(Barishal Manasa Ghat)
বাঙালির আধ্যাত্মিক চেতনার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তার নিজস্ব শৈলীর শিল্পভাবনা। তার কাছে আধ্যাত্মিকতা শুধু মোক্ষলাভের মঞ্চ নয়। সেখানে রয়েছে মরমি তুলির টানে বাঙ্ময় অভিব্যক্তিকে প্রস্ফুটিত করা। বরিশাল শৈলীর মনসা ঘটের মধ্যে সেই অভিব্যক্তি লক্ষ করা যায়। একে শ্রীঘটও বলা হয়। মূলত বরিশাল জেলার অধিবাসীরা শ্রাবণ সংক্রান্তিতে এই ঘটকে পুজো করেন। কিন্তু, দেশভাগের ফলে বরিশালের বহু মানুষ এই বঙ্গে চলে আসেন। ফলে মনসা ঘট পুজো এখানেও শুরু হয়ে যায়। ঘটের গাত্রে অঙ্কিত মা মনসার কানে থাকে গহনা, মাথায় মুকুট, নাকে নথ। মনসার গায়ের রং হলুদ বর্ণ, বড় টানা চোখ এবং স্থূল শরীরে কাপড়ের রং লাল রেখেই বংশপরম্পরায় শ্রীঘট নির্মাণ করে চলেছেন শিল্পীরা।
নদীয়া জেলার ঐতিহ্যবাহী জনপদ তাহেরপুর। এখানকার পালপাড়ার শিল্পী গোপাল পাল তাঁর অঞ্চলে এই শৈলী ধরে রেখেছেন। প্রায় ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে শ্রীঘট নির্মাণ করেন তিনি। প্রতি বছর শ্রাবণ সংক্রান্তি তিথির মনসা পুজো উপলক্ষ্যে বৈশাখ থেকে ঘট তৈরির কাজ শুরু হয়। চাক ঘুরিয়ে ঘট তৈরি করে সেটি রোদে শুকিয়ে, ভাটিতে পুড়িয়ে ও তার ওপর খড়িমাটির প্রলেপ দেওয়ার পর শুরু হয় রং-এর কাজ। গোপাল এখনও গুঁড়ো রং ব্যবহার করেন। তার তৈরি মনসা ঘটের সর্বাধিক উচ্চতা দেড় ফুট। শিল্পীর কথায়, পিতা রাধেশ্যাম পাল যেভাবে শ্রীঘট নির্মাণ করতেন, সেই একইভাবে তিনি ঘট তৈরি করে চলেছেন।
আরও পড়ুন: লক্ষ্মীসরা কারিগর সুধীর পাল
তাহেরপুরের মৃৎশিল্পী কালিপদ পাল, রাধাবল্লভ পাল, রতন পালরাও মনসা ঘট তৈরি করতেন। কিন্তু কালের নিয়মে শিল্পী কালিপদ পাল, রাধাবল্লভ পাল প্রয়াত হয়েছেন। চাহিদা কম থাকায় এই শিল্পের সঙ্গে দূরত্ব রচনা করেছেন রতন পাল। তিনি লক্ষ্মী সরা তৈরি করেন। বছরের বাকি সময় শিল্পী গোপাল পালেরও লক্ষ্মী সরা তৈরি করেই চলে যায়। শিল্পী হিসাবে কোনও প্রকারের সরকারি অনুদান তিনি পান না।
নদীয়ার তাহেরপুর ছাড়াও, উত্তর ২৪ পরগনার দত্তপুকুর চালতাবেড়িয়ার সারদাপল্লীতে বরিশালের মনসা ঘট শৈলীকে আগলে রেখেছেন শিল্পী হরিদাস পাল এবং বিজয় পাল। শিল্পী হরিদাস পালের তৈরি মনসা ঘট কলকাতার বেহালা, দক্ষিণদাঁড়িতে যায়। পাইকারি ব্যবসায়ীদের হাত ধরে উত্তর ২৪ পরগনার বারাসাত, বিড়া, গুমায় পৌঁছে যায় ঘট। ১০ ইঞ্চি থেকে তিন ফুট পর্যন্ত নানা উচ্চতার মনসা ঘট তৈরি করেন তিনি। মনসার শাড়ি এবং গাত্রে অনিন্দ্যসুন্দর কারুকার্যও থাকে। তুলির টানে তাঁর অসীম ধৈর্য ও দক্ষতা ফুটে ওঠে।

হরিদাসের নির্মিত ঘটে চিত্রিত মনসার দেহসৌষ্ঠব বিশেষভাবে লক্ষণীয়। পিতা গনেশচন্দ্র পালের কাছে মনসা ঘট তৈরির কাজ শিখেছিলেন তিনি। প্রতি বছর প্রায় ৫০০-রও বেশি মনসা ঘট তৈরি করেন তিনি ও তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। বহু লোকসংস্কৃতি ও শিল্প গবেষকরা মনসা ঘট নিয়ে পিএইচডির ক্ষেত্রসমীক্ষা করেন। তাঁদের অনেকেই হরিদাসের কাছে এসে সাক্ষাৎকার নিয়ে যান।
