(Kolkata Book Fair)
আজ সাড়ে তিন সপ্তাহ হল মেলা শেষ। মাঠে ছড়িয়ে থাকা শেষ পেরেকটাও হয়তো চলে গেছে কারুর গাড়ির চাকায়। বই নেই, স্টল নেই, আটটার পর ঢুকতে চাওয়া দেরি করে ফেলা মানুষের আর্তি নেই মাঠের দরজায়! পাঠক এখন কর্মচারীর বেশে মন দিয়েছেন যে যাঁর কাজে। করুণাময়ীর মাথার উপর মেট্রো থেকে কেউ কেউ হয়তো এখনও খুঁজে নিচ্ছেন প্রিয় ভিড়! কত বাস ছেড়ে গেল… চরিত্ররা ফিরে গেলেন পরবর্তী উপন্যাসে। সামনের বছর মেলার পঞ্চাশ বলে কথা!
আজ শেষ পর্ব, এখনও বহু কিছু বাকি রয়ে গেল লেখার! যেমন রয়ে গেল শেষদিন অরিত্রর ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা আমাদের গাড়ির দিকে… সে তাকানোয় যে কতখানি ঘৃণা ছিল, সেদিন বুঝিনি। একটি বাচ্চা ছেলের ভিতর এক আকাশ প্রতিবাদ! সমস্ত সমাজের প্রতিই কেমন এক বিরক্তি যেন! অরিত্র মেলার শেষদিনের সঙ্গী ছিল আমাদের। তারপর জীবনের শেষ ছাতার মতো ভুল অটোয় আমাদের ফেলে, নেমে চলে গেছে অন্য রাস্তায়…
বাকি থেকে যাওয়া বললে ওর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিতে মন চায় এখনও! বন্ধুর আত্মহত্যা এক পাহাড়প্রমাণ অপরাধবোধের চেয়ে কম কিছু নয়! আরও কত আড্ডা, কত ক্ষোভ, কত হিসাবনিকাশ বাকিই থেকে যায়… একটা নিবিড় আলিঙ্গন হয়তো সেসব মিটিয়ে দিতে পারত… প্রেম বা প্রতিবাদে অতটা অসহায় নিজেকে মনে করিনি, বলেই হয়তো এখনও মেলার শেষ ঘণ্টার পর আমরা গাড়ি পেয়ে যাই ফেরার… (Kolkata Book Fair)

প্রতিবাদের কথা উঠলে মনে পড়ে, বাকি রয়ে গেল মেলার প্রতিবাদ নিয়েও লেখা! তার কিছু শুনেছি, কিছু দেখেছি নিজের চোখে। তবে লিটল ম্যাগাজিন যে মেলার অনিবার্য অস্বস্তি, তা অস্বীকার করার জায়গা কোথায়! কখনও সঙ্কোচে আড়ালে থেকেছি, কখনও সামনে এগিয়ে দেখেছি সেসব। এই এক তাঁবুর নিচ থেকে কীভাবে সহজেই সংগ্রহ হয়ে যায় শ-চারেক সই! কখনও তা যশোর রোডের গাছ বাঁচাতে, কখনও অভয়ার বিচার চেয়ে! (Kolkata Book Fair)
বাবার মুখে শুনেছি, ময়দানের মেলায় নাকি একসময় রোজ মিছিল করতেন লিটল ম্যাগাজিনের কর্মীরা! গিল্ড অফিস অব্দি গিয়ে নিজেদের দাবি জানাতেন। এ ছিল রোজের রুটিন। কখনও পুলিশ দিয়ে ঘিরে দেওয়া হত গোটা প্যাভেলিয়ান! কখনও মাঠে বসে পড়া ম্যাগাজিনকে তাড়া করে তুলে দেওয়া হত পুলিশ দিয়েই! নিজেদের এই লড়াইয়ে আজ নয়, অনেকদিনই অস্তিত্ব বুঝিয়ে এসেছে ছোট পত্রিকা! (Kolkata Book Fair)

মেলা থেকে প্যাভেলিয়ন মুছে দিলে বাকিটার প্রতি ন্যূনতম মায়া থাকবে না আমাদেরও! শুধু এই আয়তাকার জায়গাটার জন্যই কতকিছু! এখানেই বিক্ষোভ দেখাতে গিয়ে গ্রেফতার হয়ে যায় অপূর্বদা! এখানেই গোল করে হাতে পোস্টার নিয়ে দাঁড়ালে, স্তব্ধ হয়ে যায় মেলার যাতায়াত! সেই পোস্টারে লেখা থাকে ‘অভয়া ভয় নাই, লড়াই ছাড়ি নাই…’, কখনও বা প্যালেস্তাইনের শিশুদের মুখ, কখনও গাছের ছায়ার যশোর রোড! (Kolkata Book Fair)
মেলার কথায় ফিরে আসে প্রেমও! কলেজের বয়সে যাঁদের প্রেম, তাঁদের জীবনে বইমেলা নেই এ যেন হতেই পারে না! আমাদের দুই অগ্রজের কথাই মনে পড়ে সবার আগে, অনিমিখদা আর সঙ্ঘমিত্রাদি!
