(Chaitra Mas)
সুবোধ ঘোষ একটি ছোটগল্প লিখেছিলেন ‘চিত্তচকোর’ নামে। চকোর পারাবত বা তিতির জাতীয় কাল্পনিক (বা পৌরাণিক) পাখি। কিংবদন্তি অনুসারে এই পাখি জ্যোৎস্না পান করে তৃপ্ত হয় এবং অনবরত ঊর্ধ্বমুখে চাঁদের দিকে চেয়ে থাকে। চিত্তচকোর হল চকোরের ন্যায় প্রতীক্ষারত হৃদয়। জ্যোৎস্নাপ্লুত চকোর যেমন মুগ্ধ চোখে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকে, তেমন হৃদয় যখন প্রিয় বা সুন্দরের জন্য ব্যাকুল, তখন সে চিত্তচকোর। এসব কথার অবতারণার কারণ, গল্পটি নিয়ে চিত্রপরিচালক প্রভাত রায় ‘সেদিন চৈত্রমাস’ নামে এক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন ১৯৯৭ সালে। ‘চিত্তচকোর’ অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্র অবশ্য নতুন নয়। ১৯৭৬ সালে চলচ্চিত্রকার বাসু চ্যাটার্জি হিন্দিতে তৈরি করেছিলেন ‘চিতচোর’ নামে একটি চলচ্চিত্র।
শুধু এ বাংলা নয়, ওপার বাংলার সংস্কৃতিতেও ‘সেদিন চৈত্রমাস’-এর দেখা মেলে। ২০০৫ সালে হুমায়ুন আহমেদের একটি উপন্যাস প্রকাশ পেয়েছিল। নাম ‘সেদিন চৈত্রমাস’।
‘সেদিন চৈত্রমাস’ শব্দবন্ধটি অবশ্য রবীন্দ্রনাথ পূর্বেই ব্যবহার করেছিলেন। ১৯৩৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত তাঁর ত্রয়োদশ উপন্যাস ‘চার অধ্যায়’-এ অতীন এলার কাছে উচ্চারণ করে— প্রহরশেষের আলোয় রাঙা/সেদিন চৈত্রমাস,/তোমার চোখে দেখেছিলাম/আমার সর্বনাশ।

শুধু তাই নয়, সেখানে অতীন স্বীকারোক্তির সুরে বলে, ‘সেই চৈত্রমাসের বারবেলা থেকেই আমার পাগলামি শুরু। যে-সব দিন চরমে না পৌঁছোতেই ফুরিয়ে যায় তারা ছায়ামূর্তি নিয়ে ঘুরে বেড়ায় কল্পলোকের দিগন্তে। তোমার সঙ্গে আমার মিলন সেই মরীচিকার বাসরঘরে।’
পরবর্তীতে ‘গীতবিতান’ বহির্ভূত গান হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়েছিল ‘প্রহরশেষের আলোয় রাঙা/সেদিন চৈত্র মাস—/তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ।…আমের বনে দোলা লাগে, মুকুল পড়ে ঝ’ড়ে—/চিরকালের চেনা গন্ধ হাওয়ায় ওঠে ভ’রে।/মঞ্জরিত শাখায় শাখায় মউমাছিদের পাখায় পাখায়,/ক্ষণে ক্ষণে বসন্তদিন ফেলেছে নিঃশ্বাস—’

‘সেদিন চৈত্রমাস’-এ ক্ষণে ক্ষণে নিঃশ্বাস ফেলে বসন্তদিন। দোলা লাগে আমগাছে, গাছ থেকে ঝ’ড়ে পড়তে থাকে মুকুল। আম্রমঞ্জরীতে উড়ে এসে বসে অলি। সেই গুঞ্জরিত অলির গান শুনে শুধু বকুল নয়, আরও অনেক ফুল উল্লসিত হয়।
কালবৈশাখীর মধ্যে দিয়ে চৈত্র তার বর্ষাবসান এবং নতুনের আবাহন ঘোষণা করে। চৈত্রের নিদাঘ যে রুদ্রতাপসকে মনে করিয়ে দেয়, কালবৈশাখীর তাণ্ডব শেষে সৃজনের সম্ভাবনা সেই তাপসের সদাশিব মূর্তি নিয়ে হাজির হয়।
