(Spring Ending)
বসন্তের এবার যাওয়ার পালা। বাংলা বছরের সব ঋতুই বেশ বোঝা যায় এই নাগরিক জীবনে। ইট-কাঠের জরাজীর্ণ শহরেও যখন ক্ষণস্থায়ী শীতের রোদের তেজ ক্রমে বাড়তে থাকে, তখন তো বোঝাই যায়, বসন্তের ফুল ফোটার সময় হয়ে এল।
আরও পড়ুন: বিস্মৃতির আড়ালে লালবিহারী দে
এ বছর ভারী সুন্দর করে বসন্ত তার কিরণমাখা পাখা মেলে ঝুপুস করে উড়ে এসে বসেছিল আমাদের আম্রপালির ডালে। নজর দিতেই দেখা গেল, সারা গাছ জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে নবজাতক আমের কুশি। সে যে কত ছোট, তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করাই যায় না। বুঝলাম, বসন্ত আগমনের বার্তা জানাচ্ছে।

এবারের বসন্তকাল বড়ই মনোরম ছিল। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে শুরু হয়েছিল। ক্যালেন্ডারে দাগিয়ে দেওয়া ১৪ ফেব্রুয়ারিই ছিল এবার বাংলার বসন্তকালের পয়লা দিন। এক্কেবারে জম্পেশ দিনেই যেন প্রেমিক-প্রেমিকা উন্মুখ হয়েছিল লেকের ধারে বসার জন্য। ভ্যালেনটাইন শুরুর দিন থেকেই সার্চলাইট জ্বালিয়ে দিল তাদের মুখের উপর।
তবে, বাঙালির বাগদেবী ‘মা সরস্বতী’ এবার পঞ্জিকার নির্ঘণ্ট অনুযায়ী বাঙালিদের কাছে আগেই ঘুরে গেছেন। তাঁর ছড়িয়ে যাওয়া বাসন্তী রং প্রকৃতির ক্যানভাসে এক মায়াময় পরিবেশ তৈরি করল। মনে হয়, এই বছর তাই বসন্ত অন্যবারের থেকে আলাদা ছিল। পুরো ফাল্গুন মাস জুড়েই ছিল শহরে উৎসব উৎসব ভাব। আর, সেই রেশ ধরেই চলে এল বাঙালির দোল উৎসব।

লক্ষ্য করলাম, আমাদের শৈশবের দোল ঠিক যেন সেরকম করে আমাকে এখন উতলা করল না। দোল এল এবং চলেও গেল, ফেলে রেখে গেল ছোটবেলার একরাশ মধুর স্মৃতি। মনে পড়ে গেল, আমার মামারবাড়ির কুলদেবতা শ্রীধরের কথা। দোলতলায় তাঁকে ঘিরেই তো কত আনন্দ। দোলের আগের দিনে দৈত্য ম্যাড়াকে বধ করে, তার আবির-রক্তে ছোটদের কপালে টিপ পরানো হত।
আমরা সব ভাইবোনেরা উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপতাম, কারণ ভোর হতেই পিতলের পিচকারি আর বালতির দখল কে নেবে, সে নিয়েই চলত হিসাব-নিকাশের পালা। আমার কাছেও যে ওই পিচকারি আসেনি, তা নয়। বড়রা দোল খেলতে নামতেন বেলা গড়িয়ে গেলে। বসন্তকালের মূল আকর্ষণ যে দোল উৎসব, এই নিয়ে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই।

দোলের পরেই দেখা গেল, বাতাসের তাপ ক্রমশ বাড়ছে। আম্রপালিও ক্রমশ শৈশব পেরিয়ে চলে যাচ্ছে যৌবনে। আর আশেপাশের পলাশ, শিমূল গাছগুলোর গালে লাগছে রক্তিম আভা। ওই চৈত্র বুঝি এল। এবার পাড়ার কালীপদদা সন্ন্যাস নিয়েছে। তারা দল বেঁধে ঢাকঢোল বাজিয়ে ঘরে ঘরে ভিক্ষা চেয়ে বেড়াচ্ছে। বেশ একটা আলাদা এফেক্ট। এই ‘ডিজে’ সংস্কৃতিতে কীরকম যেন মাটির গন্ধ উঠে আসে।
চৈত্র মানেই যেন বিদায়ের সুর। সন্ধ্যেবেলায় এই ব্যস্ত, আধুনিক শহরেও শাঁখের আওয়াজ শোনা যায়। দেখা যায়, সন্ধ্যা-প্রদীপ দেওয়া তুলসি মঞ্চ। আম্রপালির তলায় দাঁড়ালে পাওয়া যায় এক মাতাল করা গন্ধ। বসন্ত আসে, বসন্ত চলে যায়, বুড়োবুড়িরা পরের বারের জন্য অপেক্ষা করেন। তবে বিশু পাগল তার দলবল নিয়ে আমাদের পাড়ার ‘ব্লু টোকাই’তে মহড়ায় মেতে ওঠে। গেয়ে ওঠে ‘তোমায় গান শোনাব’। বসন্ত মুচকি হেসে চলে যায় অন্যখানে, অন্য কোনও কোথাও।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
One Response
খুব ভালো লাগলো সাহানা। তোমার লেখা পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল আমার গালে বসন্ত তার রাঙা পালক বুলিয়ে বলছে এবার আমার পালা হলো সারা। আসছে বছর দেখা হবে কি না কে জানে।এবারের রাঙামাটি পলাশ সিমূল
দক্ষিণে বাতাসের আবেশ নিয়ে ভালো থেকো।