প্রতিটা প্রতিবাদের সঙ্গেই আরও আরও বড় হয়ে ওঠে মেলা। মানুষ এসে দাঁড়ায়, কারোর বিরক্তি নেই, ভিড় বড় হয়, বড় হতে থাকে চিৎকার! ‘মানুষ বড় কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও…’
এ তো গেল প্রতিবাদের কথা, যদি উত্তেজনা নিয়ে লিখি? একটা সময় ছিল আমাদেরও! ছন্নছাড়া এই মেলায় আমরা খুঁজে পেয়েছিলাম কিছু আত্মীয়দের! তন্ময়, সুপ্রিয়, সুমন আর আকাশ! যে চারজনের বন্ধুত্বে হিংসা ছিল অনেকের! গোটা মেলা দাপিয়ে বেড়াতাম আমরা! পত্রিকায় লেখা থেকে নিজেদের টেবিল, সর্বত্রই এক যৌথ যাপন! দক্ষিণ কলকাতা বা হুগলি থেকে গিয়ে রোজের আড্ডা জমাতাম বেলঘরিয়া বা বাগবাজারে! মাস্তুল আর আঙ্গিক পত্রিকা দুটোকে ঘিরে তখন কতই না স্বপ্ন আমাদের! কেবলই কি আমরা? দল ভেঙে যাওয়া অগ্রজদের মুখে তখন এটুকুই চাওয়া, এরা যেন আলাদা না হয়ে যায়… (Kolkata Book Fair)
এই ব্রাদারহুডেও চিড় ধরল সময়ের দোষে! ছিটকে গেলাম আমরা! আঙ্গিকের ছাপা পত্রিকা বন্ধ করে দিল সুমন! মাস্তুল টিমটিম করে জ্বলছে তখন! বন্ধুত্ব অবিনশ্বর, এর সৃষ্টি বা ধ্বংস হয় না। কেবল মুখ বদলে যায়! দৃশ্যে অন্যরা ঢুকে আসে। যেভাবে আমরা এখন অগ্রজদের জায়গা থেকে দেখছি দেবজ্যোতি, সুবর্ণ, সৌমাল্যদের! ওদের পত্রিকা অহৈতুকী ঘিরে, তৈরি হচ্ছে চনমনে সেই দলটা! যারা মাঠে পুলিশের চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করতে পারে। প্রবীণের লেখা খারাপ লাগলে বলতে পারে মুখের উপর! দাদাদের কোমরে ব্যথা বলে চুপচাপ ছিনিয়ে নেয় তাদের ভারী ব্যাগ! নিঃশব্দে ক্ষমতার হাতবদল হয়, এভাবেই আমাদের মাথা ভরে ওঠে পাকা চুলে, চোখে চশমা আসে! (Kolkata Book Fair)

মেলার কথায় ফিরে আসে প্রেমও! কলেজের বয়সে যাঁদের প্রেম, তাঁদের জীবনে বইমেলা নেই এ যেন হতেই পারে না! আমাদের দুই অগ্রজের কথাই মনে পড়ে সবার আগে, অনিমিখদা আর সঙ্ঘমিত্রাদি! দুই অগ্রগণ্য কবি! তার চেয়েও জরুরি, তাঁরা কাছের মানুষ, ভালবাসার মানুষ… তাঁদের প্রেমের জীবন জুড়ে বইমেলার বিস্তীর্ণ মাঠ! লক্ষাধিক মানুষের ভিড়েও তাঁদের যে নীরব উপস্থিতি তা আমার কাছে এক চিৎকারের চেয়ে কম কিছু নয়! ওঁদের সমবেত যাতায়াত, টেবিলে সময় কাটানো থেকে শেষ দিনের ব্যাগবোঝাই মিষ্টি, আমাদের কাছে রিচুয়ালের চেয়ে কম কিছুই নয়! মেলার প্রেম বললে এই যুগলকে আমি সবচেয়ে বেশি নম্বর দিতে রাজি! (Kolkata Book Fair)