চৈত্র বাংলা বছরের শেষ মাস। চৈত্র সেই মধুমাস যে মাসে চিত্রা নক্ষত্রযুক্ত পূর্ণিমা আসে। চৈতালি রাতের ফুটফুটে জোছনায় পরীরা যতই বসন্তবনে ফুল বুনুক না কেন, চৈত্রের কাঠফাটা রোদ কিন্তু বড় জ্বালা ধরানো। সেখানে মধুরিমার চিহ্নমাত্র নেই। কঠোর তপস্বীর মতো বঙ্গপ্রকৃতি সেই তেজ ধারণ করে হয়ে ওঠে রুদ্রতাপস।
চৈত্রের মধ্যদিনের সেই রক্তনয়ন অবশ্য মাঝে মাঝে অন্ধও হয়ে যায় যখন ‘ধরণীর পরে বিরাট ছায়ার ছত্র’ ধরে দূর উত্তর-পশ্চিম আকাশ থেকে ধেয়ে আসতে থাকে কালবৈশাখী। কালবৈশাখী চৈত্রের অবিনশ্বর প্রতীক। চৈত্র ও কালবৈশাখী অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। চৈত্র এলে কালবৈশাখী আসে, কালবৈশাখী এলে চৈত্র। কালবৈশাখীর মধ্যে দিয়ে চৈত্র তার বর্ষাবসান এবং নতুনের আবাহন ঘোষণা করে। চৈত্রের নিদাঘ যে রুদ্রতাপসকে মনে করিয়ে দেয়, কালবৈশাখীর তাণ্ডব শেষে সৃজনের সম্ভাবনা সেই তাপসের সদাশিব মূর্তি নিয়ে হাজির হয়।

‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় কালবৈশাখীর যে অনুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়েছেন, তার তুলনা বাংলা সাহিত্যে নেই বললেই চলে। মোহিতলাল মজুমদার তাঁর ‘কালবৈশাখী’ কবিতায় অপূর্ব রূপকল্প এবং চিত্ররূপময় পরিবেশ নির্মাণ করেছেন। নজরুল ইসলাম ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় কালবৈশাখীর গর্ভে লুকিয়ে থাকা সৃজনের বেদনা অনুপম ভঙ্গিমায় প্রকাশ করেছেন। রাঢ় বাংলার কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় হয়তো বা কালবৈশাখীর কথা স্মরণে রেখে তাঁর প্রথম উপন্যাসের নামকরণ করেছিলেন ‘চৈতালী-ঘূর্ণি’।
বাংলার কালবৈশাখী আজকের অপু-দুর্গাকেও টেনে নিয়ে আসে আমবাগানে। ঝ’ড়ে পড়া আমের অন্বেষণে তারা এখানে-ওখানে ছুটোছুটি করে। আজও সর্বজয়ারা ঝড়-জলের পর কর্দমাক্ত মাটির রাস্তা দিয়ে টেনে নিয়ে যেতে থাকে নারকেল পাতা, তাদের কোলে-কাঁখে চেপে ধরা থাকে ঝুনো নারকেল। পুকুরে সদ্য জমা জলে গলা ফুলিয়ে হলুদ-সবুজ ব্যাঙ একঘেয়ে ডাকে মেতে ওঠে। তারপর সন্ধ্যা যত রাতের দিকে গড়িয়ে যায়, নিস্তব্ধতা গ্রাস করে চরাচর। কালবৈশাখী বয়ে যাওয়ার স্মৃতি বুকে নিয়ে বিধ্বস্ত প্রকৃতি যেন কেমন স্তব্ধবাক হয়ে পড়ে। অদ্ভুত এক শূন্যতা গ্রাস করে সবকিছু।
বাতাবিলেবু ফুলের গন্ধে ভেসে বেড়ায় চৈত্রের সুবাস। ফাল্গুন যদি হয় ভোগের, চৈত্র হল ত্যাগের— যেমত যোগিনী পারা। উপভোগের প্রথম কুসুম সেখানে ঝ’ড়ে পড়া শুষ্ক কুসুমদাম।