ওই একই পাড়ার মৃৎশিল্পী বছর ষাটেকের বিজয় পাল প্রায় চল্লিশ বছর ধরে মনসা ঘট তৈরি করে চলেছেন। জ্যৈষ্ঠ মাস থেকে মনসার ঘট তৈরির কাজ শুরু করেন। তিনি চাক ঘুরিয়ে ঘট তৈরি করলেও অলংকরণ এবং মনসার প্রতিকৃতি আঁকেন তাঁর স্ত্রী সুমিত্রা পাল। বছরের অন্য সময় পোড়ামাটির বিভিন্ন আসবাব ও প্রতিমা নির্মাণ করেন তাঁরা। ঘট তৈরির ক্ষেত্রে বেলে দোআঁশ মাটি ব্যবহার করা হয়। দত্তপুকুরের চালতাবেড়িয়া মূলত ছাঁচের পোড়ামাটির প্রতিমা ও অন্যান্য শৈল্পিক মূর্তি তৈরির জন্য গোটা রাজ্যে খ্যাত।
মনসা পুজোর বৈশিষ্ট্যই হল ঘট। মনসামঙ্গল কাব্যে সনকার মনসার ঘট স্থাপন তারই প্রমাণ বহন করে। সমাজের প্রান্তিক অন্তজ শ্রেণির দেবী মনসা। বরিশালি ঘটে মনসার মধ্যে গর্ভবতী নারীর প্রতিচ্ছবি প্রস্ফুটিত হয়েছে। এখানে তিনি উর্বরতার প্রতীক। সাপ যেহেতু বিপুল সন্তান জন্ম দিতে পারে, সেই কারণে তাকে উর্বরতার রূপ হিসেবেও দেখা হয়ে থাকে।
উত্তর ২৪ পরগনার নব ব্যারাকপুরের মৃৎশিল্পী সন্তোষ পালের নির্মিত ঘটের কারুকার্য শিল্পরসিকদের আকর্ষণ করে আজও। মা মনসার গাত্রজুড়ে তাঁর অনুপম তুলির টান বাংলার সংস্কৃতির অন্যতম স্তম্ভ হয়ে উঠেছে। বছর পঁচাত্তরের এই শিল্পী বর্তমানে ঘট তৈরির কাজ অনেক কমিয়ে দিয়েছেন। বয়সজনিত কারণে চোখের দৃষ্টিশক্তি কমে গিয়েছে। তাই এখন অল্প সংখ্যক ঘট নির্মাণ করেন। তাঁর কথায়, মনসার গাত্রের কারুকার্য ফুটিয়ে তুলতে হলে দীর্ঘদিনের অধ্যাবসায় জরুরি। সেখান থেকেই তুলির উপর নিয়ন্ত্রণ আসে। তুলির টান দ্রুত হলেও সামঞ্জস্য ও পরিপূর্ণতা থাকে। আজ থেকে বারো বছর পর এই শিল্প শৈলী লুপ্ত হয়ে যাবে। কারণ সেই অর্থে শিল্পী নেই।
উত্তর চব্বিশ পরগনার সদর শহর বারাসতের রামকৃষ্ণপল্লীতেও মনসার ঘট তৈরি হয়ে থাকে। প্রয়াত শিল্পী মানিক পাল এখানকার বিশিষ্ট মৃৎশিল্পী ছিলেন। কিন্তু জীবিত থাকাকালীন তিনি কোনও সামাজিক স্বীকৃতি পাননি। একইভাবে কলকাতার উল্টোডাঙার দক্ষিণদাঁড়ি কুমোরপাড়ার প্রয়াত মৃৎশিল্পী গুরুদাস পাল এবং সরযূবালা পাল মনসার ঘটের গাত্রে নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন। জীবিত অবস্থায় তাঁরা মূল ধারার শিল্পের আলোকবৃত্তের থেকে বঞ্চিত ছিলেন।

বরিশাল শৈলীর মনসাঘটের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে লোকসংস্কৃতি গবেষক বিধান বিশ্বাস বলছেন, ‘মনসা পুজোর বৈশিষ্ট্যই হল ঘট। মনসামঙ্গল কাব্যে সনকার মনসার ঘট স্থাপন তারই প্রমাণ বহন করে। সমাজের প্রান্তিক অন্তজ শ্রেণির দেবী মনসা। বরিশালি ঘটে মনসার মধ্যে গর্ভবতী নারীর প্রতিচ্ছবি প্রস্ফুটিত হয়েছে। এখানে তিনি উর্বরতার প্রতীক। সাপ যেহেতু বিপুল সন্তান জন্ম দিতে পারে, সেই কারণে তাকে উর্বরতার রূপ হিসেবেও দেখা হয়ে থাকে।’
বাংলায় বিয়ের আগে মনসা পুজো করার রীতি রয়েছে। রাজগির সংলগ্ন অঞ্চলে প্রত্নখননে একাধিক প্রাচীন মনসার ঘট পাওয়া গিয়েছিল। ভাগলপুরেও ব্যাপকভাবে মা মনসার পুজো করা হয়ে থাকে। এই সবই পাল ও সেন যুগের অখণ্ড বাংলার ঐতিহ্যের প্রতীক। রাজারা মনসার পাথর ও ব্রোঞ্জের মূর্তি গড়লেও সমাজের প্রান্তিক শ্রেণীর মানুষের কাছে ঘটেই পুজো পেয়ে এসেছেন দেবী।’
মনসা প্রকৃত অর্থে বঙ্গ জীবনের সার্বজনীন সাধনা। শিল্পীরা নিজের আন্তরিকতা দিয়ে ও পারম্পরিক ঐতিহ্যকে বজায় রেখে কখনও মনসার বরিশালি ও যশোহরের ঘট, তো আবার কখনও অষ্টনাগ, নয় নাগ, বিয়াল্লিশ নাগ তৈরি করেন।
তারাপদ সাঁতরা ‘পশ্চিমবঙ্গের লোকশিল্প ও শিল্পীর সমাজ’ বইতে লেখক জানাচ্ছেন, দেবীর পরিধান বস্ত্রের রং কোথাও লাল, আবার কোথাও সবুজ। অক্ষিগোলকসহ দেবীর চোখ দুটি বিস্ফারিত এবং হাতের উপর কোনও কোনও ক্ষেত্রে দেখা যায় বৃশ্চিকসদৃশ উল্কিরেখা। দুই হাতের মুঠোর মধ্যে একটি করে সাপ। বরিশালি মনসা ঘট হয়ে উঠেছে অর্থবহ লোকচিত্রের উদাহরণ।

হুগলি জেলার শ্রীরামপুরের মৃৎশিল্পী মনোজ পালের বাড়িতে শ্রাবণ সংক্রান্তিতে বরিশাল শৈলীর মনসা ঘটে পুজো হয়ে থাকে। ধান, কড়ি সহ অন্যান্য উপকরণের উপর চিত্রিত ঘট স্থাপন করা হয়। ঘটের উপরিভাগে আম্রপল্লব অর্থাৎ আম পাতা এবং হরিতকী দেওয়া হয়। জবা ফুলের মালা দিয়ে ঘট সাজানো হয়। বরিশালি ঘট সামনে আরও একটি ঘট রাখা থাকে। এই ঘটটি শ্রাবণ মাসের প্রথম দিন স্থাপন করা হয়। এ ছাড়া, গোটা শ্রাবণ মাস জুড়ে চলে রায়মঙ্গলের রয়ানী গান। মনোজ পাল নিজেও মনসার বরিশালি ঘট তৈরি করে থাকেন। যদিও তার তৈরি এই ঘটটি ছাঁচের তৈরি, চাকের নয়। চাকের ঘটে বসানোর সময় আলাদা করে পোড়ামাটির গোলাকার বেড় দিতে হয়। এতে ঘট উল্টে পড়ার ভয় থাকে না। অন্যদিকে ছাঁচের তৈরি মনসা ঘটের মধ্যেই বেড় সংযুক্ত করা থাকে।
মনসা প্রকৃত অর্থে বঙ্গ জীবনের সার্বজনীন সাধনা। শিল্পীরা নিজের আন্তরিকতা দিয়ে ও পারম্পরিক ঐতিহ্যকে বজায় রেখে কখনও মনসার বরিশালি ও যশোহরের ঘট, তো আবার কখনও অষ্টনাগ, নয় নাগ, বিয়াল্লিশ নাগ তৈরি করেন। এছাড়াও করণ্ডি, মঞ্জুষেও মা মনসার সাধনা হয়। এই সংস্কৃতির মধ্যে দিয়েই বইছে বাংলার লোকজ আদি অকৃত্রিম শিল্পের ধারা ও লয়।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
পেশায় সাংবাদিক। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে সাংবাদিকতা ও গণজ্ঞাপনে স্নাতকোত্তর। বাংলার পুতুল শিল্পকে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে নিরন্তর কাজ করে চলেছেন। লেখকের, ‘আমাদের কথা’ নামে একটি ইউটিউব চ্যানেল রয়েছে। সেখানে বাংলার বিভিন্ন জেলার মাটির পুতুল নিয়ে ১৫০ টি পর্বে ভিডিও করেছেন তিনি। শিল্পীদের ঘরে গিয়ে শুনেছেন তাঁদের মনের কথা। এছাড়া শিবের মুখোশ, চালচিত্র, লক্ষ্মী সরা, মনসা ঘট, মনসা চালি, ছলনের ঘোড়া নিয়েও তিনি পর্ব তৈরি করেছেন তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে। লেখক নিজে পুতুল সংগ্রাহক। এই লেখায় ব্যবহৃত ছবিগুলো লেখকের নিজের সংগ্রহে থাকা পুতুলের।