করুণাময়ীর মাথায় চাঁদ ওঠে, সেদিকে তাকালে একটু নিচেই দেখতে পাই ‘ঋত’র বোর্ড। মনে হয় এই মাটি থেকে চাঁদের যাত্রা করলেও একটা বইমেলা পড়বে রাস্তায়।
আর যাঁরা বছরের পর বছর কারোর আশ্রয় হয়ে উঠলেন? ভৌগলিকভাবে মেলার কাছে বাড়ি বলে যাঁরা স্বল্প পরিচিত বন্ধুকেও নির্দ্বিধায় নিজের বাড়িতে ডেকে নিলেন? যাঁদের মাথার উপর ছাদ ছিল বলে, বাংলা সাহিত্যে এমন সব আড্ডা, এমন সব সৃষ্টি হল… তাঁদের নিয়ে না লিখলে বইমেলা অসম্পূর্ণ থেকে যায়! মেলার শেষে যারা হাত ধরে টানে, অথবা বিনা বাক্যব্যয়ে নিজের ঘর খুলে দেয় দূর থেকে আসা পরিচিত মানুষটার জন্য, তাদের দেখে বিস্মিত হই বারবার! (Kolkata Book Fair)

আমাদেরও তো এমনটাই হওয়ার কথা ছিল! কোনও পিছুটান ছাড়া, হইহল্লা, আড্ডা, মেলার জন্য অফিসে লড়াই… সেরকম আর পারলাম কই! করুণাময়ীর মাথায় চাঁদ ওঠে, সেদিকে তাকালে একটু নিচেই দেখতে পাই ‘ঋত’র বোর্ড। মনে হয় এই মাটি থেকে চাঁদের যাত্রা করলেও একটা বইমেলা পড়বে রাস্তায়। যে মেলায় আসার জন্য সম্বিতদা চার চারটে চাকরি ছেড়েছে! যে মেলায় বইগুলো সময়ে ঢোকানোর জন্য নিজের সন্তানকে ছেড়ে একমাস ধরে কলেজস্ট্রিটে রয়ে গেছে সন্তুদা! যে মেলায় আসতে গিয়ে প্রেসের দেরির কারণে কোনও বারে ঢুকতে বাধ্য হয়েছে সুস্নাতদা! যেখানে মৃদুল দাশগুপ্তর মাপের কবি নিয়ম করে এসে টেবিলে বসেন, প্রয়োজনে ব্যানার টাঙাতেও হাত লাগিয়ে দেন কখনও! বোধশব্দ টেবিল না নিলে মনমরা হয়ে ঘোরেন গোটা মেলা! এ কি বাংলায় ছাড়া হবে? (Kolkata Book Fair)
আমাদের অশিক্ষার প্রমাণ লোপাট করে! হাতে বইয়ের ব্যাগ নিয়েও ভুল জায়গায় জলের বোতল ফেলে আসা তথাকথিত শিক্ষিত মানুষদের কুকর্ম চাপা দিতে, দিন চলে যায় তাদের।
