(Santiniketan Basanta Utsav)
‘আমি এখানে দিগন্তপ্রসারিত সবুজের মধ্যে দুই চক্ষু ডুবাইয়া বসিয়া আছি। একটা ছোট নাটক লেখাতেও হাত দিয়াছি। মনে করিয়াছিলাম শিশিরোৎসব লিখিব— সময় এবং আমার বয়স অনুসারে সেইটেই সঙ্গত হইত কিন্তু বিধাতা পরিহাস করিয়া আমাকে বসন্তোৎসব লেখাইতেছেন— কেমন করিয়া এরূপ অপাত্রে অকালবসন্তের প্রাদুর্ভাব হইল তাহা বলিতে পারি না— ইহার মধ্যে ইন্দ্রের সহিত অন্য কোনো একজন দেবতার চক্রান্ত আছে এমন আশঙ্কা করিবেন না— নারদের কৌতুক থাকিতে পারে।’
ক্ষিতিমোহন সেনকে লিখছেন রবীন্দ্রনাথ, ২২ কার্তিক ১৩১৭।
আরও পড়ুন: বিস্মৃতির আড়ালে লালবিহারী দে
রবীন্দ্রনাথের প্রিয়তম ঋতু ছিল বর্ষা। কিন্তু বসন্ত তাঁকে ডাক দিয়েছে বারে বারে। তার একটা কারণ হয়তো শান্তিনিকেতনের মতো করে বসন্ত আর কোথাও ধরা দেয় না। সেই কারণেই বাঙালির কাছে বসন্তোৎসব মানেই আজ শান্তিনিকেতন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিটি ঋতুকে বরণ করে নিতে বিশ্বভারতীতে বর্ষামঙ্গল, শারদোৎসব, নবান্ন ও বসন্তোৎসবের মতো নানা অনুষ্ঠানের সূচনা করেছিলেন। কালক্রমে এর সঙ্গে বৃক্ষরোপণ ও হলকর্ষণের মতো উৎসবও যুক্ত হয়েছে।
শান্তিনিকেতনের এই ‘তেরো পার্বণে’-র মধ্যে বসন্তোৎসবই সবচেয়ে জনপ্রিয়। দোলের সময় আশ্রমের গৌরপ্রাঙ্গণ ও মেলার মাঠে তিল ধারণের জায়গা থাকে না। দু’দিনব্যাপী এই উৎসবে প্রতিদিন সন্ধ্যায় পরিবেশিত হয় রবীন্দ্র নৃত্যনাট্য। আর, দোলের দিন ভোরে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মাধ্যমে মূল অনুষ্ঠানের সূচনা ঘটে।

কিন্তু এ উৎসব শান্তিনিকেতনে নির্বিশেষ নয়, বিশেষ। অঙ্গবিহীন আলিঙ্গনের মতো বর্ণবিহীন রঙিন হওয়া। একলা বসে রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানে যে ছবি আঁকেন, তা বাসন্তী রঙে নয়, বসন্তী রঙে। সে রং আগুনের মতো, ছড়িয়ে যায় সবখানে। মূলত গান, নাচ আর প্রকৃতির স্নিগ্ধ গন্ধে এই উৎসব পূর্ণতা পায়।
জ্যোৎস্না রাতে শালফুলের মাদকতাময় সুবাস আশ্রমের পরিবেশে এক মায়াবী আবহ তৈরি করে, যার চমৎকার বর্ণনা পাওয়া যায় প্রমথনাথ বিশীর ‘রবীন্দ্রনাথ ও শান্তিনিকেতন’ বইয়ে, ‘বাতাস একটু পড়িতেই শালফুলের গন্ধ আকাশের ভাঁজে ভাঁজে জমিয়া চাপিয়া ধরিবার উপক্রম করে।’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী সৃষ্টি ‘বসন্ত উৎসব’ মূলত ঋতুরাজের আবাহন এবং শান্তিনিকেতনের লাল মাটির স্নিগ্ধতার এক অপূর্ব সমন্বয়, যা আজ বাঙালি সংস্কৃতির এক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
প্রমথনাথ বিশীর বর্ণনায় যে নির্জন শান্তিনিকেতনের কথা পাওয়া যায়, আধুনিক কালের ভিড়ে তা অনেকটা বদলে গেলেও, তার আদিম সৌন্দর্য আজও ফুরিয়ে যায়নি। খুব ভোরে শান্তিনিকেতনের পথে হাঁটলে সেই চিরচেনা বসন্তের স্নিগ্ধ রূপ এখনও খুঁজে পাওয়া যায়। বসন্তের শান্তিনিকেতনকে চেনা যায় বিভিন্ন ফুলের সুবাস দিয়ে। প্রমথনাথ বিশী যেমনটা লিখেছিলেন— ছাতিমতলার তীব্র গন্ধ, উত্তরায়ণের পথে হেনা ও রজনীগন্ধার মিষ্টি সুরভি কিংবা শালবনের মাতাল করা ঘ্রাণ, আজও এখানকার প্রতিটি আনাচে-কানাচে