের মিশ্রণটি এবারে ব্রকোলি বাটার সঙ্গে মেখে নিন। লঙ্কা ভাজার তেলটিও দিয়ে দিন। সব ভাল করে মিলেমিশে গেলে গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন ব্রকোলি-চিংড়ি মাখা।
ডুমুরের আচার বা গা-মাখা টক
উপকরণ: কচি ডুমুর দুমুঠো, পাকা তেঁতুল, গুড়, পাঁচফোড়ন, শুকনো লঙ্কা, সর্ষের তেল, নুন, হলুদ গুঁড়ো, লঙ্কা গুঁড়ো।

পদ্ধতি: কচি দেখে ডুমুর নিন। বীজ না হলে তো খুবই ভাল। কেটে নুন হলুদ দিয়ে সেদ্ধ করে জল ঝরিয়ে নিন। কড়াইতে সর্ষের তেল দিন। পাঁচফোড়ন আর শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিন। তেলের উপর ডুমুরগুলো দিয়ে বেশ ভাজা ভাজা করে কষিয়ে নিন। অল্প নুন, হলুদ গুঁড়ো আর লঙ্কার গুঁড়ো দিন। সব বেশ মিশে গেলে তেঁতুল আর গুড় দিন।

গা মাখা হয়ে এলে বন্ধ করুন অল্প পাঁচাফোড়ন শুকনো খোলায় ভেজে গুঁড়ো করে নিন। এই ভাজা মশলা উপর থেকে ছড়িয়ে ভাল করে মিশিয়ে নিন। ঠান্ডা হয়ে গেলে বোতলে ভরুন। এক দুই দিন রোদ খাওয়াতেও পারেন। ডুমুরের গা-মাখা টক ডাল আর ভাতের সঙ্গে বেশ উপাদেয়।
ছবি সৌজন্য: লেখক, AI
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
অমৃতা ভট্টাচার্য (জ.১৯৮৪-) শান্তিনিকেতনের জল হাওয়ায় বড়ো হয়েছেন। পাঠভবনে তাঁর পড়াশোনা। পরে বিশ্বভারতীর বাংলা বিভাগ থেকে বাংলা উপন্যাসে বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে গবেষণা করেছেন। পড়িয়েছেন জগদ্বন্ধু ইনস্টিটিউশনে এবং পরে চারুচন্দ্র কলেজে। বর্তমানে স্বেচ্ছাবসর নিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলের দেশজ রান্না নিয়ে কাজ করছেন। স্বপ্ন দেখেন পুঁজির প্রতাপের বাইরে অন্যরকম জীবনের, খানিকটা যাপনও করেন তা। যে হাতে শব্দ বোনেন সেই হাতেই বোনেন ধান, ফলান সব্জি। দেশ-বিদেশের নানা-মানুষের অন্যরকম জীবন দেখতে ভালোবাসেন। তাঁর লেখা স্মৃতিগ্রন্থ ‘বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ ’ এবং 'রেখেছি পত্রপুটে' পাঠকের সুসমাদর পেয়েছে।