কবিতার থেকে কয়েকশো মাইল দূরে থাকা প্রত্যুষা রোজ সময়ে এসে বিল কেটে দেবে আঙ্গিক, মাস্তুলের টেবিলে! এ তো সবই আমাদের অর্জন! যে মেলা থেকে পুলিশ তুলে নিয়ে যায় বিধাননগর থানায়, দু’দিনের মাথায় সেখানেই হাসিমুখে ফিরে আসে অপূর্বদা! তাতে কি মুখ বন্ধ হয়ে যায় তার? জনাইয়ের রাতের রাস্তার মতো থমথমে মুখ নিয়ে বইমেলা অপেক্ষা করে থাকে ওর জন্যও! ঘরের ছেলে ঘরে ফিরেছে! (Kolkata Book Fair)

অনেক না বলার ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছেন কর্মীরা! যাঁদের নিয়ন রঙের জ্যাকেটের নিচে গায়ের চামড়ায় আমাদের চেয়ে বেশি ধুলো লেগে যায় এই মেলার মাঠেই… যারা সারাদিন মেলা ঘুরে আমাদের ফুটপ্রিন্ট মোছে, আমাদের অশিক্ষার প্রমাণ লোপাট করে! হাতে বইয়ের ব্যাগ নিয়েও ভুল জায়গায় জলের বোতল ফেলে আসা তথাকথিত শিক্ষিত মানুষদের কুকর্ম চাপা দিতে, দিন চলে যায় তাদের। ওই হাতগুলো থেকে সমাজ বই কেড়ে নিয়েছিল বলেই হয়তো আজ এই পরিস্থিতি আমাদের! যাদের হাতে বই, তারাও কি কিছু শিখতে পারল তেমন? ৬-৭টা বাথরুম থাকা সত্ত্বেও বাচ্চাদের স্টলের দেওয়ালে হিসি করাল যে বাবা-মা, তাদের দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে কখনও কি ক্ষমা করল এই কর্মীরা? (Kolkata Book Fair)

আমাদের ফেলে যাওয়া মানচিত্রে ফিশফ্রাইয়ের কাসুন্দি আর জলের পাউচ তুলতে তুলতে এক একটা সন্ধ্যে কী অবলীলায় পরিষ্কার করে ফেলল তারা! সাড়ে তিন সপ্তাহ আগে, এখন আমরা শেষ ঘণ্টার অপেক্ষায়! টেবিল জুড়ে ভিড়… ২০১১ থেকে এই ঘণ্টা একবারের জন্যও মিস হয়নি আমার! বন্ধুরাও একসঙ্গে শুনছি বছর দশেক হল। কত টেবিল স্টল হয়ে গেল, কত বন্ধু মেলার বাইরে চলে গেল, কতজন রাজ্যের বাইরে! তবু গুটিকতক তো থাকল, তারাই স্টল ছেড়ে প্যাভেলিয়নে ছুটে এল এই ঘণ্টাটুকু একসঙ্গে শুনবে বলে… মেলাশেষের আলিঙ্গনে কেঁদে উঠল কত চোখ! আমরা বড় হয়ে গেলাম, অন্য যৌবন এসে দায়িত্ব নিল কি প্যাভেলিয়নের? (Kolkata Book Fair)
চিত্রঋণ- অরিত্র দত্ত
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
আকাশ লিখতে ভালোবাসে, ভালোবাসে গাছপালা আর বাইক রাইড! একসময় খেলাধুলার সঙ্গে কাটিয়েছে এক দশকেরও বেশি সময়। গত বেশ কয়েক বছর ধরে বাংলা পোর্টালে কর্মরত। যদিও মন থেকে ব্যবসার প্রতি এক অদ্ভুত টান আছে তার!
