(Ujjhomanush 3)
There is no pain you are receding
A distant ship smoke on the horizon
You are only coming through in waves
Your lips move but I can’t hear what you’re saying
When I was a child
I caught a fleeting glimpse
Out of the corner of my eye
I turned to look but it was gone
I cannot put my finger on it now
The child is grown
The dream is gone
I have become comfortably numb
ফোনের ওপারের কণ্ঠস্বরটি শোনা গেল বটে, কিন্তু এত ক্ষীণ ও দুর্বল, যে ওটাকে শোনা যাওয়া ঠিক বলে না। কিন্তু ফোনের এপারে যিনি বসে তা শুনছিলেন, তাঁকে তো শুনতেই হত, তাই তিনি শুনলেন প্রতিটা অক্ষর। শুনলেন গাজ়া থেকে একটি মোবাইল ফোনে ভেসে আসা ছ’বছর বয়সী এক শিশুর আওয়াজ। ঘোরতর বিপন্নতা যাকে খানিক পরেই সম্পূর্ণ রূপে গ্রাস করবে…
—ট্যাঙ্কটা আমার ঠিক পাশেই। এগোচ্ছে…
প্যালেস্টাইনের রেড ক্রিসেন্ট-এর এমার্জেন্সি কল সেন্টারে বসে রানা যথাসম্ভব নিজের কণ্ঠকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছিলেন। প্রশ্ন করলেন, খুব কাছে চলে এসেছে?
বাচ্চাটির উত্তর, হ্যাঁ… খুবই, খুবই…
কিছু পর সে বলে, তোমরা আমায় এসে নিয়ে যাবে? আমার খুব ভয় করছে…

এমনি রানা বা রানার মতো আরও যাঁরা এ কাজে লিপ্ত থাকতেন, তাঁরা এমন অবস্থায়, এমন ফোনালাপে অভ্যস্ত। কিন্তু, সে দিন উল্টো প্রান্তে যে এক শিশু। ধক করে লাগল বললেও, রানার সে ব্যথা, কিছুই ধরা যায় না। রানা তখন অবশ্য কেবল কথা চালিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই করতে পারছিলেন না। ছ’বছর বয়সী সেই বাচ্চাটি, হিন্দ রজাব গাজ়া সিটিতে অসহ্য ধ্বংসের মুখে আটকা পড়েছিল, এবং মায়ের কাছে ফিরে আসার অন্তত একটা উপায় খুঁজছিল বড় কাতরভাবে। তখন হিন্দ তার কাকার গাড়ির ভেতরে লুকিয়ে, আর চার পাশে মৃতদেহের আশ্চর্য আয়োজন… প্রিয়জনেরা যেন এই শেষ বেলায়ও আদরের হিন্দকে ছেড়ে যেতে চায়নি…।
এ সবের মধ্যে, রানার কণ্ঠস্বরই ছিল ইহজগতের সঙ্গে হিন্দের একমাত্র সেতুবাঁধ। নড়বড়েই সই।
আসলে, তাঁরা ভেবেছিলেন শহরের পূর্বদিকে আহলি হাসপাতালে আশ্রয় নেওয়া নিরাপদ হবে। উইসাম ঠিক করেন, তিনি ও বড় ছেলে পায়ে হেঁটে ওদিকে যাবেন, আর বেচারি ছোট্ট হিন্দকে খানিক আরাম দিয়ে, গাড়িতে পাঠিয়ে দেবে। নিরাপদে…
সে দিন সকালে হিন্দ তার কাকা, কাকি ও পাঁচ তুতো দাদা-দিদির সঙ্গে গাজ়ার বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। সোমবার, ২৯ জানুয়ারি। ইজ়রায়েলি সেনা আগেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিল, শহরের মানুষকে বলেছিল, পারলে সরে যেও, না হলে…
হিন্দের মা উইসাম, ঘটনার পরে বলেছিলেন, তাঁদের এলাকায় তখন তীব্র গোলাবর্ষণ চলছিল।
—এমন অবস্থা নতুন কিছু ছিল না, তাও ভয়ে কাঁপছিলাম আমরা সে দিন। এক বার এখানে ছুটি, পর ক্ষণেই অন্যখানে, এয়ারস্ট্রাইক থেকে বাঁচতে।
আসলে, তাঁরা ভেবেছিলেন শহরের পূর্বদিকে আহলি হাসপাতালে আশ্রয় নেওয়া নিরাপদ হবে। উইসাম ঠিক করেন, তিনি ও বড় ছেলে পায়ে হেঁটে ওদিকে যাবেন, আর বেচারি ছোট্ট হিন্দকে খানিক আরাম দিয়ে, গাড়িতে পাঠিয়ে দেবে। নিরাপদে…

—খুব বৃষ্টি হচ্ছিল আসলে, আর সাংঘাতিক ঠান্ডা…
উইসাম বলেছিলেন। কেই বা চায়, আদরবালিকাকে জলে কষ্ট দিতে? অতএব সেই কালো কিয়া পিকান্টো গাড়িতে হিন্দ।
কিন্তু গাড়ি বেরিয়ে যাওয়ার পরমুহূর্তেই যেন, শোনা যায় গুলির শব্দ। গাড়িটি আচমকা ইজ়রায়েলি ট্যাঙ্কের সামনে পড়ে গিয়েছিল। পড়ে গিয়ে থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে তো পড়তেই হয়েছিল, কিন্তু এক সদস্য বুদ্ধি করে কোনও মতে এক আত্মীয়কে ফোন করেন। তাঁদেরই একজন রামাল্লায় রেড ক্রিসেন্টে যোগাযোগ করেন তড়িঘড়ি।
রেড ক্রিসেন্টের টিম থেকে রানা যখন আবার ফোন করেন, তখন ফোন ধরে হিন্দ। ভয়ে তার কণ্ঠস্বর প্রায় শোনাই যাচ্ছিল না। রানার বুঝতে বাকি থাকে না, যে সে-ই একমাত্র জীবিত। আর ইজ়রায়েলি ট্যাঙ্ক থেকে গুলিবর্ষণও সহজে কি থামবার?
