(Ujjhomanush 2)
মাঠে যতক্ষণ আলো থাকে, দেখা যায় সারিবদ্ধ কালো হাত… শিরা ফোলা, নিভে আসা ও সব হাত, একদা যা ছিল কাঁধ, সে সবও, হাপরের মতো একবার বুকে ভরে নেয় এক আঁজলা আয়ু, তারপর যন্ত্রমানবের মতো মুখস্থবিদ্যায় নামিয়ে আনে আকাশ থেকে মাটিতে কোদাল বা গাঁইতি বা শাবল… ভোঁতা নানা শব্দ হয়। এ শব্দের কোনও অনুরণন স্পন্দিত হয় না, আশ্চর্যভাবে। কিন্তু খুব মন দিয়ে শুনতে চাইলে ঠিক শুনতে পাবেন বা পেতেন, খেতের নানা প্রান্ত থেকে উপচে উপচে উঠছে অদ্ভুত গোঙানির শব্দসমূহ। এক টুকরো এখানে, আর এক টুকরো দু-বেগদা দূরে, পরের গোঙানি তিন ফারলং দূরে… এমন করে, এমন করে করেই…।
আরও পড়ুন: উহ্যমানুষ (১)
কিছু পর ফের, এ চক্র আসে ঘনিয়ে, মাটিতে ভোঁতা শব্দ হয়, আলো আর একটু কমায় তীব্রতা, আপন দেহে আনে নম্র ছাঁট, তারপর এক সময়, আঁধারযাপনের লগ্ন ওঠে আকাশে, কালো কালো হাতের সারি, ক্ষণিকের আস্তানার দিকে নড়বড়ে, যন্ত্রণাক্লিষ্ট পায়ে এগিয়ে চলে। সারা দিন যথেচ্ছ রোদে চাবুক খেয়ে, পিঠে শাখানদী রচিত হয়েছে অজস্র। এ বার সে শাখানদীদের খানিক থমকে থাকার কাল আগত। তামাক চাষের খেত থেকে, তুলো চাষের খেত থেকে, ধান চাষের খেত থেকে, আখচাষের খেত থেকে দগ্ধ কালো পিঠের সারি এসে মিশত বিধ্বস্ত এক মোহনায়। মাথার উপর হয়তো কেউ কেউ স্পর্ধা করে তাকাত, দেখত আলোর মহারাজ হয়ে জ্যোৎস্না ছড়াচ্ছে ঠিক সেই চাঁদ, যা হাজার মাইল দূরে, নিজভূম আফ্রিকায়-ও ঠিক এ-ভাবেই পথ দেখাচ্ছে হয়তো কোনও পথভোলা বৃদ্ধকে।

বৃদ্ধ সে, বেচারি বেরিয়েছিল সেই কোন সকালে, বহু বছর আগে সহসা হারিয়ে যাওয়া আত্মজকে খুঁজতে। অনেক খুঁজেও, ঠিক অন্য দিনের মতো আজও বৃদ্ধের মেলেনি আদপেই কোনও নিশান, আত্মজ’র, তাই সে ঠায় চেয়ে রয়েছে হয়তো সে জুলজুল করা চাঁদের দিকে। আর ভেবে দেখুন পাঠক, ওই এক চাঁদের দিকেই হয়তো তাকিয়ে দূর আমেরিকায় উবু হয়ে বসা সেই বৃদ্ধর আত্মজ। এ প্রান্তরে তাঁর পরিচয়, না পরিচয় নয়, চিহ্ন, দাসের। স্লেভ। আফ্রিকা থেকে জাহাজে চাপিয়ে যাকে এনে ফেলা হয়েছে এখানে, পিঠে শাখানদী তৈরির ব্যূহে।
আপাতত চলুন না ফিরে যাই সেই অস্থায়ী নড়বড়ে ঘুমদেশের অক্ষপথে, যেখানে ওই চাঁদের আলোয় ক্ষত শুকিয়ে নিচ্ছিল হয়তো খেতমজুরের সে জমায়েত। আর একদা যে ছিল হয়তো নিজভূমে গর্বিত গাওঁবুড়ো, এ পরবাসে, এ কারাবাসে, সে-ই হয়তো কমবয়সী কোনও আহতের ক্ষতে শান্তস্বরে জড়িবুটির আপাত শান্তি দিচ্ছেন। শান্তি দিচ্ছে তারা একে অপরকে সেই গোঙানির ছেঁড়া টুকরো সাজিয়ে সাজিয়ে। ব্যথার এ সুতোগুলি ওরা ফেলে আসেনি তামাকখেতে, নিয়ে এসেছিল, নিয়ে আসে সর্বদা পাঁজরভরে। তারপর সে ছেঁড়া টুকরো, গোঙানির যাবতীয় ফিরিস্তি জুড়ে জুড়ে ঝরে পড়ে জমায়েত মাথায়, শান্তির জল হয়ে। ঝরে পড়ে আশ্চর্য বেদনাবিধুর কিছু সুর হয়ে, আমরা গাড়িতে ব্লুটুথ সহযোগে শুনতে শুনতে যাকে বলি, ব্লুজ়।
গোধূলিরাঙা আলোয় দেখেছিলাম সেই বাচ্চা, দূর পাহাড়ের দিকে মুখ করে, বৃদ্ধকে শোনাচ্ছে কোন মনখারাপের সুর। আমাদের জিপ বেরিয়ে গিয়েছিল সামনের পথে, তাই সে সুর মনে থাকার কথা নয়, কিন্তু বিষাদের ওই কিছুটা জল-ড্রপ জোঁকের মতো অধিগ্রহণ করে নিয়েছিল আমার এক ভাগ অন্তর।
শত শত উহ্যমানুষের ব্যথাক্লিষ্ট এ কাতর গোঙানি যে সাতকাহন লিখত, তা-ই তো নিজভূমের সঙ্গে অদৃশ্য এক আম্বিলিকাল কর্ড খোদাই করত যেন, আফ্রিকার নিখোঁজ কোনও আত্মজের। এই ছায়াতার ধরেই অতঃপর আপন বিষাদব্যূহে দিনযাপন। বা দিনগত পাপক্ষয়ই না হয় লিখি। এ ভাবেই, ওই গানের বা গোঙানির হাত ধরে অন্য পথের ধারে এক ফালি আপনমন, আপনদেশ তৈরি করে নেওয়া। রোদে তেতেপোড়া কঠোর আবহেও এমন গোঙানি-গান, নামাত এক পশলা স্নিগ্ধতা। আফ্রিকার। নিজভূমের। গাঁয়ের বৃদ্ধাজন যেমন একত্রে কাঁথা বুনতে বুনতে তাতে ভরে দিতেন নিজ সমাজের, নিজ কথার চিত্রকল্প, তেমন করেই আমেরিকার এ অপরিচিত হাওয়ায় খেতমজুরের দল একে অপরকে ক্ষীণ স্বরে ঘুমপাড়ানি গান গেয়ে শোনাত। একটু নিশ্চিন্তির লক্ষ্মণরেখা।

এই যে ঘুমপাড়ানি গেয়ে শোনানো, এমনটা দেখেছিলাম, ওই আমেরিকার খেতপ্রান্তর থেকে আলোকবর্ষ দূর, বিহারের এক জঙ্গলকাটা রাস্তায়। শেষ আশির কথা, তখনও ঝাড়খণ্ড জন্ম নেয়নি। জিপ-এ করে যাচ্ছিলাম কোথায় যেন একটা, জঙ্গলের দু’ধারে কাটা রাস্তা। বিকেল করে এসেছে, আলো ক্রমে নতমস্তক হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। হঠাৎ দেখি, রাস্তার ধারে, শিশুঘাসে আধশোয়া এক বৃদ্ধ, কোলে মাথা দিয়ে। মাথা কোলে করে বসে এক বাচ্চা, হয়তো তার নাতি। গোধূলিরাঙা আলোয় দেখেছিলাম সেই বাচ্চা, দূর পাহাড়ের দিকে মুখ করে, বৃদ্ধকে শোনাচ্ছে কোন মনখারাপের সুর। আমাদের জিপ বেরিয়ে গিয়েছিল সামনের পথে, তাই সে সুর মনে থাকার কথা নয়, কিন্তু বিষাদের ওই কিছুটা জল-ড্রপ জোঁকের মতো অধিগ্রহণ করে নিয়েছিল আমার এক ভাগ অন্তর। এই যে দেখুন না, এখনও, কত যে বছর পরও স্পষ্ট আমি দেখতে পাচ্ছি, শুনতেও খানিক, ওই আশ্চর্য দৃশ্য।
গাড়ি অনেকটা এগিয়ে চলেছে যখন অন্ধকারে, আমাদের সারথি কোন্দাদাদা বলেছিল, চেনে সে বালককে। জঙ্গলে কাঠ কুড়োতে গিয়ে কোনও এক বেকায়দায় কিছু বছর আগে চোখের কাছে এক পোকার কামড়ে বৃদ্ধ, দৃষ্টিশক্তি হারান। কিন্তু কাঠ কুড়োনো কি আর বন্ধ হয়? তাই, কয়েক দিন পর, নাতিকে নিয়েই সে বৃদ্ধ বেরিয়ে পড়ত নাকি কাজে। কাঠ কুড়োতে। আর তার পর সারা জঙ্গল ঘুরতে ঘুরতে তিনি গেয়ে বেড়াতেন ওই বিষাদগান বা বলা চলে খেদ-গোঙানি। ঠিক যেন মিসিসিপি ডেল্টা’র সেই কৃষ্ণাঙ্গ-গোঙানিস্বর। সেই বৃদ্ধ নাকি বলতেন, কুঁড়েঘরে ফিরে— ওরা বলে হাটিং— আপনমনেই, সে গানে লুকিয়ে আছে দেশের ঘ্রাণ, দেশের নিমতিতা সমীরণ। নাতিও যে কালেকালে সে সুর আত্মস্থ করে নেবে, অবাক করা কিছু তো নয়।
দেশ তো তাঁর ওই বিষাদ-স্বরে, ওই গোঙানিতে, যেমন করে আফ্রিকার নিজভূম খুঁজে নিত, পেত, খেতমজুরদের ভেঙে যাওয়া মন, ব্লুজ় সুরে।
জানা হয়নি, বৃদ্ধের সে দেশ কোথায়। কিন্তু আদৌ কি সে দেশ খোঁজায় সময় ব্যক্ত করার অর্থ হয়?
দেশ তো তাঁর ওই বিষাদ-স্বরে, ওই গোঙানিতে, যেমন করে আফ্রিকার নিজভূম খুঁজে নিত, পেত, খেতমজুরদের ভেঙে যাওয়া মন, ব্লুজ় সুরে।

শিকড়হীন এমন কত যে উহ্যমানুষ ক্ষত’র শাখানদী ধরে হাঁটতে হাঁটতে অদৃশ্য এক মিলনক্ষেত্রে যোগ দেয় দলে দলে, শুধু মাত্র ওই অন্তরের গোঙানি শব্দকে আধার করে, আমাদের মতো ভীরু মধ্যবিত্তের সাধ্য কী যে নাগালে আনে? উহ্যমানুষের সে দল এ ভাবেই হয়তো ভাঙে সীমান্ত, ভেস্তে দেয় দেশভাগ। আদিমগান বুকে ভরে, পশ্চিম আফ্রিকা থেকে বিচ্ছিন্ন এক সত্তা, সুদূর আমেরিকার এক চাঁদরাতে উবু হয়ে বসে বিহারের রাস্তার ধারে আধশোয়া অন্ধ এক আদিবাসীর সঙ্গে এমন করেই অভূতপূর্ব এক ব্যূহ রচনা করেন।
এ বার আমরা সে সূর্যগ্রহণের সাক্ষী হব কি না, সে তো কালই বলবে।
তদ্দিন না হয় এটুকুই বিশ্বাস করি, যে দেশ, কাল, সীমানা ছাড়িয়ে আসলেই একখানি সুতো বয়ে চলে, যা জড়িয়ে থাকে স্যেন নদীর এক মাঝিকে, আবার হিঙ্গলগঞ্জের এক নাওচালককেও। একলা জলে যখন তারা তরী ভাসায়, তখন নিজ নিজ ভাষায় দরদ জুড়ে তারা গেয়ে চলে দেহপটের গান। উহ্যমানুষের এ অত্যাশ্চর্য সমারোহে গা ভাসাবে যারা, তাদেরই খুঁজে খুঁজে ফেরে এ গানের দল।
তাই, জলকে চল…জলকে চল…জলকে…
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
কর্মসূত্রে সাংবাদিক। কিন্তু তা বাদে অভিনেতা, চিত্রনাট্যকার, অডিয়ো গল্পের লেখক ও পরিচালকও। প্রকাশিত হয়েছে তিনটি গ্রন্থ। ইতিহাসের ছাত্র, তাই খুঁজে বেড়ানোর ঝোঁক সেই সব পুরনো অলিগলি। ঘোর পেসিমিস্ট, আবার জাত অপটিমিস্টও যে!