মিশে আছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী সৃষ্টি ‘বসন্ত উৎসব’ মূলত ঋতুরাজের আবাহন এবং শান্তিনিকেতনের লাল মাটির স্নিগ্ধতার এক অপূর্ব সমন্বয়, যা আজ বাঙালি সংস্কৃতির এক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। এটি কেবল নিছক রঙের উৎসব নয়, বরং প্রকৃতি ও মানুষের আত্মিক সম্পর্কের এক শিল্পময় বহিঃপ্রকাশ। যান্ত্রিক জীবনের সীমানা ছাড়িয়ে মানুষকে প্রকৃতির উন্মুক্ত সান্নিধ্যে আনাই ছিল কবিগুরুর মূল লক্ষ্য।

ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায়, ১৯০৭ সালের ১৭ই মার্চ শমীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্যোগে অত্যন্ত ঘরোয়াভাবে ‘ঋতু উৎসব’ হিসেবে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯২৩ সালে রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে এটি পূর্ণতা পায়। কবিগুরুর কাছে বসন্ত ছিল নতুনের ডাক ও তারুণ্যের প্রতীক। তাই তিনি এই উৎসবে উগ্রতার চেয়ে গান এবং নান্দনিকতাকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছিলেন, যাতে মানুষের অন্তরের আনন্দ প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হতে পারে।
এই দোলা লাগার কথাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতির সঙ্গে রং মিশিয়ে সম্পর্কের একটা প্রাণময় স্পন্দন চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসবের প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাবনার প্রতিফলন পাওয়া যায় তাঁর প্রবন্ধ আর গানে গানে। উৎসবের মূল সুরটি পাওয়া যায় তাঁর এই কালজয়ী গানে, যা দিয়ে শান্তিনিকেতনে উৎসবের সূচনা হয়— ‘ওরে গৃহবাসী, খোল্ দ্বার খোল্, লাগল যে দোল। স্থলে জলে বনতলে লাগল যে দোল। দ্বার খোল্, দ্বার খোল্।’ বা, ‘বসন্ত তার গান লিখে যায় ধূলির ‘পরে কী আদরে॥ তাই সে ধূলা ওঠে হেসে বারে বারে নবীন বেশে…’
এই দোলা লাগার কথাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতির সঙ্গে রং মিশিয়ে সম্পর্কের একটা প্রাণময় স্পন্দন চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। লিখেছিলেন, ‘বিশ্বের সহিত স্বতন্ত্র বলিয়া যে মানুষের গৌরব তাহা নহে। মানুষের মধ্যে বিশ্বের সকল বৈচিত্র্যই আছে বলিয়া মানুষ বড়ো। মানুষ জড়ের সহিত জড়, তরুলতার সঙ্গে তরুলতা…’

শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসবের মূল বিশেষত্ব হল এর অনাড়ম্বর প্রকৃতি, প্রণতি-গৌরব। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাবনায় বসন্ত উৎসব ছিল কৃত্রিমতাবর্জিত এক নির্মল আনন্দানুষ্ঠান। উৎসবের সেই শুচিতা বজায় রাখতেই তিনি শান্তিনিকেতনে পঙ্কিল রঙের বদলে ভেষজ ও শুকনো ‘আবির’ ব্যবহারের রীতি প্রবর্তন করেন, যা আজও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় অপরিবর্তিত রয়েছে। কিন্তু সেই আবির নিয়েও গোল বেঁধেছিল এক বার। সে গল্প শুনিয়েছেন প্রমথনাথ বিশী।