সামগ্রিক বিচারে ফাল্গুন অপেক্ষার মাস। ‘ফাগুনের গান গেয়ে’ মানুষ পথ চেয়ে বসে থাকে। চৈত্রমাস সেখানে উদাসী বিরহী। চৈত্র রাতের উদাসী স্বর উদাস প্রকৃতির মধ্যে যেন লীন হয়ে যেতে থাকে। চৈত্র যেন সেই বড়ু চণ্ডীদাসের ‘রজকিনী রূপ কিশোরী স্বরূপ/ কামগন্ধ নাহি তায়।’ মদির ফাল্গুনী-শৃঙ্গার চৈত্রে পৌঁছে পর্যবসিত হয় ‘রজকিনী-প্রেম নিকষিত হেম’ অথবা অদ্ভুত এক তুলসীমঞ্জরীর ঘ্রাণে। বাতাবিলেবু ফুলের গন্ধে ভেসে বেড়ায় চৈত্রের সুবাস। ফাল্গুন যদি হয় ভোগের, চৈত্র হল ত্যাগের— যেমত যোগিনী পারা। উপভোগের প্রথম কুসুম সেখানে ঝ’ড়ে পড়া শুষ্ক কুসুমদাম।
ফাল্গুন সংক্রান্তিতে ঘেঁটুপুজোর রাত পেরিয়ে চৈত্রের আগমন ঘটে বঙ্গদেশে। ঘেঁটু বা ঘণ্টাকর্ণ হলেন চর্মরোগের লৌকিক দেবতা। বসন্তকালে খোস-পাঁচড়ার মতো চর্মরোগের হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য মানুষজন তাঁর শরণাগত হয়। গ্রামীণ বাংলার লৌকিক ও বিলুপ্তপ্রায় ঘেঁটুপুজোর এই সন্ধ্যায় আজও বাংলার প্রত্যন্ত গ্রাম-গ্রামাঞ্চলে কচিকাঁচার দল চুপড়িতে ঘেঁটুফুল সাজিয়ে ঘুরে বেড়ায় বাড়ি বাড়ি। একক বা সমবেত কণ্ঠে ‘ঘেঁটু যায় ঘেঁটু যায় গৃহস্থের বাড়ি/ ঘেঁটুকে দাও গো পয়সা কড়ি’ অথবা ‘ঘেঁটু এল ঘেঁটু এল গৃহস্থবাড়ি/ চাল দাও গো তাড়াতাড়ি’ গীতলহরীতে মুখরিত হয় পল্লীর অঙ্গন।

তারপর পুজোর শেষে চর্মরোগ দূর করার প্রতীকী বিশ্বাস থেকে ঘেঁটুর চুপড়ি বা পালকি লাঠির আঘাতে ভেঙে ফেলা হয়। কচিকাঁচার দল সংগৃহীত চাল-ডাল-আলু এবং খুচরো পয়সা নিয়ে দু’একদিনের মধ্যেই আয়োজন করে চড়ুইভাতির। ধুলো ওড়া মাঠে অথবা বাগানে গরম হাই-ওঠা ভাত-খিচুড়ির ঘ্রাণই আলাদা!
অনেক কাহিনিতে লৌকিক দেবতা ঘণ্টাকর্ণ শিবের অনুচর। ভাবতে ভাল লাগে বিষয়টা। কেমন শিবের আগমনের পূর্বে তাঁর অনুচরের এই আসা। যেন অনুচর আগে এসে দেবাদিদেবের আগমনের বাতাবরণ তৈরি করে যান। শিবের সঙ্গে চৈত্রপ্রকৃতির বেশ মিল পরিলক্ষিত হয়। চৈত্র ঠিক যেন শিবের মতো ধ্যানমগ্ন যোগী। সর্বাঙ্গ ভস্ম বা বিভূতি-মণ্ডিত ভোলা মহেশ্বর যেমন সৃষ্টির নশ্বরতা বা বৈরাগ্য নির্দেশ করে, চৈত্রের রুদ্ররূপও তেমন বর্ষ-অবসানের বার্তা প্রকৃতির মধ্যে সঞ্চারিত করে।
পিঠে বঁড়শি গেঁথে চড়ক গাছে ঝুলে বাণ ফোঁড়া, আগুন বা জ্বলন্ত অঙ্গারের উপর দিয়ে হেঁটে চলা, কাঁটা বা ছুরির ওপর লাফানো, জিভে বা শরীরের অন্য স্থানে সূঁচ ফোঁড়ানো— এসবই সেই কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনার অঙ্গ।
চৈত্রমাস আক্ষরিক অর্থে শিবের মাস। গ্রামীণ বাংলার এক গুরুত্বপূর্ণ লৌকিক উৎসব শিবের গাজন। সারা মাস বা মাসের শেষ ক’দিন কঠোর সন্ন্যাসব্রত পালনের মাধ্যমে শিবভক্তরা বর্ষশেষের সংক্রান্তির চড়ক উৎসবের জন্য নিজেদের তৈরি করেন। গাজন শব্দটির উৎপত্তি ‘গর্জন’ থেকে। সন্ন্যাসী কণ্ঠে শিবের গান গাজন উৎসবের অন্যতম অংশ। গাজনের মূল লক্ষ্য শিবের সন্তোষসাধন, যার মাধ্যমে ভক্তজন সংসারে সুখ-শান্তি-সমৃদ্ধি লাভ করতে পারেন। আর শিবকে সন্তুষ্ট করার জন্য শিবভক্ত সন্ন্যাসীরা কৃচ্ছ্রসাধনকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যান।
পিঠে বঁড়শি গেঁথে চড়ক গাছে ঝুলে বাণ ফোঁড়া, আগুন বা জ্বলন্ত অঙ্গারের উপর দিয়ে হেঁটে চলা, কাঁটা বা ছুরির ওপর লাফানো, জিভে বা শরীরের অন্য স্থানে সূঁচ ফোঁড়ানো— এসবই সেই কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনার অঙ্গ।

গাজনের উদ্দেশ্য শিবের প্রতি ভক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে বিগত বছরের পাপমোচন এবং নতুন বছরের সমৃদ্ধি কামনা। শুধু সমৃদ্ধি কামনাতেই চৈত্র শেষ হয় না, সন্তানের মঙ্গলের জন্য চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন নীলষষ্ঠী হিসেবে পালিত হয়। সারাদিন নির্জলা উপবাসে থাকার পর মায়েরা শিবলিঙ্গে জল এবং দুধ ঢালেন, পূজা নিবেদন করেন। দিনের বেলায় শিব-পার্বতীর সাজে সন্ন্যাসীরা বাড়ি বাড়ি ভিক্ষা করে বেড়ান। এর অনুষঙ্গ হয়তো সর্বত্যাগী দেবাদিদেব মহাদেবের ভিক্ষার ঝুলি পূর্ণকারী দেবী অন্নপূর্ণা, যাঁর পূজা এই চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিতে অনুষ্ঠিত হয়।
নীলষষ্ঠীর সন্ধ্যায় শিব-পার্বতী তথা নীল-নীলাবতীর বিয়ের উৎসব হিসেবে পালিত হয় নীলপুজো। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে দক্ষযজ্ঞে সতীর দেহত্যাগের পর তিনি রাজা নীলধ্বজের কন্যা নীলচণ্ডিকা হিসেবে জন্মগ্রহণ করেন। সমুদ্রমন্থনজাত গরল কণ্ঠে ধারণ করে মহাদেব হন নীলকণ্ঠ।
বঙ্গপ্রকৃতিতে অবসান নিয়ে আসে চৈত্র। কিন্তু সেই অবসানের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে নবসৃজনের বার্তা। যা কিছু পুরাতন-ক্লিষ্ট-জরাজীর্ণ, তা পরিত্যাগ করে নব আশা-উদ্যম-উদ্যোগের স্বপ্ন দেখার শুরু চৈত্রাবসানেই।
সেই নীলকণ্ঠ শিবের সঙ্গে নীলচণ্ডিকা তথা নীলাবতীর বিবাহের দিন ছিল চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথি, যা বাংলায় দীর্ঘদিন ধরে চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন পালিত নীলষষ্ঠী হিসেবে প্রচলিত।
বঙ্গপ্রকৃতিতে অবসান নিয়ে আসে চৈত্র। কিন্তু সেই অবসানের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে নবসৃজনের বার্তা। যা কিছু পুরাতন-ক্লিষ্ট-জরাজীর্ণ, তা পরিত্যাগ করে নব আশা-উদ্যম-উদ্যোগের স্বপ্ন দেখার শুরু চৈত্রাবসানেই। বছরের শুরুতে তাই বাংলা নববর্ষের দিনই পালিত হয় হালখাতা, যা হাল ফেরানোর খাতা হিসেবে বঙ্গজীবনে হয়ে ওঠে নতুন সূচনার দ্যোতক।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত