(Good Friday)
বসন্ত নিবু নিবু তখন। ক’দিন আগেই দিন-রাত কেটেছে সমান সমান। ঈশ্বরের সুবিচারে। ক্রমে সেই সুখ ছাপিয়ে যায় পূর্ণিমা। চাঁদের হাসি বানভাসি। চারপাশ যেন ভরাট। যেন এই পৃথিবীর সব কিছু আছে। কিছুই হারায়নি কখনও, হারাতেও পারে না। সুস্বপ্নের অঞ্জন, চোখের সীমানা ছাড়িয়ে করে সাম্রাজ্য বিস্তার। চাঁদের আলোয় সে রাতে তিনিও সুখের শেষ গ্রাস তুলে নিলেন মুখে। তাঁর এক পাশে বিশ্বাস, অন্য পাশে বিশ্বাসঘাতকতা, এক পাশে প্রেম, অন্য পাশে ঘৃণা, দুই পাশে বারোজন অনুগামী, কেউ স্ববেশে, কেউ ছদ্মবেশে। সবার মাঝে নির্বিকার তিনি, প্রেমময়, ঋজু, মেরুদণ্ডী। নৈশাহারে সেদিনের পদ ঝড়ের প্রচ্ছদে থাকা স্নিগ্ধ পেলব হাওয়া।
ধীরে ধীরে মায়া রাত ফুরোয়। প্রতারণার রাত্রিপুষ্পও দলমণ্ডলের আবরণ ভেঙে ফেলে। পরের দিন গলগোথায় আলো ফুটেছিল অন্ধকারের প্রতিনিধি হয়ে। জেরুজালেম থেকে তো খুব বেশি দূর নয়। দেওয়ালের এপার ওপার, অথচ কত ফারাক। একদিকে জীবনের উৎসব, অন্যদিকে হত্যার। মন্ত্রীসান্ত্রী ও মহান ধর্মরক্ষকরা সেদিন রাজপথ আগলে প্রহরায়। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা। কোনও ফাঁক গলে যেন ঢুকে না পড়ে মানবিকতা, বর্রবতার মহা-উদযাপনে।
সুবিস্তৃত রাজপথের উপর থাকা সূর্য সেদিন ম্লান। অগণিত মানুষের চোখের জলে ঝাপসা তার সুনিপুণ রশ্মিফলা। নির্মম কাটাছেঁড়া হবে এক ঐশ্বরিক শরীরের। আঁকা হবে হিংসার মানচিত্র। মধ্যগগনে পৌঁছায় কষ্টের ভাগীদার। চড়া, চরম, দুঃখস্রোতের মতো অনিবার, ক্রুরতার উল্লাস শুরু হয়।
দেখতে দেখতে এভাবেই কেটে যায় এক প্রহর। অ্যানো ডমিনির আরেকটি দিনে বেলা পড়ে আসে। গলা ভেঙে যাওয়ায়, বর্বরতার উন্মত্ত ধ্বনি নিভে যায়। ‘ধর্ম’-এর কাছে ততক্ষণে অমানুষরা ভেট দিয়েছে একটা দেবতুল্য শরীর। কাটাছেঁড়া করতে করতে ক্লান্ত ঘাতকেরাও। পেরেকের গোড়ায় রক্ত জমাট বাঁধছে ধীরে ধীরে।

কে না জানে, একটু আগেও চারপাশে প্রখর রোদ ছিল। সমুদ্রবৎ পাপ আর অন্যায় মেঘে মেঘে ডেকে আনল বিকেল। ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসা রক্তেও বিকেল নামল এবার। বিকেল নেমেছে তার যৌবনসম টকটকে রঙে। নেমেছে বিকেল তাঁর চোখের পাতায়, মায়াময় শরীরী বিভঙ্গে।
ছায়াঘন থইথই বিকেলের সবটাই তাঁর জানা। পূর্বরাতের সুখ জেনেবুঝেই যেন মিশিয়ে দিলেন বৈকালিক এই গ্লানিতে। তবু, আলো নেভার আগে, খানিক অঙ্গহারা আরেক চাঁদের রাত শুরুর আগে, শেষ বাক্য বলে গেলেন নশ্বর জীবনের। কেন্দ্রে রইল একটাই শব্দ, সমস্ত যুদ্ধশেষে নম্র বিকেলের মতো, জীবনের পরম চালিকাশক্তির মতো— ‘ক্ষমা’।
সীমাহীন নৃশংসতা, সুনিপুণ প্রতারণা ও অনন্ত পাপ, মানুষের যাবতীয় বীভৎস ক্লেদের জন্যই ক্ষমা চেয়েছিলেন ঈশ্বরের কাছে। প্রাণের বিনিময়ে ক্ষমা চেয়েছিলেন আর, ক্ষমার বিনিময়ে ভালবাসা। শেষ লগ্নেও এমন গভীর হিসেব তাঁর মতো করে কেই বা কষতে পারে? কেই বা অমন প্রেমের অঙ্ক কষে বলতে পারে ‘ওদের ক্ষমা করে দাও’?
ক্ষমা চেয়েছিলেন তিনি। সীমাহীন নৃশংসতা, সুনিপুণ প্রতারণা ও অনন্ত পাপ, মানুষের যাবতীয় বীভৎস ক্লেদের জন্যই ক্ষমা চেয়েছিলেন ঈশ্বরের কাছে। প্রাণের বিনিময়ে ক্ষমা আর, ক্ষমার বিনিময়ে চেয়েছিলেন ভালবাসা। শেষ লগ্নেও এমন গভীর হিসেব তাঁর মতো কেই বা করতে পারে? কেই বা অমন প্রেমের অঙ্ক কষে বলতে পারে ‘ওদের ক্ষমা করে দাও’?
ভালবাসা দিয়ে আদ্যন্ত গড়া যে মন ও শরীর, ক্ষমা তার ক্ষরণস্বরূপ। যিশু ক্ষমা চাইতে ভোলেননি নিজের ঘাতকদের জন্য। ভালবাসার শরীর থেকে যে রক্ত গড়াল, মহাসময় তাকে পরিণত করল ঈশ্বরপ্রেমীদের প্রিয় পানীয়ে। আবহমান কালের দ্রাক্ষারসে ক্ষমার সমবন্টন হল, মানুষে অমানুষে।

তাঁর ক্ষমা রচনা করে শান্তির মুখবন্ধ। রচনা করে চরম ক্রোধ, গভীর দুঃখ, ও অশেষ হিংসার উপসংহার। চোখের বদলে চোখের অ্যাখ্যান নিষ্প্রভ হয় সেখানে। আপাত অন্ধকার শুক্রবার হয়ে ওঠে গুড ফ্রাইডে। ‘গুড’-এর অর্থ হোলি বা পবিত্র। মৃত্যুতেও যাঁর মৃত্যু হয় না, বরং শুরু হয় অমরত্বের যতিহীন অধ্যায়, তার জন্য পবিত্রতার অ্যাখ্যান ছাড়া আর কীই বা লিখতে পারে কয়েকটি নাতিদীর্ঘ পেরেক! তরুণ মাংস এফোঁড় ওফোঁড় করে, কাঠের গায়ে ধরে রাখতে রাখতে তারাও কখন যেন ক্ষমায় আর্দ্র হয়ে যায়।
ভালবাসা আর ক্ষমা, একটিকে অপরটির পিঠে খোদাই করে দিয়েছিলেন প্রথম জীবনে মিস্ত্রির কাজ করা ওই যুবক। ভালবাসি বলেই ক্ষমা করা যায়। ক্ষমা, সে ভালবাসার জন্যই। জন, ম্যাথিউ, পিটার বা অন্যান্য অনুগামীদের গসপেলে তাই বারবার ফিরে আসে এই শব্দদ্বয়, একে অপরের হাত ধরে। ক্রুশে গাঁথা ঈশ্বরপুত্র মনে করিয়ে দেন ভালবাসা আর ক্ষমা, দুই-ই হতে হয় শর্তহীন। অনুতাপকে মারফত করে দেন কুৎসিত থেকে সুন্দর হয়ে ওঠার।
পিটার প্রশ্ন করেছিলেন যিশুকে। একজনকে ৭ বার ক্ষমা করলেই কি যথেষ্ট? ম্যাথিউয়ের গসপেলে জানা যায় ঈশ্বরপুত্রের উত্তর— তারও ৭০ গুণ। প্রতীকী উত্তর। আদতে ইঙ্গিত অসীমের দিকে। মনের গহনে যার অসীম মানবপ্রেম, গুণে গুণে ক্ষমা করার কথা সে বলবেই বা কী করে!
কতবার ক্ষমা করা উচিত? পিটার প্রশ্ন করেছিলেন যিশুকে। একজনকে ৭ বার ক্ষমা করলেই কি যথেষ্ট? ম্যাথিউয়ের গসপেলে জানা যায় ঈশ্বরপুত্রের উত্তর— তারও ৭০ গুণ। প্রতীকী উত্তর। আদতে ইঙ্গিত অসীমের দিকে। মনের গহনে যার অসীম মানবপ্রেম, গুণে গুণে ক্ষমা করার কথা সে বলবেই বা কী করে!