‘শান্তিনিকেতনে আবির খেলা কোনও সময়েই নিষিদ্ধ ছিল না। রবীন্দ্রনাথ আশ্রমে উপস্থিত থাকলে তিনিও আবির গ্রহণ ও আবির দান করতেন। কিন্তু যেবারের কথা বলছি, সেবারে তিনি উপস্থিত ছিলেন না। সেবার উপস্থিত ছিলেন একজন কট্টর ব্রাহ্ম। তাঁর ধারণা ছিল শান্তিনিকেতন একটা ব্রাহ্মসমাজ বা ব্রাহ্ম প্রতিষ্ঠান। তিনি প্রায় প্রত্যেক বিষয়ে হিন্দু আর ব্রাহ্ম নিয়ে খুঁতখুঁত করতেন। আবির খেলাটাকে তিনি বিশেষভাবে হিন্দুদের ব্যাপার বলে মনে করতেন।
ক্ষিতিমোহনবাবু বললেন, বিলক্ষণ! ব্রাহ্মধর্ম পুস্তিকায় আছে, আবির আবিরাবীর্ম এধি-। কট্টর শুধালেন, অর্থাৎ? অর্থাৎ সরল, আবিরে আবিরে ময় হও।’
এবারে রবীন্দ্রনাথের অনুপস্থিতি তাঁকে জোর দিল। ক’দিন আগে থেকে তিনি বলে বেড়াতে লাগলেন, আশ্রমে আবির খেলা অসঙ্গত। ওটা ব্রাহ্মসমাজের অনুমোদিত নয়। বাকি সকলে অর্থাৎ শতকরা পঁচানব্বই জন বললেন, এখানে প্রতি বৎসর আবির খেলা হয়, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও তাতে যোগ দেন। স্পষ্টত কিছু না বললেও ভাবেভঙ্গিতে তিনি প্রকাশ করলেন যে, রবীন্দ্রনাথও যেন যথেষ্ট ব্রাহ্ম নন। অথচ অধিকাংশ লোক আবির খেলার পক্ষে। তখন তিনি ক্ষিতিমোহনবাবুকে উকিল পাকড়াও করলেন। বললেন, আপনি তো পণ্ডিত লোক, আবির খেলা সম্বন্ধে ব্রাহ্মসমাজের কী মত প্রকাশ করে বলুন। উকিল নির্বাচন করতে গেলে একটু সতর্ক হওয়া দরকার, একথা তিনি জানতেন না। ক্ষিতিমোহনবাবু বললেন, বিলক্ষণ! ব্রাহ্মধর্ম পুস্তিকায় আছে, আবির আবিরাবীর্ম এধি-। কট্টর শুধালেন, অর্থাৎ? অর্থাৎ সরল, আবিরে আবিরে ময় হও।’

কট্টর তা হতে পারেননি। শোনা যায়, তিনি অচিরে শান্তিনিকেতন ত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু সারা বিশ্ব শান্তিনিকেতনের ওই আবিরে আবিরময় হয়েছে। এককালের এই ঘরোয়া আশ্রমিক আয়োজন বর্তমানে বিশ্বজনীন রূপ পেয়েছে। বসন্ত তো রবীন্দ্রনাথের কাছে কেবল একটি ঋতু নয়, ছিল যৌবন, আনন্দ এবং প্রাণের নবজাগরণের এক উদযাপন। তাঁর গানে ও কবিতায় বসন্তের যে রূপটি ফুটে ওঠে, তা মূলত রূপক। রবীন্দ্রনাথ বসন্তকে জীর্ণতা থেকে মুক্তির দূত হিসেবে দেখতেন। শীতের রিক্ততা ও স্তব্ধতা ভেঙে যখন নতুন পাতা ও ফুল ফোটে, তখন তিনি একে মানুষের মনের জড়তা কাটিয়ে ওঠার আহ্বান হিসেবে গণ্য করতেন। ‘ফাল্গুনী’ তারই কথা।
শুধু কি মিলন? রবীন্দ্রসাহিত্যে বসন্ত বিরহের সুরেও বেজে ওঠে। ‘রোদনভরা এ বসন্ত’ গান মনে পড়বে অনেকের। রবীন্দ্রনাথ বসন্তকে এক বিচিত্র বিশেষণে ভূষিত করেছেন— ‘রাজা’ এবং ‘সন্ন্যাসী’। বসন্তের প্রাচুর্য যেমন রাজকীয়, তেমন তার বিলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা তাকে সন্ন্যাসী করে তোলে। তিনি বিশ্বাস করতেন, বসন্ত প্রকৃতির ভাণ্ডার শূন্য করে নিজেকে বিলিয়ে দেয় বলেই সে সার্থক।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
আশিস পাঠক বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগের প্রকাশনা ও বিপণন আধিকারিক।
আনন্দবাজার পত্রিকায় সাংবাদিকতার পাশাপাশি নানা সময়ে যুক্ত থেকেছেন সাহিত্য অকাদেমি, বাংলা আকাদেমি, কেন্দ্রীয় বৈজ্ঞানিক পরিভাষা বিভাগের নানা প্রকল্পে, নানা পুরস্কারের বিচারক হিসেবে। সংস্কৃতির নানা মহলে তাঁর আগ্রহ, বিশেষ আগ্রহ রবীন্দ্রনাথ ও গ্রন্থবিদ্যায়।