দুপুর তখন আড়াইটে। কল সেন্টার থেকে হিন্দের কাকার নম্বরে ফোন করা হলে, ফোন ধরে তাঁর ১৫ বছর বয়সী মেয়ে লায়ান। রেকর্ড করা কলে শোনা যায়, লায়ান বলছে তার বাবা-মা এবং ভাইবোন সবাই মারা গেছে এবং গাড়ির পাশে একটি ট্যাঙ্ক দাঁড়িয়ে আছে। সে বলে— ওরা গুলি চালাচ্ছে…।
ব্যস। এরপর চিৎকার এবং কথা চুপ। চিরতরে চুপ।
রেড ক্রিসেন্টের টিম থেকে রানা যখন আবার ফোন করেন, তখন ফোন ধরে হিন্দ। ভয়ে তার কণ্ঠস্বর প্রায় শোনাই যাচ্ছিল না। রানার বুঝতে বাকি থাকে না, যে সে-ই একমাত্র জীবিত। আর ইজ়রায়েলি ট্যাঙ্ক থেকে গুলিবর্ষণও সহজে কি থামবার?
রানার গলা বসে যেতে শুরু করে, তবুও তিনি অস্ফুটে বলেন— সিটের নিচে লুকিয়ে থাকো, কেউ যেন দেখতে না পায়…।
অপারেটর রানা ফকিহ্ অতঃপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা ছোট্ট হিন্দের সঙ্গে কথা বলে যান। একই সঙ্গে রানা অন্য লাইনে কাকুতি মিনতি করতে থাকেন ইজ়রায়েলি সেনাবাহিনীর কাছে, যেন তাদের অ্যাম্বুলেন্সকে সেখানে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়।

হিন্দ কাঁপছিল, ফুঁপিয়ে কাঁদছিল, মায়ের কাছে যেতে চাইছিল… রানার আজও মনে আছে জলের মতো। রানা বলেছিলেন পরে— হিন্দ বার বার বলছিল, ওর সব আত্মীয় আপাতত ঘুমোচ্ছে। রানা বুঝে ফেলেছিলেন, ক্রমশ ক্ষীণতর হয়ে আসা এ আগামীতে তিনিই হিন্দের শেষতম খড়কুটো। বা কে জানে, ছোট্ট হিন্দ বোধহয় তখনও অন্ধের মতো বিশ্বাস করে যাচ্ছিল, যে বাড়ির ওম ফের তার ভাগ্যে লেখা…
রানা বলেছিলেন— ঘুমোতে দাও ওদের, এই তো আমি আর তুমি কী সুন্দর গল্প জুড়েছি, ওরা ঘুমোক, বিরক্ত করব না ওদের, ঠিক আছে?
হিন্দ রানার কথায় ভুলে যাচ্ছিল বারবার, তবুও মাঝে মধ্যে প্রায় ঢেউ কেটে বেরিয়ে এসে আব্দারি ধুমের মতো ডিজ্ঞেস করছিল— আমায় নিতে আসবে না তুমি? মা আসবে না আমায় নিতে?
মাও কি ছাড়িয়ে যেতে পারে মায়ার সে আঙুল? তা-ই ভয়াবহ ভাঙনকালের সম্মুখীন হয়েও মা জিজ্ঞেস করেছিল আত্মজাকে— কোথায় লেগেছে বল মা…
হিন্দ জিজ্ঞেস করেছিল রানাকে, কত দূর এখান থেকে আমার বাড়ি? রানা বানিয়ে উত্তরও দিয়েছিলেন কিন্তু কিছুই বলতে পারেননি, যখন হঠাৎ হিন্দ বলে বসেছিল— খুব অন্ধকার এখন, জানো…
এই প্রায় অনন্ত কল শুরু হওয়ার ঘণ্টা তিন পর, শেষ পর্যন্ত হিন্দকে উদ্ধারের জন্য একটি অ্যাম্বুলেন্স পাঠানো গিয়েছিল। তার মধ্যে অবশ্য রেড ক্রিসেন্ট টিম হিন্দের মা উইসামের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁকেও লাইনে যুক্ত করে।
মায়ের কণ্ঠ শুনে, যেমনটা নিয়ম, সব বাঁধ ভেঙেছিল হিন্দের। অকাতরে কেঁদেছিল।
মায়ের প্রায় হাতেপায়ে ধরেছিল হিন্দ, যাতে ফোনটা না রাখে।
মাও কি ছাড়িয়ে যেতে পারে মায়ার সে আঙুল? তা-ই ভয়াবহ ভাঙনকালের সম্মুখীন হয়েও মা জিজ্ঞেস করেছিল আত্মজাকে— কোথায় লেগেছে বল মা…

যেন খেলা শেষে সামান্য ছড়ে যাওয়ার খবর নিচ্ছে লাল ওষুধ আর ভালবাসার রোদ্দুর হাতে মা। এক্ষুনি হয়তো বলবে, ওইটুকুতে কেউ কাঁদে? এই দেখ, তোর জন্যে আমি কী বানিয়েছি, তোর প্রিয়…এই সব…
উইসাম কী করে যেন মন স্থির করে মেয়েকে বলেন, কোরান পড়ি আয় আমরা দুইজনে। প্রার্থনা করি চল, দূর থেকেই হাতে হাত ধরে…
হিন্দকে আর পাওয়াই যায়নি, মায়ের সঙ্গে প্রার্থনা করতে করতেই কখন যেন…
পাওয়া যায়নি, সেই অ্যাম্বুলেন্সের দুই কর্মী, ইউসেফ এবং আহমেদকেও, যাঁরা শেষ রানাকে জানিয়েছিলেন, যে শেষমেশ তাঁরা পৌঁছতে পেরেছেন, দূর থেকে দেখতেও পাচ্ছেন হিন্দের গাড়িকে, এই বার ইজ়রায়েলি বাহিনী তাঁদের তল্লাশি করবে।
হিন্দের দাদা বাহা হামাদা সংবাদসংস্থাকে পরে জানিয়েছিলেন, মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ আরও কয়েক মুহূর্ত ছিল হিন্দের, এবং মা উইসাম শেষ যা শুনেছিলেন তা হল গাড়ির দরজা খোলার শব্দ, এবং হিন্দ বলছে যে সে দূরে অ্যাম্বুলেন্স দেখতে পাচ্ছে।
আর আমি, আপনি, সবাই, লেখার আরম্ভে ব্যবহৃত পিঙ্ক ফ্লয়েডের ‘কম্ফর্টেবলি নাম্ব্’ গানটির কথা আত্মস্থ করে, মজ্জাগত জেনে, বসে বসে আশ্চর্য এ দৃশ্যের নীরব দর্শক সাজব।
হিন্দকে আর কখনওই তার মা দেখতে পাননি।
এটাই সত্যি।
এটাই ইতিহাস।
উইসাম অবশ্য এখনও বলেন— প্রতি বার অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ শুনলে ভাবি, হয়তো ও আসছে…
আর আমি, আপনি, সবাই, লেখার আরম্ভে ব্যবহৃত পিঙ্ক ফ্লয়েডের ‘কম্ফর্টেবলি নাম্ব্’ গানটির কথা আত্মস্থ করে, মজ্জাগত জেনে, বসে বসে আশ্চর্য এ দৃশ্যের নীরব দর্শক সাজব।
ইচ্ছে করে, উহ্যমানুষ সাজব।
আর কী অনায়াসে ভুলেও যাব রানাকে…রানাদের। তীব্র ব্যথাদাগের এমনতরো সাতকাহনে যাঁদের প্রকৃত উহ্যমানুষের ভূমিকা ধরিয়ে দেওয়া হয়। অধ্যায় শেষেও যাঁদের পাশে দু’দণ্ড বসে, করুণ ধারাবিবরণী শোনার লোক পাওয়া যায় না।
উইসাম-এর কষ্ট নাগালে পাওয়ার নয়। হ্যাঁ, ঠিক।
আর রানার কষ্ট?
পাড়ে দাঁড়িয়ে ভাঙন দেখা প্রতক্ষ্যদর্শীর বুঝি আম্বিলিকাল কর্ড থাকে না?
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত