Rahul Sankrityayan
স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দেওয়ার অপরাধে তখন তিনি ছ’মাস জেলে বন্দী। কিন্তু এমনি এমনি সময় কাটিয়ে দেওয়ার লোক তো তিনি নন! জেলে বসেই সংস্কৃতে অনুবাদ করে ফেলছেন কোরান। অন্য আসামিদের শোনাচ্ছেন বেদের মর্মকথা। আবার লিখে ফেলছেন ব্রজবুলি ভাষায় কবিতা। একবার নয়, সারা জীবনে অন্তত ৩-৪ বার জেল খেটেছেন। আর, তাঁর জেল খাটা মানেই নিরন্তর জ্ঞানের চর্চা ও সাহিত্যের পুষ্টিসাধন। ১৯৩৯ সাল নাগাদ জেল খাটার সময় এভাবেই লিখে ফেললেন তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় বই ‘ভোল্গা থেকে গঙ্গা’। কয়েদির নাম রাহুল সাংকৃত্যায়ন।
ভারত ভূখণ্ডকে যেসব মনীষী নিজ প্রতিভায় সমৃদ্ধ করেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম রাহুল সাংকৃত্যায়ন। আসল নাম কেদারনাথ পাণ্ডে। বাবা গোবর্ধন পাণ্ডে, মা কুলবন্তী দেবী। জন্ম ১৮৯৩ সালের ৯ এপ্রিল, উত্তর প্রদেশের আজমগড় জেলার কনৈলা গ্রামের এক ব্রাহ্মণ পরিবারে। বাবা ছিলেন কৃষক। কিন্তু ৫ বছর বয়সে রাহুল সাংকৃত্যায়ন উর্দু শিখতে ভর্তি হন স্থানীয় মাদ্রাসায়।
বিয়ে অতি অল্প বয়সে। কিন্তু ধর্মই তাঁকে টানত বেশি। তাই ৯ বছর বয়সে বেনারসের সাধু বাবার কাছে চলে যান। টিকতে না পেরে অবশ্য ঘরে ফিরে এসেছিলেন। কিন্তু ১৪ বছর বয়সে ফের ঘরছাড়া। গন্তব্য কলকাতা। পকেট গড়ের মাঠ, চাকরিও নেই। ফের বাড়ি ফিরলেন। ফের ১৬ বছর বয়সে কলকাতা যাওয়া। এক তামাকের দোকানে কাজ জুটল। সাধুদের দলে ভিড়ে তামাকের পাশাপাশি অন্য নেশাও হল। কিন্তু ভণ্ড সাধুদের সঙ্গ ভাল লাগল না বেশিদিন। ফের বেরিয়ে পড়লেন। শূন্য পকেটে মাইলের পর মাইল হেঁটে, কখনও বিনা টিকিটে ট্রেনে চড়ে পৌঁছোলেন হরিদ্বার। মাত্র ১৭ বছর বয়সেই দেখা হয়ে গেল চারধাম।
ভিডিও: বাংলা কথাসাহিত্যের হীরে-‘মানিক’ – জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ্য
ধর্মের ব্যাপারে প্রথম থেকেই যেমন একনিষ্ঠ ছিলেন, তেমনই ছিলেন ভণ্ডামির বিরোধী। সেবার অযোধ্যায় পৌঁছে দেখলেন, এক কালীমন্দিরে পাঁঠাবলি হচ্ছে। দেবতার নামে জীবহত্যা আহত করে তাঁকে। পুরোহিতদের ওই কার্যকলাপের প্রতিবাদ করলে, পাল্টা কুৎসার শিকার হতে হয় রাহুল সাংকৃত্যায়নকে। আর্যসমাজের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন দীর্ঘদিন। কিন্তু প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন শাখা পরিভ্রমণের সময় অভ্যন্তরীণ কার্যকলাপ দেখে বিচলিত হন। পরে তাঁর ধর্মীয় ভাবনায় বদল ঘটে অনেকটাই।
আমৃত্যু পরিব্রাজক রাহুল সাংকৃত্যায়ন ভ্রমণ করেছেন তিব্বত, শ্রীলঙ্কা, রাশিয়া, জাপান, ইরান এবং ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে রোমহর্ষক তাঁর তিব্বতযাত্রা। সারনাথ ভ্রমণ ও মহাবোধি সোসাইটির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর বৌদ্ধধর্মে দীক্ষা নেন। প্রাচীন ভারত থেকে হারিয়ে যাওয়া বৌদ্ধ পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করতেই এরপর ছদ্মবেশে পাড়ি দেন তিব্বত। এ পথ তখন দুর্গম, ডাকাতদের আস্তানা।
সন্দেহজনক লোক দেখলে, ভিখারির বেশ ধরতেন তিনি। এভাবে মোট চারবার তিব্বত গিয়ে খচ্চরের পিঠে করে ফিরিয়ে আনেন শয়ে শয়ে দুর্লভ বৌদ্ধ পুঁথি। বর্তমানে সেগুলি সংরক্ষিত পাটনা মিউজিয়ামে।
কেদারনাথ পাণ্ডের রাহুল সাংকৃত্যায়ন হয়ে ওঠার পিছনেও রয়েছে বৌদ্ধ প্রভাব। হিন্দু সাধুসংঘে যোগ দেওয়ার পর, কেদারনাথ হয়েছিলেন রামউধার দাস। বৌদ্ধধর্মে দীক্ষা নেওয়ার পর, বুদ্ধের পুত্র রাহুলের নামে নামাঙ্কিত হলেন তিনি।
ধর্মপ্রাণ রাহুলের রাজনীতিতে বিশেষ আগ্রহ ছিল না। কিন্তু ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল জালিওয়ানওয়ালাবাগের নৃশংস হত্যা তাঁকে বিচলিত করে। তিনি রাজনীতিতে যোগ দিলেন। প্রথম জীবনে কংগ্রেস দলে থাকলেও, পরে রাশিয়ায় গিয়ে মার্কসবাদে আকৃষ্ট হন। দেশে ফিরে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন।
ভিডিও: মুক্তারামের রামকথা – জন্মদিনে শিবরাম
রাহুল সাংকৃত্যায়নের পাণ্ডিত্য সর্বকালেই বিরল বলা চলে। তিনি একাধারে হিন্দি, সংস্কৃত, পালি, তিব্বতি, রুশ, ফারসি এবং ইংরেজিসহ প্রায় ৩৬টি ভাষায় ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন। বইয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন ভাষার ভাষাকোষ রচনাতেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। হিন্দি সাহিত্যের পুনর্জাগরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বৈচিত্র্যময় জীবনে লিখেছেন প্রায় ১৫০টিরও বেশি গ্রন্থ। ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব, দর্শন, জীবনী এবং ভ্রমণকাহিনি— সবক্ষেত্রেই ছিল অবাধ বিচরণ। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলি হল ‘দর্শন দিগদর্শন’, ‘কনৈলা কি কথা’, ‘সিংহ সেনাপতি’, ‘জয় সৌধেয়’।
শ্রীলঙ্কা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনের অধ্যাপক থাকাকালীন তাঁর শরীরের অবনতি হয়। ১৯৬১ সালের ডিসেম্বরে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। অ্যামনেশিয়ার শিকার হয়ে স্মৃতিশক্তি হারান। তার কয়েকদিনের মধ্যে বাকশক্তিও হারাতে হল। রাশিয়ায় দ্বিতীয় স্ত্রী ও পুত্রের কাছে নিয়ে গেলেও, কথা বলতে পারলেন না। সেখান থেকে নিয়ে আসা হল দার্জিলিং-এ। দার্জিলিং-এ থাকাকালীন ১৯৬৩ সালের ১৪ এপ্রিল মহাপ্রয়াণ হয় এই বিরল প্রতিভার।
রাহুল সাংকৃত্যায়নের জীবন কেবলই এক বৈচিত্র্যময় জীবন নয়, শ্বাসপ্রশ্বাস সচল থাকা অবধি ছকভাঙা বহুবিধ কাজ করতে পারার অদম্য সাহসিকতা। অজস্র বিষয়ে অগাধ জ্ঞান, নিবিড় সাহিত্যচর্চা, মানুষের জন্য আন্দোলন ও মানুষের উন্নতিসাধনে কল্যাণকর ধর্মচর্চা তাঁকে চির অমর করে রাখবে ইতিহাসের পাতায়।