ক্ষমা-ভালবাসার মতোই বারবার তাঁর বাণীতে স্থান করে নেয় ‘ঈশ্বর যেমন’। ঈশ্বর যেভাবে আমাদের ভালবাসেন, মানুষকে ভালবাসতে হয় সেভাবে। ক্ষমা করা উচিত সেভাবেই, যেভাবে ঈশ্বর আমাদের ক্ষমা করেন। ভোরের মিষ্টি মৃদু আলো যেভাবে রোজ গাঢ় কঠিন অন্ধকারকে ক্ষমা করে, যেভাবে গাছকে ক্ষমা করে ঝরা ফুলেরা রোজ, যেভাবে প্রতিটি শিশু আজও ক্ষমা করে প্রতিটি যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রনেতাকে, ক্ষমা করতে হয় সেভাবেই, বারবার। ঈশ্বর না হোক, ঈশ্বরপ্রতিম হতেই পারে সেই ক্ষমা করার গুণ। সব ভুলে ফের ভালবাসা যায় বলে, ভালবাসতে ভাল লাগে বলে, ভালবাসা ছাড়া আর কিছুতেই সুখ নেই তাই, ও ভালবাসাই অস্তিত্বের প্রথম ও শেষ অনুভূতি বলে, ক্ষমার ভূমিকা লিখে শুরু করা যায় এই মহা অনুভবের যাত্রা।
ভালবাসার টান বড় অমোঘ। ইহলোক পরলোকের দড়ি টানাটানি খেলায় অতিরিক্ত টান মারে এই অনুভব, জিতে যায় নশ্বরের দল, বা হেরেও জিতে যান ঈশ্বর। দেহ চিরঘুমে গেলেও ফিরে আসেন ঈশ্বরপুত্র। রেজারেকশনের অছিলায় লুকোনো থাকে নিখাদ ভালবাসারই টান। জীবন মরণের সীমানা সেখানে বিলীনপ্রায়। দড়ি টানাটানি খেলতে গিয়ে কখন ওই পক্ষ সীমা পেরিয়ে এই পক্ষের ঘাড়ে এসে পড়েছে, বোঝা যায় না। বোঝা যায় শুধু, বড্ড কঠিন, হ্যাঁচকা, নিবিড়, আনন্দঘন সে টান। তাই তাঁকে মানুষের পাশে এসে বসতেই হয়। প্রেমের চুক্তিতে বাঁধা পড়ে একই পঙক্তিতে পরমান্ন গ্রহণ করতে হয় ঈশ্বর ও নশ্বরকে। প্রেমের জোরে নশ্বরেরা স্পর্ধাভরে বলে, ‘আমায় নইলে ত্রিভুবনেশ্বর, তোমার প্রেম হত যে মিছে,…তুমি তাই এসেছ নিচে…’।

গুড ফ্রাইডে থেকে ইস্টার উৎসবের সময়কাল যেন ঈশ্বর ও নশ্বরের এমনই যৌথবাসের কাহিনি। এক পাল্লায় রাখা পাপের জন্য আরেক পাল্লায় ত্যাগ, এক পাল্লার অন্যায়ের বিপ্রতীপে আরেক পাল্লায় ভালবাসা। যতটা না দিলে, যতক্ষণ না দিলে, দুই পাল্লা সমান হয়, ঈশ্বর ততক্ষণ দিতে থাকেন, দিতে শেখানও।
যে ভালবাসা সহজেই হতে পারত, অথচ হয়ে ওঠেনি আজও, সে ভালবাসার কথা মনে করায় তাঁর ফিরে তাকানো বা ফিরে আসা, রেজারেকশন বা ইস্টার। উইকেন্ডের আকাশের কাছে ক্লেদাক্ত উইক ডেজ চেয়ে নেয় সেই ক্ষমা। উইক ডেজের ঈর্ষা-হিংসা-দ্বেষ ভুলে, আরেকবার তাকে ভালবাসে উইকেন্ড। ফের মুখোমুখি বসেন ঈশ্বর ও নশ্বর।
যে ক্ষমা আজও করা হয়নি, অথচ করা যেত সহজেই, সে ক্ষমা করার কথা আরেকবার মনে করায় তাঁর গুড ফ্রাইডে। যে ভালবাসা হতে পারত সহজেই, অথচ হয়ে ওঠেনি আজও, সে ভালবাসার কথা মনে করায় তাঁর ফিরে তাকানো, বা ফিরে আসা, রেজারেকশন বা ইস্টার। উইকেন্ডের আকাশের কাছে ক্লেদাক্ত উইক ডেজ চেয়ে নেয় সেই ক্ষমা। উইক ডেজের ঈর্ষা-হিংসা-দ্বেষ ভুলে, আরেকবার তাকে ভালবাসে উইকেন্ড। ফের মুখোমুখি বসেন ঈশ্বর ও নশ্বর। মাঝে থাকে শুধু রেড ওয়াইন আর ব্রেড থুড়ি ঈশ্বরপুত্র!
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
One Response
বছরের এই একটি সপ্তাহের সুগন্ধ অন্য একান্ন সপ্তাহকে ছাপিয়ে যায়, তার সাঙ্গীতিক উচ্চারণ এই লেখা। আমি আপ্লুত।