(Bengali Novel)
মোবাইল বেজে যাচ্ছে। চলতে চলতে মোহনা এসব পুরোনো ভাবনায় এমন ডুবে গিয়েছিল যে, খেয়ালই করেনি কতটা পথ হেঁটে ফেলেছে।
মোবাইল ধরে বলল- হ্যাঁ, কোথায় তুই?
-ম্যাডাম আপনি শোভাবাজার ছাড়িয়ে গেছেন। আমি দেখলাম নিজের মতো হেঁটেই যাচ্ছেন। তাই না ডেকে বাগবাজার লেনের মুখে দাঁড়িয়ে আছি।
-আচ্ছা, দাঁড়া। আসছি। মোহনা মোবাইলে দেখল আরও দুটো মিসড কল। একটা রাইয়ের। আরেকটা রূপাঞ্জনের। গাড়িতে উঠে ফোন করে নেবে ভেবে হাঁটার গতি বাড়াল।
আরও পড়ুন: জলকে চল: পর্ব – (১) (২) (৩) (৪) (৫) (৬) (৭) (৮) (৯) (১০) (১১), (১২) (১৩)
বাবু গাড়িটা যেখানে দাঁড় করিয়েছে তার সামনেই একটা দোকানে খুব ভাল মটন কাটলেট, ঘুগনি, চা পাওয়া যায়। এতটা হেঁটে এসে মোহনার চা পানের নেশা জাগল।
-আপনি গাড়িতে বসুন, আমি এনে দিচ্ছি, আর কিছু খাবেন?
-এক প্লেট ঘুগনি, আর চা। তুই কিছু খেলে খেয়ে নে।
-রাই ফোন করেছিল, আপনাকে না পেয়ে। আইসক্রিম নিতে বলেছে।
-নিয়ে নে। আর একটা মটন কাটলেট, একটা ডেভিল নিয়ে নিস বাড়ির জন্য। বলে গাড়িতে উঠে বসল মোহনা।

‘কতটা পথ হাঁটলে পরে পথিক হওয়া যায়’ – এই লাইনগুলো মাথায় এল। সাত বছর হতে চলল তার এই দায়িত্বভার নেওয়া। কতটা সফল হল আর কতটা সামনে যেতে হবে, এর মূল্যায়ন কে করবে! পিছন ফিরে তাকালে সব কেমন গল্পের মতো মনে হয়। রূপকথায় সব শেষে দারুণ একটা এন্ডিং থাকে। কিন্তু এতটা সহজ ছিল না রাস্তাটা। এই জগতে না এলে জানাই হত না, আপাতদৃষ্টিতে সবচেয়ে শ্রদ্ধার পাত্র যাদের মনে করে সাধারণ মানুষ, বুদ্ধিজীবী বলে সম্মান করে, তাদের ভিতরেও কত লোভ, লালসা, মোহ, ক্ষমতার আগ্রাসন। কদর্য সেসব রূপ ঢাকা পড়ে থাকে মুখোশের আড়ালে। একটু এদিক-ওদিক হলেই দাঁত-নখ বেরিয়ে আঁচড়ে ক্ষতবিক্ষত করে দিতে উদ্যত সেইসব চরিত্রগুলো থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে কী অসম্ভব মনের শক্তি লাগে, তা এতগুলো বছরে সে শিখে গেছে।
এই জগতে না এলে জানাই হত না, আপাতদৃষ্টিতে সবচেয়ে শ্রদ্ধার পাত্র যাদের মনে করে সাধারণ মানুষ, বুদ্ধিজীবী বলে সম্মান করে, তাদের ভিতরেও কত লোভ, লালসা, মোহ, ক্ষমতার আগ্রাসন।
এটাও বুঝে গেছে যত ওপরে উঠতে চাইবে, তত তাকে রক্তাক্ত করার চেষ্টা করবে প্রতিপক্ষ। সেখানে কোনও সৌজন্যবোধ, সহানুভূতি, আবেগ, ভালবাসা কিচ্ছু নেই। এগুলো উপেক্ষা করে একটা হাসি ঠোঁটের কোণে ধরে রেখে কাজ করে যাওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।
মোহনা নিজের মনেই হাসল। জীবন একটা সুউচ্চ পর্বত থেকে নেমে আসা ঝরনার মতো। কত বাঁক, পাথর, ঘন গাছেদের সারির সঙ্গে টক্কর খেতে খেতে নামতে হয় তাকে। কিন্তু শেষ অবধি মাটি স্পর্শ করতেই হয়। না করতে পারলে তার খোঁজ কেউ রাখে না। অথচ সবার প্রত্যাশা মাটি ছোঁয়ার। এই আকুলতাই শেষ অবধি প্রতিটা মানুষের মধ্যে জারিত।

চা পান করতে করতে আবার ফোন বেজে উঠল। রূপাঞ্জন। ফেরার পথে তার সঙ্গে একবার কথা না হলে, মানুষটা শান্তি পায় না।
সে মোবাইল ধরে, বলো বলা মাত্র রূপাঞ্জন বলল, কী ব্যাপার ভুলেই গিয়েছিলে আমাকে ফোন করতে? আমি আরেকবারও ফোন করলাম, বেজে গেল।
-আমি এখন রাস্তায়, বাড়ি ফিরিনি।
-এত রাত করলে কেন? কোথায় ছিলে এতক্ষণ?
রূপাঞ্জনের এই কথাটায় হাসি পেল। সঙ্গে সঙ্গে এটাও মনে হল, এখনও পর্যন্ত যে-কটা মানুষ তার জন্য চিন্তা করে, তাদের মধ্যে রূপাঞ্জন একজন। এমন মানুষের সংখ্যা পৃথিবীতে বড় কম আর দুর্লভ।
রূপাঞ্জনের এই কথাটা শুনলেই বিরক্ত লাগে তার। মনে হয় কেন দেব এত কৈফিয়ত? কিন্তু সে কথা না বলে বলল, কাজ করছিলাম। বলো তুমি কী করছ?
-আমি চিন্তায় থাকি তোমার ফোন না পেলে। সেটাই করছিলাম।
-চিন্তার কোনও কারণ তো ঘটেনি।

-চারপাশে এত ঝামেলা বাড়ছে, আর তুমি এখনও এত রাত অবধি অফিসে থাকছ, চিন্তা হওয়াটাই স্বাভাবিক।
রূপাঞ্জনের এই কথাটায় হাসি পেল। সঙ্গে সঙ্গে এটাও মনে হল, এখনও পর্যন্ত যে-কটা মানুষ তার জন্য চিন্তা করে, তাদের মধ্যে রূপাঞ্জন একজন। এমন মানুষের সংখ্যা পৃথিবীতে বড় কম আর দুর্লভ। সে বলল, যতদিন আমার ললাটে এই ধরাভূমিতে থাকার কথা চিত্রগুপ্ত লিখে রেখেছেন, ততদিনই আমাকে থাকতে হবে, একদিন আগেও নয়, পরেও নয়। কাজেই ভেবে লাভ নেই।
-সে যিনি লেখার লিখেছেন। কিন্তু সুস্থ হয়ে তো বাঁচতে হবে। তোমার সামনে এখন প্রচুর কাজ। হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়লে কে সামলাবে?
আবার অভিনয়ে ফিরতে চেয়েছিলাম। শুরুও তো করলাম। তারপর দেখো সবকিছু কেমন থমকে গেল। এখন ফ্লোরে যেতেই ভয় লাগছে।
-যদি হই তখন ভাবা যাবে। তোমার কথা বলো।
-আমার আর কী কথা! ভাবছিলাম যে কাজগুলো করার কথা ছিল, সেগুলো কিছুই করা হল না। সময় কেমন নিজের গতিতে চলে গেল।
-কী কী কাজ করার কথা ভেবেছিলে?

-সে তো তুমি জানোই। আবার অভিনয়ে ফিরতে চেয়েছিলাম। শুরুও তো করলাম। তারপর দেখো সবকিছু কেমন থমকে গেল। এখন ফ্লোরে যেতেই ভয় লাগছে।
-সে আর কী করা যাবে! যখন করার কথা ছিল, চুপ করে চাকরি করে গেলে, আর টুকটাক অভিনয় করলে, এখন ভেবে লাভ নেই।
-তার জন্যেই নিয়মিত যা যা করার করছি। যোগব্যায়াম, গলার এক্সারসাইজ, নাটকের ডায়লগ সব প্র্যাকটিস করছি। যাতে শুরু করলে যেন কোনও খামতি না থাকে।
-বাহ! মন খারাপ করো না। সব হবে।
তুমি রাগ করলে? আসলে আমি ভাবছিলাম… তাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই মোহনা বলল- বুঝতে পেরেছি। আমার খুব ক্লান্ত লাগছে। রাখি?
-আচ্ছা শোনো, তোমাকে সকালে বলব ভেবেছিলাম, ভুলে গেছি। এবছর বেশ কিছু পৃথিবী বিখ্যাত মানুষের জন্মশতবার্ষিকী। তুমি পত্রিকার ক্রোড়পত্র করতে পারো তাঁদের নিয়ে। পুরোনো ‘সাগরিকা’য় তাঁদের অনেকের লেখা আছে বলে আমার ধারণা। সেগুলো দেখে তাঁদের লেখা নিয়ে সংকলন গ্রন্থ বের করো। বাজারে ভাল রেসপন্স পাবে।
-আচ্ছা তোমার কি আমার সঙ্গে কথা বলতে গেলে খালি এসব কথাই মনে পড়ে? একটু বিরক্তি নিয়েই বলল মোহনা।
-তুমি রাগ করলে? আসলে আমি ভাবছিলাম… তাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই মোহনা বলল- বুঝতে পেরেছি। আমার খুব ক্লান্ত লাগছে। রাখি?
-বাড়ি এসে গেলে?
-না, আর মিনিট তিনেক। কাল আবার কথা বলব। বলে ফোন রেখে দিল মোহনা।
মাঝে মাঝে রূপাঞ্জনের এই ওভারপ্রোটেক্টিভ আচরণ, সবসময় সাহিত্য-শিল্প নিয়ে আলোচনা তাকে ক্লান্ত করে তোলে। সে সাহিত্যের ছাত্রী কোনওকালেই নয়। শখ করে এই পেশা বেছে নেওয়ার কারণে পড়তে হয় ঠিকই, কিন্তু এত বেশি না জানলেও চলে যায়। অথচ রূপাঞ্জন মনে করে সে বুঝি খুবই বিদুষী। মোহনা, না জেনেই ঝাঁপ দিয়েছ সমুদ্রে, এখন তুমি যে ভাল সাঁতারু, তা প্রমাণ করো। নিজের মনেই হেসে উঠল সে।
(ক্রমশ)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
বিতস্তা ঘোষাল ঔপন্যাসিক, গল্পকার, কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। আধুনিক ইতিহাসে এম এ, লাইব্রেরি সায়েন্সে বিলিস। কলেজে সাময়িক অধ্যাপনা। প্রকাশনা সংস্থা ভাষা সংসদের কর্ণধার। ও অনুবাদ সাহিত্যের একমাত্র পত্রিকা ‘অনুবাদ পত্রিকা’-র সম্পাদক।
'বাংলা আকাডেমি', 'সারস্বত সম্মান', 'বিবেকানন্দ যুব সম্মান', ‘একান্তর কথাসাহিত্যিক পুরস্কার', 'কেতকী' কবি সম্মান, ‘চলন্তিকা’, 'দুই বাংলা সেরা কবি সম্মান', 'বিজয়া সর্বজয়া', 'মদন মোহন তর্কালঙ্কার সম্মান', 'বই বন্ধু সেরা লেখক ২০২৪' সহ একাধিক পুরস্কার ও সম্মান প্রাপ্ত।
বিতস্তার প্রকাশিত বই ৩৪টি। তাঁর কবিতা ও গল্প হিন্দি, ওড়িয়া, অসমিয়া ও ইংরেজি,ইতালি, গ্রীক ও স্প্যানিশে অনুবাদ হয়েছে। সম্প্রতি ওড়িয়া ভাষায় প্রকাশিত তার গল্প সংকলন রূপকথার রাজকন্যারা।
দেশ বিদেশে কবিতা ও গল্প পড়ার ডাক পেয়েছেন একাধিকবার।বাংলা সবকটি জনপ্রিয় পত্রিকা ও সংবাদপত্রে তার লেখা নিয়মিত প্রকাশিত।
নিজের কাজের গণ্ডীর বাইরে অফিস ও পরিবারেই স্বচ্ছন্দ বিতস্তা কাজের ফাঁকে অবসর সময় কাটান নানান সামাজিক কাজে।
ভালোবাসা ছাড়া বাকি সব কাজ গুরুত্বপূর্ণহীন। তার নিজের কথায় ভালোবাসা ছাড়া কেউ কি বাঁচে?
